• ফুটবল

অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস: নারী ফুটবলে যার আধিপত্য

পোস্টটি ৭৭৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

 

ব্যালন ডি’অরের রাত এখনও অস্পষ্ট। এক মুহূর্তে আমি স্পেন জাতীয় দলের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছেড়ে যাচ্ছি। তারপরেই আমি একটি ব্যক্তিগত বিমানে প্যারিসে যাচ্ছি, তারপর হঠাৎ কিলিয়ান এমবাপ্পে আমাকে ট্রফি তুলে দিচ্ছেন। আমি এই সুন্দর থিয়েটারের দিকে তাকিয়ে আছি এবং সামনের সারিতে দেখছি আমার পরিবার এবং লিও মেসিকে! এটি একটি ঐতিহাসিক রাত ছিল, শুধু আমার জন্য নয়, আমার বার্সা সতীর্থদের জন্য যারা মনোনীত হয়েছিল - আমরা চারজন ছিলাম স্পেন থেকে।

 

কথাগুলি বলছিলেন অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস সেগুরা। তার প্রথম ব্যালন ডি’ অর পাবার অনুষ্ঠান মঞ্চে, ২০২১ সালে। তার পরের বছরও তিনি ব্যালন ডি’ অর জিতে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ পর পর দুই বছর নারী ফুটবলার হিসেবে এই অর্জনের দেখা পান তিনি। স্পেনে জন্ম নেওয়া এই চমৎকার ফুটবলারের কিছু গল্প আসুন জেনে নেওয়া যাক।

 

অ্যালেক্সিয়ার শুরু

১৯৯৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি স্পেনের মোলে দেল ভ্যালিস নামক স্থানের এক ক্রীড়াপ্রেমী পরিবারেই জন্ম অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াসের। পরিবার খেলাধুলা পছন্দ করতো বলে খেলাধুলার সাথে তার যোগ ছিল ছোটবেলা থেকেই। পরিবারের সখ্যতা ছিল বাস্কেটবল খেলার প্রতি। তবে অ্যালেক্সিয়ার বাবা ফুটবলার ছিল আর সেকারণে সে নিজেও সবসময়ই ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা টের পেত। যদিও সে ছোটবেলায় মনে করত, এই খেলাটা শুধুই ছেলেদের জন্য। এবং এর ফলে অনেকটা সময় শুধু ছেলেদের ফুটবল ট্রেনিং দেখতো সে মনোযোগ দিয়ে।

 

[Downloader.la]-64209c972bb0e

 

সিই মার্কান্টাইল নামের একটি লোকাল ক্লাব, যা অ্যালেক্সিয়ার নিজ শহরে অবস্থিত- সেখানে খুব ছোট বয়সেই যুক্ত হয়ে যান তিনি। এরপর অ্যালেক্সিয়ার যখন ১১ বছর বয়স, তখন বার্সেলোনার ইয়ুথ একাডেমিতে ভর্তি হন এবং তা ছিল মাত্র এক বছরের জার্নি। স্পেনে জন্ম হওয়ার কারণে এবং বার্সেলোনার একাডেমিতে যুক্ত থাকবার ফলেও, বার্সেলোনার হয়ে খেলাটা তার জন্য খুব স্বাভাবিক একটা স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অ্যালেক্সিয়ার বয়স যখন ১৬ বছর, তখন তার ডেব্যু হয় এস্পানিওলের হয়ে। যা তার স্বপ্নের ক্লাব বার্সেলোনার হয়ে খেলার আগ মুহূর্তের কথা। মাঝে লেভান্তের হয়েও খেলেন বেশ কিছুদিন। ২০১২ সাল, বার্সেলোনার সাথে যুক্ত হন অ্যালেক্সিয়া। সেটা ছিল তার জন্য স্বপ্ন পূরণের বছর। তারপরের বছর, ২০১৩ সালেই স্পেন দলের হয়ে ডেব্যু হয় অ্যালেক্সিয়ার।

 

অ্যালেক্সিয়ার এই সুন্দর মুহূর্তে থাকা হয়নি তার বাবা জোমে পুতেয়াসের। যে বাবা তাকে ছোটবেলায় ফুটবল খেলার জন্য উৎসাহ যোগাত, তার একাডেমিতে যাতায়াত করবার সঙ্গী ছিল- সেই বাবা, অ্যালেক্সিয়া যখন স্পেন অনূর্ধ্ব উনিশ দলে খেলছে, তখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তাই অ্যালেক্সিয়ার যত অর্জন- সে তার বাবাকে উৎসর্গ করবার কথাই ছলছল চোখে বারবার বলে থাকেন ঐ ঝলমলে মঞ্চগুলিতে।

 

 অ্যালেক্সিয়ার যা যা অর্জন চলমান

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ফিফা কর্তৃক ‘দ্য বেস্ট উইমেন'স প্লেয়ার’ হিসেবে টানা দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হন অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস। আগস্ট ২০২১ থেকে জুলাই ২০২২ পর্যন্ত ৩৪ টি গোল এবং ১৫ টি অ্যাসিস্ট অ্যালেক্সিয়াকে এই অর্জন পেতে সাহায্য করে। এবং বলাই বাহুল্য যে, একমাত্র নারী ফুটবলার হিসেবে ২০২১ এবং ২০২২ সালে ব্যালন ডি’ অর অর্জনও অ্যালেক্সিয়ার নিজের কাছেই।

 

এছাড়াও বার্সেলোনার হয়ে ৬ বার লীগ জিতেছেন। একবার জিতেছেন নারীদের চ্যাম্পিয়নস লীগ। তিনি বার্সেলোনা নারী ফুটবল দলের বর্তমান অধিনায়ক। ৬ বার জিতেছেন ডোমেস্টিক কাপ, ২ বার সুপার কাপ। উয়েফা কর্তৃক বছরের সেরা নারী ফুটবলার হিসেবে ২০২০-২০২১ এবং ২০২১-২০২২ নির্বাচিত হন অ্যালেক্সিয়া। এরপর গ্লোব সকার এওয়ার্ড সহ আরো নানা অর্জন নিজের করে নেন তিনি। স্পেন জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ২০১৫ এবং ২০১৯ বিশ্বকাপ। খুব একটা ভালো করেনি দল, তবুও স্পেনকে শেষ ষোলোতে পৌঁছাতে অ্যালেক্সিয়ার ভূমিকা ছিল বলার মতোই। 

 

[Downloader.la]-64209be308177

 

অ্যালেক্সিয়ার জন্য যেন ফুটবলের সকল খেলোয়াড়ি অর্জনই নিজের মতো সাজিয়ে নেবার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠে যখন খেলেন, তার পজিশন থাকে মিডফিল্ডার, খেলেন ১১ নাম্বার জার্সি পরে। খেলতে খেলতে হঠাৎই হয়ে যান উইংগার, তো এই প্লে-মেকার। দরকার একটা সেটপিস, অ্যালেক্সিয়ার চমৎকার শট খুঁজে নেয় প্রতিপক্ষের জাল।

 

এই বছরই আছে নারীদের ফুটবল বিশ্বকাপ। অ্যালেক্সিয়ার জন্য একটা দলীয় অর্জন যেন ভীষণভাবে আকাঙ্ক্ষিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তার আগে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ইঞ্জুরি, জুন-জুলাইয়ের আগে ফিরতে পারবেননা মাঠে, তাই বিশ্বকাপে খেলা নিয়েও আছে শঙ্কা। তবুও অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস! যেভাবে এগোচ্ছেন, তাতে ক্যারিয়ার শেষে গ্রেটেস্ট অব অল টাইম নারী ফুটবলারদের কাতারে থাকবার জায়গাটা হয়তো সে নিজেই তৈরি করবেন, আর পুরস্কার নিতে গিয়ে মঞ্চে এসে বলবেন, “আমি আশা করি তুমি তোমার কন্যার জন্য গর্ববোধ করছো। এটা তোমার জন্য বাবা, তুমি যেখানেই থাকোনা কেনো।“