• অন্যান্য

বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের প্রতি মানুষের ঝোঁক নেই কেন??

পোস্টটি ৩৯৩ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

খেলাধুলা হলো বাঙালির এক আবেগের জায়গা। এই খেলার জন্য টংয়ের দোকানে কথার লড়াই, মারপিট থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধবদের সাথে ঝগড়াঝাটি, প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদ, সাংসারিক জীবনে কলহ কতকিছুই না করি আমরা। তবে দিনশেষে নিজের সমর্থন করা দল জিতে গেলে সব দুঃখ-কষ্ট আমরা এক নিমিষেই ভুলে যাই। হ্যাঁ, ফুটবল-ক্রিকেট যেন এই এক জায়গাতে মিলেমিশে একাকার।

 

স্বয়ং মান্না দে’র সেই বিখ্যাত গান “সবখেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল” সকল ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে আজও দাগ কাঁটে। তবে হঠাৎই এই বঙ্গদেশে ক্রিকেটীয় সূর্য্যের উদয় ঘটল। ১৯৯৭ সালের ১৩ই এপ্রিল আইসিসির ট্রফির ফাইনাল সব যেন উলটপালট করে দিল। শেষ বলে কেনিয়াকে হারিয়ে ফুটবলপ্রেমী এক জাতিকে ধীরে ধীরে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহী করে তুলল পাইলট-আকরাম খানরা। সুযোগ মিলল বিশ্বকাপে খেলার। 

 

তবে আইসিসি ট্রফি জয়ের এই ২৬ বছরে ক্রিকেটে বাংলাদেশের অর্জনটাই বা কি?? সাকিব, তামিম, মাশরাফি, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহর মতো খেলোয়াড় থাকতেও বারবার হতাশ হতে হয়েছে স্টেডিয়ামভর্তি সমর্থকদের। বিশ্ব ক্রিকেটে বড় কোনো অর্জন না থাকা সত্ত্বেও সবসময় তাদের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখিয়েছেন এদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। তার তুলনায় বাংলাদেশ ফুটবলের কি এক সিকিভাগ সমর্থনও কি প্রাপ্য ছিল না?? দেশের ফুটবলকে সমর্থনের বেলায় বিগত ১০-১৫ বছর ধরে নাক ছিটকে আসছে বাঙালি জাতি। যারা একসময় ফুটবলকে নিজেদের সেরা খেলা হিসেবে দাবি করত আজ তাদের কাছে পছন্দের খেলা জিজ্ঞেস করা হলে ৭০-৮০% লোকই ক্রিকেটের নাম আগে বলবে। সেই ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে প্রতিনিয়ত নাক কাটা যাচ্ছে এদেশের সমর্থকদের।

 

তাই বলে কিন্ত ফুটবলকে ভুলে যায়নি এদেশের মানুষজন। ইউরোপীয় ফুটবলের ডামাডোলে অনেক নির্ঘুম রাত পার করছেন এদেশের ফুটবলপ্রেমীরা। মেসি-রোনালদো-নেইমাররা- এদেশের ফুটবলপ্রেমীদের যেন এক নেশায় বুদ করে রেখেছেন। হালের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্বকাপ, প্রিমিয়ার লীগ, লা-লীগা যেন একেরপর এক দর্শনীয় এবং উত্তেজনাপূর্ন ম্যাচ উপহার দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তবে সব সমস্যা কেবল দেশের ফুটবলের বেলায়। যে দেশের মানুষ ফুটবলে পাগল, বিশ্বকাপের সময়ে অন্য দেশের পতাকায় যে দেশের আকাশ সয়লাব হয়ে যায়, সেই দেশের এমন করুণ অবস্থা সত্যি মেনে নেওয়া কষ্টকর।

 

বর্তমানে মাঠে সেই ৮০-৯০ দশকের আবাহনী বনাম মোহামেডান ম্যাচের দ্বৈরথ দেখা যায় না। বেশিরভাগ খেলাই অনুষ্ঠিত হয় দর্শকশূণ্য মাঠে। অথচ এই ফুটবলই বাংলাদেশের ক্রিড়াঙ্গনে প্রথম সাফল্য নিয়ে আসে। রোকোনুজ্জামান কাঞ্চন, আলফাজ আহমেদ, আমিনুল হকদের হাত ধরেই নিজেদের ঘরের মাঠে দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ খ্যাত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। সেই আসরে বাংলাদেশ ছিল গ্রুপ-বি তে। সেই গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গী ছিল নেপাল, মালদ্বীপ ও ভুটান। টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচে নেপালের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। শক্তির বিচারে নেপালের চেয়ে এগিয়েই ছিল বাংলাদেশ তাই জয়টাই প্রত্যাশিত ছিল। সেই প্রত্যাশা পূরণের কাজটা সহজ করে দেন আলফাজ আহমেদ। তার একমাত্র গোলে  ১-০ গোলের জয় দিয়ে শুভ সূচনা করে বাংলাদেশ।

 

নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে মালদ্বীপের মুখোমুখি হয় জর্জ কোটানের শিষ্যরা। এই ম্যাচেই সেই টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। কারণ মালদ্বীপ নিজেদের প্রথম ম্যাচে ভুটানের বিপক্ষে  ৬-০ গোলের জয় পায়। সেজন্য শুরু থেকেই চড়াও হয়ে খেলতে থাকে বাংলাদেশ। কিন্তু কিছুতেই গোলের দেখা পাচ্ছিল না। অবস্থার পরিবর্তন আনতে খেলার ৬৯তম মিনিটে আগের ম্যাচের গোলদাতা আলফাজের বদলে ফরহাদকে নামান জর্জ কোটান কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হচ্ছিল না। তখনই ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির হন আরিফ খান জয়। ৮৯তম মিনিটে জয়ের করা গোলেই মালদ্বীপের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হয়। নিজেদের শেষ ম্যাচে ভুটানের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। ফরহাদের জোড়া গোল ও কাঞ্চনের গোলে ভুটানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। 

 

গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া সত্ত্বেও সেমিফাইনালে ভারতের মতো কঠিন দলের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। খেলার ৭৭তম মিনিটে দলের প্লে-মেকার আরমানের নেওয়া কর্নার থেকে হেডে গোল করে বাংলাদেশকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন কাঞ্চন। কিন্তু ৮১তম মিনিটে ভারতের আলভিটো ডি সুজার আচমকা এক শটে খেলায় ১-১ এ সমতা চলে আসে। শেষপর্যন্ত ১-১ গোলেই নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষ হয়। তখন ছিল গোল্ডেন গোলের নিয়ম। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে যারা প্রথমে গোল করবে তারাই জয় লাভ করবে। খেলার ৯৮ মিনিটে মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে কিছুটা দৌড়ে এসে প্রায় ২০ গজ দূর থেকে দূরপাল্লার এক শট নেন মতিউর মুন্না। তার অসাধারণ সেই শটে মহাকাঙ্ক্ষিত গোল্ডেন গোল পেয়ে যায় বাংলাদেশ এবং চলে যায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোলের তালিকা করলে মতিউর মুন্নার এই গোল্ডেন গোল হয়তো সবার উপরে থাকবে।

 

ফাইনালে পুনরায় মালদ্বীপের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। ২০ শে জানুয়ারি, ২০০৩। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ম্যাচের ১২তম মিনিটে স্বাগতিক দর্শকদের আনন্দে ভাসান বাংলাদেশের স্ট্রাইকার রোকনুজ্জামান কাঞ্চন। কিন্তু ম্যাচের ৫৭ তম মিনিটে ডানপ্রান্ত থেকে আসা আচমকা ক্রস থেকে গোল করে মালদ্বীপকে সমতায় ফেরান আলি উমর। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ গোলেই শেষ হলে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেমিফাইনালের মতো ফাইনালেও আরেকটু হলেই বাংলাদেশের হয়ে গোল্ডেন গোল করে ফেলেছিলেন মতিউর মুন্না কিন্তু এদফায় তার নেওয়া শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। শেষ পর্যন্ত খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম দুই শটে গোল করেন নজরুল ও ফরহাদ। মালদ্বীপের আহমেদের নেওয়া শট আমিনুল ঠেকাতে না পারলেও আশরাফ লুতফির নেওয়া শট ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন আমিনুল। আমিনুলের এই সেভের কারণে শিরোপা জয়ের খুব কাছাকাছি চলে যায় বাংলাদেশ। এরপর বাংলাদেশের হাসান আল-মামুন ও মাহমুদুল হাসান দলের হয়ে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ পেনাল্টি শটে গোল করেন। অন্যদিকে মালদ্বীপও পরের দুই শটে গোল করায় খেলা গড়ায় পঞ্চম শটে। ভাগ্যনির্ধারণী সেই শট থেকে গোল করে বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত শিরোপা উপহার দেন সুজন। এর আগে অবশ্য এশিয়া কাপ এবং এশিয়ান গেমসেও খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ।

 

আমিনুল হকের ইনজুরির কারণে সেই ফাইনাল ম্যাচে খেলার কথা ছিল না। কিন্তু দেশের এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ কিছুতেই মিস করতে চাইছিলেন না আমিনুল। তাই ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে ফাইনাল খেলতে নামেন। টাইব্রকারে ঠেকিয়ে দেন একটি শট। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ২ গোল হজম করেন। তিনি বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক। সদ্য প্রয়াত সাবেক বাংলাদেশ কোচ জর্জ কোটানের দেখা সেরা গোলরক্ষক ছিলেন তিনি। আলী আশফাক এবং ভাইচুং ভুটিয়ার পাশাপাশি তাকে দক্ষিণ এশিয়ায় সেই প্রজন্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলারদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। হকের পজিশনিং সেন্স এবং অ্যাবিলিটি তাকে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক করে তোলে। তার ভেতরে একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিককে দেখতে পেতো ফুটবলপ্রেমীরা। ইংলিশ ক্লাব নিউক্যাসেল ইউনাইটেডে খেলার সুযোগ থাকলেও সেটা কিছু কমিউনিকেশন প্রবলেমের কারণে সম্ভব হয়নি। অথচ এই সাফজয়ী দেশবরেণ্য ক্রীড়াবিদ, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও গোলরক্ষক আমিনুল হককে কি আমরা যোগ্য সম্মান দিতে পেরেছি??

 

সাফ জয়ের পর পেরিয়ে গেছে দুই দশক। ফুটবলেও বলার মতো সেরকম কোনো সাফল্য নেই। মাঝখানে ভুটানের কাছে হেরে দুইবছরের নির্বাসনে যেতে হয়েছিল জাতীয় ফুটবল দলকে। তবে স্প্যানিশ কোচ হাবিয়ের কাবরেরার হাত ধরে সুদিন ফিরতে চলেছে দেশের ফুটবলে। মালদ্বীপকে হারিয়ে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডে পা রাখল বাংলাদেশ। সেখানে প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, লেবানন, প্যালেস্টাইন। যে বিশ্বমঞ্চে খেলার স্বপ্ন আলফাজ আহমেদ, রোকনুজ্জামান কাঞ্চন  এবং আমিনুল হকরা দেখতেন সেটাই হালের জামাল ভূঁইয়া, মোরসালিন, রাকিব, তারিক কাজীরা দেখছেন। হোক না সামনের পথ অনেক কঠিন তো আমরা কি পারি না দেশের ফুটবলের নবজাগরণে তাদের সমর্থন দিতে?? ক্রিকেটের মতো তাদেরও তো আমাদের মতো সমর্থকদের সমর্থন প্রাপ্য।

 

তাই আসুন সবাই দেশকে ভালোবাসি, ফুটবলকে ভালোবাসি, দেশের ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করি, ইউরোপীয় ফুটবলের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত মাঠে গিয়ে নিজের দেশের খেলা উপভোগ করি।

 

ধৈর্য্য ধরে এতক্ষণ পড়ার জন্য ধন্যবাদ সকলকে।