• ফুটবল

গোলবলের অর্ধশতক- প্রথম পর্ব

পোস্টটি ২০৯ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

ওলেহ ব্লোখিন: সোভিয়েত আগ্রাসনের আড়াল থেকে উঠে আসা সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার

 

স্পষ্টভাবে বলতে গেলে ষাটের দশকের শেষের দিকে ভ্যালেরি লোবানভস্কির দ্বারা পরিচালিত কিংবদন্তিতুল্য দিনামো কিয়েভ ছিল ব্যাপকভাবে সুনির্দিষ্ট এবং বৈজ্ঞানিক মেশিনের এক উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা। তবে সেই দুর্দান্ত এবং অসাধ্য সাধন করা স্কোয়াডের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আগুনের এক ক্ষুদ্রকায় স্ফুলিঙ্গ সময়ের ব্যবধানে দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করে- নাম তাঁর ওলেহ ব্লোখিন।

 

প্রায় সময়ই লোবানভস্কি ম্যাচ চলাকালীন সময়ে ড্রেসিংরুমে তার খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলতেন, "তোমরা বেশি ভেবো না! আমি তোমাদের জন্য বেশ চিন্তাভাবনা করি। তোমরা তোমাদের স্বভাবসুলভ খেলাটাই খেলো!" ব্লোখিন অবশ্য তার বাকি সব সতীর্থদের মতোই নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারতেন, কিন্তু তিনিও যে তার মায়ের দেখানো পথ অনুসরণ না করে অনেকটা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে সেরা ক্রিড়াবিদ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সঙ্গত কারণেই তখন বেশ গুজব উঠেছিল যে কিংবদন্তি স্প্রিন্টার এবং ১৯৭২ সালে মিউনিখ অলিম্পিকে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে স্বর্ণপদকজয়ী ভ্যালেরি বোরজভের চেয়েও দ্রুত গতিতে ছুটতে পারতেন ব্লোখিন।

 

ব্লোখিন শারীরিকভাবে যেমন শক্তিশালী ছিলেন তেমনই মাঠের খেলায় তার চিন্তাভাবনাও ছিল অসাধারণ। বল নিয়ে বিদুৎগতিতে ছোটার পাশাপাশি তার মারাত্মক ফিনিশিংয়ের দরুন নিছকই তাকে সেই সময়ের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করে। তবে ব্লোখিনকে তার যে গুণ বাকিদের থেকে আলাদা করেছিল সেটা হলো তার বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা। তিনি তার নাগালের মধ্যে থাকা প্রায় প্রতিটি রেকর্ড দুই থেকে তিনবার করে ভেঙেছিলেন। যেমন-  দিনামো কিয়েভের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, সোভিয়েত লীগে সর্বোচ্চ গোলদাতা, সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ গোলদাতা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সোভিয়েতের জার্সিতে সর্বাধিক ম্যাচ, প্রথম ইউক্রেনীয় হিসেবে ব্যালন ডি'অর, সোভিয়েত উচ্চতর লীগে সর্বাধিক  শিরোপা। ব্লোখিন যদি চাকরির সাক্ষাৎকারের জন্য তার নিজস্ব সিভি তৈরি করতেন সেটা নিসন্দেহে প্রায় দিগন্তের ওপারে প্রসারিত হতো।

 

১৯৭৫ সালে এক দর্শনীয় মৌসুমের উপহার দেয় দিনামো কিয়েভ। লোবানভস্কির দলকে উয়েফা কাপ উইনার্স কাপ শিরোপা জেতানোর পরেই ব্লোখিন ইউরোপের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। কেননা সেবছরই ইউরোপিয়ান সুপার কাপে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, সেপ মায়ার, কার্ল-হেইঞ্জ রুমিনেগে এবং গার্ড মুলারের দুর্দান্ত বায়ার্ন মিউনিখ দলের বিপক্ষে তিনি যে জাদু দেখিয়েছিলেন সেটা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত।

 

মিউনিখে ইউরোপিয়ান সুপার কাপের প্রথম লেগে ম্যাচের এক মুহূর্তে দিনামোর পেনাল্টি এরিয়ার ঠিক বাইরে বায়ার্নের আক্রমণ নস্যাৎ হয়ে যায়। নিজেদের অর্ধের ভিতরে যখন বলটি ব্লোখিনের দিকে বাড়ানো হলো, তখন তার মাথায় কেবল একটি জিনিসই ঘুরপাক খাচ্ছিল। তিনি বল নিয়ে প্রায় অর্ধেক পথে চলে গিয়েছিলেন, জর্জি শোয়ার্জেনবেককে কাটিয়ে পাস দেওয়ার জন্য নিজের সতীর্থদের খুঁজছিলেন। কিন্তু তারপরও তার কোনো সতীর্থকে না দেখতে পেয়ে তাই তিনি একাই বল নিয়ে দৌঁড়ে  যান।

 

যতক্ষণে তিনি পেনাল্টি এরিয়ার প্রান্তে ঢুকে পরেছিলেন ততক্ষণে বায়ার্ন ডিফেন্ডাররা নিজেদের পজিশন পুনরায় নিয়ে ফেলেছিল। তবে ব্লোখিন কেবল তাদের মধ্য দিয়ে নিজের শরীরটাকে ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি এই সিদ্ধান্ত এতটাই দ্রুততার সাথে নেন যে মনে হচ্ছিল সবকিছু আগে থেকেই পূর্বপরিকল্পিত। মূর্তিমান বেকেনবাওয়ারের পাশ দিয়ে নাচতে নাচতে সেপ মায়ারকে বোকা বানিয়ে পরিপাটি ফিনিস করেন ব্লোখেন।

 

এমন বাগ্মিতা ও সৃজনশীলতার অনন্ত নজির খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ছেড়ে ছড়িয়ে পরে গোটা বিশ্বে। তখনকার সময়ে সোভিয়েত খেলোয়াড়দের ২৯ বছর বয়সে পৌঁছানোর পরেই আনুষ্ঠানিকভাবে অন্যদেশে পাড়ি জমানোর অনুমতি দেওয়া হতো তবে ইউরোপের অন্যতম সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ কিয়েভের এই সাদা বনবিড়ালের (দ্য হোয়াইট পুমা; ব্লোখিনের ছদ্মনাম) গন্ধ শুঁকে তাকে দলে ভেড়াতে আগেথেকেই ওত পেতে ছিল।

 

পূর্ববর্তী দুটি প্রত্যাখ্যাত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, ১৯৮১ সালে লস ব্লাঙ্কোসরা ব্লোখিনকে তার খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পরে কোচিংয়ের ভূমিকার প্রস্তাব দিয়ে স্পেনের রাজধানীতে আনার এক লোভনীয় প্রস্তাব দেয়। শর্তাবলী অনুযায়ী ব্লোখিন তার সম্মতি দিয়েছিল বলে জানা যায়। তবে শেষ মুহুর্তে, সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ তাদের তারকাখচিত খেলোয়াড়কে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের জন্য তাকে পাওয়ার আশায় সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং ফলস্বরূপ তিনি তার দেশেই থেকে গিয়েছিলেন।

 

অবশেষে সাত বছর পর যখন তিনি ইউরোপে পাড়ি জমান, নিঃসন্দেহে তখন তার পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি। কেননা এতোদিনে ব্লোখিন তার সেরা সময়টা পার করে এসেছিলেন। তিনি দিনামো কিয়েভে প্রায় দুই দশক কাটানোর পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাগ হওয়ার ঠিক দুইবছর আগে অস্ট্রিয়ার প্রথম বিভাগ ফুটবলে সদ্যই পদোন্নতি পাওয়া ভোরওয়ার্টস স্টেয়ারে পাড়ি জমান। যারা পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময়ে পরে অস্ট্রিয়ার ঘরোয়া ফুটবলের অষ্টম স্তরে খেলছিল এবং তাদেরকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়েছিল। ৩৬ বছর বয়স এবং ক্যারিয়ারের শেষের দিকে দাঁড়িয়ে থাকলেও নিজের দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর বেলায় ব্লোখিন যথেষ্ট ব্যাক্তিত্ব দেখিয়েছিলেন।

 

ব্লোখিনের যথেষ্ট প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও, তার জাতীয় দলের ক্যারিয়ারটি বড় টুর্নামেন্টে সোভিয়েত ইউনিয়নের দুর্বল স্পেলের সাথে বিশেষভাবে মিলে যায়। ১৯৭২ সালে এই ইউক্রেনীয় ফরোয়ার্ডের অভিষেক হয় সোভিয়েত জার্সিতে এবং ঠিক ১৬ বছর পর একই জার্সিতে শেষম্যাচ খেলার মধ্যবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন মাত্র দুটি টুর্নামেন্টে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল - ১৯৮২ এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপ। সম্ভবত ব্লোখিন তার খারাপ সময় এবং পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন।

 

আমার মতে তিনি ক্যরিয়ারে সঠিক সুযোগ পেলে নিশ্চয়ই পুরো বিশ্বকে দেখাতে পারতেন যেটা ইউক্রেনীয়া আগে থেকেই জানত যে, ব্লোখিন সর্বকালের অন্যতম সেরা প্রতিভাধর ফুটবলার ছিলেন।

 

(এই সিরিজটিকে আমি ৫০ টি আলাদা পর্বে ভাগ করেছি। প্রতিটি পর্বে একজন খেলোয়াড়কে আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরব। আশা করি এই সিরিজটি আপনাদের ভালো লাগবে। প্রতি সপ্তাহের রবি-মঙ্গল-বৃহস্পতি বার একটি করে পর্ব আমি পোস্ট করার চেষ্টা করব)