• ক্রিকেট

কান পেতে রই...

ওভালের সেই শেষ না হওয়া করতালির মাঝে ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা এসে ভর করে যেন। 

ক্ষুদ্র একটা মুহুর্ত মিলিয়ে যায় দর্শকদের অভিবাদনধ্বনিতে। অ্যালেস্টার কুক, ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংসে এসে করলেন সেঞ্চুরি, ৩৩তম। হেলমেট খুলে ব্যাটটা ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরিয়ে দর্শকদের অভিবাদন দেওয়ার চেষ্টা করলেন। পরে লাজুক ভঙ্গিতে থামতে বললেন তাদের- খেলা যে শুরু করতেই দিচ্ছেন না তারা। এরও আগে, সেই মুহুর্ত। যে মুহুর্তটার জন্য আপনি অপেক্ষা করে আছেন।

ডানহাতটা মুঠোবন্দি করে কানের কাছে তুললেন একবার, অ্যালেস্টার ন্যাথান কুকের সেঞ্চুরির চিরায়ত উদযাপন। সে উদযাপনটা সমালোচকদের জবাব দেওয়ার জন্য করেন না, বরং অভ্যাসবশতই করেন- কুক বলেছিলেন একবার। আর আপনার শুধু মনে হয়, কুক কান পেতে শুনছেন কিছু। 

যেমন আপনি আপনার প্লেলিস্টে কান পাতেন। অ্যালেস্টার কুক আপনার কাছে একটা খুব পরিচিত, অনেকবার শোনা প্লেলিস্টের মতো। এতোবার শুনেছেন, আপনি জানেন, এরপর কী বাজবে। 

সেই প্লেলিস্টে হুট করেই একটা গান বেজে ওঠে। এটা ছিল সবসময়ই, আপনি সেটা এড়িয়ে গেছেন। বাজাতে চাননি। 


****

সবকিছু স্বাভাবিক। 

রোমাঞ্চকর এক সিরিজ। ডিউক বলের খেল, স্যাম কারানের আবির্ভাব। বিরাট কোহলির একা দাঁড়িয়ে যাওয়া। জেমস অ্যান্ডারসনকে ডাকছে গ্লেন ম্যাকগ্রাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার রেকর্ড। এজবাস্টনে টানটান, লর্ডসে বড় ব্যবধান। ট্রেন্টব্রিজে জয়ের ব্রিজটা ভেঙে পড়া। অ্যালেস্টার কুকের ওপেনিং সঙ্গী হিসেবে কিটন জেনিংসের অনিশ্চিত ভবিষ্যত, কোর্ট-কাচারির অন্ধকার থেকে বেন স্টোকসের মুক্ত জীবনে ফিরে আসা। চোটের সঙ্গে ক্রিস ওকসের লড়াই। মইন আলির হঠাৎ আগমন। আর কুকের ব্যাটে রান-খরা। অস্বাভাবিক কিছু নেই। ইংলিশ গ্রীষ্মে ক্রিকেট চলছে আপন গতিতে, রোমাঞ্চ জাগিয়ে। আর চলছে আপনার প্লেলিস্ট। 

সাউদাম্পটন টেস্টের আগে জো রুট জবাব দিলেন কুকের বিরুদ্ধ ওঠা সমালোচনার। সমালোচনা চলুক, সমস্যা নেই। কুককে হিসাবের খাতা থেকে বাদ দিন, সমস্যা নেই। এমন হলেই বরং ভাল। কুক একটা ডাবল সেঞ্চুরি করে জবাব দেবেন। রুট এমসিজির দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। 

 

কান পেতে রই...

কুক সাউদাম্পটনে রান পেলেন না। ইংল্যান্ড জিতল ঠিকই। জয়ের পর অ্যান্ডারসন-ব্রডকে জড়িয়ে ধরছিলেন, কেমন একটু বেশি আবেগ। আপনি সেসব চিন্তা দূরে সরিয়ে দেন, বিশ্বের এক নম্বর দলের বিপক্ষে সিরিজ জয়ে এমন উদযাপনে অস্বাভাবিক কিছু নেই। আপনার প্লেলিস্ট ঠিকঠাকই চলছে। 

এর আগেই আপনার ফোনটা বিগড়ে গেছে, কাল-সীমানার বন্দিত্ব ফিরে এসেছে আবার। হাতঘড়ির অভ্যাস নেই, সময় দেখতেও তাই পিসিটা অন করতে হয়। জোনাথন অ্যাগনিউয়ের টুইট চোখে পড়ে, বড় কিছু ঘোষণা আসতে পারে ইসিবি থেকে, তিনি আপডেট জানাবেন। ক্ষণিকের জন্য আপনার একটু অস্বাভাবিক লাগে। 

প্যাভিলিয়নে এসে অ্যালেস্টার কুক নামে আপনি গুগল করেন। আপনি জেনে যান, আশঙ্কাটা সত্যি। ওভালে কুক যেটাই করুন, তাতে জবাব দেওয়ার কিছু থাকবে না। 

আপনার প্লেলিস্টের সেই বাজাতে না চাওয়া গানটা শুরু হয়ে গেছে। 

**** 

সে রাতে কী একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন আপনি। 

যে সময়ে ম্যাচ শুরু হওয়ার কথা, সে সময়ের অনেক আগেই হয়ে গেছে। কেমন অদ্ভুতুড়ে পিচে খেলা হচ্ছে। ঢাকায় শীত তখনও শুধু আভাস দিয়ে যায়। সেই সকালে উঠবেন আপনি, নীচের ফ্ল্যাটের ভাইদের কাছ থেকে চাবি নিয়ে রেখেছেন। অ্যাশেজ। ব্রিসবেন, প্রথম টেস্ট। 

ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের রানে পিষ্ট। আর তারপর, ব্যাটিং করে যান অ্যালেস্টার কুক। প্রায় ঝাঁকড়া চুল তখন তার। ব্যাট শুধু এদিক ওদিক হচ্ছে। গ্যাবার দীর্ঘ হওয়া ছায়া মাড়িয়ে কুকের শট এগিয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়াকে ছাড়িয়ে যায় ইংল্যান্ড। তখন ব্রডব্যান্ডের গতি এখনকার ঢাকার থিকথিকে জ্যামে গাড়ির গতির মতো। চলেই না। সারাদিনের খেলা দেখার পরও তাই হাইলাইটস দেখা চাই, স্কাইয়ের কমেন্ট্রি শোনা চাই। ইউটিউবে হাইলাইটস রাতে ডাউনলোড করতে দিয়ে সকালে রোমাঞ্চ নিয়ে প্লে করা। 

 

"নট ইয়েট, নট ইয়েট..."

নাসের হুসেইনের সেই কমেন্ট্রিটা বোধহয় গেঁথে যায় অনেকদিনের জন্য, “টুয়েন্টি ফোর ইয়ারস অফ পেইন ইন অস্ট্রেলিয়া, ফাইনালি দে আর বিটেন অ্যাট হোম বাই ইংল্যান্ড”। স্প্রিংকল ড্যান্স। আর একটা সংখ্যা। ৭৬৬। অ্যালেস্টার কুক, ৫ ম্যাচ, ৭ ইনিংস, ৭৬৬ রান, ১২৭.৬৬ গড়। 

বছর দেড়েক পর স্ট্রাউস চলে যান। অ্যালেস্টার কুকের ওপেনিং সঙ্গী হিসেবে এরপর কতোজন আসেন, হিসাব রাখতে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন আপনি। তবে কুক থাকেন। আপনার প্লেলিস্টের অভ্যাস হয়ে। 

****

ওভালের করতালি থামছে না। মুহুর্তের জন্য মনে হয়, এ করতালি থামবে না। চলতেই থাকবে। চলুক না। যেমন চলেছিল কুকের আবুধাবির সেই ইনিংসটা। যেন কাল-সীমানা পেরিয়ে শুধু ব্যাটিং করে যাচ্ছিলেন কুক! অথবা অন্য কোনও ইনিংসের পর আপনার বন্ধু বা ভাইয়ের টেক্সটার কথা মনে পড়ে আপনার, “ভাই, ওরে থামতে কও। আর কতো খেলবে!”

ওভালে অ্যালেস্টার কুকের সেঞ্চুরি হয়েছে একটু অদ্ভুতভাবে। ওভারথ্রো থেকে। সিঙ্গেল হতো, আরও বাকি থাকতো চার রান। সেই পথটা না চাইতেই পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন তিনি। বছরকয়েক আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে একটা সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন এভাবে। মোহাম্মদ আসিফ কিপারকে থ্রো করতে গিয়ে বাউন্ডারি দিয়েছিলেন ওভারথ্রোতে। কুক উল্লাসে মেতেছিলেন। 

এক সপ্তাহে কুকের সঙ্গে করে ফিরে এসেছে ১২ বছরের স্মৃতি। ফ্ল্যাশব্যাকের মতো করে। ধীরে ধীরে নয়। ঝটকা দিয়ে গেছে স্মৃতি, অতীত-বর্তমানে চলেছে টানাটানি। কুকের সেঞ্চুরি আপনাকে হয়তো ফিরিয়ে নিয়ে গেছে সেই উইন্ডিজ সফরে। অনেক ইনিংস পর সেঞ্চুরি পেলেন। আপনার কোনও বন্ধুর কথা হয়তো মনে পড়ে, যিনি কুককে সেঞ্চুরির সামনে রেখে ঘুমাতে পারেন না। 

আপনার অনুভূতিটা অন্যরকম হওয়ার কথা ছিল। 
 

**** 

জো রুটের এমন একটা ভাব, হয় তিনি অথবা কুক উইকেটটা পেয়েছেন। স্লিপে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কুকের, শেষবারের মতো। টানা চৌদ্দ ওভারের স্পেল করছিলেন অ্যান্ডারসন। ৫৬৩-তে এসে আটকে গেছেন, আরেকটি উইকেট তাকে বানিয়ে দেবে টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ফাস্ট বোলার। অ্যান্ডারসন খুব করে উইকেটটা পেতে চাইছেন। ম্যাকগ্রাকে পরেও ছাড়িয়ে যেতে পারবেন, কিন্তু এরপর যে সেটা দেখার জন্য থাকবেন না কুক, তার ‘বেস্ট মেট’। 

মোহাম্মদ শামির রক্ষণ ভেদ করেন অ্যান্ডারসন। এক হাত ওপরে তুলে সেই পরিচিত উদযাপনটা করেন। সতীর্থদের হাই-ফাইভ পেরিয়ে এসে আলিঙ্গনে সিক্ত হন কুকের। তার আগেই কুকের সঙ্গে হাই-ফাইভ সেরেছেন রুট। কুক, রুটের যিনি 'আইডল'। রুট খুশি, অ্যান্ডারসন খুশি, কুক খুশি। খুশি ওভাল। 

এরপর অ্যান্ডারসন থমকে গেলেন। তাকে সঙ্গে করে মাঠ ছাড়তে চাচ্ছিলেন কুক, অথবা বলছিলেন তাকেই এগিয়ে যেতে। অ্যান্ডারসন রাজি নন। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। 

দাঁড়িয়ে গেল ইংল্যান্ড দল। মোহাম্মদস শামি, জাসপ্রিত বুমরাহ। কুমার ধর্মসেনা, জোয়েল উইলসন। সবাই থমকে দাঁড়িয়েছেন। শুধু সময়টা চলছে। প্লেলিস্টের শেষ গানটা বাজছে। 

ক্যাপটা খুলে হাতে নিলেন, মাথার ওপর ঘুড়িয়ে আনলেন এক চক্কর। দুই পায়ে শিনপ্যাড। ওভালের সীমানা পেরিয়ে গেলেন কুক। ক্যামেরাম্যান ছবি তুলছিলেন বসে থেকে, চুলে একটু আঁচড় কেটে গেলেন! ভারতীয় ক্রিকেটারদের দীর্ঘ সারি, করমর্দনের পালা। ইশান্ত শর্মার সঙ্গে বাড়তি কিছু বললেন, ক্যারিয়ারে একটা উইকেট যে ওই ইশান্তেরই! পেরিয়ে গেলেন নিজের কোচিং স্টাফ, দ্বাদশ ক্রিকেটার হিসেবে থাকা সারের উঠতি তরুণদের। ওভালের ড্রেসিংরুমের বিখ্যাত সিঁড়ি বেয়ে, হারিয়ে গেলেন আড়ালে। 

প্লেলিস্টটা ফুরিয়ে গেল। আপনার প্লেলিস্টটা নিয়ে কুক আড়ালে চলে গেলেন। 

**** 

স্কাইয়ের ইংলিশ গ্রীষ্মের কাভারেজ শেষ। স্কাই-টিমের সদস্যদের বলা হলো তাদের এ মৌসুমে ব্যক্তিগত পছন্দটা বেছে নিতে। নাসের হুসেইন বেছে নিলেন সবচেয়ে সহজটা- রুপকথা। 

স্ক্রিন হলদেটে। ব্যাকগ্রাউন্ডে গ্ল্যাডিয়েটরের মিউজিক, “নাউ উই আর ফ্রি”। 

সে ভিডিওতে দেখাক বা নাই দেখাক, আপনি তখন দেখতে পাচ্ছেন অনেক কিছু। অথবা শুনতে পাচ্ছেন। 

ভারতের প্রতিটি ক্রিকেটার ছুটে এলেন। বিহাইন্ড দ্য স্কয়ারে একেবারে সীমানায় যিনি ছিলেন, অথবা এপাশে। ঋশাভ পান্ট ক্যাচটা ধরে উল্লাস করলেন কিছুক্ষণ, এরপর এসে তার এক সতীর্থের পেছনে দাঁড়ালেন, হাতটা বাড়িয়ে দেওয়ার পর পেছনে একটা চাপড় মেরে অভিনন্দনও জানালেন। নিজে বাঁহাতি, পুরো ক্যারিয়ারটা পড়ে আছে সামনে তার। নিশ্চয়ই, আরেক বাঁহাতি কিংবদন্তির বিদায়টা ছুঁয়ে যায় তাকেও! পান্ট হয়তো আর কারও জন্য একটা প্লেলিস্টের প্রথম অরিজিনাল স্কোরটা তৈরি করলেন এই ওভালেই। 

এমসিজিতেও অস্ট্রেলিয়ানরা ছুটে এসেছিলেন। স্টিভেন স্মিথ এসেছিলেন। এবার বিরাট কোহলি এলেন। স্মিথ, কোহলি- আধুনিক ক্রিকেটের কতো বিনোদনদায়ী বড় বড় নাম। তারাও কুর্ণিশ করেন একজনকে। যিনি ক্রিকেটের আদি ফরম্যাটটা তার গ্রে নিকলসে ভর দিয়ে ভালবেসে গেছেন। 

 

 

হাত দিয়ে চোখটা ঘষলেন একবার। কিন্তু কুক তো ঘামেন না। তাহলে? 

সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজার সময় নেই। আপনি ব্যস্ত কানে হেডফোন লাগিয়ে ওভালের করতালিতে মিশে যেতে। কুকের ব্যাট ঘোরানোর সঙ্গে উঁচুতে উঠছিল সে করতালির তীব্রতা। আর আপনার কানে শুধু তীব্রভাবে বাজছে নাসের হুসেইনের গলা, “ফর ওয়ান লাস্ট টাইম”। 

আর গ্ল্যাডিয়েটরের শেষ দৃশ্যটা ফিরে আসছে। 

“...আই উইল সি ইউ এগেইন। বাট নট ইয়েট, নট ইয়েট”, অ্যান্ডারসন যেন বলছেন কুককে। 

স্কাইয়ের ভিডিও থেমে গেছে। হেডফোনে আর কিছু বাজছে না। আপনি হেডফোন খুলে কানের কাছে অর্ধ-মুঠোবন্দি হাতটা আনেন। 

কান পাতেন, সুদূরে। সেখানে এখন নিস্তব্ধতা। 

আপনি চাইলেও প্লেলিস্টটা রিপিট করতে পারছেন না।