• বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে
  • " />

     

    • বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে

    ফেসবুকও যখন রাব্বিদের 'প্রতিপক্ষ'

    জিম্বাবুয়ের সঙ্গে দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে চট্টগ্রামে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ দলের অনুশীলন চলছে। আর সবার চেয়ে বাড়তি একটু ঘাম ঝরালেন ফজলে মাহমুদ রাব্বি। আগের ম্যাচে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোনো রান না করে আউট হয়ে গেছেন। অনুশীলন শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলছিলেন, ‘বুঝলেন ভাই, ফেসবুকের অ্যাকাউন্ট আপাতত ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিয়েছি। পরিচিত সবাই সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নক দিচ্ছে। আমি যতই বোঝাই, আমি ঠিক আছি, আমি হতাশ নই, সেটা কজন আর বোঝে? এখন ভালো আছি, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম সবকিছু থেকে দূরে আছি। খেলার মধ্যেই ডুবে আছি।’

    ‘চাপের’ কথাটা উহ্য রেখেই চলে গেলেন রাব্বি, তবে সেটা যে অক্টোপাসের শুড়ের মতো চারদিক থেকে আঁকড়ে ধরে আছে, সেটা মুখে না বললেও বোঝা যাচ্ছিল। ঘরোয়া ক্রিকেটে তো অনেক দিন ধরেই খেলছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার চাপ কী জিনিস সেটা টের পাচ্ছেন হাড়ে হাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজ বলয়ের শুভাকাঙ্খীদের সান্ত্বনাও যেন এখন বিষম হয়ে ঠেকছে। আর ভুলেও যদি ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজগুলোতে ঢুঁ মারতেন, তাহলে একেবারে সেরেছিল! বিস্ময়, ক্ষোভ, ক্রোধ ইত্যাদি সব অনুভূতি একসাথে দলা পাকিয়ে আসার কথা তাঁর মধ্যে।

    তবে চাইলেই কি সবসময় পালানো যায়? এই যুগে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম থেকে দূরে থাকাটা পুরাণকালে অনেকটা বাণপ্রস্থে চলে যাওয়ার মতোই। এই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নেই এমন তরুণ খুঁজে বের করা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই। ক্রিকেটাররাই বা তার বাইরে থাকবেন কেন? বাংলাদেশের জাতীয় দলের প্রায় সব ক্রিকেটারেরই ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে অ্যাকাউন্ট আছে। একদম তরুণরা হয়তো একটু বেশি সক্রিয়, কিন্তু সিনিয়ররাও ভার্চুয়াল জগতের হাল হকিকত সম্পর্কে ভালোই ধারণা রাখেন। শীর্ষ ক্রিকেটারদের আবার ভেরিফায়েড ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টও আছে, সেখানে কমবেশি নিয়মিত পোস্ট করেন তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী হচ্ছে না হচ্ছে, সেটা না চাইলেও তাদের নজরে আসে। অনেক ক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যমের চেয়েও অন্তর্জালের সমালোচনার ঝাপটা সরাসরি তাদের গায়ে লাগে। সেটার অন্য একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়াও আছে, সাব্বির রহমান যেমন এখন দলের বাইরে। তবে এই লেখায় সেই আলোচনা প্রাসঙ্গিক নয়।

     

    অভিষেকের আগে অনুশীলনে ফজলে রাব্বি/বিসিবি

    সমস্যা হচ্ছে, একজন নতুন খেলোয়াড়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়টা বড় ঝঞ্ঝামুখর। এই দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতিটাই এমন একটা ফাঁপা, অন্তঃসারশুন্য কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে, নতুন একজনের ব্যর্থতা মেনে নিয়ে তাকে উৎসাহ দেওয়ার চিন্তা করাও এখানে বাতুলতা। ক্যারিয়ারের এক দশকের কাছাকাছি কাটিয়ে দেওয়ার পরও তামিম ইকবালকে যেখানে শুনতে হয়েছে শস্তা কটুক্তি, সেখানে নতুনরা তো রীতিমতো সহজ শিকার। আর ফজলে রাব্বির ক্ষেত্রে বয়সটা যখন ৩০, সেই সমালোচনার পালে হাওয়া দেওয়ার লোকের অভাবও নেই।

    নতুনদের জন্য কাজটা কতটা কঠিন, সেটা আজ বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা নিজেই মনে করিয়ে দিলেন। বললেন, মূলধারার প্রচারমাধ্যমের সঙ্গে এখন ফেসবুক-টুইটারের চাপও নতুনদের জন্য একটা বাধা, ‘একটা খেলোয়াড় যখন জানে যে টিভিতে খেলাটা দেখা হচ্ছে তখন অটোমেটিক প্রেসার চলে আসে। তারপরে হোমে খেলা হলে একটা ক্রাউড তো থাকেই। আর তো ধরেন আমাদের যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আছেই । প্রেস আছে, টিমমেট আছে, পরিবার আছে। এগুলো তো ঘরোয়া ক্রিকেটে নেই। কেউ হয়তো খোঁজও রাখে না। এর সাথে ব্যবধান অনেক বড়। উনিশ-বিশও নয় আসলে। এমনকি ফার্স্ট ক্লাসের সঙ্গেও ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটের ব্যবধান অনেক বড়।’

    এই তো কয়েক দিন আগেই ভারতের নবাগত শ্রেয়াস আইয়ার বলছিলেন, দলে সুযোগ পাওয়ার পর মহেন্দ্র সিং ধোনি তাঁকে ফেসবুক-টুইটার থেকে পুরোপুরি দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বড় আসরে খেলোয়াড়দের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা জারিটা নতুন কিছু নয়। ২০১৫ সালেই পাকিস্তান সেটি করেছিল। নতুন একজনের জন্য তো সেই চাপ আরও কঠিন হওয়ার কথা।

    যুগ পাল্টে গেছে বলেই এই ফেসবুকের ‘চাপটা’ বেশি। এমনিতে খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সময় পত্রিকা-টিভি চ্যানেল থেকে দূরে থাকার ঘটনা অহরহ। শচীন টেন্ডুলকার, বিরাট কোহলি থেকে শুরু করে এই তালিকায় খেলোয়াড়ের অভাব নেই। ওই সময় পত্রিকা না পড়ে দিন পার করা যতটুকু কঠিন ছিল, এই যুগে সারাদিন ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে একবারও ঢুঁ না মেরে পার করাটা তার চেয়ে কঠিন কি না তা নিয়ে তর্ক হতে পারে।

    তবে মূল কথা একটাই। রাব্বিদের এখন টিভি, পত্রিকা বা এসবের পাশাপাশি আরও একটি অদৃশ্য প্রতিপক্ষের সঙ্গেও যুঝতে হচ্ছে- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।