• ক্রিকেট

বাংলাদেশ রেকর্ড গড়তে চায়, কিন্তু...

‘আসলে টেস্ট ক্রিকেটটা রেকর্ডের খেলা। রেকর্ড কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটেই বেশি হয়। আমরাও তাই চাচ্ছি, আমাদের দল এমন কোন রেকর্ডই করুক।’

তাইজুল ইসলাম যখন সংবাদ সম্মেলনে কথাগুলো বলছেন, তিনিও নিজেও বোধ হয় জানেন না বাংলাদেশকে আসলে ঠিক কী রেকর্ড করতে হবে। দুঃস্বপ্নে যা হয়, তার চেয়েও বোধ হয় বেশি কিছু হয়েছে আজ বাংলাদেশের জন্য। সিলেট টেস্টের প্রথম ইনিংসে অলআউট হয়েছে ১৪৩ রানে, জিম্বাবুয়ে এর মধ্যেই ১৪০ রানের লিড নিয়েছে। এই ম্যাচ জেতা বা ড্র করাটাও এখন সিলেটের লালচে হয়ে যাওয়া গ্রিন গ্যালারি একদিনের মধ্যে সবুজ করে ফেলার মতো কঠিন। তবে রেকর্ডের কথাই যখন হচ্ছে, বাংলাদেশকে এমন একটা কীর্তি করতে হবে, যা আগে কখনো করতে পারেনি। বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম ইনিংসের ৭৫ রানের চেয়ে বেশি পিছিয়ে থেকেই জেতার কীর্তি আছে মাত্র একটি। ২০০৬ ফতুল্লা টেস্টে প্রথম ইনিংসে ১৫৮ রানে পিছিয়ে থেকেও জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া, যে ম্যাচ বহুদিন বাংলাদেশের হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়ে আসছে। বাংলাদেশের কাজ কতটা কঠিন (আসলে পড়ুন অসম্ভব), সেটা বুঝিয়ে বলার আসলে দরকার নেই।

তাইজুল অবশ্য দলের হয়ে এখনও সেই আশা ছাড়ছেন না, ‘আসলে ক্রিকেটে কখনো ভাল হবে আবার কখনো খারাপ হবে, এমন সময় কিন্তু আসে। সকালে হয়তো আমাদের সময়টা ভাল কেটেছে। মধ্যাহ্ন বিরতির পর থেকে দুই সেশন আমাদের পক্ষে আসে নি। আমাদের হাতে আরও তিন দিন সময় আছে, আমরা চেষ্টা করব ওদের দ্রুত অল আউট করার। আমরা জয়ের চিন্তাই করছি।’

 এসবই অবশ্য বাঁধা গতের কথা। শেষ উইকেটে জয়ের জন্য ২০০ রান করতে হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দল হারার আগে হার মেনে নেবে না, অন্তত সংবাদ সম্মেলনে। সমস্যা হচ্ছে, তাইজুলের কাছে ব্যাটিং ব্যর্থতার খুঁটিনাটি জানতে চাওয়ারও উপায় নেই। টেস্টের রীতি মেনে দলের হয়ে দিনের সেরা পারফর্মারই কথা বলেছেন। কে জানত, তাঁর সোনালী সকালটা সতীর্থদের ব্যর্থতার বিষণ্ণ অপরাহ্নে এভাবে ম্লান হয়ে যাবে?

ব্যাটসম্যানদের কাঠগড়ায় তোলার কারণের অবশ্য অভাব নেই। টানা সাত ইনিংসে দলের রান ১৭০ পার করেনি, টেস্ট ব্যাটিংটা যেন ভুলেই গেছে বাংলাদেশ। অবশ্য পারত কবে, সেই প্রশ্নও তুলতে পারেন। সাকিব-তামিম না থাকার অজুহাত যদি দেন, তাহলে সেটার চেয়ে হাস্যকর কিছু হওয়া কঠিন। কদিন আগেই সাকিব-তামিমকে ছাড়া ওয়ানডেতে হেসেখেলে জিতেছে। রঙিন পোশাক বদলে সাদা পোশাক পরতেই সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল কেন?

উত্তরটা লুকিয়ে যতটা না ব্যাটসম্যানদের সামর্থ্যে, তার চেয়েও বেশি মানসিকতায়। এই উইকেটে কীভাবে ব্যাট করতে হয়, প্রথম দিনে সেটা দেখিয়েছেন শন উইলিয়ামস আর দ্বিতীয় দিনে পিটার মুর ও আরিফুল হক। এখানে রান করা খুব সহজ নয়, কিন্তু উইকেট না দিলে আউট হওয়াও কঠিন। যেটির প্রমাণ আজ বাংলাদেশ দল খুব ভালোভাবেই দিয়েছে। শীর্ষ সাত ব্যাটসম্যানের মধ্যে শুধু মুমিনুল হক আর মুশফিকুর রহিমই শট না খেলে আউট হয়েছেন। এই দুজনও এমন কোনো আনপ্লেয়েবল বলে আউট হননি, দুজনের মনযোগটাই নড়ে গিয়েছিল ওই মুহূর্তে। তবে বোলাররা তাতে কিছুটা কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন।

বাকিদের কথা বলতে আসলে গা উজাড় হয়ে যাবে। ইমরুল আর মাহমুদউল্লাহ যেমন অফ স্টাম্পের বাইরের বল অবিশ্বাস্যরকম আলসেমিতে ভরা শটে টেনে নিয়ে এসেছেন স্টাম্পে। লিটন দাস শরীর থেকে দূরে শট খেলে টেস্টে তাঁর ওপেনিং করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নাজমুল হোসেন শান্ত নতুন হলেও যেভাবে খোঁচা মেরে আউট হয়েছেন, তাতে তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। মেহেদী হাসান মিরাজ উইলিয়ামসের যে বলে আউট হয়েছেন, সেটাতে চেষ্টা করেও আউট হওয়া কঠিন।

তবে আরিফুল হককে দেখে কিছু শিখতে পারেন তাঁরা। প্রতিটা বল দেখেশুনে খেলেছেন, অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নেননি। উইকেটে পড়ে থাকলে রান ধীরে হলেও আসবে, সেটাও দেখিয়েছেন। অথচ এই ম্যাচেই তাঁর অভিষেক, শেষে ওই পাগুলে রান আউট না হলে পেয়ে যেতে পারতেন ফিফটিও।

তাইজুল অবশ্য বলেছেন, এরকম একটা খারাপ দিন আসতেই পারে যে কোনো দলের। কথাটা অযৌক্তিক নয় মোটেই, কিন্তু দলটা বাংলাদেশ বলেই শুধু খারাপ দিন বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানদের টেস্টে আউট করার যে সহজ ফর্মুলা, একটা ভালো শট খেলার পরেই মনযোগ হারিয়ে ফেলা- সেটাই কাজে লাগিয়েছে জিম্বাবুয়ে। জার্ভিসের বলে চার মারার পরের বলটাই তাই মুশফিক খোঁচা দিয়ে দেন। চার মারার দুই বলের মধ্যে যেমন লিটন ও শান্ত উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন। টেস্ট ম্যাচের দ্বিতীয় দিনে ৫০ ওভার পার করতেই হিমশিম খেয়ে যায় দল, সর্বোচ্চ স্কোর আসে একজন অভিষিক্তের কাছ থেকে। সাদা পোশাকে প্রায় দুই দশক পার করার পরও এই ধৈর্য হারিয়ে ফেলার দুষ্টচক্র চলছেই।

টেস্ট ব্যাটিং ভুলে গেছে বাংলাদেশ- এটা আসলে শিরোনাম নয়। বরং টেস্ট ব্যাটিং পারত কবে, সেটাই প্রশ্ন।