• ফুটবল

চেলসিতে রঙ হারিয়েছেন যে ৫ স্ট্রাইকার

এসি মিলান থেকে চেলসিতে যোগ দিয়েছেন আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার গঞ্জালো হিগুয়াইন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গোলখরায় ভোগা ‘ব্লুজ’দের জন্য হিগুয়াইনের দলে যোগ দেওয়া অবশ্যই ইতিবাচক দিক। কিন্তু প্রিমিয়ার লিগে নিজেকে প্রমাণ করার চেয়েও হয়ত চেলসির সাম্প্রতিক স্ট্রাইকার ‘জুজু’ কাটানোই হবে ‘এল পিপিতা’র মূল চ্যালেঞ্জ। বড় চুক্তিতে চেলসিতে এসেও এর আগে নামকরা সব স্ট্রাইকাররা রঙ হারিয়েছেন। স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে হিগুয়াইনের ভাগ্যে কী আছে সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে অন্তত এই ৫ জনের উত্তরসূরী হইতে চাইবেন না তিনি...

 

১) আন্দ্রে শেভচেঙ্কো

শৈশবের ক্লাব ডায়নামো কিয়েভের হয়ে ন্যু ক্যাম্পে বার্সেলোনার বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগে হ্যাটট্রিক করে ইউরোপের সেরা ক্লাবগুলোর নজর কেড়েছিলেন আন্দ্রেই শেভচেঙ্কো। প্রায় ২৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করে তখনকার ট্রান্সফার রেকর্ড ভেঙ্গেই তাঁকে দলে নিয়েছিল এসি মিলান। ‘রোজ্জোনেরি’দের সর্বজয়ী দলের স্ট্রাইকার শেভচেঙ্কো জিতেছিলেন সবই। ২০০৬ সালে তাকে প্রিমিয়ার লিগের রেকর্ড গড়ে দলে নেয় চেলসি। প্রত্যাশা ছিল পর্বতসম। কিন্তু বছর পাঁচেক আগের বিশ্বসেরা শেভচেঙ্কো চেলসির আস্থার প্রতিদান দিতে পারেননি একেবারেই।

 

 

‘ব্লুজ’দের হয়ে শুরুটা অবশ্য দারুণই ছিল তার। গোল পেয়েছিলেন প্রথম দুই ম্যাচেই। কিন্তু এরপর থেকেই একেবারেই ফর্ম হারিয়ে ফেলেন ‘শেভা’। ইনজুরি ভাগ্যটাও সহায় হয়নি খুব একটা। পুরো মৌসুমে ৫১ ম্যাচ খেললেও গোল পেলেন মোটে ১৪টি। মূলত ইতালির অপেক্ষাকৃত মন্থর গতির ফুটবল থেকে হুট করে প্রিমিয়ার লিগের গতিশীল এবং শক্তিমত্তা নির্ভরশীল খেলায় মানিয়ে নিতেই পারেননি তিনি। দ্বিতীয় মৌসুমেও কপাল খোলেনি শেভচেঙ্কোর। মরিনহোর বদলে চেলসির হটসিটে আভরাম গ্রান্ট আসার পর মূল একাদশে জায়গাটাও হারান তিনি। বদলি হিসেবে বেশিরভাগ ম্যাচ খেলা শেভচেঙ্কো ঐ মৌসুমে গোল করেছিলেন মাত্র ৫টি। দুই মৌসুমে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গে চেলসিরও। শেভচেঙ্কোকে ধারে ফেরত পাঠানো হয় এসি মিলানে। সেখানেও নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত শৈশবের ক্লাব কিয়েভে ফিরেই ক্যারিয়ারের ইতি টানেন শেভচেঙ্কো।

 

২) হার্নান ক্রেসপো

শেভচেঙ্কোর মতই এসি মিলান থেকে চেলসিতে যোগ দিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তী স্ট্রাইকার হার্নান ক্রেসপো। প্রায় ১৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে দলে নেয়া হয়েছিল তাকে। ক্রেসপোকে চেলসি সমর্থকদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দিন রীতিমত কানায় কানায় পূর্ণই ছিল স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ। কিন্তু প্রথম মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের সাথে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন ক্রেসপো নিজেও।

 

 

৩১ ম্যাচে মাত্র ১২ গোল করতে পেরেছিলেন আর্জেন্টাইন। পরের মৌসুমেই ধারে এসি মিলানে চলে যান তিনি। কোচ হয়ে আসেন মরিনহো, ক্রেসপোর বদলে চেলসি দলে নেয় তরুণ দিদিয়ের দ্রগবাকে। মরিনহোর প্রথম মৌসুমেই লিগ জেতার পর ক্রেসপোকে ফিরিয়ে আনেন ‘স্পেশাল ওয়ান’। মরিনহোর অধীনে অবশেষে ইংল্যান্ডে নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করেন ক্রেসপো। ঐ মৌসুমে আবারও লিগ যেতে চেলসি, ক্রেসপো করেন ১৮ গোল। ইংল্যান্ডে সাফল্য পেলেও মানসিকভাবে বেশ বিপর্যস্ত ছিলেন ক্রেসপো। পরিবার থাকত ইতালিতে, এর মধ্যে ছোট সন্তান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ায় পরের মৌসুমেই চেলসিকে নিজেই আবেদন জানান তাকে। প্রিয় আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকারের অনুরোধ ঠিকই রেখেছিল চেলসি। চোখের জলে বিদায় জানানো ক্রেসপো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছিলেন ‘ব্লুজ’দের হয়ে, কিন্তু তার ওপর রাখার আস্থার প্রতিদান দিতে ব্যর্থই হয়েছেন তিনি।
 

৩) ফার্নান্দো তোরেস

লিভারপুলের কিংবদন্তী ফরোয়ার্ডদের তালিকা বানালে তার নামটা আসবে শুরুর দিকেই। কিন্তু ২০১১ সালে সবাইকে চমকে দিয়ে দল ছাড়ার ঘোষণা দেন ফার্নান্দো তোরেস। তখনকার প্রিমিয়ার লিগে ট্রান্সফার ফি’র রেকর্ড গড়ে ৫০ মিলিয়নে চেলসিতে যোগ দেন ‘এল নিনো’। লিভারপুল থেকে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারকে দলে ভিড়িয়ে যারপরনাই উচ্ছ্বসিত ছিল চেলসি। কিন্তু চেলসির তোরেসের পারফরম্যান্সে আস্থার প্রতিদান একেবারেই পায়নি ‘ব্লুজ’রা।

 

 

চেলসিতে খেলা মোট ১৭২ ম্যাচে মাত্র ৪৫ গোল করেছিলেন তোরেস। কিন্তু ইউরোপা লিগ ফাইনাল, বার্সার বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনাল সহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছিলেন তিনি। কিন্তু তোরেস কখনোই নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি চেলসির জার্সিতে। শেষ পর্যন্ত এসি মিলানে দুই বছর ধারে কাটিয়ে শৈশবের ক্লাব অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদেই ফিরে যান তোরেস। চেলসিতে নিজের ফর্মহীনতার কারণে ইনজুরির সাথে নিজের মানসিক অবস্থাকেও দায়ী করেছিলেন তোরেস, “চেলসিতে যাওয়ার আগেই হাঁটুর ইনজুরিতে পড়েছিলাম। পুরো মৌসুমই ইনজুরিটা বেশ ভুগিয়েছে আমাকে। কিন্তু চেলসির ফর্মেশন আমার জন্য একেবারেই উপযোগী ছিল না। লিভারপুলের স্টিভের (জেরার্ড) লম্বা পাসগুলো চেলসিতে অনেক বেশি মিস করেছি। সত্যি বলতে চেলসিকে কখনোই দলগতভাবে লিভারপুল বা অ্যাটলেটিকোর মত একতাবদ্ধ মনে হয়নি আমার।” মাত্র বছর তিনেক পরই চেলসি থেকে বিদায় নেন তোরেস। সাফল্যের চেয়ে হতাশা এবং ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস মোড়ানো তিনটি বছর তিনি পার করেছিলেন স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে।

 

৪) আদ্রিয়ান মুটু

রোমানিয়ার সর্বকালের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড ধরা হয় তাকে। পার্মার সর্বজয়ী দল থেকে প্রায় ১৬ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে চেলসিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন মুটু। কেনার পরই তাকে ভূয়সী প্রশংসায় মেতেছিলেন তখনকার কোচ হোসে মরিনহো। কিন্তু মাসখানেক যেতে না যেতেই দুজনের মাঝে সম্পর্কের ছেদ ঘটতে থাকে।
 

 

২০০৪ সালে ডোপটেস্টে পজিটিভ শনাক্ত হওয়ায় ফুটবল থেকে ৭ মাস নিষিদ্ধ করা হয় মুটুকে। এ ব্যাপারে চেলসিকে কিছু না জানানোয় মুটুকে ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে অভিহিত করেন মরিনহো। নিষিদ্ধ হওয়ার আগে খেলা ২৩ ম্যাচে মাত্র ৭ গোল করেছিলেন রোমানিয়ার ফরোয়ার্ড। মুটুকে ‘স্বার্থপর ফুটবলার’ বলেছিলেন ডিফেন্ডার জন টেরি। ফুটবলের চেয়ে নৈশজীবনের দিকেই ঝোঁকটা বেশি থাকায় ক্যারিয়ারে আর কখনোই তেমন সাফল্যের দেখা পাননি মুটু। ডোপটেস্টের সেই ঘটনার কারণে চেলসির নিয়মানুযায়ী ক্লাবের কাছে এখনও ১৬ মিলিয়ন পাউন্ড দেনা আছে মুটুর, যা প্রায় ১৫ বছর পরও শোধ করেননি তিনি।

 

৫) আলভারো মোরাতা

জুভেন্টাস থেকে যখন রিয়াল মাদ্রিদে ফিরে এসেছিলেন, তখন আলভারো মোরাতাকেই রিয়ালের মূল স্ট্রাইকার হিসেবে দেখছিলেন অনেকেই। কিন্তু জিনেদিন জিদানের অধীনে মূল একাদশে একেবারেই সুযোগ পাননি মোরাতা। বিশ্বকাপ সন্নিকটে থাকায় রিয়াল ছেড়ে চেলসিতে পাড়ি জমান তিনি। ‘ব্লুজ’দের সর্বকালের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় এখন তিনিই।

 

 

কিন্তু চেলসিতে এসে প্রায় বছরখানেক পেরিয়ে গেলেও একেবারেই থিতু হতে পারেননি মোরাতা। সেই সাথে জায়গা হয়নি স্পেনের বিশ্বকাপের স্কোয়াডেও। জায়গা হারিয়েছেন অলিভিয়ের জিরুর কাছে। বেশকিছু ম্যাচে স্কোয়াডেও জায়গা হয়নি তার। চেলসিতে খেলা ৪৮ ম্যাচে মাত্র ১৮ গোল করেছেন মোরাতা, যা তার জন্য চেলসির খরচ করা ৬০ মিলিয়ন পাউন্ডের যথার্থতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ একেবারেই। গঞ্জালো হিগুয়াইনকে দলে নিয়ে তাকে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কাছে বিক্রি করে দেবে চেলসি, শোনা যাচ্ছে এমনটাই। তবে ডিয়েগো সিমিওনের দলে ডিয়েগো কস্তা এবং আঁতোয়া গ্রিযমান থাকায় হয়ত সেখানে থিতু হতেও বেশ বেগ পেতে হতে পারে মোরাতার।