• লা লিগা
  • " />

     

    'ভিএআর' বিতর্ক পাশ কাটিয়ে রিয়ালের ডার্বি জয়

    'ভিএআর' বিতর্ক পাশ কাটিয়ে রিয়ালের ডার্বি জয়    

    ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জুভেন্টাসে পাড়ি জমানোর পর রিয়াল মাদ্রিদের আক্রমণের 'নেতা' ভাবা হচ্ছিল তাকেই। কিন্তু মৌসুমের শেষভাগে এসেও তার প্রতি দেখানো আস্থার সিকিভাগও পূরণ করতে পারেননি গ্যারেথ বেল। লা লিগায় ২৪ ম্যাচে গোল করেছিলেন মাত্র ৫টি। ইনজুরি, ফর্মহীনতায় তো মূল একাদশে জায়গাও হারিয়েছিলেন। আজও ছিলেন না শুরু থেকে। কিন্তু আজ যেন নিজেকে প্রমাণ করার মিশনেই নেমেছিলেন তিনি। বেল যেন এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। দারুণ এক গোলে রিয়ালের জয় নিশ্চিত করেছেন তিনিই। আজকের আগে ২০১৮-১৯ লা লিগায় নিজেদের মাঠে হারেনি অ্যাটলেটিকো, গোলোও হজম করেছিল সব মিলিয়ে মাত্র ৩টি। কিন্তু বেলের নিজেকের চেনানোর ম্যাচে ওয়ান্ডা মেট্রোপলিটানোতে অ্যাটলেটিকোকে ৩-১ গোলে হারিয়েছে রিয়াল। 'লস ব্লাঙ্কোস'দের হয়ে গোলের 'সেঞ্চুরি' পূরণ করার এর চেয়ে ভাল উপলক্ষ্য খুব সম্ভবত বেছে নিতে পারতেন না বেল।

    ওয়ান্ডায় রিয়ালের মূল একাদশে বেশ বড়সড় এক চমকই রেখেছিলেন সোলারি। গ্যারেথ বেলের বদলে ডানপ্রান্তে নেমেছিলেন লুকাস ভাজকেজ। কোচের আস্থার পূর্ণ প্রতিদান দিয়েছেন লুকাস। পুরোটা প্রথমার্ধ আক্রমণে বেনজেমাদের যেভাবে পাস যুগিয়েছেন, নিচে নেমে কারভাহালদেরও সাহায্য করেছেন সেভাবেই। লুকাসের জন্যই মাঝমাঠে নিজের সেরা খেলাটা দিতে পেরেছেন টনি ক্রুস, লুকা মদ্রিচরা। প্রথমার্ধে তাদের সামনে পাত্তাই পায়নি কোকেবিহীন অ্যাটলেটিকোর মাঝমাঠ। মাঝমাঠের সাথে আক্রমণের কোনও বোঝাপড়া না থাকায় রিয়ালের রক্ষণভাগকে শুরুর দিকে একেবারেই পরীক্ষায় ফেলতে পারেননি গ্রিযমানরা। নখদন্তহীন অ্যাটলেটিকোর বিপক্ষে সুযোগটা দারুণভাবেই কাজে লাগিয়েছে রিয়াল। অ্যাটলেটিকোর বিপক্ষে সেটপিস থেকে গোল করা যেন নিয়মই বানিয়ে ফেলেছিলেন রিয়াল অধিনায়ক সার্জিও রামোস। আজ রামোসকে কর্ণার বা ফ্রিকিক থেকে কড়া মার্কিংয়েই রেখেছিলেন ডিয়েগো গোডিনরা।

     

     

    কাল হয়ে দাঁড়ায় অ্যাটলেটিকোর রামোস কেন্দ্রিক সেটপিস ট্যাকটিক্স। ১৬ মিনিটে ক্রুসের কর্ণার থেকে তিনজন ডিফেন্ডারের চার্জেও বলে মাথা ছোঁয়ান রামোস। ডিবক্সে ফাঁকা জায়গায় বল পেয়ে যান কাসেমিরো। অ্যাটলেটিকো গোলরক্ষক ইয়ান ওবলাক এগিয়ে আসার আগেই দুর্দান্ত এক বাইসাইকেল কিকে বল জালে জড়ান কাসেমিরো। ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডারের এই গোলটা হয়ত রিয়াল সমর্থকদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল গত মৌসুমে জুভেন্টাসের মাঠে রোনালদোর করা সেই বাইসাইকেল গোলের কথা। এতক্ষণ সমর্থকদের চিৎকারে মুখরিত ওয়ান্ডা মেট্রোপলিটানো এক মুহূর্তের মধ্যেই পরিণত হয় মৃত্যুপুরিতে। লিড নিয়ে আক্রমণের ধারটা আরও বাড়িয়ে দেয় রিয়াল।

    ১৮ মিনিটেই ব্যবধান দ্বিগুণ করতে পারত রিয়াল। গত সপ্তাহে ন্যু ক্যাম্পে বার্সার মত আজ অ্যাটলেটিকোর বিপক্ষেও রিয়ালের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন ভিনিসিয়াস। কিন্তু গত সপ্তাহের মত আজও তার ভুল সিদ্ধান্তে বেশ ভুগতে হয়েছে রিয়ালকে। ২৬ মিনিটে ভিনিসিয়াসের পা থেকে বল কেড়ে নেন আনহেল কোরেয়া। আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের চমৎকার থ্রু পাসে রিয়াল গোলরক্ষক থিবো কর্তোয়াকে একা পেয়ে যান গ্রিযমান। বল জালে জড়াতে ভুল করেননি তিনি। কিন্তু ততক্ষণে অফসাইডের বাঁশি দিয়েছিলেন সহকারী রেফারি। তবে অ্যাটলেটিকোর ত্রাণকর্তা হয়ে আসে ভিডিও রেফারি, সমতায় ফেরে সিমিওনের দল। গোলের পর স্বভাবসুলভ দুর্দান্ত প্রেসিংয়ে রিয়ালকে চেপে ধরে অ্যাটলেটিকো। কিন্তু দ্বিতীয় গোলটা আর করা হয়নি গ্রিযমানদের। পজেশন, গোলের সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে থাকলেও কর্তোয়াকে পরীক্ষায় ফেলা হয়নি অ্যাটলেটিকোর। সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে রিয়াল। আক্রমণভাগে তার 'ডিসিশন মেকিং'-এ বেশ ভুগতে হয়েছে রিয়ালকে। কিন্তু ৪১ মিনিটে সেই ভিনিসিয়াসের দুর্দান্ত ড্রিবলে লিড পুনরোদ্ধারের সু্যোগ পেয়ে যায় রিয়াল। কিন্তু এজন্য ভিডিও রেফারিকে ধন্যবাদ জানাতেই পারে রিয়াল। তরুণ ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডকে ফাউল করে বসেন অ্যাটলেটিকো ডিফেন্ডার সেবাস্তিয়ান আরিয়াস। পেনাল্টির বাঁশি দেন রেফারি। রিপ্লেতে ফাউল ডিবক্সের বাইরে দেখা গেলেও পেনাল্টিরই সিদ্ধান্ত জানায় 'ভিএআর'। ১২ গজ থেকে ওবলাককে পরাস্ত করেন রামোস। গোলের পর রামোসের বুনো উদয়াপনের বিপরীতে গ্রিযমান-মোরাতাদের শূন্যদৃষ্টি যেন পুরো প্রথমার্ধেরই খণ্ডচিত্র।

     

     

    প্রথমার্ধের শেষদিকে পিছিয়ে পড়লেও মনোবল হারায়নি অ্যাটলেটিকো। উল্টো দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই গ্রিযমানদের প্রেসিংয়ে আবারও চাপে পড়ে যায় রিয়াল। দ্বিতীয়ার্ধের মিনিট দশেকের মধ্যেই রিয়ালের জালে আবারও বল পাঠিয়েছিল অ্যাটলেটিকো। কিন্তু মোরাতার গোল বাতিল হয় অফসাইডে। প্রথমার্ধের মত দ্বিতীয়ার্ধেও নিজেদের 'ভিএআর'-এর বিতর্কিত সিদ্ধান্তের  ভুক্তভোগী মানতেই পারে অ্যাটলেটিকো। ৬৩ মিনিটে মোরাতাকে ডিবক্সে ফেলে দেন কাসেমিরো। গোলকিকের বাঁশি দেন রেফারি, বিস্ময়করভাবে 'ভিএআর'-এও বদলায়নি সিদ্ধান্ত। রেফারির একাধিক সিদ্ধান্ত নিজেদের বিপক্ষে যাওয়ায় সেই চাপা ক্ষোভটা যেন মদ্রিচদের ওপরই ঝেড়েছেন অ্যাটলেটিকো ফুটবলাররা। শুধু দ্বিতীয়ার্ধে হলুদ কার্ড দেখতে হয়েছে সিমিওনের দলের ৬জনকে। ৬৯ মিনিটে দারুণ এক সুযোগ পেয়েছিলেন কোরেয়া। কিন্তু এবার দক্ষহাতে শটটি ফিরিয়ে দেন কর্তোয়া।

    অ্যাটলেটিকোর ম্যাচে ফেরার যতটুকু ক্ষীণ সম্ভাবনা বাকি ছিল, ৭৩ মিনিটে তা নি:শেষ করে দেন বেল। প্রতি-আক্রমণে মদ্রিচের থ্রু পাস থেকে বাঁ-পায়ের 'ট্রেডমার্ক' শটে অ্যাটলেটিকোর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেন ওয়েলশ ফরোয়ার্ড। পুরো ম্যাচে তাকে দুয়ো জানিয়েছিলেন অ্যাটলেটিকো সমর্থকেরা, ছুঁড়ে মেরেছিলেন খেলনা ইদুঁরও। বেলের গোলে নিশ্চুপ ওয়ান্ডায় বুনো উল্লাসে মাতলেন কর্তোয়া, শেষ হাসিটাও হাসলেন তিনিই। এই গোলের পর যেন ম্যাচে ফেরার শেষ ইচ্ছাটাও হারিয়ে ফেলে অ্যাটলেটিকো। সিমিওনের দলের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসে ৮০ মিনিটে থমাস পার্টির দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়া। ম্যাচের শেষদিকে গোলের আরও দুটি দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন বেল, কিন্তু হাতছাড়া করেছেন দুটিই। কিন্তু তাতেও হয়ত খুব একটা অপ্রাপ্তি থাকবে না তার। সপ্তাহখানেক আগেই যার মুণ্ডুপাতে ব্যস্ত ছিলেন খোদ মাদ্রিদ সমর্থকেরাই, সেই তাদের কাছে আজ তিনি 'হিরো'- এর চেয়ে বেশি আর কীইবা চাইতে পারতেন বেল!