• দক্ষিণ আফ্রিকা-শ্রীলংকা সিরিজ
  • " />

     

    • দক্ষিণ আফ্রিকা-শ্রীলংকা সিরিজ

    পেরেরা যেদিন লারা হলেন...

    কিলোমিটার বলছে দূরত্বটা ১০ হাজারের, আর সময় বলছে ব্যবধানটা প্রায় ২০ বছরের।

    কখনো কখনো অলৌকিককেও এভাবে এক করে ফেলে ক্রিকেট। ২২ গজে বিলীন হয়ে যায় সময় আর দূরত্বের ব্যবধান। নইলে ২০ বছর আগের ব্রিজটাউন আর আজকের ডারবান এভাবে মিলে যাবে যাবে কোন সমীকরণে? ব্রায়ান লারার ব্যাটে যেদিন ক্রিকেটপাত্র উচ্ছলিয়া উঠেছিল মাধুরী, কুশল পেরেরা সেই দিনটাই এভাবে ফিরিয়ে আনবেন কোন ক্রিকেটদেবতার ইশারায়? ‘ক্রিকেট ইজ অ্যান ওল্ড ফানি গেম’, কথাটা আরও একবার অমোঘ সত্যি হয়ে যাবে কোন চিত্রনাট্যে?

     

     

    মিল খুঁজতে গেলে আসলেই চমকে যেতে হয়। আজ থেকে ২০ বছর আগে ব্রায়ান লারার ব্যাট এভাবে আস্থা রেখেছিল ভীষণ অসম্ভবে, পেরেরার ব্যাটে আজ ভর করেছিলেন যেন ত্রিনিদাদের রাজপুত্র। দুজনেই নেমেছিলেন পাঁচ নম্বরে, দুজনেই ঠিক ১৫৩ রানের ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন, দুজনেই আবার বাঁহাতি। সবচেয়ে বড় মিল, সময়ের ভয়ংকরতম আক্রমণের সামনে চতুর্থ ইনিংসে দুজনকেই তাড়া করতে হয়েছিল ৩০০র বেশি রান। সংখ্যার মিল এখানে শেষ হয়ে যাচ্ছে বটে, কিন্তু প্রেক্ষাপট আর পরিস্থিতির যে মিল, সংখ্যার সাধ্য কি তা বোঝানোর?

     

    সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর আজকের শ্রীলঙ্কার কথাই ধরুন। ১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের আগে ক্যারিবিয় ক্যালিপসো বাজছিল বিষাদের বিউগল হয়ে। সিরিজের আগে দক্ষিণ আফ্রিকাতেই পাঁচ টেস্টে ধবলধোলাই হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, বেতনভাতা নিয়ে বিতর্কজর্জর দলটার পিঠ ঠেকে গিয়েছিল দেয়ালে। পোর্ট অব স্পেনের প্রথম টেস্টে ২১৩ রানের ইনিংসে লারা শুরু করেছিলেন ঘুরে দাঁড়ানোর। যেটি পূর্ণতা পেয়েছিল ব্রিজটাউনের সেই অতিমানবীয় ইনিংসে।

    এই ডারবানের আগেই তো শ্রীলঙ্কা প্রায় সেরকম কোণঠাসাই হয়ে পড়েছিল। অস্ট্রেলিয়াতে বিধ্বস্ত হওয়ার স্মৃতিটা একদম তরতাজা, অধিনায়ক ছাটাইয়ের পর শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের খোলনলচে বদলে ফেলার দাবিটা উঠে গিয়েছিল সরবে। দক্ষিণ আফ্রিকা মাত্রই পাকিস্তানকে সাদা পোশাকে হারিয়েছে, ডারবান টেস্টে দুই দলের প্রথম ইনিংস শেষেও সেরকম একটা চিত্রনাট্যই অপেক্ষা করছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা ৪৪ রানে এগিয়ে, চতুর্থ ইনিংসে শ্রীলঙ্কাকে সামলাতে হবে রাবাদা-ফিল্যান্ডার-স্টেইন-অলিভিয়ের চতুষ্টয়ের তোপ। ২০ বছর আগে অবশ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের আশাটা ছিল আরও ক্ষীণ। ওয়াহ-পন্টিংয়ের সেঞ্চুরির পর প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া করল ৪৯০, শেরউইন ক্যাম্ববেল ব্যাট অমন চওড়া হয়ে ওঠার পরেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ করতে পারল ৩২৯। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ১৪৬ রানে অলআউট হলো বটে, তারপরও ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে ৩০৮ রানের লক্ষ্যটা ছিল ভীষণ শ্বাপদসংকুল এক পথ।

    শ্রীলঙ্কার জন্যও তো পরিস্থিতিটা এবার প্রায় তেমনই ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় ইনিংসে ২৫৯ রানে অলআউট হওয়ার পর শ্রীলঙ্কার লক্ষ্য দাঁড়াল ৩০৪। ডারবানের কিংসমিডে চতুর্থ ইনিংসে ৩০০র বেশি তাড়া করে জেতার কীর্তিই আছে মাত্র দুইটি। কাজটা কতটা কঠিন এটিই তা বলে দিচ্ছে।

    কুশাল পেরেরা যখন নামলেন, তখন সেই কীর্তি যে বেড়ে তিনটি হবে, এমন সম্ভাবনা মনে হচ্ছিল সুদূরপরাহত। ৫২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলেছে শ্রীলঙ্কা, এক সময় যেটি হয়ে গেল ১১০ রানে ৫ উইকেট। এখানেও তো লারার সাথে কত মিল! ব্রিজটাউনে লারা যখন চতুর্থ ইনিংসে নেমেছিলেন, ৭৮ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলে টলছে ক্যারিবিয় নৌকা। খানিক পরেই তা হয়ে গেল ৫ উইকেটে ১০৫। লারা আর পেরেরা, দুজনের সামনে তখন ডিঙি নৌকা নিয়ে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চ্যালেঞ্জ।

    সেই চ্যালেঞ্জের শুরুর ধাপে লারা বৈঠা বাওয়ার জন্য পেয়েছিলেন জিমি অ্যাডামসকে। ষষ্ঠ উইকেটে দুজনের ১৩৩ রানের জুটিতে একটু একটু করে এভারেস্টের দিকে এগুচ্ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কী অদ্ভুত, সেই ষষ্ঠ উইকেটেই পেরেরা আজ দোসর পেলেন দনঞ্জয়া ডি সিলভাকে। দুজনের ৯৬ রানের জুটিটাই শ্রীলঙ্কাকে দেখাচ্ছিল অবিশ্বাস্য কিছুর আশা।

    কিন্তু দুজনেই খানিক পরে আবিষ্কার করলেন, খেলাঘর ভেঙে যাচ্ছে বেদনার বালুচরে। ৬ উইকেটে ২৩৮ রান থেকে দেখতে দেখতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর হয়ে গেল ৮ উইকেটে ২৪৮। তখনও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে করতে হবে ৬০ রান, ক্রিজে শেষ দুই ব্যাটসম্যান কার্টলি অ্যামব্রোস আর কোর্টনি ওয়ালশ। বলতে গেলে লারাকে একাই বাইতে হবে বৈঠা। ম্যাকগ্রা-ওয়ার্ন-গিলেস্পি-ম্যাকগিলদের সামলে সেই কাজটা প্রায় মিশন ইম্পসিবল।

    কুশল পেরেরার সমীকরণটা বরং আরও বেশি কঠিন। ২০৬ রানে দনঞ্জয়ার বিদায়ের পর পরের বলেই লাকমল আউট। আম্বুলদেনিয়া ও রাজিথার বিদায়ে দেখতে দেখতে তা হয়ে গেল ৯ উইকেটে ২২৬। ওদিকে যদি ম্যাকগ্রা-গিলেস্পিরা থাকেন, এদিকে তোপ দাগার জন্য প্রস্তুত রাবাদা-অলিভিয়ের-স্টেইনরা। ভারনন ফিল্যান্ডার চোটের জন্য ছিটকে পড়েছিলেন, এটাই যা একটু পক্ষে ছিল শ্রীলঙ্কার। কিন্তু শেষ উইকেটে ৭৮ রান করা তো তখনও ফেব্রুয়ারির কর্মব্যস্ত দিনে আধ ঘন্টার নোটিশে মিরপুর থেকে টিএসসি পৌঁছে যাওয়ার মতো কঠিন। টেস্ট ক্রিকেট দূরে থাক, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও যে চতুর্থ ইনিংসে শেষ উইকেটে এত রান করে জেতার কীর্তি নেই কোনো দলের!

     

    তবে কিছু কিছু দিনে তো সব হিসেব ওলটপালট হয়ে যায়। ব্রিজটাউনে যেমন অ্যামব্রোসকে নিয়ে লারা যোগ করে ফেললেন ৫৪ রান। এর মধ্যে অ্যামব্রোসের অবদান মাত্র ১২। দুজন অবিচ্ছিন্ন ছিলেন ১০৬ বল, এর মধ্যে অ্যামব্রোসকে খেলতে হয়েছে ৩৯ বল। তবে শেষ পর্যন্ত অ্যামব্রোস যখন আউট হলেন, জয় থেকে তখনো ৭ রানের দূরত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শেষ ব্যাটসম্যান কোর্টনি ওয়ালশ, ব্যাট হাতে যাঁর ওপর আস্থা রাখাটা কঠিন বললেও কম বলা হয়। কিন্তু সেদিন ওয়ালশও কীভাবে কীভাবে যেন আউট না হয়ে খেলে ফেললেন পাঁচটি বল।

    পেরেরার কাঁধ বরং লারার চেয়েও আরও চওড়া হয়ে গেল। শেষ উইকেটে ৭৮ রানের মধ্যে বিশ্ব ফার্নান্ডোকে করতে হলো মাত্র ৬ রান, যার আবার ৪ রানই এসেছে ওভারথ্রো থেকে। দুজনের জুটির সেই ৭৮ রান এলো মাত্র ৯৫ বলে, যার মধ্যে ফার্নান্ডোকে খেলতে হয়েছে ২৭ বল। পেরেরা একাই করেছেন ৬৮ বলে ৬৭, স্টেইন-মহারাজদের নির্মমভাবেই আছড়ে ফেলেছেন সীমানার ওপারে।

    পার্থক্য বলতে একটাই, সেদিন লারার জন্য ব্রিজটাউনের মাঠ হয়ে গিয়েছিল লোকে লোকারণ্য, ভক্তদের আলিঙ্গনে হারিয়ে গিয়েছিলেন মুহূর্তেই। বিদেশ বিভুঁইয়ে পেরেরাকে বরণ করতে ডারবান হয়ে যায়নি একটুকরো পিসারা ওভাল বা গল। পেরেরার কীর্তিটা বরং আরও বেশি মহিমান্বিত হয় তাতে।

    তবে অনেক অলৌকিকের ভীড়ে এটুকু গরমিল আসলে অগ্রাহ্যই করা যায়। প্রতিদিন তো লারা বা পেরেরারা ২২ গজে রূপকথা লেখেন না! লারার জাতিস্মর হয়ে পেরেরাও তো আর প্রতিদিন এভাবে জন্ম নেন না!