• ফুটবল

যেভাবে কথা রাখলেন রোনালদো...

তুরিনের আবহাওয়া গত কয়েকদিন ধরে বেশ উপভোগ্য ছিল। বৃষ্টি নেই, নেই ঘাম এনে দেওয়া গরমটাও। ইংরেজিতে যাকে বলে একেবারে ‘প্লেজেন্ট ওয়েদার’। কিন্তু ১২ মার্চ দিনটা যেন বুড়ো আঙ্গুলই দেখাল তুরিনের আবহাওয়া অধিদপ্তরকে। রাত ৮টা থেকে হুট করেই দমকা হাওয়া, আকাশে মেঘের গর্জন। এরই মাঝে জুভেন্টাস স্টেডিয়ামে বিখ্যাত সেই সাদাকালো ডোরাকাটা বাস থেকে নামলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। আকাশের গর্জনও বেড়ে গেল আরেক কাঠি। যেন আগমনী ধ্বনি, এসে গেছে ত্রাণকর্তা- বজ্রদেবতা থর।

সবার আগে টিম বাস থেকে স্টেডিয়ামে ঢুকেছিলেন, ম্যাচের আগে অনুশীলনেও মাঠে ঢুকলেন সবার আগে। নেতারা তো নেতৃত্ব দেন সামনে থেকেই। কিছুক্ষণ দৌড়ে পা দুটো ধাতস্থ করে নিলেন রোনালদো। এরপর পাসিং, ‘ওয়ান টু’ সহ অন্যান্য কেতাবী অনুশীলন। মাঠে সমর্থকেরা তখন মাত্র ঢুকতে শুরু করেছেন। মিরালেম পিয়ানিচ ‘নাটমেগ’ করলেন ব্লেইজ মাতুইদিকে। ছুটে এলেন রোনালদো। মাতুইদিকে আলাদা করে কী যেন বললেন। আজ হার মানা যাবে না, মাথা নোয়ানো যাবে না এক মুহূর্তের জন্যও।

তাকে এমনিতেই আলাদা করে চোখে পড়ে সবখানেই। কিন্তু আজকের অনুশীলনে রোনালদো যেন পুরোপুরি নিজ দুনিয়ায়। বল থেকে চোখ সরাচ্ছেন না, ‘রন্ডো’ বা পাসিং অনুশীলনে প্রেসিং করছেন অন্যদের চেয়ে বেশি। ফ্রিকিক, হেডার গুলোও ঝালিয়ে নিলেন। ম্যাচের আর মিনিট বিশেক বাকি। মাঠে ঢুকেছিলেন সবার আগে, অনুশীলন শেষে বের হলেন সবার পরে। রোনালদো বের হওয়ার সময় আবারও তুরিনে আকাশে গর্জন। চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত আকাশ পানে তাকালেন তিনি, এরপর মিলিয়ে গেলেন টানেলে। আসল খেলা তো শুরু এখন।

 

 

অনুশীলনে সবচেয়ে মনোযোগী রোনালদো প্রাণপণে ছুটছেন অ্যাটলেটিকো ডিফেন্ডারদের পা থেকে বল কেড়ে নিতে। ৩ মিনিটে আরেকটু হলেই ব্লেইজ মাতুইদির পাসে পা ছোঁয়াতে পারতেন, হল না। জুভেন্টাসের প্রথম কর্নারের আগেই দু’হাত উঁচু করে যেন অনুপ্রাণিতই করলেন সমর্থকদের। তাদের বিশ্বাসটা ছিল পারদসম, রোনালদোর অনুপ্রেরণায় যেন ছাড়িয়ে গেল সব। ৫ মিনিটেই অধিনায়ক জর্জিও কিয়েলিনির শটে অ্যাটলেটিকোর জালে বল পাঠাল জুভেন্টাস। হর্ষধ্বনিতে প্রকম্পিত স্টেডিয়াম মুহূর্তেই থেমে গেল রেফারির ফাউলের বাঁশিতে। ছুটে এলেনে রোনালদো, কিন্তু রেফারি অনড়। শুরুতেই এমন সিদ্ধান্ত বিপক্ষে গেলে হয়ত আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরত অনেকের। কিন্তু আজ মনোবল আর ম্যাচ- হারানো যাবে না কোনোটিই। কিয়েলিনি আকাশের দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ছুটে এলেন রোনালদো। আবারও খাটালেন সেই ‘মাতুইদি ফর্মুলা’। কিয়েলিনিও ফিরে পেলেন উদ্যম, ফিরে গেলেন রক্ষণে।

ঘড়ির কাঁটা এগোয়। বল অ্যাটলেটিকো অর্ধেই। কিন্তু গোলের সুযোগ আর মেলে না। ১০ মিনিট, ২০ মিনিট। নাহ, কিছু একটা বদলানো দরকার। যে ভাবা সেই কাজ। ফেদেরিকো বের্নার্দেশি এবং মারিও মানজুকিচের সাথে কথা বলে জায়গা পরিবর্তন করলেন রোনালদো। বাঁ-প্রান্ত ছেড়ে আসলেন মাঝে, মানজুকিচ চলে এলেন ডানপ্রান্তে, বের্নার্দেশি গেলেন বামে। ফলাফল? ২৭ মিনিটে বাঁ-প্রান্ত থেকে বের্নার্দেশির ক্রসে হুয়ানফ্রানকে ফাঁকি দিয়ে দুর্দান্ত হেড। জুভেন্টাস স্টেডিয়ামে তখন কান পাতা দায়। কিন্তু উদযাপন করলেন না রোনালদো, গোলের পর ওই এক চিলতে হাসিই। কাজ যে এখনও ঢের বাকি। সেন্টার বৃত্তের কাছে এসেই আবারও দু’হাত উঁচিয়ে সমর্থক, সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করলেন। জুভেন্টাস সমর্থকেরা এমন বৈরী পরিবেশ সৃষ্টি করলেন, যেখানে খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন ডিয়েগো গোডিনের মত পরীক্ষিত সৈনিকরাই।

 

 

গোডিনদের বিপক্ষে গত দশকে গোল করা যেন ছেলের হাতের মোয়াই বানিয়ে ফেলেছিলেন। জার্সি বদলালেও অভ্যেসটা যে বদলাননি, জানান দিলেন প্রথমার্ধেই। দ্বিতীয়ার্ধের ঠিক আগ মুহূর্ত। টানেলের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন রোনালদো। একে একে আসলেন সতীর্থরা। সবাইকে আলাদা করে কী যেন বললেন, এরপর ঢুকলেন মাঠে। অনেকটা বড় ভাইয়ের মত, জুভেন্টাসের মাশরাফি বললেও হয়ত ভুল বলা হবে না খুব একটা।

রেফারি দ্বিতীয়ার্ধের বাঁশি দেন। আবারও ছুটতে থাকেন তিনি। তার সাথে ছোটেন মানজুকিচরা। কে বলবে, গত মাসে এই মানুষটা পা দিয়েছেন ৩৪-এ? প্রেসিং ফুটবলে যারা ইউরোপের ‘মাস্টার’, সেই অ্যাটলেটিকোকেই পরাস্ত করলেন প্রেসিং দিয়েই। কাঁটা দিয়েই যেন কাঁটা তুললেন। শুধু ডিবক্স নয়; মাঠের মাঝে, এমনকি রক্ষণেও সরব উপস্থিতি ছিল তার পুরো ম্যাচেই। একেকটা লাফে যেন ছুঁয়ে ফেলতে পারতেন আকাশটা। আজকের ম্যাচে রোনালদোর লক্ষ্য তো সেটাই, আকাশ ছোঁয়া সাফল্য নিয়ে আসা।

প্রথমার্ধের টোটকাটাই দ্বিতীয়ার্ধে খাটালেন। চলে আসলেন মাঝে। ফলাফল? ৪৮ মিনিটে জুভেন্টাস এগিয়ে ২-০ গোলে। অ্যাগ্রিগ্রেটে ২-২। স্বদেশী হোয়াও ক্যান্সেলোর ক্রসে হেড করতে যেভাবে লাফিয়ে উঠলেন, মনে হল লিলিপুটদের জগতে যেন আগমন ঘটল গালিভারের। হিমেনেজ-গোডিনের মত পরীক্ষিত জুটি পাত্তাই পেল না রোনালদোর সামনে। ইয়ান ওবলাক অবশ্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। দুর্দান্তভাবে হাওয়ায় ভেসে বলটা হাতেও লাগিয়েছেন, কিন্তু রাতটা যেন শুধুই রোনালদোর। বল ততক্ষণে পার হয়ে গেছে গোল লাইন।

দ্বিতীয় গোলটা বুঝতে হলে তাকাতে হবে ডাগআউটের দিকে। উদযাপনের সময় মাসিমিলিয়ানো আলেগ্রির দিকে ইশারা করেছিলেন। সাধারণত গম্ভীর আলেগ্রির মুষ্টিবদ্ধ উদযাপন এবং ‘বাজিকর' হাসি যেন জানান দিল, টোটকা হয়ত অনুশীলনেই বাজিয়ে দেখেছিলেন তারা। অন্যদিকে ডিয়েগো সিমিওনে তখন কোথায় লুকোবেন, সে চিন্তায় ব্যস্ত। আপাতত ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন ডাগআউটে। কোচের মত হতবুদ্ধি হয়ে থাকলেন আঁতোয়া গ্রিযমানরা, এমন দিনে কি আসলেও কিছু করার আছে?

 

 

ম্যাচের আগে যদি জুভেন্টাসকে অতিরিক্ত সময়ের কথা বলা হত, হয়তো আপত্তি করতেন না কেউ। কিন্তু রোনালদো বদ্ধপরিকর, খেলা শেষ করতে হবে ৯০ মিনিটেই। নিচে নেমে আলভারো মোরাতার পা থেকে বল কেড়ে নেন, উপরে উঠে গোডিনদের বিপক্ষে হাওয়ায় ভেসে বল কেড়ে নেন হেডে। শুধু গোলকিপিংটাই করা বাকি রেখেছিলেন, সুযোগ পেলে হয়ত করে ফেলতেন সেটাও। 

গত ৪ মৌসুমে অ্যাটলেটিকোর ইউরোপিয়ান স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ করার মূল কৃতিত্ব রোনালদোরই। তার কারণে দু’বার ইউরোপযাত্রা সমাপ্তি ঘটেছে জুভেন্টাসেরও। তুরিনের বুড়িদের থেকে কম নেননি, আজকের ম্যাচটা তো রোনালদোর জুভেন্টাসকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ারই উপলক্ষ। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই সমতায় ফিরেছিল আলেগ্রির দল। এখন অপেক্ষা, প্রত্যাবর্তনের গল্পের শেষভাগ রচনা করা।

শুধু রোনালদোকে নিয়ে চাইলেই পুরো ম্যাচের বর্ণনা দেওয়া যায়। কিন্তু আক্রমণে রোনালদোর সতীর্থ বের্নার্দেশির কথা না বললেই হয়। প্রথম গোলটা এসেছিল তার ক্রস থেকেই। প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার সুযোগটাও এনে দিলেন তিনি। ৮৬ মিনিটে আদায় করলেন পেনাল্টি। এগিয়ে এলেন রোনালদো। সামনে ওবলাক, পেনাল্টি থেকে যাকে পরাস্ত করেই রিয়াল মাদ্রিদের ‘লা উনদেসিমা’ নিশ্চিত করেছিলেন তিনি। রোনালদো চোখ বন্ধ করলেন, দু’হাত জুড়ে প্রার্থনায় মগ্ন স্টেডিয়ামের সবাই। একটি শটের ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু।

রোনালদোকে পারতেই হত। বিকল্প ছিল না কোনও। তিনি পারলেন। ওবলাককে পরাস্ত করে পূরণ করলেন হ্যাটট্রিক। আর এক অনুপ্রেরণাময় রোনালদোতেই বিদায় নিল অ্যাটলেটিকো। সিমিওনে এবং তার দলের সাথে রোনালদোর বৈরী সম্পর্ক অজানা নয়। প্রথম লেগ জেতার পর দু’পায়ের মাঝে ইঙ্গিত করে বেশ আপত্তিকর এক উদযাপনই করেছিলেন সিমিওনে। ইটের জবাব পাটকেলে দিতে রোনালদোর চেয়ে দক্ষ বোধহয় কেউ নেই। ম্যাচ শেষে অ্যাটলেটিকো সমর্থকদের সামনে সিমিওনেকে নকল করে সেই উদযাপনটাই করলে। কাটা ঘায়ে নুনের ছিঁটে কাকে বলে, জুভেন্টাস স্টেডিয়াম থেকে যেন সেটা হাতে কলমেই শিখে গেল অ্যাটলেটিকো। আজকের আগে এই মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগে তার গোল ছিল মাত্র ১টি। ক্যারিয়ারের ৫২তম হ্যাটট্রিকের রাতে এমন জবাব তো দিতেই পারেন রোনালদো।

ম্যাচ শেষে বের্নার্দেশি থেকে ক্যান্সেলো- সবাই ছুটে এলেন রোনালদোর কাছে। অনুপ্রেরণা এবং হার না মানার চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় পুরো দলকে বেঁধেছিলেন এক সুতোয়। সেই সতীর্থরাই তাকে বানালেন উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু। শেষ বাঁশির পর চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে আসল জর্জিনা রড্রিগেজ এবং ক্রিশ্চিয়ানো জুনিয়রের। যে অশ্রু দুঃখ-বিরহের নয়, বরং প্রাপ্তির। ম্যাচের আগেই পরিবারের সবাইকে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আজ হ্যাটট্রিক করবেন। রোনালদো কথা রাখলেন। অবশ্য ২-০ গোলে প্রথম লেগ হারের পর হ্যাটট্রিক করে দলকে পরের রাউন্ডে নেওয়া রোনালদোর জন্য নতুন কিছু নয়। ২০১৫-১৬ মৌসুমে উলভসবার্গের বিপক্ষে রিয়ালের জার্সিতে দ্বিতীয় লেগে হ্যাটট্রিক করে দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন শেষ আটে। সেবারও সমর্থকদের কথা দিয়েছিলেন হ্যাটট্রিকের।   

ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও সমর্থকেরা ছিলেন কিছুক্ষণ, ‘রোনালদো!’ ‘রোনালদো!!’ চিৎকারে মুখর ছিল পুরো স্টেডিয়াম। কয়েকজন সমর্থক তো কুর্নিশই জানালেন তাকে। তুরিনের নতুন রাজা যে তিনিই!

 

 

আর বিশ্ব ফুটবলে আরও একবার প্রমাণ করলেন, কেন চ্যাম্পিয়নস লিগকে অনেকেই ‘ইউয়েফা ক্রিশ্চিয়ানো লিগ’ বলেন। সব মিলিয়ে ১২৫ গোল, নকআউট পর্বে ৭৭ ম্যাচে গোল করেছেন ৬৩টি। বয়স ত্রিশ পেরুনোর পর চ্যাম্পিয়নস লিগে গোল করেছেন ৫১টি, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইব্রাহিমোভিচের গোলসংখ্যা মাত্র ২৪। ইউরোপসেরা প্রতিযোগিতায় ঠিক এতটাই দুর্দান্ত, এতটাই অদম্য তিনি।

 

 

১৯৯৫-৯৬ মৌসুমের পর চ্যাম্পিয়নস লিগ ছুঁয়ে দেখা হয়নি জুভেন্টাসের। রোনালদোকে দলে ভেড়ানোর অন্যতম কারণ ছিল ইউরোপে ভাল করা। ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়নদের হয়ে নিজের প্রথম ‘চ্যালেঞ্জ’-এর রাতে রোনালদো প্রমাণ করলেন, বয়সটা ৩৪ হলেও এখনও অনেক কিছুই দেওয়ার আছে তাঁর!