• " />

     

    গোঁফওয়ালা সেই শেকারি বেড়াল!

    ১৯৯৮-৯৯ সালের কথা। ডেনিস লিলি গিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার এক পেস বোলিং ক্যাম্পে। দেখলেন ১৭ বছরের এক কিশোর ফাস্ট বোলারকে। দেখলেন,মুগ্ধ হলেন। এতটাই যে সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করলেন তখনকার একাডেমী কোচ রড মার্শকে! ফলাফল-কদিন বাদেই সেই বোলারের অ্যাডিলেড অভিমুখে যাত্রা আর নিজেকে আবিষ্কার করা অস্ট্রেলিয়ার অনূর্ধ্ব-১৯ দলে।

    ২০১৩-১৪ অ্যাশেজ। এক গোঁফওয়ালাতে ভরকে গেল ইংল্যান্ড, মুগ্ধ হলো ক্রিকেট বিশ্ব! নাইন নিউজ তাঁর‘শেভ’ করার ফুটেজ প্রচার করেছিল,ডেনিস কারনাহান ‘...তোমার গোঁফকে ফিরিয়ে আনো’(ব্রিং ব্যাক ইয়র মুশট্যাশ) শিরোনামে গান তৈরী করেছিলেন!

    গোঁফ তো কতজনেরই আছে, এমন বিখ্যাত কজনের বলুন? কী ভাবছেন,এক কিশোরের কথা বলতে গিয়ে গোঁফ নিয়ে টানাটানি কেন? কারণ এই গোঁফওয়ালাই তো সেদিনের সেই ফাস্ট বোলার-মিচেল গাই জনসন!

    **

    প্রথম শ্রেনির অভিষেক ২০০১ সালে, কুইন্সল্যান্ডের হয়ে। ২০০৩-০৪ মৌসুমে লিস্ট ‘এ’তে। স্বপ্ন তখন আকাশছোঁয়া নিশ্চয়ই! কিন্তু ফাস্ট বোলারের চিরকালীন সঙ্গী যে ওই চোট! তাই বাধ সাধলো স্বপ্ন দেখায়! পিঠের চোটের কারণে বাদ পড়লেন প্রাদেশিক চুক্তি থেকে।

     

    মিচেল জনসন ক্ষণিকের জন্য তো ক্রিকেট ছেড়ে দেয়ার কথাই ভাবলেন! শুরু করলেন ‘প্লাম্বিং-ভ্যান’ চালানো!তবে যিনি পরবর্তীতে ব্যাটসম্যানদের এমন ‘ত্রাস’ হবেন, ভাবলেই কি আর তাঁর ক্রিকেট ছেড়ে দেয়া হয়!

    পরের মৌসুমেই ডাক পেলেন পাকিস্তান সফরের জন্য,’এ’ দলের হয়ে।

    ওয়ানডে অভিষেকও হয়ে গেল, ২০০৫-০৬ এ,নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে।

    সিরিজের শেষ ম্যাচ, আগেই সিরিজ জেতা অস্ট্রেলিয়া ঐদিন যে পাঁচজন ফ্রন্ট-লাইন বোলার নিয়ে নেমেছিল,তাঁদের সাকুল্যে ম্যাচ খেলা ছিল ৩৪টি! জনসন ৯ ওভারে দিয়েছিলেন ৬৪ রান,পরের ওয়ানডে খেলতে তাই অপেক্ষা করতে হলো পাক্কা এক বছর! সেই এক বছরেই ঘরোয়া ক্রিকেটে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দিয়ে ফিরলেন দলে। পেলেন স্মরনে রাখার মত টেন্ডুলকার,দ্রাবিড়,লারা,পিটারসেনের উইকেট। সেবার অ্যাশেজে স্কোয়াডে ছিলেন,তবে প্রতি ম্যাচেই দ্বাদশ ব্যাক্তি হিসেবে! স্বপ্নের ‘ব্যাগি গ্রিন’টা হাতে পেয়েছিলেন ২০০৭ সালে, শ্রীলংকার সঙ্গে ব্রিসবেনের গ্যাবায়।

    ২০১৩-১৪ এর স্বপ্নালু মৌসুমটা বাদ দিলে, জনসনের সেরা সময়টা ছিল ২০০৯। সে বার ডারবান টেস্টে ১ম ইনিংসে উইকেট পেয়েছিলেন ৩ টি, কিন্তু ভেঙ্গেছিলেন স্মিথের হাত,ফাটিয়েছিলেন ক্যালিসের থুতনি! ক্যালিস সেলাই নিয়ে ব্যাট করেছিলেন,২য় ইনিংসে স্কোরকার্ডে স্মিথের নামের পাশে লিখা ছিল ‘আহত অবসর’!

     

    **

    ২০১৩-১৪ অ্যাশেজে ‘জনসন-রুপকথা’ শুরুর আগে কিন্তু পূর্বাভাস ছিল অন্য কিছুর! এর আগে খেলা শেষ টেস্টে ভারতের সাথে ছিলেন উইকেটশূন্য,ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মত। প্রথমবার এমনটি ঘটেছিল ২০১০-এ,ইংল্যান্ডের সঙ্গে ব্রিসবেনে।

    তবে অভিষেক টেস্টের ভেন্যু গ্যাবায় যখন অ্যাশেজের প্রথম টেস্টে নামলেন,তখন কি ইংল্যান্ড জানত,কী অপেক্ষা করছে তাদের জন্য! যে অ্যাশেজ ধরে রাখার মিশনে এসেছিল অ্যালেস্টার কুকের দল, তারা কি জানতো, জনসন ফিরিয়ে আনবেন সেই পুরনো দিনের ফাস্ট বোলিংয়ের স্মৃতি, তাদেরকে ধ্বসিয়ে দিবেন জনসন নামের বোলারটি, প্রায় একাই! ৯ উইকেট দিয়ে শুরু,এরপর সিরিজে উইকেটসংখ্যা ৮,৬,৮,৬! সিডনিতে যেখানে অ্যাশেজ শেষ করেছিলেন,সেঞ্চুরীয়নে শুরু করেছিলেন সেখান থেকেই! দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে তিন টেস্টে উইকেট নিয়েছিলেন ২২টি। কী স্বপ্নের মৌসুমই না কাটিয়েছিলেন, ৮ ম্যাচে ১৫.২৩ গড়ে নিয়েছিলেন ৫৭ উইকেট! তবে শুধু উইকেটসংখ্যাও বোঝাতে পারবেনা সেই জনসনকে,যেটা বুঝেছিলেন তাবৎ ইংরেজ ব্যাটসম্যানরা, বুঝেছিলেন প্রোটিয়ারা! বিশাল গোঁফ,তেড়ে-ফুঁড়ে উইকেটে এসে,শরীরের পিছন থেকে নিয়ে আসা হাই-আর্ম অ্যাকশনে বল ছাড়ছেন,বুঝতে না বুঝতেই বল এসে হাজির শরীরে দোরগোড়ায়! যে-কোন ব্যাটসম্যানকে বললেই আপনি শুনতে পেতেন, তাদের কাছে দুঃস্বপ্নেরই তো আরেক নাম ছিল‘জনসন’!

    জনসনের ‘ফাস্ট-বোলিংয়ের’ তোপে নাজেহাল হয়ে তাই জোনাথন ট্রট দেশে ফিরেছিলেন অ্যাশেজের মাঝপথেই! আর ‘মাথায়’ আঘাত পেয়ে রায়ান ম্যাকলারেন চলে গিয়েছিলেন স্কোয়াডের বাইরে! আরও আছে। সেসব বিচিত্র অংগভঙ্গি! কখনো উড়ন্ত চুমু, কখনো স্থির চেয়ে থাকা ব্যাটসম্যানের মুখপানে,কাটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতই তো লাগার কথা আগের ডেলিভারিতেই পরাস্ত কিংবা আউট হওয়া ব্যাটসম্যানের কাছে!

     

     

    অথচ মাঠের বাইরের জনসন নাকি ‘লাজুক’ প্রকৃতির। আর গোঁফ রাখা কিংবা কাটানোর পিছনেও ছিল মহৎ উদ্দেশ্য-দাতব্য ফাউন্ডেশনের জন্য তহবিল গঠন করা। এবং এই ‘দানব’কেও আবেগ কীভাবে ছুঁয়ে যায় সেটা দেখেছে ক্রিকেটবিশ্ব, সেবার অস্ট্রেলিয়াকে অ্যাশেজ জিতিয়ে তাঁর আনন্দাশ্রু কজনই বা ভুলেছেন!

    ব্যাট হাতের জনসনও কম যাননা! নিজের ব্যাটিং ক্ষমতার উপর তার এতই আত্নবিশ্বাস যে,ভবিষ্যতে নাকি তাঁকে সীমিত ওভারের ম্যাচে ওপেনিংয়েও দেখা যেতে পারে! ১ম শ্রেণির ম্যাচে নিজের প্রথম স্কোরিং শটটাই ছিল তার ‘ছয়’, কথক যখন সেই জনসন ,অবিশ্বাসের কী আছে খুব বেশী কিছু!

     

    **

    ২০১৪-১৫ মৌসুমটা খুব একটা ভাল যায়নি। ৫ ম্যাচে ৩৩.৫৭ গড়ে ১৯ উইকেট, আর সাল ২০১৫ তে তো হেরে আসলেন অ্যাশেজই! এ বছর সব মিলিয়ে খেলেছেন ৭ টেস্ট, উইকেট ২৩টি। তবে গড়টা ওই ৩০ ছুঁই ছুঁই রয়েই গেছে! সামনে দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ড সিরিজ, বছরের শেষটা কি আবার ‘স্বপ্নালু’ হবে মিচের! হলে তা খুব একটা সুখকর অভিজ্ঞতা হবে না ব্রেন্ডন ম্যাককালামের দলের জন্য!

    তা যেমনই হোক। তবে রজার ফেদেরার,রাফায়েল নাদাল বা নোভাক জোকোভিচরা একটা ধন্যবাদ দিতেন হয়তো ডেনিস লিলিকে। তিনি যে জনসনকে খুঁজে বের করলেন, তাঁর ক্রিকেটের চেয়ে টেনিসই যে বেশী পছন্দ ছিল একসময়! জনসন টেনিসে খুব একটা খারাপ করতেন না বোধহয়, হয়তো হতেন শীর্ষস্থানীয় কেউই! লিলির সঙ্গে ফেদেরারদের দেখা হয়নি এখনও! তাঁদের কজন জনসনকে চেনেন, সেটাও একটা প্রশ্ন। ধন্যবাদের ব্যাপারটিও তাই তোলাই থাকবে আপাতত!

    তা তোলা থাক। দুনিয়াজোড়া জনসনের আগ্রাসী-সৌন্দর্যে মুগ্ধ ক্রিকেটপ্রেমীরা কিন্তু লিলিকে শুধু ধন্যবাদ নয়, কৃতজ্ঞতাও জানিয়েই যাবেন!

    ভাগ্যিস, লিলি সেদিনের সেই পেস-ক্যাম্পে ছিলেন!

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন