• " />
    X
    GO11IPL2020

     

    পাকিস্তানিরা কি বিপিএলের 'বোঝা'?

     

    হৈচৈটা শুরু হয়েছিল বিপিএলের খসড়া খেলোয়াড় তালিকায় বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটারদের সম্ভাব্য সংখ্যা প্রকাশের পরপরই। প্রায় দু’শ বিদেশীর মধ্যে পাকিস্তানের ক্রিকেটারই ছিলেন পঞ্চাশের বেশী। সঙ্গত কারণেই ‘প্লেয়ার্স বাই চয়েজ’ লটারিতেও বিভিন্ন দলে ডাক পাওয়া বিদেশীদের মধ্যে পাকিস্তানিদের সংখ্যাধিক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ক্রিকেট পরাশক্তি দেশগুলোর নামীদামী তারকাদের উপস্থিতিবিহীন এ আসরে চলে আসা পাকিস্তানের ‘প্রায় জাতীয়’ দলটা আলো ছড়াবে - এমন যুক্তিও কম শোনা যায় নি। কিন্তু আদতে সেটা কতটুকু হয়েছে বা হচ্ছে? অর্ধেকেরও বেশী পথ পাড়ি দিয়ে ফেলা বিপিএলের তৃতীয় আসরের পরিসংখ্যান এমন প্রশ্নের নেতিবাচক জবাবই দিচ্ছে।

     


    আরও পড়ুনঃ যত কাণ্ড বিপিএলে


     

    এ পর্যন্ত হয়ে যাওয়া কুড়িটি ম্যাচের মধ্যে রানের খাতায় সফল ব্যাটসম্যানদের তালিকায় চোখ রাখলে দেখা যাচ্ছে শীর্ষ দশজনের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশের, চারজন শ্রীলংকার আর একজন ওয়েস্ট ইন্ডিজের। অর্থাৎ, বিদেশীদের মধ্যে সংখ্যায় আধিক্য থাকা সত্ত্বেও সাফল্যের খাতায় সেরা দশে এখন পর্যন্ত নেই একজন পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানও।

     

    ৮ ম্যাচ খেলে ২৯০ রান নিয়ে সবার উপরে আছেন চিটাগং ভাইকিংসের অধিনায়ক জাতীয় দলের ওপেনার তামিম ইকবাল। দিলশান, সাঙ্গাকারা ও মুনাবীরা- এই তিন লঙ্কান আছেন পরের তিনটি স্থানে। অস্ট্রেলিয়া সফরের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট দলে যোগ দিতে ফিরে যাওয়ার আগে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের মারলন স্যামুয়েলস চার ম্যাচ খেলে করে গেছেন ১৪২ রান, শীর্ষ রান সংগ্রাহকের তালিকায় এখনও তাঁর অবস্থান ৬ নম্বরে। ৩টিতেই অপরাজিত থেকে তাঁর গড়ও ১৪২। শীর্ষ দশে থাকা অন্যান্য বাংলাদেশীদের মধ্যে আছেন মুশফিকুর রহিম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, ইমরুল কায়েস ও সৌম্য সরকার। সেরা দশের অপরজন শ্রীলংকার থিসারা পেরেরা (রংপুর রাইডার্স)।

     

    উদ্বোধনী ম্যাচে চিটাগংয়ের বিপক্ষে রংপুরের ১ রানের রোমাঞ্চকর জয়ে ব্যাট হাতে সামনে থেকেই ভূমিকা রেখেছিলেন পাকিস্তানের টেস্ট অধিনায়ক মিসবাহ-উল-হক, অনবদ্য ৬১ রানের জন্য এবারের আসরের প্রথম ম্যাচসেরাও তিনিই। কিন্তু এরপর আরও তিনটি ম্যাচে ব্যাট হাতে নেমে করেছেন মোট ৪৭ রান। ‘লো স্কোরিং’ টুর্নামেন্টে ব্যক্তিগত ১০৮ রান নিয়ে ব্যাটসম্যানদের তালিকায় তিনি আছেন ১৩ নম্বরে।

     

    সেরা ৩০ জন ব্যাটসম্যানের মধ্যে মিসবাহ ছাড়া আর মাত্র একজন পাকিস্তানিই আছেন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের আসহার জাইদি। অবশ্য পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এই অলরাউন্ডার খেলেন মূলত ইংলিশ কাউন্টিতে। ৩ ইনিংসে ১০৬ রান নিয়ে ব্যাটসম্যানদের তালিকায় তাঁর অবস্থান ১৪ নম্বরে।

     

    অন্যান্য পাকিস্তানিদের মধ্যে ঢাকা ডায়নামাইটসের নাসির জামশেদ ৩ ম্যাচে করেছেন ৬৭ রান। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টিটোয়েন্টি সিরিজ খেলে ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে চিটাগং ভাইকিংসে যোগ দিয়েছিলেন পাকিস্তানের উমর আকমল। কথিত আশি হাজার টাকা বিমান ভাড়ায় তাঁকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে স্বাগতিকদের অর্জন ছিল ৮ বলে ১ রান। এর আগের ম্যাচে একই দলের হয়ে তাঁর বড় ভাই কামরান আকমল হাস্যকর এক রান আউট হয়ে জন্ম দিয়েছিলেন ‘সন্দেহজনক ফিক্সিং’ আলোচনার।

     

     

    উপর্যুপরি পরাজয়ে টুর্নামেন্ট থেকে কার্যত ছিটকে পড়া সিলেট সুপারস্টার্সের ‘ত্রাতা’ হয়ে আবির্ভূত হবেন পাকিস্তানের টিটোয়েন্টি অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি - এমন প্রত্যাশা ছিল অনেকেরই। মুশফিকুর রহিমের দলের হয়ে প্রথম ম্যাচে তিন তিনবার জীবন পেয়ে ৬২টি রানও পেয়েছেন, তবে তিন বছর বাদে পাওয়া টিটোয়েন্টি অর্ধশতকটা তাঁর দলের পরাজয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট হয় নি।

     


    আরও পড়ুনঃ বিপিএলের কাবুলিওয়ালারা


     

    জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক সিরিজ খেলে আরব আমিরাত থেকে সরাসরি উড়ে আসেন কুমিল্লার দুই পাকিস্তানি শোয়েব মালিক ও আহমেদ শেহজাদ। প্রথম ম্যাচে নিষ্প্রভ দু’জনই অবশ্য গতকাল চিটাগংয়ের বিপক্ষে ম্যাচে রান পেয়েছেন। শোয়েব মালিকের অপরাজিত ৩৪ ভূমিকা রেখেছে দলের জয়েও। কিন্তু ৩৭ রান করতে গিয়ে আহমেদ শেহজাদ খরচ করে ফেলেন ৪১টি বল। স্বদেশী বিলওয়াল ভাট্টির শিকার হয়ে ফেরার আগের ওভারে তাসকিন আহমেদকে ৩টি চার না হাকালে রান-বলের ব্যবধানটা আরও দৃষ্টিকটু থেকে যেত।

     

    স্পট ফিক্সিং কেলেংকারিতে জড়িয়ে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে বিপিএলের এই আসর দিয়েই মূলত দেশের বাইরের ক্রিকেটে পা রেখেছেন পাকিস্তানের মোহাম্মদ আমির। মাঠের বাইরের আলোচনায় বিপিএলকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘গরম’ করে রাখা চিটাগং ভাইকিংসের এই বাঁহাতি পেসার মাঠের পারফরম্যান্সেও স্বদেশীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আলো ছড়িয়েছেন। ৮ ম্যাচে ১১ উইকেট নিয়ে উইকেট সংগ্রাহকদের তালিকায় বরিশাল বুলসের ক্যারিবিয়ান কেভিন কুপার ও বাংলাদেশী আল-আমিন হোসেনের সাথে যৌথভাবে আছেন ২ নম্বরে। প্রথম ম্যাচেই ৩০ রানের বিনিময়ে নিয়েছেন টিটোয়েন্টি ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ৪ উইকেট।

     

     

    একটি করে ম্যাচে পাকিস্তানের দুই ফরম্যাটের ক্রিকেটের দুই অধিনায়ক মিসবাহ আর আফ্রিদিকে বোল্ড করে হয়তো কোন বার্তাও পাঠিয়ে দিয়েছেন স্বদেশের ক্রিকেট কর্তাদের কাছে। বিপিএলে সপ্রতিভ পারফরম্যান্সের পর পিসিবি সভাপতি শাহরিয়ার খান এবং জাতীয় দলের কোচ ওয়াকার ইউনুস দু’জনই তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন গতকাল।

     

    আমির বাদে বল হাতেও পাকিস্তানের অন্য ক্রিকেটারদের উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স চলতি বিপিএলে এখনও পর্যন্ত চোখে পড়ে নি। ৭টি করে উইকেট নিয়ে উইকেট সংগ্রাহকদের মধ্যে যৌথভাবে চৌদ্দ নম্বরে আছেন আসহার জাইদি ও ইয়াসির শাহ। ৬ উইকেট নিয়ে ১৬ নম্বরে আছেন মোহাম্মদ সামি। বাকি পাকিস্তানিদের মধ্যে বিলওয়াল ভাট্টি ও সাঈদ আজমল ২টি করে ও এক ম্যাচ খেলে ১টি উইকেট নিয়েছেন ওয়াহাব রিয়াজ।

     

    বোলারদের তালিকায়ও উইকেট সংগ্রহের দিক থেকে সেরা দশে এগিয়ে আছেন বাংলাদেশীরাই। ৬ ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে সবার উপরে রয়েছেন রংপুরের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। তাঁর সাথে যৌথভাবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন কুমিল্লার আলোচিত তরুণ বাঁহাতি পেসার আবু হায়দার রনি। বাকি বাংলাদেশীদের মধ্যে শফিউল ইসলাম ১০টি এবং মুস্তাফিজ, মোশাররফ, আরাফাত সানি, আবুল হোসেনরা নিয়েছেন ৮টি করে উইকেট।

     

    এবারের বিপিএলে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের অংকের হিসেব বলছে বিদেশীদের মধ্যে ‘এ’ এবং ‘বি’ ক্যাটগরিতে থাকা প্রত্যেকেই পাচ্ছেন দেশসেরা ছয় আইকন ক্রিকেটারের চেয়েও বেশী অর্থ! আর বিদেশী ‘সি’ ক্যাটাগরির একজন পাচ্ছেন দেশের ‘এ’ ক্যাটাগরির ক্রিকেটারের চেয়ে বেশী পারিশ্রমিক! সে বিবেচনায় বিশ্বের নামীদামী লিগে যেখানে সাকিব আল হাসানকে কাড়ি কাড়ি টাকায় দলে ভেড়ায় বড় দলগুলো, সেই বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার দেশের টুর্নামেন্টে পাচ্ছেন সাঈদ আজমল-নুয়ান কুলাসেকারাদের চেয়েও কম অর্থ!

     

     

    সাকিবের হিসেবটাই যখন এমন, তখন বাকিদের উদাহরণ টানা অর্থহীন। টুর্নামেন্টের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শেষ হয়ে যাবার পর জাতীয় তারকাদের এহেন অবমূল্যায়নের প্রশ্নটাই আবার সামনে চলে আসছে। সম্পূরক প্রশ্ন হিসেবে উঠে আসছে মোটা অংকের পারিশ্রমিকে একগাদা পাকিস্তানি ক্রিকেটার নিয়ে এসে দলগুলোই বা কতটুকু লাভবান হল? মানের বিচারে পদে পদে প্রশ্নবিদ্ধ দেশীয় আয়োজনটির পথচলা দীর্ঘায়িত করতে হলে অন্য অনেক কিছুর সাথে এই বিষয়গুলোও ভেবে দেখাটা আবশ্যক বৈকি।

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন