• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    সিজন প্রিভিউ: নতুন মৌসুমেও 'অপরিবর্তিত' টটেনহাম?

    দলবদলের বাজারে যখন শশব্যস্ত সবাই, তখন কাউকে দলে না ভিড়িয়েই গত মৌসুম শুরু করেছিলেন টটেনহাম হটস্পার ম্যানেজার মরিসিও পচেত্তিনো। অসাধারণ ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দিয়ে সবাইকে অবাক করে দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালেও, অল্পের জন্য অবশ্য ছুঁয়ে দেখা হয়নি ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্মান। নতুন মৌসুমের আগে সেই পচেত্তিনোতেই বিশ্বাস রাখছে স্পার্স। এবার অপেক্ষা গত মৌসুমকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার।

     

    যারা এলেন, যারা গেলেন

    একসময় আয়াক্স, পোর্তো, বেনফিকার মত ‘সেলিং’ ক্লাব স্পার্সকে অন্তত দলবদলের দিক দিয়ে খোলনলচেই বদলে ফেলেছেন পচেত্তিনো। গত কয়েক মৌসুম দারুণ খেলার পরও ক্রিশ্চিয়ান এরিকসেন, হ্যারি কেইনদের ঠিকই ধরে রেখেছে স্পার্স। পচেত্তিনো নিজেই বলেছেন, ফুটবলে দীর্ঘকালীন সাফল্য পেতে হলে দলের ভিত অন্তত অপরিবর্তিত রাখতে হবে। আর্জেন্টাইন ম্যানেজারের দর্শনে দিষ্ট স্পার্স হাঁটছে সে পথেই।

    রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনার মত দলগুলোর থেকে প্রস্তাব আসলেও পচেত্তিনোর দূরদর্শী পরিকল্পনায় বিশ্বাস রেখেই নর্থ লন্ডনেই থেকে গেছেন কেইন, ড্যালে আলিরা। গত মৌসুমে কাউকে দলে না নেওয়া স্পার্স এবার নিজেদের ট্রান্সফারে রেকর্ড ভেঙ্গেই লিঁও থেকে এনেছে মিডফিল্ডার টাঙ্গুয়ে এন’দোম্বেলেকে। লিডস ইউনাইটেড থেকে ফরোয়ার্ড জ্যাক ক্লার্ককে দলে নিয়ে আবার লিডসেই ফেরত পাঠিয়েছে তারা। মোনাকো থেকে ধার শেষে ফিরেছেন উইঙ্গার জর্জ এন'কুদু।

    দল ছেড়েছেন কিয়েরন ট্রিপিয়ের, মিশেল ভর্ম, ফার্নান্দো ইয়োরেন্তে এবং ভিনসেন্ট ইয়েনসেন। এদের মধ্যে কেবল ট্রিপিয়েরই খেলতেন মূল একাদশে। আরও একবার তাই দলের ভিত অপরিবর্তিত রাখার মিশনে সফল হলেন পচেত্তিনো।

     


     

    আমরা যা জানি

    গত কয়েক মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ধারাবাহিকতার দিক দিয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, আর্সেনাল, চেলসির মত দলকেও পেছনে ফেলেছে স্পার্স। ‘রেড ডেভিল’ বা ‘গানার’রা যেখানে চ্যাম্পিয়নস লিগেই জায়গা করে নিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে গত চার মৌসুমের প্রতিটিতেই শীর্ষ চারে থেকেই মৌসুম শেষ করেছে পচেত্তিনোর দল। চ্যাম্পিয়নসে লিগে জায়গা করে নেওয়ার দিক দিয়ে ইংল্যান্ডে স্পার্সের সমকক্ষ কেবল লিভারপুল এবং ম্যানচেস্টার সিটি। এই সাফল্যের স্বপ্নদ্রষ্টা পচেত্তিনোই।

    সিটি, ইউনাইটেডরা যেখানে কাড়াকাড়ি টাকা খরচ করে দল গোছাতে ব্যস্ত, সেখানে আলি, কেইন, এরিকসেনদের ওপরই ভরসা রাখছেন পচেত্তিনো। ফলাফলটাও এসেছে হাতেনাতে। একই একাদশ থাকার পরও ট্যাকটিক্স দিয়েই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করছেন তিনি, যেমনটা করেছেন গত মৌসুমে। এবারের প্রাক-মৌসুমও ভালো কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। রিয়াল, বায়ার্ন (টাইব্রেকার), জুভেন্টাসের মত দলগুলোকে হারিয়েছে স্পার্স। ইউনাইটেড এবং ইন্টার মিলানের (টাইব্রেকার) কাছে হারলেও তাই নতুন মৌসুমের আগে নতুন আশায় বুক বাঁধছে স্পার্স সমর্থকেরা। 

    দল প্রায় একই হওয়ায় কেইন, এরিকসেনদের বোঝাপড়াটাও দুর্দান্ত। দলে নতুন আসা এন’দোম্বেলেও প্রাক-মৌসুমে জানান দিয়েছেন নিজ সামর্থ্যের। ফ্রান্সে লিঁওর হয়ে খেলার সময় 'নতুন পগবা' উপাধিও পেয়েছিলেন তিনি। গত মৌসুমের শুরুতে মুসা দেম্বেলে চলে যাওয়ার পর তার শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেনি স্পার্স, সেজন্য বেশ ভুগতেও হয়েছিল তাদের। মুসা সিসোকো, হ্যারি উইঙ্কস বা ভিক্টর ওয়ানইয়ামারাও নিজেদের তেমন মেলে ধরতে পারেননি। রক্ষণের সামনে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকায় এন'দোম্বেলেতেই ভরসা রাখছে স্পার্স। আর পচেত্তিনোর ট্যাকটিক্স তো আছেই। সব মিলিয়ে নতুন মৌসুমেও ‘পুরনো’ স্পার্সকে হারানো সহজ হবে না একেবারেই। 

     

     

    যা নিয়ে সংশয়

    স্কোয়াড ডেপথ। চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে খেলা, তৃতীয় হয়ে মৌসুম শেষ করার পরও এ বছরের এপ্রিলে পচেত্তিনো নিজেই স্বীকার করেছিলেন; স্কোয়াডের শক্তি-সামর্থ্যের বিচারে প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষ ছয়ের চেয়ে কিছুটা হলেও পিছিয়েই আছে তার দল। প্রমাণটাও মিলেছে আগে। গত মৌসুমে একটা সময় টেবিলের শীর্ষেই ছিল স্পার্স। কিন্তু মৌসুম যত এগিয়েছে, ইনজুরি এবং অবসাদ ততটাই গ্রাস করেছে তাদের। একটা সময় তো শীর্ষ চারের বাইরেই চলে গিয়েছিল তারা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলা নিয়ে সমস্যা হয়নি তাদের।

    দারুণ বোঝাপড়া, দুর্দান্ত ম্যানেজার- স্পার্সের দূর্বলতা নেই খুব বেশি। কিন্তু স্কোয়াড ডেপথ আগেও ভুগিয়েছে তাদের। নতুন মৌসুমের আগে মাত্র দু’তিনজনকে দলে ভিড়িয়ে আগের স্কোয়াডেই ভরসা রাখছেন পচেত্তিনো। কেইন-এরিকসেনরা ইনজুরিতে পড়লে হয়তো বেশ বেকায়দায়ই পড়তে হবে স্পার্সকে। নতুন মৌসুমের আগে তাই সংশয়টা থাকল সেই স্কোয়াডের শক্তি-সামর্থ্য নিয়েই।

    অবশ্য এদিক দিয়ে গত মৌসুমের চেয়ে কিছুটা হলেও হয়তো চিন্তামুক্ত থাকতে পারেন পচেত্তিনো। এবারের মৌসুমে ইউরো বাছাইপর্ব ছাড়া টুর্নামেন্ট নেই তেমন। তাই গত মৌসুমে হিউঙ-মিন সনের মত জাতীয় দলের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দীর্ঘদিন ক্লাব ফুটবল থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে না কাউকেই। লুকাস মউরা, এরিক লামেলারাও ফিরেছেন স্বরূপে। এবার দেখার বিষয়, গত মৌসুমের সমস্যা নতুন করে মাথাচাড়া দিলে কীভাবে সেটা মোকাবেলা করে পচেত্তিনোর দল।

     

     

    শেষ পাঁচ মৌসুমের স্পার্স

    পচেত্তিনো ম্যানেজার হয়ে আসার পর থেকে গত পাঁচ মৌসুমে মাত্র একবার চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলতে পারেনি স্পার্স। ২০১৪-১৫ মৌসুমে ৫ম হয়েছিল তারা। ২০১৫-১৬ এবং ২০১৭-১৮ মৌসুমে টেবিলের তিন-এ থেকে মৌসুম শেষ করেছিল স্পার্স। ২০১৬-১৭ মৌসুমে লিগ জেতার দৌঁড়েও ছিল তারা, কিন্তু আন্তোনিও কন্তের চেলসি হাসে শেষ হাসি; স্পার্স হয় রানার্স-আপ। গত মৌসুম চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার সম্ভাবনা একসময় একেবারেই ক্ষীণ মনে হলেও শেষ পর্যন্ত ৪র্থ হয়েছে তারা।

    ইউরোপের সেরা ম্যানেজারদের কাতারে নিয়ে গেছেন বেশ আগেই। ট্যাকটিক্সের ক্ষুরধার চিন্তাশক্তির বিচারে তার চেয়ে কেবল পেপ গার্দিওলা এবং ইয়ুর্গেন ক্লপকেই এগিয়ে রাখেন অনেকেই। কিন্তু দল যত ভালো বা ধারাবাহিক পারফর্মই করুক, শিরোপা যেন পচেত্তিনোর কাছে মরীচিকা। নতুন মৌসুমের আগে তাই দলের শিরোপা জেতা দেখতে চাওয়ই হয়তো পচেত্তিনোর কাছে স্পার্সের সমর্থকদের একমাত্র দাবি। ২০১৯-২০ মৌসুমে পচেত্তিনো কি পারবেন ক্যারিয়ারে নিজের প্রথম শিরোপা উঁচিয়ে ধরতে? উত্তরটা অবশ্য সময়ই বলে দেবে। 

     

    প্যাভিলিয়নের প্রিমিয়ার লিগ প্রেডিকশন: তৃতীয় (ধারাবাহিকতার বিচারে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা ক্লাব তারা। কিন্তু সিটি, লিভারপুলের চেয়ে শক্তিমত্তার বিচারে পিছিয়েই আছে তারা। বেশকিছু নতুন সাইনিং করা আর্সেনাল, ইউনাইটেড, চেলসিদের বোঝাপড়ার অভাবের সুযোগটা নেবে স্পার্স। কিন্তু লিভারপুল, সিটির ওপরে থেকে মৌসুম শেষ করা হয়তো আর হবে না তাদের)