• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    প্রিমিয়ার লিগ দলবদল: "জিতছেন ভাই, হারছেন ভাই"

    বছরের সেই সময়টা চলছে। রাস্তায় যখন 'ভাই কত?' রব ওঠে; 'জিতছেন ভাইশোনার জন্য যখন দ্বিগুণ উৎসাহে কান খাড়া হয় আপনার। নিতান্ত পোড়া কপালে না হলে 'হেরেছেন' কথাটা শোনার কথা না আপনার। খেলার মাঝে গরুর হাট টেনে আনায় এরই মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক শুরু হয়ে গেছে হয়ত আপনার। তাই মূল অংশে ফেরত যাওয়া যাক। প্রিমিয়ার লিগের দলবদল শেষ হয়ে গেছে ৮ আগস্ট। এরপর আর নতুন করে কাউকে দলে ভেড়াতে পারবে না ইংল্যান্ডের ক্লাবগুলো। আড়াই মাসের বেশি সময় বিরতি দিয়ে প্রিমিয়ার লিগও শুরু হয়ে যাচ্ছে। মাঝে গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা এসেছে- মাঠে ফুটবল না থাকলেও টাকার ঝনঝনানি আর 'নির্দোষগুজব চলেছে এতোদিন মাঠের বাইরে । অর্থাৎ দলবদলের মৌসুম। প্রিমিয়ার লিগের 'টপ সিক্স' ক্লাব দলবদলের বাজারে কেমন করল? জিতল না হারলো?


    ম্যানচেস্টার সিটি/ "জিতছেন ভাই"
    এবারও নিজেদের দলবদলের রেকর্ড ভেঙেছে ম্যানচেস্টার সিটি। যদিও দলবদলের বাজারে কিছুটা নীরব ছিল প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়নরা। দলে এসেছেন মোট চারজন নতুন খেলোয়াড়। পেপ গার্দিওলা মনমতো খেলোয়াড় পেয়েছেন দুইজন। রদ্রি এখন সিটির সবচেয়ে দামী খেলোয়াড়। ফার্নান্দিনহোর একেবারে মোক্ষম রিপ্লেসমেন্ট বলা যেতে পারে তাকে। স্প্যানিশ মিডফিল্ডারের খেলায় আছে সার্জিও বুস্কেটসের ছায়াও। ভিনসেন্ট কোম্পানি ক্লাব ছাড়ার পর একজন ডিফেন্ডার দলে ভেড়াতে হত গার্দিওলাকে। নিকোলাস অটামেন্ডি, জন স্টোনসরা বহু আগেই কোচের ভরসা হারিয়েছেন। এক্ষেত্রে ফার্নান্দিনহোকে সেন্টারব্যাকে খেলানোর একটা সুযোগও তৈরি হয়েছে গার্দিওলার জন্য। আর সেই সময়ে প্রিমিয়ার লিগে মানিয়ে নিতে যথেষ্ট সময়ও পেয়ে যাওয়ার কথা রদ্রির।

    হুয়াও ক্যান্সেলোর চুক্তিটা চকোলেটের বাক্স খুলে সুই-সুতো  না পেয়ে চকোলেট পেয়ে যাওয়ার মতো। দানিলো এমনিতেই দলে সুযোগ পেতেন না। তার জায়গায় এসেছেন ২৬ বছর বয়সী পর্তুগিজ রাইটব্যাক। বিনিময়ে সিটিকে খরচ করতে হয়েছে মাত্র ২৭ মিলিয়ন পাউন্ড। অদ্ভুত এই দলবদলে পুরোটাতেই জিতেছে সিটি।  

    যারা এলেন
    রদ্রি- অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ
    অ্যাঞ্জেলিনো- পিএসজি আইন্দোভেন
    হুয়াও ক্যান্সেলো-জুভেন্টাস
    স্কট কার্সন- ডার্বি

    যারা গেলেন (উল্লেখযোগ্য)
    ভিনসেন্ট কোম্পানি- অ্যান্ডারলেখট
    ফাবিয়ান ডেলফ- এভারটন
    দানিলো-জুভেন্টাস

    লিভারপুল/ "আগেরবার না আরও দামী কিনলেন?"
    গতবার দলবদলে কাড়ি কাড়ি অর্থ খরচ করাটা বিফলে যায়নি লিভারপুলের। চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে ইয়ুর্গেন ক্লপ প্রমাণ করেছেন সবকিছুই। কিন্তু শীর্ষে থাকা অবস্থায়ও তো উন্নতি করার সুযোগ থাকে। এবার অবশ্য সেই পথে হাঁটেনি লিভারপুল। অদ্ভুত এক দলবদল পার করেছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা।

    সিমোন মিনিওলের জায়াগায় ওয়েস্টহাম থেকে এসেছেন আদ্রিয়ান। আর দুইজন ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী খেলোয়াড়। একজন নেদারল্যান্ডসের ডিফেন্ডার সেপ ভ্যান ডেন বার্গ। আরেকজন ১৬ বছর বয়সী ইংলিশ উইঙ্গার হার্ভি এলিয়ট। এই তিনজনের কারও মূল দলে খেলার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অর্থাৎ গতবারের স্কোয়াডই এবার ভরসা লিভারপুলের। এবার দলবদলে সেভাবে সচেষ্ট না হওয়ার কি মূল্য দিতে হবে? 

    যারা এলেন
    আদ্রিয়ান-ওয়েস্টহাম 
    সেপ ভ্যান ডেন বার্গ- পিইসি জোল 
    হার্ভি এলিয়ট-ফুলহাম

    যারা গেলেন
    সিমোন মিনিওলে- ক্লাব ব্রুজ
    আলবার্তো মরেনো, অ্যাডাম বোগদান, ড্যানিয়েল স্টারিজ- রিলিজড
    হ্যারি উইলসন-বোর্নমাউথ (ধার)

    টটেনহাম হটস্পার/"জিতছেন ভাই" 
    গত দেড় বছরে কোনো খেলোয়াড়ই দলে ভেড়ায়নি যারা, সেই টটেনহাম এবার চমকই দেখাল। অবশ্য ডেডলাইন ডে এর আগে আরও চমক দেখাতে বসেছিল তারা। পাউলো দিবালা, ফিলিপ কৌতিনিয়ো- সবগুলো নাম শোনা গেল একবারে। কোনোটাই হয়নি যদিও। এরপরও খুশি মনেই দলবদল শেষ করার কথা টটেনহামের।

    মাউরিসিও পচেত্তিনো এবার মনমতো খেলোয়াড়ই পেয়েছেন। মুসা ডেম্বেলে ক্লাব ছেড়ে যাওয়ার পর হোল্ডিং মিডফিল্ডে একটা ঘাটতি রয়ে গিয়েছিল টটেনহামের। সেটা পুষিয়ে দিতে ক্লাব রেকর্ড ভেঙেছে টটেনহাম। ২২ বছর বয়সী টাঙ্গুয়ে এনদম্বেলে বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার। পাসিং ও পজিশনিং দারুণ, গতিও আছে- পল পগবার সঙ্গে তার খেলার মিল খুঁজে পান অনেকেই।

    ডেডলাইন ডে তে আরও দুইজনকে দলে ভিড়িয়েছে টটেনহাম। জিওভানি লো সেলসোও ২২ বছর বয়সী। গতবার পিএসজি ছেড়েছিলেন নিয়মিত খেলার সুযোগ না পেয়ে। রিয়াল বেটিসে এক মৌসুমে জাত চিনিয়েছেন সুযোগ পেয়ে। আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার এসেছেন আরেক আর্জেন্টাইন কোচের কাছে। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে গেলে লো সেলসো মৌসুমের সেরা দলবদলও হয়ে যেতে পারে।  

    ফুলহামকে প্রিমিয়ার লিগে তোলার মৌসুমে চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিল রায়ান সেসিনিয়োন। শেষদিনে তাকেও দলে এনেছে টটেনহাম। ইংলিশ ফুটবলার অবশ্য লেফটব্যাক ও লেফট উইঙ্গার দুই পজিশনেই খেলতে পারেন। তবে টটেনহামে লেফটব্যাকেই খেলার কথা। রক্ষণেও তাই নতুন যোগান পেলেন পচেত্তিনো।

    যারা এলেন
    টাঙ্গুয়ে এনদম্বেলে - লিঁও
    জিওভানি লো সেলসো- বেটিস
    রায়ান সেসিনিয়োন- ফুলহাম
    জ্যাক ক্লার্ড- লিডস ইউনাইটেড

    যারা গেলেন
    ফার্নান্দো ইয়োরেন্তে- রিলিজড
    কিয়েরান ট্রিপিয়ের (অ্যাটলেটিক মাদ্রিদ)

    ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড/ "হারছেন ভাই"
    ১২৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করেছে এবার ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। সেটা করতেই হত। কিন্তু যে ঢঙে সে খরচটা হলো তাতে ইউনাইটেডের ভাগ্য খুব বেশি ফেরার কথা নয়। দুই ডিফেন্ডারের পেছনেই ইউনাইটেডের খরচ হয়ে গেছে ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ড। হ্যারি ম্যাগুয়েরকে ডিফেন্ডারদের বিশ্বরেকর্ড গড়ে এনেছে তারা। ম্যাগুয়ের এখনও বিশ্বসেরাদের কাতারে নন। অবশ্য বিশ্বসেরা হওয়ার যোগ্যতা আছে তার। কিন্তু অপরীক্ষিত। অ্যারন ওয়ান বিসাকা সম্ভাবনাময় দারুণ ফুটবলার। তবে তাকে পাড়ি দিতে হবে বহু পথ। সবমিলিয়ে রক্ষণ কিছুটা শ্রী ফেরার কথা ইউনাইটেডের।

    পল পগবাও হয়ত শেষ পর্যন্ত থেকে যাবেন। কিন্তু মিডফিল্ডের সমস্যাটা যাচ্ছে না। অ্যান্ডার হেরেরা যাওয়ার পর তার জায়গায় নতুন কাউকে আনতে ব্যর্থ হয়েছে ইউনাইটেড। ফ্রেড, নেমানিয়া মাতিচ, জেসি লিনগার্ডদের অবস্থা আপনার বাথরুমের টিপ টিপ করে জ্বলে থাকা লাইটের মতো। না বদলালেও চলে। কিন্তু জরুরী কাজের সময় সেটা জ্বলবে কী না আপনি নিশ্চিত নন। আক্রমণে রোমেলু লুকাকুকে ছেড়ে দিয়েছে ইউনাইটেড। স্ট্রাইকার বলতে এখন আছেন শুরু মার্কোস র‍্যাশফোর্ড ও অ্যান্থনি মারশিয়াল। দুইজনের কেউই জাত স্ট্রাইকার নন। সোয়ানসি থেকে আসা ড্যানিয়েল জেমস আপাতত ভবিষ্যতের জন্য। এবার খুব বেশি পার্থক্য গড়তে পারার কথা নয় তারও। 

    দলবদলের বাজারে ব্রুনো ফার্ন্দেজ, পাউলো দিবালা- নামগুলো কেবল শুনেই গেছেন ইউনাইটেড সমর্থকেরা। নিকোলাস গাইতানের মতো কেউ কথা রাখেনি! অথবা এড উডওয়ার্ড আরেকবার ব্যর্থ। চ্যাম্পিয়নস লিগে না থাকায় অবশ্য দলবদলের বাজারটা একটু কঠিনই হওয়ার কথা ছিল এবার তাদের জন্য। তবে আরেকটু কৌশলী হতে পারত বোধ হয় ইউনাইটেড।   

    যারা এলেন
    ড্যানিয়েল জেমস- সোয়ানসি সিটি
    অ্যারন ওয়ান বিসাকা- ক্রিস্টাল প্যালেস
    হ্যারি ম্যাগুয়ের- লেস্টার সিটি

    যারা গেলেন
    অ্যান্টোনিও ভ্যালেন্সিয়া- কিতো
    অ্যান্ডার হেরেরা- পিএসজি
    জেমস উইলসন- রিলিজড
    রোমেলু লুকাকু- ইন্টার মিলান

    চেলসি/"হারছেন ভাই"
    ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডকে দোষ দেওয়ার কোনো উপায় নেই। দলবদলে নিষেধাজ্ঞা, কিছু করার নেই তার। কিছু করার নেই সমর্থকদেরও। ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচকে আগে থেকেই চেলসির হয়ে ছিলেন, এবার যোগ দিচ্ছেন তাই। আর মাতেও কোভাসিচকে ধারে নেওয়ার সময় কিনে রাখার অপশন ছিল, তাই তিনিও আছেন দলে। এছাড়া নতুন কাউকে কিনতে পারেনি চেলসি। সেটাও হয়ত ততোখানি দুশ্চিন্তার কারণ হত না, যদি না এডেন হ্যাজার্ড থেকে যেতেন ক্লাবে। গত কয়েক মৌসুম ধরে নিজেদের সেরা খেলোয়াড় হারিয়ে তাই ল্যাম্পার্ডের চেলসি এখন কিছুটা ধারহীন । স্ট্রাইকার বলতে আছেন শুধু অলিভিয়ের জিরু। এই দল নিয়ে কোনকিছুই আন্দাজ করার চেয়ে বরং না করাই ভালো।

    যারা এলেন
    ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ- বরুশিয়া ডর্টমুন্ড
    মাতেও কোভাসিচ- রিয়াল মাদ্রিদ

     

    যারা গেলেন
    আলভারো মোরাতা-অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ
    ডেভিড লুইজ- আর্সেনাল
    (রীতি মেনে একগাদা তরুণ ফুটবলার পাড়ি জমিয়েছেন অন্যান্য ক্লাবে)

    আর্সেনাল/ "জিতছেন ভাই"
    ম্যান সিটি, টটেনহামের পর দলবদলের রেকর্ড ভেঙেছে আর্সেনালও। নিকোলাস পেপেকে দলে নিয়েছে তারা। পিয়ের এমেরিক অবামেয়াং, অ্যালেক্সান্ডার লাকাতেজের সঙ্গী এখন তিনি গানারদের ফ্রন্ট থ্রিতে। গোল পেতে খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা নয় আর্সেনালের।

    মিডফিল্ডে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ধারে আর্সেনাল এনেছে দানি সেবায়োসকে। তাতে মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ পেতে আরেকটু সুবিধা হওয়ার কথা। রক্ষণের সমস্যাটা অবশ্য প্রকট ছিল আর্সেনালের। এর ভেতর লরেন্ট কোশেয়লনি ক্লাব ছাড়ায় ঝামেলা বেড়েছে আরও (বোর্দোতে যোগ দেওয়ার ভিডিও দেখে অবশ্য গানার সমর্থকেরা আফসোস ভুলেছেন)। শেষদিনে কিয়েরান টিয়ের্নিকে দলে নিয়েছে গানাররা। ২২ বছর বয়সী স্কটিশ লেফটব্যাক বয়সের তুলনায় অসাধারণ খেলেন। আর্সেনালের রক্ষণে বেশ ভালো সংযোজন। ডেভিড লুইজ বল প্লেয়িং ডিফেন্ডার। চোখে লাগার মতো ভুল করেন হরহামেশাই, রক্ষণে হয়ত সেভাবে ভরসাও করা যায় না তার ওপর। তবে উনাই এমেরির খেলার স্টাইলের সঙ্গে দারুণভাবে মিশে যাওয়ার কথা তার। 

    শেষদিকে অ্যালেক্স ইওবিকে ৩৫ মিলিয়নে এভারটনের কাছে বিক্রি করে আয়-ব্যয়ের হিসাবটাও বেশ সুন্দরভাবে মিলিয়ে ফেলেছে আর্সেনাল।

    যারা এলেন
    নিকোলাস পেপে- লিল
    ডেভিড লুইজ- চেলসি
    কিয়েরান টিয়েরনি- সেল্টিক

    উইলিয়াম সালিবা- সেন্ট এতিয়েন
    দানি সেবায়োস- রিয়াল মাদ্রিদ

     

    যারা গেলেন
    পিটার চেক- অবসর
    লরেন্ট কোশেয়েলনি- বোর্দো
    ড্যানি ওয়েলবেক- ওয়াটফোর্ড

    অ্যারন রামসি- জুভেন্টাস
    স্টেফান লিচস্টেইনার- রিলিজড
    অ্যালেক্স ইওবি- এভারটন