• আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্ট
  • " />

     

    স্মৃতির এমএ আজিজে আফতাবের সঙ্গে...

    কথা বলতে বলতে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ছিলেন আফতাব আহমেদ। ‘এই মাঠে কত স্মৃতি আমার’- বলতে বলতে যেন হারিয়ে গেলেন প্রায় ১৫ বছর আগে। চট্টগ্রামের ক্রিকেট মানে তখন এমএ আজিজ স্টেডিয়াম, আর ঘরের ছেলে আফতাবের সেখানে তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। সেই এমএ আজিজে স্টেডিয়ামে এখন আফতাবের ফেরা কোচ হয়ে, আফগানিস্তানের প্রতিপক্ষ বিসিবি একাদশের সহকারী কোচ ছিলেন আজ। প্রায় ভাঙা হাটের মতো এমএ আজিজে আফতাবের আক্ষেপটা তাই বাজল বিষাদের করুণ সুরেই।

    এমএ আজিজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত অনেক আগে থেকেই। এই মাঠে ক্রিকেটের শুরুটা অবশ্য আজকের কথা নয়। উইকিপিডিয়া বলছে, ১৯৫৫ সালে নির্মানের পর ভিনু মানকড়ের নেতৃত্বে সে সময়ের ভারত দল খেলতে আসে এখানে। তাদের প্রতিপক্ষ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্পোর্টস ফেডারেশন। কাজির দেউড়িস্থ এই মাঠ তখন থেকেই ছিল চট্টগ্রামের খেলাধূলার প্রাণকেন্দ্র। মূল মাঠের বাইরে আউটার স্টেডিয়ামে খেলেই বড় হয়ে ওঠা ঢিল ছোড়া দূরত্বে বাড়ির মিনহাজুল আবেদীন, আকরাম খানদের।

    এমএ আজিজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শুরুটাও সেই ১৯৮৮ সালেই। প্রথম ম্যাচে ছিলেন ‘গরর ফুয়া’ মিনহাজুল আবেদীন, সাকুল্যে অবশ্য এই মাঠে দুইটি ওয়ানডেই শুধু খেলতে পেরেছেন। আকরাম খানের তো মাত্র একটি ওয়ানডে খেলার সৌভাগ্য হয়েছে আক্ষরিক অর্থেই পাড়ার মাঠে। বরং তাদের চেয়ে অনুজ আফতাব আর নাফীস ইকবালরা একটু বেশি সৌভাগ্যবান। এখানে চারটি ওয়ানডে খেলেছেন নাফীস, আর আফতাবও চারটি। কাকতালীয়ই বটে, দুজনেরই আবার তিনটি করে টেস্ট খেলার সুযোগ হয়েছে। তাদের চেয়ে কীর্তিতে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া আরেক ঘরের ছেলে তামিম ইকবালের যখন অভিষেক হয়েছে, তার আগেই চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাট চুকে গেছে এমএ আজিজ স্টেডিয়ামের।

    তবে আর সবকিছু সময়ের স্রোতে ভেসে গেলেও এই মাঠের একটা স্মৃতি সারাজীবনই মনে থাকবে নাফীস-আফতাবের। ২০০৫ সালের ১০ জানুয়ারি। সময় ঠিক ১২টা বেজে ৫৪ মিনিট। এনামুল হক জুনিয়রের বলে সিলি মিড অফে ক্রিস পোফুর ক্যাচটা ধরলেন মোহাম্মদ আশরাফুল, এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে যেন একটুকরো বিস্ফোরণ। সেই “বাংলাদেশ, বাংলাদেশ” চিৎকার, একদল কিশোরের সেই উদ্বাহু নাচ, রফিক, এনামুলদের সেই ভিক্টরি ল্যাপ-অবকিছুই অংশ হয়ে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট পুরাণের অংশ। কাকতালীয়ভাবে সেদিন গ্যালারিতে ছিলেন এই লেখকও, আফতাবদের সেই উল্লাস এখনও তার স্মৃতিতে বাঙময়। প্রথম কিছু কখনোই ভোলা যায় না, আর প্রথম টেস্ট জয়ের স্মৃতি তো ভোলা অসম্ভব।

     

     

    সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়া হলে আফতাব যেন টাইম মেশিনে চড়ে হারিয়ে গেলেন সেখানে, ‘যেটা ফার্স্ট টেস্ট জিতলাম, সেটার সব কিছুই মনে আছে। এই এমন একটা মাঠ, যেখানে আমার অনেক স্মৃতি।’ ২০০৪ সালে এই মাঠে ভারতের সঙ্গে একটা ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচটা এখনও যেন স্পষ্ট দেখতে পান আফতাব, ‘ভারতের সঙ্গে যেদিন খেললাম,  সেদিন দর্শক এখানে ভেতরে যতজন ছিল, বাইরে ঠিক সেরকমই দর্শক ছিল। মাইকিং করে পরে বলে দেওয়া হয় যে এখানে আর জায়গা নেই আপনারা চলে যান। এত দর্শক। এটা আসলে অন্যরকম স্মৃতি।’ আফতাবের বয়স মাত্র ৩৩ হলেও খেলা ছেড়েছেন বেশ অনেকদিন, এমএ আজিজের সঙ্গে সম্পর্কটাও গেছে বদলে। যে মাঠে একটা সময় বল আছড়ে ফেলতেন সীমানার ওপারে হরদম, এখন সেখানে সেই করার দীক্ষা দেন তরুণদের। স্বীকার করলেন, সাকিবদের মতো কেউই এখন বেরিয়ে আসছে না তেমন। তবে জোর দিয়েই বললেন, যথেষ্ট সময় না দিলে তেমন প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে না।

     

    কাকতালীয়ই বটে, আজ মাঠে আফতাবের সঙ্গে এই মাঠের ঘরের ছেলেও দুজন ছিলেন। নুরুল আবেদীন নোবেল ও মিনহাজুল আবেদীন সহোদর ভাই। প্রথমজন বিসিবি একাদশের কোচ আর পরের জন তো এখন প্রধান জাতীয় নির্বাচক। এমএ আজিজে ভিন্ন ভূমিকায় আসতে হয়েছে তাদেরও।

    তবে সেই জৌলুস এই মাঠ হারিয়েছে অনেকদিন আগেই। শ্রীহীন গ্যালারি দেখলে বোঝা যায়, যত্নআত্তি নেওয়া হয় না একদম। এমনিতেই বারোয়ারি ব্যবহারে এই মাঠ একরকম ধুঁকছে। আন্তর্জাতিক ম্যাচ না হলেও বিদেশী দলগুলোর প্রস্তুতি ক্রিকেট ম্যাচ এখানে হয়। আবার ফুটবলের মৌসুমেও হয় ফুটবল, সেখানে আবার আন্তর্জাতিক আসরও হয়। সামনেই এখানে হওয়ার কথা শেখ কামাল গোল্ড কাপ। কিউরেটর জাহিদ রেজা বাবু আফসোস করে বলছিলেন, খুব তড়িঘড়ি করে এই মাঠের উইকেট প্রস্তুত করতে হয়। ক্রিকেটের সঙ্গে প্রায় সম্পর্ক হারিয়ে যেতে বসা এই মাঠ নিয়ে তাই একটা আফসোসও আছে আফতাবের, ‘জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামটা একটু দূরে হয়ে যায়।আর এইটা এমন একটা মাঠ, যেটা আসলে ক্রিকেটের জন্য হলে আমাদের জন্য খুব ভালো হতো। ’

    আপাতত অবশ্য আফতাবের আক্ষেপ মেটার সুযোগ কম। সাগরিকার জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামই এখন চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রাণকেন্দ্র। হেলায় পড়ে থাকা গ্যালারি, অযত্নে বেড়ে ওঠা ঘাস তাই মনে করিয়ে দেয়, এমএ আজিজকে নিয়ে ক্রিকেট-রোমান্টিকদের শুধু স্মৃতির জাবরই কেটে যেতে হবে।