• লা লিগা
  • " />
    X

     

    লা লিগায় 'লেস্টার রূপকথা' ফিরিয়ে আনবে গ্রানাদা?

    লা লিগার পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে কে আছে? স্প্যানিশ লিগের খোঁজখবর খুব একটা না রাখা ফুটবল ভক্তরা হয়তো চট করেই বলে দেবেন, বার্সেলোনা অথবা রিয়াল মাদ্রিদ; অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদও হতে পারে। তবে পয়েন্ট তালিকার বর্তমান অবস্থাটা দেখে খানিকটা চমকে উঠতে পারেন তারা। লিগের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও বার্সা, রিয়াল কিংবা অ্যাটলেটিকো নয়; শীর্ষে আছে গ্রানাদা। চমকটা আরও বাড়বে, যখন মাথায় আসবে, আরে এই গ্রানাদা তো এবারই দ্বিতীয় বিভাগ থেকে উঠে এসেছে! দক্ষিণ স্পেনের ছোট্ট এই ক্লাবটি রীতিমত চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে লা লিগার বাঘা বাঘা ক্লাবদের কপালে। প্রথম দুই মাসে তাদের অবিশ্বাস্য যাত্রা দেখে সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন, ২০১৫-১৬ মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে যা করেছিল লেস্টার সিটি, গ্রানাডা কি তেমন কিছু করে দেখাতে পারবে? 

    ২০১৭ সালের মে মাস, লা লিগা মৌসুমের শেষদিন। এস্তাদিও লস কারমেনেসে তখন শ্মশানের নীরবতা। ৩৮ ম্যাচে মাত্র ২০ পয়েন্ট নিয়ে সবার শেষে থেকেই অবনমনে পড়ল গ্রানাদা। সেই মৌসুমে চারজন কোচ বদল করেও খুব একটা লাভ হয়নি আখিরে। অবনম নিশ্চিত হওয়ার পর তখনকার কোচ টনি অ্যাডামসকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠলো। কিন্তু ক্লাব কর্তৃপক্ষ অ্যাডামসকেই রেখে দিলেন। 

    ডিয়েগো মার্টনিজের জাদুর স্পর্শে বদলে গেছে গ্রানাডা 

     

    পরের মৌসুমে দ্বিতীয় বিভাগেও খুব একটা সুবিধা করতে পারল না গ্রানাদা, মৌসুম শেষ করল দশম অবস্থানে থেকে। কিন্তু এই সময়টায় অ্যাডামস গুছিয়ে দিলেন গ্রানাদার টালমাটাল হয়ে যাওয়া ঘর। অ্যাডামস যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন গ্রানাডার স্কোয়াডের ২৮ জনের মাঝে ২০ জনই ছিলেন বিদেশি ফুটবলার। বোর্ডের সাথে অনেক আলোচনার পর অ্যাডামসের কল্যাণেই সিদ্ধান্ত হলো, ক্লাবে স্প্যানিশ ফুটবলারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। 

    এরপর এলো ২০১৮ সালের গ্রীষ্ম। অ্যাডামসের চুক্তি শেষ হওয়ার পর গ্রানাদা নিয়োগ দিল ৩৭ বছর বয়সী ডিয়েগো মার্টিনেজকে। দলের নাজুক অবস্থায় এমন তরুণ কোচকে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে অবশ্য কম কথা শুনতে হয়নি গ্রানদার চাইনিজ মালিক জিয়াংকে। জিয়াং, যিনি মাত্র দুই বছর আগেই ক্লাব কিনে নিয়েছিলেন। সেবারই অবনমনে পড়েছিল গ্রানাডা। চীনের একজন ব্যবসায়ী স্প্যানিশ ক্লাবকে বুঝতে পারবেন কিনা, সেটাই প্রশ্ন ছিল সমর্থকদের মনে। জিয়াং অবশ্য সমর্থকদের হতাশ করেননি, শক্ত হাতেই সামলেছেন কঠিন সময়টা। সবাই যেন ক্লাবের খেলা দেখতে আসে, দলকে নিয়মিত সমর্থন জানিয়ে যায়, কোচিং স্টাফের ওপর ভরসা রাখে; সেই প্রচেষ্টা সবসময়ই ছিল জিয়াংয়ের। জিয়াং অকপটে স্বীকারও করে নিয়েছিলেন, ফুটবল নিয়ে খুব বেশি জ্ঞান নেই তার, সবার সাহায্য ছাড়া তিনি এগোতে পারবেন না।

    গ্রানাডার বার্সা-বধের সেই রাত

     

    মার্টিনেজকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে অবশ্য সবাইকে পাশে পাননি জিয়াং। তবে মার্টিনেজ অল্প কয়েকদিনের মাঝেই দূর করেছেন সমর্থকদের মনের সব সন্দেহ। তার হাত ধরেই ২০১৮-১৯ মৌসুমে দ্বিতীয় বিভাগে রানার্সআপ হয়ে আবারও লা লিগায় ফিরল গ্রানাদা। সেই মৌসুমে ৪২ ম্যাচে গ্রানাডার পয়েন্ট ছিল ৭৯, পুরো মৌসুমে তারা গোল হজম করেছে মাত্র ২৮টি। 

    দুই মৌসুম পর লা লিগায় গ্রানদা। প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী ভিয়ারিয়ালের মাঠে খেলতে গিয়ে ৪-৪ গোলের দুর্দান্ত এক ড্র নিয়ে বাড়ি ফিরল তারা। সেই শুরু, এই মৌসুমে গ্রানাদা রূপকথা যেন থামছেই না। এই মৌসুমের সবচেয়ে বড় সাফল্যের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে সেটা অবশ্যই বার্সেলোনার বিপক্ষে সেই ম্যাচটা। ঘরের মাঠে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের রীতিমত নাকানি চুবানি খাইয়ে ২-০ গোলের ঐতিহাসিক জয় পেয়েছিল গ্রানাদা।

    ১০ ম্যাচ শেষে ৬ জয়ে ২০ পয়েন্ট নিয়ে এখন পর্যন্ত শীর্ষে আছে গ্রানাদা। বার্সা, রিয়াল সোসিয়েদাদ, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, সেভিয়ারা অবশ্য ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ১৯ পয়েন্ট নিয়ে। আজ রিয়াল ভায়াদোলিদের বিপক্ষে বার্সা জিতলে শীর্ষে ফিরবে লিওনেল মেসিরাই। লা লিগার শীর্ষস্থানের লড়াইটা যে ম্যাজিকাল চেয়ারের মতো চলতেই থাকবে, তা অবশ্য গ্রানাদার অজানা নয়। 

    অর্থ, ইতিহাস কিংবা সাফল্য; কিছুতেই রিয়াল-বার্সার ধারেকাছেও নেই গ্রানাদা। নেই মেসি-বেলদের মতো নামীদামী ফুটবলারও। শুধু আছে হার না মানা একঝাক তরুণ ফুটবলার, যাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে আছেন আরেক তরুণ কোচ, আছে সবাইকে আগলে রাখা এক মালিক। তিন বছর আগে প্রিমিয়ার লিগে শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়েছিল অখ্যাত লেস্টার সিটি। নিজেদের ৮৮ বছরের ইতিহাসে কখনোই লা লিগার শিরোপা না জেতা গ্রানাডার সামনে এখন লেস্টারের মতো ইতিহাস গড়ার হাতছানি। মৌসুমের এখনো অনেকটাই বাকি, কিন্তু গ্রানাদা সমর্থকরা হয়তো এখনই দেখতে শুরু করেছেন স্বপ্ন। ‘লেস্টার পারলে আমরা কেনো নয়?’ বহু সমর্থক বলছেন এমনটাই।

    এস্তাদিও লস কারমেনেসে গ্রানাডা অধিনায়ক ভিক্টর দিয়াজের হাতে উঠছে লা লিগার ট্রফি, এর চেয়ে মধুর স্বপ্ন আর কিই বা হতে পারে?