• বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    ব্যাংকার থেকে 'বসুন্ধরার বুকে' | অস্কার ব্রুজোন

    অস্কার ব্রুজোন নীলফামারির শেখ কামাল স্টেডিয়ামকে ভালোবেসে ফেলেছেন। তার দল যত জায়গায় ফুটবল খেলেছে, তার ভেতর ওই মাঠের অবস্থা কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে ব্রুজোনকে। আরও একটা কারণ আছে। নীলফামারিতে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। ঢাকায় সেই সুযোগ কই? ঢাকার বাসিন্দাদের নাভিশ্বাস উঠে যায়, স্প্যানিশ ‘বিদেশী’র জন্য তো সেটা একরকম নরকের মতো মনে হওয়ার কথা। 

    বসুন্ধরা অবশ্য আরও পছন্দ ব্রুজোনের। তার ক্লাব নতুন ট্রেনিং গ্রাউন্ড তৈরি করেছে। সেখানে নিয়মিত দলকে অনুশীলন করান তিনি। এএফসি কাপে অভিষেক হচ্ছে বসুন্ধরা কিংসের। নীলফামারির মাঠ এএফসির ছাড়পত্র পায়নি। বসুন্ধরাকে হোম ভেন্যু হিসেবে বেছে নিতে হচ্ছে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামকে। ব্রুজোনের হাতে ক্ষমতা থাকলে বসুন্ধরার মাঠেই মালদ্বীপের টিসি স্পোর্টসের বিপক্ষে হোম ম্যাচ খেলে ফেলার ব্যবস্থা করতেন।

    মার্চের ১১ তারিখ বাংলাদেশ ফুটবলের নতুন শক্তি বসুন্ধরা কিংস পা রাখছে এশিয়ান পর্যায়ে। গত মৌসুমে প্রথমবার প্রিমিয়ার লিগ খেলতে এসে দাপট দেখিয়ে শিরোপা জিতেছে বসুন্ধরা। এএফসি কাপে খেলার যোগ্যতা পাওয়া হয়ে গেছে তাতে। আর বসুন্ধরার সাফল্যের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিলেন কোচ ব্রুজোন।
     

    বাংলাদেশে এটি ব্রুজোনের দ্বিতীয় মৌসুম। প্রিমিয়ার লিগ, স্বাধীনতা কাপ, ফেডারেশন কাপ- বাংলাদেশে সম্ভাব্য সব শিরোপা জেতা হয়ে গেছে তার। এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেকে প্রমাণ করার পালা তার- এএফসি কাপ।

      


    প্রিমিয়ার লিগে দ্বিতীয় মৌসুমে এখনও দাপট দেখাতে পারেনি বসুন্ধরা। ৫ ম্যাচে ৩ জয় আর ১ ড্রয়ে অবশ্য লিগের সর্বোচ্চ ১০ পয়েন্ট তাদের দখলেই আছে। বসুন্ধরা মৌসুম শুরু করেছিল ফেডারেশন কাপ ঘরে তুলে। এতো কিছুর পরও ‘দাপট’ দেখাতে না পারা শব্দটায় খটকা লাগার কথা। কিন্তু বসুন্ধরা কিংসের অস্কার ব্রুজোনের জন্য এটাই বাস্তবতা। 

    সংবাদমাধ্যমকর্মী থেকে শুরু করে সমর্থক- কারও কাছে বসুন্ধরার জয়টাই শেষ কথা নয়। প্রথম মৌসুমের দাপট যে মানদন্ড দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তার পুনরাবৃত্তিই যেন চাই সবার। অথবা ওর চেয়েও ভালো কিছু। জয় সবচেয়ে বড় কথা, কিন্তু শেষ কথা নয় এখানে। এএফসি কাপে ভালো করতে হবে- সেটাও প্রচ্ছন্ন একটা চাপ ব্রুজোনের ওপর। 

    এই চাপও অবশ্য ব্রুজোন ভালোবাসেন। “চাপে থাকলেই নিজের সেরাটা বের করে আনতে পারি আমি”- এ কথা বলতে বলতে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে জ্বলজ্বল করে ব্রুজোনের চোখ। ব্রুজোন আসলে যে পথ পাড়ি দিয়ে এতো দূর এসেছেন আত্মবিশ্বাসই তার ভীত গড়ে দিয়েছিল।  

    ব্রুজোন হতে চেয়েছিলেন ফুটবলার। স্প্যানিশ ফুটবলের আঁতুড়ঘর হিসেবে ভালো নাম ডাক আছে সেল্টা ভিগোর। সে ক্লাবের ‘বি’ দলের হয়ে সেগুন্দা ডিভিশনে খেলতেন ব্রুজোন। বয়স যখন ২৪, তখন বাধ্য হয়েই ফুটবল ছাড়তে হয় তাকে। কুঁচকির ইনজুরিতে পড়েছিলেন তিনি। তার প্রভাব পড়েছিল কোমরে। ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষটাও সেখানে। 

    ফুটবলে মন-প্রাণ-দেহ উজাড় করা তরুণ বাধ্য হয়েই পড়াশুনায় মন দিয়েছিলেন এরপর। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসা প্রশাসনে মাস্টার্স শেষ করে ব্রুজোন চাকরি নিয়েছিলেন ব্যাংকে। গল্পটা জুভেন্টাস ম্যানেজার মাউরিসিও সারির মতো অনেকটা। কয়েক মাস যাওয়ার পরই ব্রুজোন বুঝে গিয়েছিলেন ৯-৫টা অফিস তার জন্য না। চাকরির পাশাপাশি তখন থেকেই কোচিং লাইসেন্স নেওয়ার কাজ শুরু তার। সকালে চাকরি, রাতে ফুটবল কোচিং- ঘুমুতে যাওয়ার সময় অন্তত একটি তৃপ্তি যোগ হত স্প্যানিশ যুবকের। 

    চাকরি ছেড়ে ব্রুজোনের পুরোপুরি ফুটবলে মনোযোগী হওয়ার গল্পটা অবশ্য আরও মজার। 

    টেক্সটাইল কোম্পানির ইনস্যুরেন্স করতে ৩ মাসের জন্য ভারত এসেছিলেন তিনি। প্রজেক্টটা ছিল ব্রুজোনের এক বন্ধুর। কিন্তু সেই বন্ধুর বাবা মারা যাওয়ার পর আর হুট করে প্রজেক্টও বাতিল। ব্রুজোন জীবনের কাছ থেকে সিদ্ধান্তটা পেয়ে গেলেন তখন, “প্রজেক্ট বন্ধ হওয়ার পর আমি স্পেনে ফিরে যেতে পারতাম। আমার মনে হয়েছে এসব আর আমাকে দিয়ে হবে না। ফুটবল আমায় টানত। আমি একজন স্পোর্টিং লোক। আমি জীবনের সবকিছু বিনিয়োগ করেছি ফুটবলে। ফুটবল ছাড়াও আমি স্কোয়াশ, টেনিস, হকি খেলতাম। খেলা ছাড়া আমার পক্ষে থাকা সম্ভব না।”

    ব্রুজোন এর পর ভারতের এসপিটি একাডেমিতে বয়সভিত্তিক দলের কোচ হয়ে গেলেন। কোচিং শুরু করতে এমন কিছুই খুঁজছিলেন তিনি। ওই একাডেমির এক ছাত্রের বাবা ব্রুজোনের কাজ দেখে তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন স্পোর্টিং ডি গোয়ার সঙ্গে। ২০১১ সালে তখনও ফুটবলে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেনি ভারত। ব্রুজোন এর আগেই নিজেকে ‘বিনিয়োগ’ করেছিলেন ভারতে। 

    গোয়ার হয়ে সাফল্য পথ তৈরি করে রেখেছিল ব্রুজোনের জন্য। আইএসএলে হতে পারতেন অ্যাটলেটিকো ডি কলকাতার কোচও। সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে মুম্বাই সিটিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ওই সিদ্ধান্তটা এখনও খানিকটা আফসোসে ভোগায় ব্রুজোনকে, “গোয়ায় আমার সময়টা ভালো যায়নি। আসলে কোচিং জীবনটাই এমন। সব জায়গায় সবকিছু হয় না।” 

    মুম্বাই সাফল্য ধরা না দিলেও এর পর কপাল খুলে গিয়েছিল ব্রুজোনের। রিয়াল মায়োর্কার সহকারি কোচ হয়ে ভারত থেকে স্পেনে ফিরেছিলেন ব্রুজোন। ব্রুজোনের কোচিং ক্যারিয়ারের মাইলফলক বল যায় সেটি। এর পর ভারতের মুম্বাই এফসি, মালদ্বীপের নিউ রেডিয়েন্ট হয়ে বাংলাদেশে আসা ব্রুজোনের। 

    ২০১৮ সালে যখন বসুন্ধরার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন সবকিছুই জানা ছিল ব্রুজোনের। এখানকার অবস্থা, ফুটবল কাঠামো, মাঠের দর্শকখরা- যা যা জানা প্রয়োজন। ক্লাবটা বসুন্ধরা আর তাদের লক্ষ্য ইউরোপিয়ান ধাঁচে ক্লাব গড়া- এই দুইয়ের সমন্বয় সাহায্য করেছিল ব্রুজোনের সিদ্ধান্তের সবুজ বাতি জ্বালাতে। ব্রুজোনের প্রথম মৌসুমে তার দল আসলে অন্যদের কোনোরকম পাত্তাই দেয়নি। লিগের ২৪ ম্যাচ খেলে বসুন্ধরা হেরেছিল মাত্র ১ বার। তাও শিরোপা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর। ‘ইনভিন্সিবল’ তকমাটা আনুষ্ঠানিকভাবে গায়ে সাঁটাতে পারেননি ব্রুজোন। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে তারা ছিল অপরাজেয়।

    ব্রুজোন বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন পজেশনাল ফুটবলের সঙ্গে। শরীর নির্ভর, শক্ত ট্যাকেল আর এলেমেলো ফুটবলের বিপরীতে ব্রুজোনের দল খেলেছে মস্তিষ্কনির্ভর, ফ্লুইড পাসিং ফুটবল। ব্রুজোন সে ধাঁচে ফুটবল খেলান তাতে ফুলব্যাকরা হয়ে যান আক্রমণের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। ভার্টিকাল ক্রস আর আধুনিক ইনসাইড ফরোয়ার্ড নির্ভর আক্রমণ বাংলাদেশ দেখেছে তার কল্যাণে। 

    এর পরও ব্রুজোনের কাছে খেলার স্টাইল নয়, জয়টাই মুখ্য, “আমরা বিশ্বাস করি আমরা যে ধাঁচে ফুটবল খেলি সেটা দিয়ে প্রতিপক্ষকে হারাতে পারব আমরা। এখানে স্টাইল মুখ্য নয়। বাংলাদেশে এসে প্রথমে খেলোয়াড়দের এই ধ্যান-ধারণার সঙ্গে পরিচয় করাতে কিছুটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলাটা শিখতে হয় ছোটবেলা থেকে।”

    ব্রুজোনের জন্য কাজটা কঠিন ছিল বটে। তবে ক্লাবটা বসুন্ধরা কিংস। বড় অঙ্কের বিনিয়োগ তাদের জন্য সমস্যার কারণ নয়। অবশ্য শুধু বিনিয়োগ করলেই যে উন্নতি করা সম্ভব না, তার প্রমাণ তো দেশের ফুটবল পেয়েছে বারবার। ক্লাব কর্তৃপক্ষের স্বদিচ্ছাটাই আসলে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বসুন্ধরা কিংসকে। তারা চায় ইউরোপিয়ান আদলে ফুটবল ক্লাব গড়তে। একাডেমি, স্টেডিয়াম- সবদিকেই মনোযোগ আছে তাদের। 

    বসুন্ধরার সেই স্বপ্নের সারথী ব্রুজোন। যিনি মাঠে দর্শক আনাটাও নিজের দায়িত্ব ভাবেন, “আমার আর আমার ক্লাব প্রেসিডেন্টের বিশ্বাস, মাঠে ভালো ফুটবল হলে দর্শক আসবে। টিভিতে সম্প্রচার হবে।” ব্রুজোন মুখে জয়ের কথা যতই বলুন, ৪২ বছর বয়সী স্প্যানিশ ভদ্রলোকও মৃতপ্রায় ফুটবল জাগিয়ে তোলার সংগ্রামের অনুঘটক।     

    ব্রুজোনের জন্য কাজটা তাই এবার দ্বিগুণ কঠিন। মৌসুম শুরুর আগেই সেরকম ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন তিনি, “এবার অনেকেই বুঝতে পেরেছে আমরা কোন কৌশলে খেলি। তারা আমাদের ধরার চেষ্টা করছে। আমাদের তাই প্রতিদিন উন্নতি করতে হবে।” 

    উন্নতি বসুন্ধরা করছে। তবে এবারের উন্নতির ছাপটা চোখে ধরা দিচ্ছে না সহসায়। এই মৌসুমে জাতীয় দলের আরও কয়েকজন খেলোয়াড় দলে ভিড়িয়েছে বসুন্ধরা কিংস। বিশ্বকাপ খেলা দানিয়েল কলিনদ্রেস রয়ে গেছেন। নিকোলাস দেলমন্তে, আখতাম নাজারোভরা দল ভারী করেছেন। দলবদলের সময় ফুরিয়ে যাওয়ায় লিগের প্রথম অংশে খেলতে না পারলেও আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে খেলা স্ট্রাইকার হের্নান বার্কোসকে তুলে দেওয়া হয়েছে ব্রুজোনের হাতে। লক্ষ্য একটাই, এএফসি কাপে ভালো করা। 

    চাপটাও তাই দ্বিগুণ ব্রুজোনের জন্য। ম্যাচ জিতেও সংবাদ সম্মেলনে ব্রুজোনকে শুনতে হয় অন্যরকম প্রশ্ন। “আরও গোল কেন হলো না?”, “আরেকটু ভালো তো খেলা উচিত ছিল”, “জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা সুযোগ পাচ্ছেন না কেন?”- প্রশ্নবাণে একরকম জর্জিরিত হতে হয় তাকে। ব্রুজোন তাই প্রেরণা খোঁজেন নিজের ক্যারিয়ারে, যে সময় প্রতিদিন লক্ষ্য পূরণের বোঝা নিয়ে ‘ফরমাল’ পোশাকে ঘর থেকে বের হত থাকে। “স্পেনে চাকরি করার সময় আমাকে প্রতি মাসেই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হত। আমি আমার কোম্পানির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। ইনস্যুরেন্সে চাকরির অভিজ্ঞতা এখন ফুটবলেও কাজে দিচ্ছে আমার। বসুন্ধরা কিংসকে নিয়ে এএফসি কাপে প্রত্যাশা অনেক বেশি। চাপ আমার জন্য কোনো বিষয় না। আমার মনে হয় চাপে থাকলেই আমি আমার সেরাটা বের করে আনতে পারি।” 

    ব্রুজোনের এই একটি পরীক্ষাই বাকি আছে। এএফসি কাপের কঠিন পরীক্ষা। বসুন্ধরার সঙ্গে তার চুক্তি ২০২০ পর্যন্ত। তার ধ্যান-ধারণা অনুযায়ী এক ক্লাবে দুই বছরের বেশি সময় পার করা উচিত না। মৌসুম শেষে ক্লাব প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন ব্রুজোন। এর আগে বসুন্ধরাকে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল এনে দিতে হবে। সেই পরীক্ষা শুরু হচ্ছে ১১ মার্চ থেকে, টিসি স্পোর্টসের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। 

    বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মাঠ মোটেই পছন্দ নয় ব্রুজোনের। তার খেলার ধরনের জন্য মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা জাতীয় স্টেডিয়ামের পিচের মান। শুধু ব্রুজোন নয়, বাংলাদেশে কাজ করেন এমন প্রায় সব বিদেশী কোচই মাঠের মান নিয়ে কথা বলেন একই সুরে। ব্রুজোন সীমাবন্ধতার কথা জানেন, বোঝেন। ভরসা তার নিজ ক্লাবের ওপর। বসুন্ধরাকে নিয়ে তিনি এএফসি কাপের গ্রুপ পর্ব পেরুতে চান। 

    এরপর বাংলাদেশ ছাড়ার আগে একবারের জন্য হলেও বসুন্ধরার মাঠটায় একটি ম্যাচ খেলে যেতে চান তিনি। আসলে শুধু নীলফামারির সেই মাঠ নয়, বসুন্ধরার প্রেমেই পড়েছেন ব্রুজোন।