• বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    মেসিকে নিজের জার্সি উপহার দিয়েছিলাম | বসুন্ধরা ফুটবলারের সাক্ষাৎকার

    এই মৌসুমের শুরুতে নিকোলাস দেলমন্তেকে দলে ভিড়িয়েছে বসুন্ধরা কিংস। বৈশ্বিক মহামারিতে খেলা বন্ধ, দেলমন্তেও তাই আছেন ঘরেই। ঢাকায় নিজের বাসা থেকেই প্যাভিলিয়নকে জানিয়েছেন বাংলাদেশে তার অভিজ্ঞতার কথা। শুনিয়েছেন লিওনেল মেসির সঙ্গে দেখা করার গল্পও। 

    সব ঠিকঠাক থাকলে এখন পুরোদমে খেলায় ব্যস্ত থাকতেন। সময়টা তো ভালো না। কী করে দিন কাটছে ঢাকায়?

    দেলমন্তে: অদ্ভুত একটা সময় পার করছি আমরা। এই সময়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা পালন করা উচিত সবার। খেলোয়াড়দের জন্য সময়টা আরও বিরল। ভেবে দেখুন, মাঠেই যেতে পারছেন না। তবে থেমে থাকলে তো চলবে না। বাড়িতে বা যেখানে অল্প জায়গা আছে সেটাকে কাজে লাগিয়ে অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছি।

    অতীতেই ফিরে যাওয়া যাক। বসুন্ধরা কিংসের প্রথম আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় আপনি। এর আগে স্পেনের দ্বিতীয় স্তরেও খেলেছেন। বসুন্ধরার কাছ থেকে যখন প্রস্তাব পেলেন কী মনে হয়েছিল? বাংলাদেশ সম্পর্কে কতোটা জানতেন এখানে আসার আগে?  

    দেলমন্তে: বাংলাদেশ টেক্সটাইল ইন্ড্রাস্ট্রির জন্য বিখ্যাত জানতাম। এছাড়া জানা শোনা কমই ছিল সত্যি বলতে। তবে যখন বাংলাদেশের আসার কথা-বার্তা চলছিল তখন আর্জেন্টিনা দল নিয়ে এদেশের মানুষের পাগলামোর কথা শুনে বিস্মিত হয়েছিলাম। বিশ্বকাপের সময় এখানে মানুষের ঘরে ঘরে পতাকা আর জার্সির পরার উৎসবের ছবি দেখে অবাকই হয়েছিলাম আসলে।
    .
    অস্কার ব্রুজোন (বসুন্ধরা কিংস কোচ) শুরুরদিকে বলেছিলেন আপনার ভূমিকাটা দলের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন পজিশনে খেলছেন এখানে। এই কয়দিনের বিচারে নিজের পারফরম্যান্স কিভাবে বিচার করছেন?  

    দেলমন্তে: আমি আসলে সেন্টার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকায় সবচেয়ে বেশি খেলেছি। অবশ্য সেন্টারব্যাক আর লেফটব্যাক হিসেবেও আমার ভালো অভিজ্ঞতা আছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের আমার পারফরম্যান্সকে বিচার করতে বললে আমি বলব পজিটিভ দিকগুলোই বেশি। তবে এই ভালো কাজগুলো চালিয়ে যেতে হবে। দল হিসেবে আমাদের আরও উন্নতি দরকার।


    সাবাদেলের ড্রেসিংরুমে মেসির ছবির সামনে, এরপর মেসির সঙ্গেই দেলমন্তে!


    আরেকজন আর্জেন্টাইন পেয়েছেন দলে। হের্নান বার্কোসের আসায় ব্যক্তিগত দিক থেকেও লাভ হলো?

    দেলমন্তে: অবশ্যই বার্কোস দলে আসার পর আমাদের দলের মান ও শক্তি বহুগুণ বেড়েছে। আগে এই দলের একমাত্র আর্জেন্টাইন ছিলাম আমি। এখন ও আসার পর আরেকটু সুবিধাই হয়েছে। খেলাধুলা বাদেও আর্জেন্টিনার অবস্থা নিয়ে গল্প করার লোক হয়েছে আর কী!  

    আপনার ঘরে বড়সড় দুইটি আর্জেন্টিনার পতাকা আছে। প্রায়ই আপনাকে মেসির জার্সি পরে বসুন্ধরায় দেখা যায়। কারণটা কী?

    দেলমন্তে: ফুটবলের জন্য যখন আমি দেশ ছেড়েছি, তখন থেকেই আমার সঙ্গে এই পতাকাগুলো আছে। আমি যেখানেই যাই আমার সঙ্গে দুটি জিনিস থাকে দেশের পতাকা আর মেসির একটি জার্সি। পতাকার রঙ আমার মনে প্রশান্তি এনে দেয়। আর জার্সিটা রাখা নিতান্তই অন্য কারণে। আমি চাই এই পতাকার রঙ্গে মেসি একদিন বিশ্বকাপ জিতুক!

    আপনি তো বিরাট মেসিভক্ত তাহলে! আপনি যে ক্লাবে খেলতেন সেটাও তো কাতালুনিয়ায়। মেসির সঙ্গে আলাদা করে কখনও দেখা করার সুযোগ হয়েছে?

    দেলমন্তে: দেখা করার গল্পটা অবশ্য দারুণ। বলতে পারেন আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহুর্ত। গত বছর সাবাদেলের হয়ে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ ছিল। দলকে রেলিগেশনের হাত থেকে বাঁচাতে জয়টা দরকার ছিল আমাদের। ড্রেসিংরুমে সবার ক্লজেটে যার যার ছবি থাকে। আমি ওখানে মেসির ছবি সাঁটিয়ে রেখেছিলাম। মেসির প্রতি আমার এই পাগলামো আমাদের ক্লাব প্রেসিডেন্ট এস্তেভে ক্লাজাদাও জানতেন।

    ওই ম্যাচের আগের রাতে তিনি আমাকে একটি টেক্সট পাঠিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এই ম্যাচ দলকে জেতাতে পারলে মেসির সঙ্গে দেখা করিয়ে দেবেন। ম্যাচটা আমরাই জিতেছিলাম। ক্লাজাদাও কথা রেখেছিলেন।

    ইনস্টাগ্রামের আপনার প্রোফাইল পিকচারের ছবিটা তাহলে সেদিনের?
    হ্যাঁ। মেসির সঙ্গে দেখা হওয়ার অনুভূতি আসলে আমার পক্ষে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। প্রথমে গিয়েছিলাম বার্সার ট্রেনিং গ্রাউন্ডে, তখন মেসিরা অনুশীলন করছিল। অনুশীলন শেষে দেখি মেসি আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ওই মুহুর্তটা অসাধারণ ছিল। ১০ মিনিট সময় কিভাবে পার হয়ে গেছে আমি বুঝতেই পারিনি।

    কী কথা হয়েছিল মেসির সঙ্গে?
    সময় যেহেতু অল্প, আর আমিও আসলে অভিভূত ছিলাম। তাই ফুটবলের বাইরে খুব বেশি কথা হয়নি। ফেরার আগে আমি বলেছিলাম চোখের সামনে ওর মতো একজনের খেলা দেখতে পেরে আমি ভাগ্যবান। আমার মতে মেসিই সেরা। ও হ্যাঁ, এর আগে আমার একটি জার্সিও মেসিকে উপহার দিয়েছিলাম। সেটা আবার স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছিল মেসি!      

    দারুণ গল্প! আপনি তো মেসির মতোই মাটেও পান করেন? বাংলাদেশে এই বস্তু পেলেন কিভাবে?

    দেলমন্তে: (হাসি) এটা আসলে আমাদের আর্জেন্টাইন সংস্কৃতি বলতে পারেন। ইয়ার্বা (মাটের প্রধান উপাদান) আর বম্বিয়া (মাটে কাপ) আর্জেন্টিনা থেকে এগুলো নিয়ে এসেছিলাম। এখানে শুধু গরম পানি ঢালি (হাসি)।



    মেসির হাতে দেলমন্তের স্বাক্ষর করা জার্সি


    ফুটবল বাদ দিলে নাচ ব্যাপারটা আপনার কাছে বেশ প্রিয়। কোয়ারেন্টিনে ট্যাঙ্গো নেচে সময় পারছেন?

    দেলমন্তে: হা হা হা, না আমি ট্যাঙ্গো নাচতে জানিনা। আর্জেন্টাইন এই নাচটাই সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত। তবে আমি বাছাতা, সালসা, কুয়ারতেত, কুম্বিয়া এসব পছন্দ করি বেশি।

    নীলফামারি হোক আর সেটা ঢাকায়ই হোক, আপনাকে নিয়মিত সাধারণ বাংলাদেশীদের মিশতে দেখা যায়। সত্যি বলতে বাংলাদেশে ঘরোয়া ফুটবল অতোটা জনপ্রিয় নয়। আপনাকে দেখে ওরা কী বলে?  

    দেলমন্তে: আমি নতুন দেশ নতুন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে ভালোবাসি। আমার মনে হয় জীবনকে গভীরভাবে বুঝতে এর বিকল্প নেই। বাংলাদেশের মানুষের দারুণ। সবাই বন্ধুর মতো আচরণ করে এখানে। আমাকে দেখে জানতে চায় আমি কোথা থেকে এসেছি। আর যখন শোনে আমি আর্জেন্টাইন তখন তারা মেসি আর ম্যারাডনার কথা জিজ্ঞেস করে। আমাকে জানায় তারাও এই দুইজনকে কতো ভালোবাসে। তাদের সঙ্গে মিশতেও তাই আমার সুবিধা হয়।


    ফুটবল বাদে ঢাকায় দেলমন্তের দিন কাটে যেভাবে!


    প্লেয়ার প্রোফাইল: নিকোলাস দেলমন্তে

    গত বছর নভেম্বরে স্পেনের সেগুন্দা ডিভিশনের ক্লাব এক্সত্রেমাদুরা থেকে বসুন্ধরা কিংসে যোগ দিয়েছিলেন নিকোলাস দেলমন্তে। ফেডারেশন কাপে দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন, লিগেও ৬ ম্যাচের ভেতর ৫টিতেই খেলেছেন। অস্কার ব্রুজোনের দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যই তিনি। নিকোলাস ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন নিজ দেশ আর্জেন্টিনায়। আর্জেন্টাইন লিগের ‘টপ ফাইভ’ ক্লাব ইন্ডিপেন্ডিয়েন্টেতে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু। ২০১১-১২ মৌসুমে কোচ অ্যান্টোনিও মোহামেদের অধীনে খেলেছেন গ্যাব্রিয়েল মিলিতোর সঙ্গেও। বাংলাদেশে আসার আগে সাবাদেলের হয়ে ধারে খেলছিলেন তিনি।