• সিরি আ
  • " />

     

    ইতালির জন্য ভালোবাসা | ফ্যাবিও ক্যানাভারোর কোয়ারেন্টিন ডায়েরি

    করোনা ভাইরাসের রূদ্ররূপ এখন পর্যন্ত ইতালির মতো খুব কম দেশই দেখেছে। বাজ্জিওদের দেশে অকাতরে মরেছে মানুষ, আর দেশ থেকে অনেক দূরে সেই খবর পেয়ে দীর্ণ হয়েছে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ফাবিও ক্যানাভারোর হৃদয়। প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে লেখা এই খোলা চিঠিতে এত হতাশার মাঝেও স্বপ্ন দেখেছেন নতুন ভোরের। 


     

    ইতালির সবার প্রতি,

    আমাদের দেশে এখন যা হচ্ছে তা নিয়ে আমি যথেষ্ট আতঙ্কিত এবং ব্যথিত। ইতালিতে প্রতিদিন এতো প্রাণ ঝরে যাওয়ার খবর মেনে নেওয়া সত্যিই কঠিন। যারা এই ভাইরাসের ফলে তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তাদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা।

    আমি ফ্রন্টলাইনে দাড়িয়ে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা সকল স্বাস্থ্যকর্মীদের স্যালুট করতে চাই, যারা তাদের সবটা দিয়ে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর কাজ করে যাচ্ছেন। আপনারাই এখন এই দেশের আসল নায়ক।

    দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে আমরা কেউই সুপারম্যান নই, এই ভাইরাসে যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে, এই সহজ বিষয়টি অনুধাবন করতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে। চীনে যখন প্রথম এই মহামারী হানা দেয়, আমরা ইতালিয়ানরা তখন ভেবেছি, আমাদের কিছুই হবে না।

    আমি নিজেও এটাকে শুধুই একটা ফ্লু হিসেবে দেখেছি। আমি নিজেও এর ভয়াবহতা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম।

    অথচ আমরা কতটা ভুল ছিলাম।

    শেষ পর্যন্ত ইতালিতে সব কিছু বন্ধ করে লোকজনকে ঘরে পাঠানো হয়েছে। আমি এখন গুয়াংজু এভারগ্রান্দের কোচিং করানোর জন্য চীনে অবস্থান করছি। এখানে আমরা অন্য সবার চেয়ে আরও কয়েক সপ্তাহ আগে কোয়ারেন্টিনে চলে গিয়েছিলাম। এখানকার লোকেরা এর আগে ভয়াবহ সার্স ভাইরাসের মোকাবেলা করেছে, তাই তারা জানে এমন অবস্থায় কী করা জরুরী। তবে ইতালিতে আমরা আগে কখনও এমন পরিস্থিতির মুখে পড়িনি। তবে যেহেতু আমাদের এখন এই যুদ্ধে অংশ নিতে হচ্ছে, তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করাটা জরুরী। এর মানে হচ্ছে নিজেদের সেরাটা দিয়ে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করতে হবে।

    ইতালি একটি দারুণ দেশ। আমাদের আছে অসাধারণ সমুদ্রতট এবং দর্শনীয় গ্রামীণ জনপদ। জলবায়ুগত কারণে আমরা দিনের বেশিরভাগ সময় গৃহের বাইরে কাটাতে পারি। আমাদের আছে ফ্যাশন, দারুণ খাবার। আর আমরা নিজেদের এই আভিজাত্যগুলোর কারণে একটু বেশিই গা এলানো স্বভাবের হয়ে গিয়েছি। আমাদের মাঝে এক ধরনের স্বার্থপরতা তৈরি হয়েছে, আমরা শুধুই নিজেদের নিয়ে ভাবি, অন্যদের নিয়ে ভাবি না। আর এই জিনিসটি অত্যন্ত ক্ষতিকর।

    তবুও আমরা কঠিন সময়ে এখনও একতার পতাকা উঁচিয়ে ধরি। বিপদে পড়লে আমরা এখনও একে অন্যকে পাশে পাই।

    আমার এই ব্যাপারটিতে বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। সবার আগে যেই উদাহরণটি আমার মনে আসছে তা হচ্ছে যখন ইতালি ফুটবল বিশ্বকাপ খেলত সে সময়ের। আমি জানি, এমন কঠিন সময়ে ফুটবল নিয়ে স্মৃতিচারণ করাটা অনেকের কাছে অবান্তর মনে হতে পারে, তবে আমরা এটাও জানি ফুটবল ইতালিয়ানদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। যখন ইতালির জাতীয় দল খেলে, তখন সবার একাত্ম হওয়া দেখলে এটা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, ফুটবল আমাদের জন্য খেলার চেয়েও বেশি কিছু।

    আর ইতালিয়ানরা ঐক্যবদ্ধ হওয়া মানেই দারুণ কিছুর সম্ভাবনা।

    ইতালি যখন ১৯৮২ বিশ্বকাপ খেলেছিল, আমার বয়স তখন মোটে আট। নেপলসে আমরা বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় খেলা দেখতে যেতাম। আমার এখনও মনে আছে, ইতালি যখন গোল করত আমরা সবাই সবার পরিচিত না হলেও একসাথে চিৎকার করতাম, আলিঙ্গন করে সেই গোল উদযাপন করতাম।

    আমি যখন ২০০৬ বিশ্বকাপে ইতালির অধিনায়কত্ব করছিলাম, এই একতার বিষয়টি আমি দলের সবার মাঝে দেখেছিলাম। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ক্যালসিওপোলি স্ক্যান্ডালের কারণে সবকিছু বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল। আমরা যখন বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, অনেকেই বলাবলি করছিল ঐ স্ক্যান্ডালের কারণে আমাদের পক্ষে বিশ্বকাপে শতভাগ দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।

    তবে আমরা সেসব নেতিবাচক কথা-বার্তা কানে তুলিনি। আমাদের ক্যাম্পের মুড ছিল দারুণ। তখনও আমরা শুধু নিজেদের নিয়েই নয়, সবাইকে নিয়ে ভেবেছি। আর সেই সময়ে আমরা মার্সেলো লিপ্পির মতো একজন সুযোগ্য নেতা পেয়েছিলাম, যিনি পুরো দলের ঐক্য বজায় রাখতে এবং সবাইকে অনুপ্রাণিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আর এতে করে বিশ্বকাপে খেলতে আমরা যখন জার্মানিতে পা রাখি, আমাদের মনে তখন কোনো নেতিবাচক ভাবনা ছিল না। আমাদের শুধুই খেলার জন্য মুখিয়ে ছিলাম।

    অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে ইতালি কীভাবে সেবার বিশ্বকাপ জিতেছিল। আমরা শুধু ভাগ্যের জোরে সেই বিশ্বকাপ জয় করিনি। আমাদের একটা ভালো দল ছিল এবং নিজেদের ওপর বিশ্বাস ছিল যে আমরা জিতবই। আর ঠিক এই দুটি জিনিসে ভর করেই বিশ্বকাপ জয় করেছিলাম আমরা।

    এখন আমাদের ঠিক সে ধরনের একতাই প্রয়োজন। আমরা ভ্রাতৃত্ববোধের তেমন কিছু নিদর্শন এরই মধ্যে দেখেছি। যারা এখন ঘরে আটকে আছে, ভীত, একা, হতাশাগ্রস্ত তাদের উদ্দেশ্য আমি শুধু একটি ইতালিয়ান প্রবাদ বলতে চাই, ‘আন্দ্রা তুত্তো বেনে’ যার অর্থ সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ যেভাবে নিজেদের ব্যালকনিতে এসে প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলে গান গেয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এমন একতাই তো প্রয়োজন আমাদের।

    এই সংকটের পর যখন নতুন ভোর আসবে, আমরা একটি ভিন্ন ইতালি দেখব। অনেকে তাদের চাকরি হারাবে। অনেকে হয়ত ব্যবসা হারাবে। সবকিছু চূড়ান্তভাবে স্বাভাবিক করতে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের এখন একটাই আশা, যত দ্রুত সম্ভব একটি ভ্যাকসিন যেন আবিষ্কৃত হয়, যাতে এই দুঃস্বপ্নের দিন দ্রুত গত হয়।

    তবে সেই পর্যন্ত আমাদের টিকে থাকতে হবে। সুতরাং এখন আমাদের সবাইকে বাসায় থাকতে হবে, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। আর যতটা সম্ভব বাসার বাইরে কারো সঙ্গে সরাসরি মেলামেশা থেকে বিরত থাকতে হবে।

    এছাড়া এই সময়টায় সবার ভালোর জন্যও সম্ভব হলে কিছু করা উচিৎ। আমি ২০০৬ বিশ্বকাপে যাদের সঙ্গে খেলেছি, তাদের নিয়ে অনুদান সংগ্রহের একটি ক্যাম্পেইন চালু করেছি এরই মধ্যে, যার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ইতালির রেড ক্রস এবং হাসপাতালগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হবে। আমি আশা করি এই উদ্যোগে আপনাদেরও পাশে পাব।

    আর যদি আপনি অর্থ সাহায্য নাও করতে পারেন তাতেও কোনও সমস্যা নেই। আপনার সাধ্যের মাঝে প্রতিবেশীর জন্য খুব অল্প কিছুও যদি করতে পারেন সেটাও অনেক কাজে আসবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, লড়াইটা আমাদের সবার, তাই সবাইকে মিলেই লড়তে হবে।

    হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমরা কেউ সুপারম্যান নই। তবে আমরা ঐক্যবদ্ধ হলে যেকোনো কিছু অর্জন করা সম্ভব।

    ভালো থাকবেন সবাই।

     

    বিনীত

    ফাবিও ক্যানাভারো 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন