• ক্রিকেট, অন্যান্য
  • " />

     

    'শচীন হু?'

    ছবিতে মুহুর্ত থমকে দাঁড়ায় বা বন্দী হয়ে থাকে। ছবি মানে গল্প। ছবি সে গল্পের অনেক কিছু বলে, অনেক কিছু বলে না। তবে সে ছবির সঙ্গে জড়িয়ে যায় সেসব গল্প। আমাদের নতুন সিরিজে ছবি নিয়ে গল্প বলার চেষ্টা করেছি আমরা, হয়ত সে গল্প এ ছবিতে আছে, কিংবা নেই। অথবা স্রেফ আমরা দেখি না। 


    শচীন টেন্ডুলকার শেষবারের মতো ব্যাটিংয়ে নামছেন ভারতের হয়ে। বাঁহাতের গ্লাভস পরা, ডানহাতেরটা পরার আগে ব্রেসলেটটা একবার ঠিক করে নিচ্ছেন হয়তো। ওয়াংখেড়ের ড্রেসিংরুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি ভেঙে নামার আগে হেলমেটের আড়ালে থাকা মুখটা ওপরে তুলতে উদ্যত তিনি একবার, হয়তো ঈশ্বর বা বাবা বা দুজনকেই স্মরণ করবেন। কিংবা চারপাশে সবকিছু দূরে ঠেলে দিতে এটা তার একটা সিস্টেম। এসব 'হোয়াইট নয়েজ' অফ করে দিয়ে শচীন তার ব্যাটিংয়ের সুইচ অন করবেন। 

    চারপাশে তখন কোরাস, ‘শচীইইন, শচীইইইইন’। 

    একসময় এমআরএফ নামের এক টায়ার কোম্পানিকে ব্যাট প্রস্তুতকারক কোম্পানিতে ‘পরিণত’ করে তাদের সত্ত্বাকে অনিশ্চয়তার ঘোরটোপে ফেলে দেওয়া শচীনের কাছে এখন অ্যাডিডাস, মোরাট প্যাডজোড়া আছে আগের মতোই, আর্মগার্ডটা পরেন এখনও, টেনিস এলবোর পর থেকে হাতে ওঠা ব্যান্ডটা দেখা যাচ্ছে না এপাশ থেকে। টেস্টের সাদা ট্রাউজারস এখন আর ক্রিকেটাররা নিজেদের মতো পরেন না, টিম কিটের অংশ সেটি। নাইকি নামের স্পোর্টস ম্যানুফাকচারিং জায়ান্ট ক্রিকেটে একমাত্র স্পন্সর করে ভারতকে। শচীন যখন প্রথম খেলা শুরু করেন, ভারত ঠিকঠাক স্পন্সরই পেতো না। 
     

    শেষবারের মতো নামছেন শচীন, আতুল কাম্বলির তোলা এ ছবিটি ২০১৩ উইজডেন-এমসিসির বর্ষসেরা ছবির পুরস্কার জিতেছিল।


    ওয়াংখেড়ের ড্রেসিংরুমের সিঁড়ি গ্রিল দিয়ে আলাদা করা, গ্রিলের ওপাশে শেষবারের মতো তার ব্যাটিংয়ে নামার দৃশ্যটা গিলতে হুড়োহুড়ি, ঠাসাঠাসি। হয়তো অন্য কোথাও হলে সৌভাগ্যবান দর্শকরা নিরাত্তাকর্মীদের ঠেলে একটু ছুঁয়ে দেখতে পারতেন তাকে, তবে উপমহাদেশের গ্রিলঘেরা গ্যালারিতে সে সুযোগটা নেই। শচীন এখানে তাই ঈশ্বরের মতোই, ছোঁয়ার উপায় নেই। 

    তবে দেখা তো যাচ্ছে। বেশিরভাগের হাতে তাই স্মার্টফোন, সময়টা বন্দী করে রাখতে চান তারা। শচীন তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেই ক্যামেরাওয়ালা স্মার্টফোন আসতে দেখেছেন।

    দুটি বাচ্চা দুজনের কাঁধে, পরনে ভারতের নীল জার্সি- এদের একজন মুখের কাছে হাতটা এনেছে, হয় চিৎকার করছে, নাহয় চোখে এসে পড়া আলো ঠেকাচ্ছে। আরেকজন সামনে থাকা তার প্রায় তিনগুণ বয়সী কারও মাথা সরিয়ে দিচ্ছে, দেখা যাচ্ছে না ঠিকঠাক বলে। 

    শচীন নামছেন, শেষবারের মতো। 

    তার মিরাকলের একটা অংশ চান হয়তো ওই দর্শকরা, যিনি মিরাকল ঘটাতে পারেন বলে তাদের বিশ্বাস। হাতের ফোনে সেটা বন্দী করে বাকি জীবনটা হয়তো কাটাতে চান। অথবা নেহায়েত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে বলতে চান, ‘আমিও ছিলাম’। 

    আমরা আদতে জানি না ঠিক। 'মব সাইকোলজি'র মাঝে মাঝে সরল ব্যাখ্যা করা যায়, মাঝে মাঝে তা জটিল হয়ে ওঠে।

    ****

    ‘শচীন হু?’ 

    ২০১৪ উইম্বলডনে রয়্যাল বক্সে ডেভিড বেকহামের সঙ্গে বসে খেলা দেখলেন শচীন। উইম্বলডন তাদের রয়্যাল বক্সে প্রায়ই আমন্ত্রণ জানায় শচীনকে, যিনি নিজে বিয়ন বোর্গের ভক্ত। প্রথম ক্রিকেট বল দিয়ে খেলার ছয় বছরের মাঝে টেস্ট অভিষেক করা শচীন ক্রিকেটার হওয়ার আগে টেনিসে মজে ছিলেন। 

    ম্যাচের পর মারিয়া শারাপোভাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, বেকহামের সঙ্গে আরেকজন যিনি ছিলেন, তাকে তিনি চেনেন না কিনা। ‘হু ইজ শচীন টেন্ডুলকার?’ শারাপোভা অবশ্য এটাও জানতেন না, তিনি এরপর হয়তো চাইলেও শচীনের নামটা ভুলতে পারবেন না আর। 

    শচীনভক্তরা শারাপোভাকে শচীন চেনানোর দায়িত্ব নিলেন। আক্রমণামত্মক, রসাত্মক কমেন্টে ছেয়ে গেলে শারাপোভার ফেসবুক পেইজ, টুইটারে উলটো ট্রেন্ডিং হলো হ্যাশট্যাগ- ‘হু ইজ মারিয়া শারাপোভা?’ ভারতে ক্রিকেট ধর্ম- এ কথা প্রায়ই বলা হয়। তবে সে ধর্মকেও আলাদা করে ফেলেন একজন ঈশ্বর- শচীন। 

    এ শতাব্দীর শুরুতে উইজডেন তখন পর্যন্ত খেলা টেস্ট ইনিংসগুলির সেরা ১০০-এর একটি তালিকা করেছিল। প্রতিপক্ষ, উইকেট, ম্যাচের অবস্থা- এমন আরও অনেক ফ্যাক্টর বিবেচনায় এনে একটা সিস্টেম দাঁড় করিয়েছিলেন এক ভারতীয়- তার ভিত্তিতেই সে তালিকা। ভিভিএস লক্ষণের ইডেন-রূপকথা ছিল সেরা দশে, শচীনের আগে ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যাটিং তারকা সুনীল গাভাস্কারের ইনিংস আছে, কপিল দেব, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের আছে, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের দুটি ইনিংস আছে এ তালিকায়। স্যার ডন ব্র্যাডম্যান নিজে বলেছিলেন, শচীন তার মতো ব্যাটিং করেন। ১ কিংবা ৯৫ নাম্বারে- দ্য ডনের ৫টি ইনিংস আছে তালিকায়। একটা প্রজন্ম কথার লড়াই চালিয়ে গেছে নিজেদের মাঝে- শচীন নাকি লারা। ব্রায়ান লারার ৩টি ইনিংস আছে (ব্র্যাডম্যানের পর দ্বিতীয়টি তার)- ২, ১০ ও ১৪ নম্বরে। 

    শচীনের একটিও নেই। 

    লরেন্স বুথ উইজডেনে কাজ করেন তখন। তার ই-মেইল আইডি ‘ভারতীয়দের তোপের শক কাটিয়ে উঠতে পারেনি’ বেশ কয়েক বছর, কেন শচীনের কোনও ইনিংস সেরা ১০০-এর তালিকায় নেই। 

    ২০০২ সালে, টেস্টের সেরা ১০০-এর তালিকার পরের বছর, ওয়ানডের সেরা ১০০-এর তালিকা করে উইজডেন। এখানে স্থান পায় শচীনের ৪টি ইনিংস- ২৩, ৩০, ৩৩ ও ৭২ নম্বরে।
     


    উইম্বলডনের রয়্যাল বক্সে শচীন


    শচীন ওয়ানডে ইতিহাসের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন আরও ৮ বছর পর। ২৪ ফেব্রুয়ারি, গোয়ালিয়রে, ২০১০ সালে। শচীন যখন তার ক্যারিয়ারের অসংখ্য রেকর্ডের আরেকটির দিকে এগুচ্ছেন, ক্রিকইনফোতে চাপ বাড়ছে। ডাবল সেঞ্চুরির কাছাকাছি এসে ধসে পড়ল তাদের সার্ভার। মানে ব্যাক-আপ যেগুলো ছিল এমন পরিস্থিতির কারণে- সেসবও। সে ম্যাচের ম্যাচ রিপোর্ট ক্রিকইনফোর তখনকার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভিজিট করা পেইজ ছিল, সব মিলিয়ে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন পেইজভিউ ছিল সেদিন তাদের। তখনও ক্রিকইনফোতে সবচেয়ে বেশি প্লেয়ারস প্রোফাইল ভিজিট করা পেইজটার নাম- শচীন টেন্ডুলকার। 

    শচীনের যখন ভারতের হয়ে অভিষেক হয়, ক্রিকইনফো তখনও যাত্রা শুরু করেনি। শচীন যেদিন ক্রিকইনফো ধসিয়ে দিলেন, ততদিনে উইজডেন ক্রিকইনফোকে কিনে নিয়ে আবার বিক্রিও করে দিয়েছে ইএসপিএনের কাছে। শচীন তখনও রেকর্ড ভাঙছেন। 

    ক্রিকইনফো এশিয়ার বিশ্বকাপজয়ী দলগুলির মাঝে স্বপ্নের একাদশ বানাবে একটা। ১৯৮৩ ও ২০১১ সালের ভারত, ১৯৯২ সালের পাকিস্তান, ১৯৯৬ সালের শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপজয়ী দলগুলিকে নিয়ে গড়া হবে এ একাদশ। ওপেনিংয়ে সংখ্যার ভিত্তিতে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রমিজ রাজা থেকে সনাথ জয়াসুরিয়াসহ আছেন শচীন টেন্ডুলকারও। 

    ক্যারিয়ারের একদম শেষের দিকে এসে শচীন বিশ্বকাপের স্বাদ পেয়েছিলেন, যা পাননি ক্রিকেটের অনেক কিংবদন্তীই। ব্র্যাডম্যানের সময় বিশ্বকাপ দূরের কথা, ওয়ানডেই ছিল না। লারাকে এখনও বিশ্বকাপ আক্ষেপ জোগায় কিনা নিশ্চিত নয়। তবে শচীন সেবার শুধু একাদশের আরেকজন ব্যাটসম্যান ছিলেন না, ‘৯৬, ‘৯৯, ‘০৩-এর ঝলক ফিরিয়ে এনে ৫৩.৫৫ গড়, ২ সেঞ্চুরিতে করেছিলেন ৪৮২ রান, টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। 

    শচীন ঠাঁই পেলেন ক্রিকইনফোর স্বপ্নের একাদশে। ক্রিকইনফোর একজন পাকিস্তানী লেখক মজা করে বললেন, ‘শচীনকে না রাখলে আমাদের সাইট বন্ধ হয়ে যেতে পারে, আগে নিজের কাজের কথা তো ভাবতে হবে।’

    ২০২০ সালে এসেও শচীন তার ভক্তদের কাছে ঈশ্বরই আছেন। যেখানে যুক্তি সবসময়ই ধোপে টেকে না, টেকে বিশ্বাস, টেকে মিরাকলের আশা। 

    ****

    বাংলাদেশে শচীন কে? 

    শচীন তার ক্যারিয়ারের শততম সেঞ্চুরি করেছিলেন বাংলাদেশের বিপক্ষে, সে ম্যাচে বাংলাদেশ হারিয়ে দিয়েছিল ভারতকে। পাকিস্তানের বিপক্ষে- যারা ভারতের ‘চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী’- অভিষেক হয়েছিল শচীনের। শচীন যখন অবসর নিয়েছেন, পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারত ততদিনে বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট ছাড়া খেলে না। আরও কিছুদিনের মাঝে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বীতার একটা আলাদা ‘ঝাঁঝ’ তৈরি হয়েছে। 

    শচীনের টেস্টে সর্বোচ্চ স্কোরটা বাংলাদেশের বিপক্ষে, তার কোনও ট্রিপল সেঞ্চুরি নেই। শচীনের সমান বা এর বেশি ডাবল সেঞ্চুরি আছে আরও ১১ জনের। 

    বাংলাদেশে- আমাদের প্রজন্ম- মানে নব্বইয়ের প্রজন্মের কাছে ক্রিকেট একটু আলাদা (হয়তো সব প্রজন্মই এটি বলবে, প্রজন্ম ব্যাপারটা এসেছেই হয়তো এভাবে- থাকবে মতপার্থক্য)। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মাশরাফি বিন মুর্তজারা তখন আসেননি। 

    তখন বেশি করে ছিলেন শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান চার্লস লারা, ছিলেন ওয়াসিম আকরাম, শেন ওয়ার্ন। যারা এখনও টিকে আছি- তারা সেই সময়টাতে ফিরে যেতে চাইলে এদের ওপর ভর করি হয়তো। শচীনের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক উত্থানের যোগাযোগ আমাদের ভাবিয়ে তোলে না হয়তো সেভাবে, ‘জাতীয়তা’র দিক দিয়ে ভারতীয়দের যেভাবে তোলে। শচীন আমাদের ক্রিকেট ধর্মের ঈশ্বর হয়তো নন, আমরা হয়তো ‘নিরপেক্ষ’ থেকে শচীন নাকি লারার আলোচনায় যেতে পারি। 

    ডন ব্র্যাডম্যানের সেই গড় বা জিম লেকারের ১৯ উইকেট- আপাতদৃষ্টিতে এমন কিছু ছাড়া বা এমন কিছু সহ ক্রিকেটে কোনও রেকর্ডই হয়তো স্থায়ী নয়। মানে আমরা জানি না, এসব আদতেই অবিনশ্বর কিনা। আমরা অনুমান করতে পারি। বিরাট কোহলি যেভাবে এগুচ্ছেন, আমরা অনুমান করতে পারি শচীনের ওয়ানডে সেঞ্চুরিসংখ্যা বা সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটা তিনি ভেঙে দেবেন। টেস্টে তার যাত্রাটা এখনও সেরকম গতি নেয়নি, যদিও শচীনের চেয়ে ডাবল সেঞ্চুরি এখনই বেশি তার। 

    ভারতের দুই নম্বর উইকেট যাওয়ার পর তারা এখনও উল্লাস করে- কোহলি নামেন যখন। শচীনের ক্ষেত্রে যা হতো। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোহলির ফলোয়ার শচীনের চেয়ে বেশি- ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম- সবখানে। শচীন যখন ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে, তখন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যাপারটি আসেইনি। অবসরে যান না কেন, শচীনকে ঘিরেও এমন প্রশ্ন উঠেছিল। 

    ২০১১ বিশ্বকাপের পর শচীনকে কাঁধে নেওয়া কোহলি বলেছিলেন, “২১ বছর যিনি আমাদের প্রত্যাশার চাপ বয়ে নিয়েছেন, এবার আমাদের পালা তাকে বয়ে নেওয়ার।” 

    যদি ক্রিকেট ইতিহাসে একজন মাত্র ক্রিকেটার ‘প্রত্যাশার চাপ’ ব্যাপারটা বুঝতে পারেন, সেটা শচীন। বছরের পর বছর, দুই দশকের বেশি, দুই যুগ ধরে শচীন একটা সিস্টেম দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন নিশ্চিতভাবেই, সেসব চাপ কীভাবে উপেক্ষা করা যায়, কিংবা সেসব কীভাবে বয়ে নিতে হয়। যে কোনও ক্রিকেটারকে জিজ্ঞসা করুন, তারা এই কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশার চাপের কথাটা বলবেন শচীনকে নিয়ে কথা বলতে গেলে। সেটা শচীন কীভাবে করেছেন, আপনার-আমার কথা বাদ দিন, ভারতের অনেক ক্রিকেটারই হয়তো বুঝতে পারবেন না ঠিক। তারাও অনুমান করতে পারেন হয়তো শুধু। 

    ****

    কখনও একজন মেডিকেল স্টাফ কীভাবে কোনও গোলাবারুদ ছাড়াই প্রায় ৭৫ জনের জীবন বাঁচালেন- হ্যাকস রিজে যা দেখানো হয়, বা ‘সালি’তে একজন পাইলট কীভাবে হাডসন নদীতে বিমান নামিয়ে বাঁচালেন ১৫৫ জনের জীবন- গল্প শুনেও, সিনেমা দেখেও হয়তো সেসবের রহস্যভেদ করা যায় না। বলতে হয় মিরাকল। ক্রিকেট আর এভাবে ফ্রন্টলাইনে জীবন বাঁচানো এক নয়- এটা হয়তো না বললেও চলে। তবে হোমো স্যাপিয়েন্স ‘টিকে থাকা’র লড়াইয়ে যোগ করেছে আরও অনেক কিছু, ক্রিকেটের মতো নেহায়েত একটা খেলা তাই অন্যরকম।

    আমরা দেখেছি, কিংবা গল্প শুনেছি- ভারতকে বিশ্বক্রিকেটে মাঠে একটা শক্তিতে কীভাবে পরিণত করলেন সৌরভ গাঙ্গুলি। শচীন অধিনায়কত্বে কীভাবে ঠিক যুত করতে পারলেন না। ভিভিএস লক্ষ্মণ, রাহুল দ্রাবিড়, অনিল কুম্বলেরা কীভাবে শচীনের ছায়া মাড়িয়েও হয়ে উঠলেন কিংবদন্তী। আর আমরা দেখেছি, কীভাবে আইপিএল দিয়ে বিসিসিআইয়ের আদলে ভারত হয়ে উঠলো ক্রিকেট-অর্থনীতির একচ্ছত্র অধিপতি। আইপিএল কীভাবে বদলে দিল ক্রিকেট, যার ঝড় গিয়ে লাগলো সবখানে।

    কপিল দেবের ভারত শচীনকে ক্রিকেটে উদ্বুদ্ধ করেছিল। শচীন উদ্বুদ্ধ করেছিলেন কোহলি বা অভিষেক বচ্চনকে। এরপরের একটা প্রজন্ম হয়তো বলবে, তারা ক্রিকেট শুরু করেছিলেন বিরাট কোহলিকে দেখে। বাংলাদেশের আমাদের একটা প্রজন্মকে সাকিব-তামিম-মাশরাফিরা সুযোগ করে দিয়েছেন এটা বলার- আমরা তাদের মতো হতে চাই। 

    তবে, শচীন হয়তো বলবেন, ক্রিকেটের এতো এতো রেকর্ড নয়, তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি দল হিসেবে জেতা সেই বিশ্বকাপ। তিনি আরও অনেকের মতো ক্রিকেটকে ভালবেসেছিলেন শুধু।

    অবশ্য শচীন মিরাকল ঘটাতে পারতেন বলে ধারণা হয়তো অনেক ভারতীয়র, সেটা তারা পুষে রাখেন। সেই মিরাকলের ভাগ চান তারা। শচীনের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে তাই সংখ্যা-রেকর্ডের ভীড়ে ‘চাপ’ নামের এক ‘এক্স’ ভ্যারিয়েবলকে আনতে হয়। শচীন মানুষ থেকে ঈশ্বরে রূপ নেন ভারতীয়দের কাছে- যাদের কাছে ব্যক্তিগত এমন অর্জন দলীয় সাফল্যকেও ছাপিয়ে যায়। 

    তারা মানতে পারেন না উইজডেনের সেরা ১০০ ইনিংসে কেন শচীনের একটিও নেই, তার ডাবল সেঞ্চুরির দিনে তারা ক্রিকইনফো ধসিয়ে দেন। শারাপোভাকে তারা শচীন চেনানোর দায়িত্ব নেন। 

    আর আমরা- যারা বেশিরভাগই শচীনকে দেখেছি টিভিতে- শচীনকে বন্দী করে রেখেছি পেপারকাটিংয়ে- তারা এতসব বিশ্লেষণে না গিয়ে, কিংবা এতো আলোচনা না করে শুধু দূর থেকে মন্তব্য করতে পারি ক্রিকেটে ভারতের এই ‘আধিপত্য’ দেখে, আইপিএলের আগে ভারতের শচীন ছিল। 

    সেদিন ওয়াঙ্খেড়েতে হয়তো আমরা ছিলাম না- শচীন যেদিন শেষবারের মতো নামলেন, শেষবারের মতো বেরিয়ে গেলেন, ফিরে এসে পিচকে প্রণাম করলেন। শচীন হতে পারেন ক্রিকেটের সবচেয়ে ‘কমপ্লিট’ ব্যাটসম্যানদের একজন, শচীন হতে পারেন ভারতীয়দের ক্রিকেট-ঈশ্বর, শচীন হতে পারেন ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার প্রায় সাড়ে ৫ হাজার ক্রিকেট রেকর্ডের অধিকারী কেউ একজন। শচীন হতে পারেন এমন একজন, যিনি ‘ব্যাটিং করতে নামলে থমকে যেতো ভারতীয়দের জীবন’। 

    তবে ‘শচীন কে’ এমন প্রশ্নে আমরা এতো কিছু না ভেবে শুধু তাই সেদিনের ওয়াঙ্খেড়ের মতো করে কোরাস ধরতে পারি, “শচীইইন, শচীইইইইইন...”। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন