• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    স্থিতিশীলতা আর ধৈর্য্য সাফল্য এনে দিয়েছে ক্লপের লিভারপুলকে | জেমি ডে

    দীর্ঘ অপেক্ষা পর অবশেষে প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে লিভারপুল। ৩০ বছরের অপেক্ষা অবসান ঘটেছে ইউর্গেন ক্লপের হাত ধরে। লিভারপুল লিগ জিতেছে নতুন সব রেকর্ড গড়ে। ইংল্যান্ডে লিভারপুলের ইতিহাস গড়া মৌসুমের বিশ্লেষণ করেছেন বাংলাদেশ কোচ জেমি ডে। অনুবাদ করেছেন রিফাত মাসুদ।


    প্রথম মৌসুমে ইউরোপা লিগের ফাইনালে ব্যর্থ। দুই বছর পর চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও একই পরিণতি। পরের মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে পুরো মৌসুমে এক ম্যাচ হেরেও দুর্দান্ত ম্যানচেস্টার সিটির কাছে ১ পয়েন্টে লিগ হারানো- এসব কিছু সহজেই শুষে নিতে পারে একজন কোচ, একটা দলের সব শক্তি। গেল মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপাটা উঁচিয়ে ধরতে না পারলে আক্ষরিক অর্থেই অপবাদ জুটে যেতে পারত ক্লপের গায়ে।

    চ্যাম্পিয়নস লিগ নিঃসন্দেহে প্রেরণা যুগিয়েছিল লিভারপুলকে। এরপরও কাজটা কঠিন ছিল। ধাপে ধাপে ক্লপ তার চেতনায় লিভারপুলকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাকে সময়ও দেওয়া হয়েছে সেই কাজ করতে। দুইয়ের সমন্বয় লিভারপুলের আক্ষেপ ঘুচিয়েছে। একটা লম্বা সময় ধরে শিরোপা জিততে না পারলে সেই ঘোর কাটানো আরও কঠিন হয়ে যায়। ক্লপ দায়িত্ব নেওয়ার ৫ বছর পূরণ হওয়ার আগেই সেই কাজটা সারলেন। ম্যানেজমেন্ট তার ওপর ধৈর্য্য রেখেছে, পরিকল্পনাগুলো কাজে দিয়েছে সব। আজকের লিভারপুলের সাফল্যের পেছনে এসবের অবদান খাটো করে দেখার উপায় নেই।

    ক্লপ জার্মানিতেই নাম কামিয়েছিলেন। তরুণ কোচ, তারুন্য আর তার গেগেসপ্রেসিং নাম ডাক কামিয়েছিল আগেই। তবে লিভারপুলে ক্লপ যখন এসেছিলেন তখনও তিনি এলিট লেভেলের কোচ ছিলেন না। উন্নতি এভাবেই হয়, কোচের সঙ্গে দলের, দলের সঙ্গে কোচের। ফুটবলের মধুর গল্প এসব।

    লেস্টার সিটির রুপকথার গল্প সহসা ঘটে না। আমাদের জীবদ্দশায় অমন আরেকটি ঘটনা হয়ত আরেকবার ঘটবেও না। লিভারপুলের প্রিমিয়ার লিগ জেতা ঐতিহাসিক ঘটনা বটে, তবে ওই গল্পের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।


    ক্লপের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তিনি তার চিন্তা-চেতনা ইংলিশ ফুটবলে কার্যকর করে দেখিয়েছেন। গেগেনপ্রেসিং শব্দটারই কোনো ইংলিশ প্রতিশব্দই নেই। ইংল্যান্ডে এমন কিছু অপরিচিতই ছিল আগে। ক্লপ যখন প্রথম লিভারপুলে এলেন, তখন তাকে নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। এখানকার পান্ডিতেরা টেলিভিশনে প্রায়ই বলতেন, ক্লপের এই স্টাইল ইংল্যান্ডে কাজে দেবে না।

    শেষ পর্যন্ত ক্লপের হাই টেম্পো গেমপ্ল্যানই পার্থক্য গড়ে দিল। গেগেনপ্রেস আর হাই টেম্পো গেমপ্ল্যানের বেসিকটা আসলে একইরকম। দলের খেলোয়াড়দের শক্তিশালী হতে হয়। শক্তিশালী বলতে অফুরান প্রাণশক্তি। এই পদ্ধতিতে প্রতিপক্ষের পায়ে বল গেলে দ্রুত সেটা আবার দখলে আনতে হবে। শুধুমাত্র স্ট্যামিনা থাকলেও হবে না, সঙ্গে খেলোয়াড়দের ভেতর কমিউনিকেশন ঠিক থাকতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, মাঠে খেলোয়াড়দের শেপ ঠিক রাখতে হবে। এলোমেলো প্রেসিং দিয়ে ম্যাচ জেতাই কঠিন, শিরোপা তো দূরের কথা। খেলোয়াড়দের তাই এক সুতোয় গাঁথতে হয়। খেলোয়াড়দের মনে-প্রাণে বিশ্বাস করাতে হয়, তোমরা যা করছ ঠিক করছ। এটা অনেকটা ধর্ম প্রচারের মতো। সেই কাজটা ক্লপ করেছেন ঠিকমতো। লিভারপুলও গেগেনপ্রেস রপ্ত করেছে দ্রুত।

    লিভারপুল বল পজেশন থাকা অবস্থায় খুব দ্রুত জায়গা শিফট করে। আক্রমণভাগে গতি থাকে তাই। সঙ্গে ফুলব্যাকরাও আক্রমণে অংশ নেয়। প্রতিপক্ষের অর্ধে ওভারলোড করে সবসময়ই তাদের চাপে রেখেছে লিভারপুল। তারা যদি বলও হারায়, বেশিরভাগ সময় সেটা প্রতিপক্ষের অর্ধেই ঘটে। আর অনেক খেলোয়াড় থাকায়, দ্রুত আবার বল পজেশনও আয়ত্তে নিয়ে নেয় লিভারপুল। এগুলো তত্বকথা, মাঠে প্রয়োগ করা আরও কঠিন। এই কাজগুলো যখন কোনো দল ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারে তখন তারা হয়ে ওঠে দুর্দান্ত।

    ক্লপ এসেই যে দলটা পেয়েছিলেন সেটা দিয়ে সেই কাজ আদতে হত না। ৫ বছর পর দুই স্কোয়াড মেলালে দেখা যায় গুটিকয়েকজন বাদে প্রায় সবাই বদলে গেছেন। এমন দলের বিপক্ষে খেলাই তখন কঠিন হয় যায়। সেটাই হয়েছে ইংল্যান্ডে। লিভারপুলের কাছে নত হয়েছে সবাই।

    তবে এই বিশ্লেষণটা মোটা দাগের। এক ঝটকায় কিন্তু লিভারপুলের স্কোয়াডে গণ পরিবর্তন আনেননি ক্লপ। এসেই রেডিমেড দল পাননি। সেটা পাওয়ার কোথায় ছিল না। পুরনোদের রেখেছেন। কাউকে কাউকে বাদ দিয়েছেন। প্রতি মৌসুমে এভাবে ধীরে ধীরে দল গড়েছেন তিনি। ট্রেন্ট অ্যালেক্সান্ডার আর্নল্ডকে নিয়ে আসা, অ্যান্ডি রবার্টসনকে গুরুদায়িত্ব দিয়ে দেওয়া- এবং এরপর সফল হওয়া এগুলো স্থিতিশীল একটা দলের চেহারা।

    তবে দলবদলে লিভারপুল দাও মেরেছিল ভার্জিল ভ্যান ডাইককে ভিড়িয়ে। ক্লপ আসার পর আক্রমণে লিভারপুল ধারালো হলেও, রক্ষণ কিন্তু সেভাবে গোছালো ছিল না কখনই। ভ্যান ডাইক এসে গোটা চেহারা পালটে দিলেন নিমিষেই। একটা দলে একজন খেলোয়াড় কতোখানি প্রভাব রাখতে পারেন ভ্যান ডাইক তার নিদর্শন। ভুলে গেলে চলবে না এর মাঝে কিন্তু ফিলিপ কৌতিনহোকেও হারিয়েছেন ক্লপ। লিভারপুলের আক্রমণভাগের প্রাণ ছিলেন যিনি। কৌতিনহোর মতো খেলোয়াড় চলে যাওয়ার পর ধ্বস নামার কথা ছিল লিভারপুলের। সেটা আবার অন্য নিদর্শন সৃষ্টি করেছে। দলের মূল খেলোয়াড় চলে গেলেও দুর্দান্তভাবে ফেরা যায়। একটা সিস্টেমের ভিত শক্তিশালী হলেই কেবল সেটা সম্ভব। পরের মৌসুমে তো অ্যালিসনকে কিনে আনল লিভারপুল। লিভারপুলের শিরোপা জয়ের পেছনে ভ্যান ডাইক আর অ্যালিসনের সংযোজন বড় ভূমিকা পালন করেছে। লিগ জিততে হলে শক্ত রক্ষণ আপনার লাগবেই, আর ক্লিনশিট ম্যাচের সঙ্গে শিরোপাও জিতিয়ে দেয় মৌসুম শেষে।

    লিভারপুলের ট্রান্সফরমেশনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ আমার মনে হয় জর্ডান হেন্ডারসনকে। কৌতিনহো থাকার সময় ৪-২-৩-১ এ দলকে খেলাতেন ক্লপ। এরপর সেটা বদলে গেল ৪-৩-৩ এ। হেন্ডারসন পুরনো ফর্মেশনে অনেক বেশি ডিফেন্সিভ ছিলেন, ৪-৩-৩ এ তার ভূমিকাই গেল পালটে। নাম্বার ফোরের ভূমিকা থেকে সে হয়ে গেল নাম্বার এইট।     সান্ডারল্যান্ডে থাকতে উঠতি ইংলিশ তরুণদের একজন ছিল হেন্ডারসন। কিন্তু ২০১১ তে লিভারপুলে যোগ দেওয়ার পর কখনই কিন্তু সেভাবে নিজেকে চেনাতে পারেনি। আর ক্লপের আমলে তার বাহুতেই অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। সত্যিকারের নেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছে সে। 

    গত কয়েক মৌসুমের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করেছে দারুণ ছন্দে থেকেই শিরোপাখরা ঘোচাল লিভারপুল। এখান থেকে আমাদের একটা ব্যাপারই শেখার আছে। টিম ওয়ার্ক আর স্থিতিশীলতা আপনাকে দারুণ অর্জন এনে দেবে। ইতিহাস, ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে সেটা ফিরে পাওয়া কঠিন। কিন্তু অসম্ভব নয়। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন