• ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইংল্যান্ড সফর ২০২০
  • " />

     

    এভারটন উইকস থামলেন। শেষ হলো 'থ্রি ডব্লিউস'-এর যে ভ্রমণ...


    এভারটন উইকস থামলেন। তাকে থামতে হলো, পুয়ের্তোরিকোতে। 

    বার্বাডোস থেকে জ্যামাইকার রাজধানী কিংস্টনে যাবেন তিনি, বিমানের ইঞ্জিনের গোলমাল সারাতে মাঝপথে পুয়ের্তোরিকোতে যাত্রাবিরতি নিতে হলো তাদের। সে রাতটা কাটাতে হলো সেখানেই। পরদিন যতক্ষণে স্যাবাইনা পার্কে পৌঁছালেন, টেস্টের প্রথম দিনের লাঞ্চ হয়ে গেছে। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফিল্ডিংয়ে। উইকস নিশ্চিত হলেন, এক সেশন মিস করে গেলেও দলে আছেন তিনি। তখনকার দিনে এমন কিছু সম্ভব ছিল। 

    এ টেস্ট থেকে শুরুতে বাদ পড়েছিলেন উইকস। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৪৮ সালের সে সিরিজ ছিল দেশের মাটিতে বিশ্বযুদ্ধের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম সিরিজ। সে সিরিজেই অভিষেক তার, তবে প্রথম ৫ ইনিংসে সর্বোচ্চ ৩৬ রানের পারফরম্যান্স যথেষ্ট হলো না। বাদ পড়লেন। কিন্তু শেষ মুর্হতে গিয়ে আবারও ডেকে পাঠানো হলো তাকে, জর্জ হেডলির চোটের কারণে। হেডলি- 'দ্য ব্ল্যাক ব্র্যাডম্যান' ছিলেন উইকসের ‘হিরো’। 

    লাঞ্চের পর উইকস নামলেন, স্যাবাইনা পার্কের দর্শকরা দুয়ো দিতে লাগলেন। উইকসের বদলে ফিল্ডিং করছিলেন জন হল্ট, যিনি কিংস্টনের ঘরের ছেলে। হল্টের জায়গায় নেমে দুয়ো পাওয়াটা ঠিক ‘অস্বাভাবিক’ ছিল না। 

    পরদিন স্যাবাইনা পার্কের দর্শকরা ছুটে এলো মাঠে, উইকসকে তুলে ধরতে। প্রথম ইনিংসে উইকস করলেন ১৪১। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করতে হলো না তাকে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতলো ১০ উইকেটে। 

    সে ইনিংসে ব্যাটিং করতে হলো না ফ্র্যাঙ্ক ওরেল বা ক্লাইড ওয়ালকটকেও। 

    ____________


    ১৯২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বার্বাডোসের রাজধানী ব্রিজটাউনের সেন্ট মাইকেলের ওয়েস্টবিউরিতে জন্ম নিয়েছিলেন উইকস। তার আগের বছর ১ আগস্ট ওরেলের জন্ম, সেন্ট মাইকেলের ব্যাঙ্ক হলে। উইকসের পরের বছর জানুয়ারিতে সেন্ট মাইকেলেরই নিউ অরলিনসে জন্ম নিয়েছিলেন ওয়ালকট। কথিত আছে, তিনজনের জন্ম হয়েছিল একই ধাত্রীর হাত ধরে। 

    ক্রিকেটের সবচেয়ে বিখ্যাত ধাত্রী বোধহয় ওই ভদ্রমহিলাই। 
     


    বাঁ থেকে ফ্র্যাঙ্ক ওরেল, এভারটন উইকস ও ক্লাইড ওয়ালকট/গার্ডিয়ান/পিএ


    ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘৪৮-এর সেই সিরিজের প্রথম টেস্টে অভিষেক হয়েছিল উইকস ও ওয়ালকটের। ওয়ালকট নেমেছিলেন ওপেনিংয়ে, উইকস তিন নম্বরে। দ্বিতীয় টেস্টে ওরেলের। সে টেস্টের প্রথম ইনিংসে তিন, চার ও পাঁচে ব্যাটিংয়ে নামলেন ওরেল, উইকস, ওয়ালকট-- ‘থ্রি ডব্লিউস’।

    ____________

    এভারটন ডি কারসি উইকস। 

    বাবা ছিলেন ইংল্যান্ডের ফুটবল ক্লাব এভারটনের ভক্ত। ছেলের নাম রেখেছিলেন প্রিয় ক্লাবের নাম অনুযায়ীই। কেনসিংটন ওভাল থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে ক্রিকেট খেলে বড় হয়েছিলেন, তবে সে মাঠে ঢুকতে কৌশল খাটাতে হতো ছোট্ট উইকসকে। 

    টেস্ট শুরুর আগে স্থানীয়রা ভালবেসে গ্রাউন্ডসম্যানের কাজ করতেন, উইকসও যোগ দিতেন তাদের সঙ্গে। চলে যেতেন সূর্য ওঠার আগেই। ঘাস কাটা, পিচ রোল করার কাজের পর থেকে যেতেন। কারণ আলাদা করে মাঠে ঢোকার মতো পয়সা ছিল না তার। উইকসের পরিবার ঠিক আর্থিক দিক দিয়ে স্বচ্ছলতার ওপরের দিকে ছিল না। ১৯৩৫ সালে সেখানেই হিরো হেডলির খেলা দেখেছিলেন উইকস।

    ১৩ বছর বয়সে উইলশায়ার ক্রিকেট ক্লাবে সুযোগ পেয়েছিলেন, গ্রামের একটা ক্লাব ছিল সেটি। সে ক্লাবের পিচ আর মাঠের পরিবেশ দেখে উইকসের প্রথমেই মনে হয়েছিল-- ‘এত সুন্দর পিচে কেউ আউট হয় কীভাবে!’ উইকসের ব্যাটিংয়ের মূলমন্ত্রই ছিল-- উইকেটে গিয়ে সময় কাটানো। 

    ক্রিকেট খেলতে বার্বাডোস আর্মিতে যোগ দিয়েছিলেন উইকস। “স্থানীয়, ভারপ্রাপ্ত, অবৈতনিক ল্যান্স-কর্পোরাল ৬৭৫২, উইকস ইডি”, নিজের ভাষায় তার পরিচয় ছিল এমন। সে রেজিমেন্টের ক্রিকেট দলের শীর্ষস্থানীয় ব্যাটসম্যান হয়ে উঠতে সময় লাগেনি তার। সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার ইএলজি হোডের নজরে এলেন সহজাত প্রতিভার উইকস। ২০ বছর বয়সে বার্বাডোসের হয়ে অভিষেক হয়ে যায় তার। তিন বছর পর টেস্ট অভিষেক। 

    কাট, পুল, সঙ্গে ড্রাইভ-- ডানহাতি উইকস ছিলেন দেখার মতো একজন। 

    ____________


    উইকস থামলেন ৯০ রানে। 

    আম্পায়ার রান-আউট দিয়েছেন তাকে। ভারতের তখনকার মাদ্রাজ, এখনকার চেন্নাইয়ে সিরিজের চতুর্থ টেস্টের প্রথম ইনিংস। ইংল্যান্ডের সঙ্গে অভিষেক সিরিজে কিংস্টনের সেই সেঞ্চুরির পর উইকসকে বাদ দেওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠেনি আর। 

    দিল্লিতে ১২৮, মুম্বাইয়ে (বোম্বে) ১৯৪, কলকাতায় (ক্যালকাটা) ১৬২ ও ১০১ রানের পর টানা ৬ষ্ঠ সেঞ্চুরির দিকে এগুচ্ছিলেন তিনি। তবে সে মাইলফলক থেকে ১০ রান দূরে থামতে হলো তাকে। উইকসের মতে, স্কয়ার লেগ আম্পায়ারের সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘সংশয়ের অবকাশ ছিল’। 

    তবে ৫ সেঞ্চুরিই উইকসকে নিয়ে গেল ইতিহাসে। এর আগে কেউ এমন কিছু করেননি টেস্টে, এরপরও না। শেষ ২০০২ সালে টানা ৪ সেঞ্চুরিতে তার কাছাকাছি গিয়েছিলেন ভারতের রাহুল দ্রাবিড়। 

    টানা ছয় না হলেও সেই ৯০ রানের ইনিংসে ১০০০ ক্যারিয়ার রান হয়ে গেল উইকসের। এ মাইলফলকে যেতে তার দরকার পড়লো মাত্র ১২ ইনিংস। হারবার্ট সাটক্লিফেরও লেগেছিল সমানসংখ্যক ইনিংস, স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের লেগেছিল ১৩টি। টানা পাঁচের মতো দ্রুততম হাজার- উইকসের এই রেকর্ডটাও টিকে আছে এখনও। 
     


    কাট, পুল, সঙ্গে ড্রাইভ-- ডানহাতি উইকস ছিলেন দেখার মতো একজন।/গেটি


    ছয়-- সংখ্যাটা উইকসের জন্য একটা আক্ষেপের, এমন মনে হতেই পারে। 

    উইকস তার টেস্ট ক্যারিয়ারে ছয়ও মেরেছিলেন একটি। ১৯৫৫ সালে, পোর্ট অফ স্পেনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। বিল জনস্টনকে লং-অনের ওপর দিয়ে, যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ড্রয়ের জন্য খেলছিল। তার ছয়ের প্রতি এই ঔদাসীন্যের একটা কারণ আছে অবশ্য। 

    ছোটবেলায় খেলতেন খুবই ছোট মাঠে, তার ওপর ছিল বলের সঙ্কট। বন্ধুরা মিলে কর্কের ওপর কাপড় আর কাগজ পেঁচিয়ে খেলতেন উইকসরা। 

    “যদি বাতাসে মারেন, আর তারপর সেটা কারও জানালা ভেঙে দেয়, তাহলে বল ফিরে পাওয়ার সুযোগ ছিল না আর। ফলে আমাদের নিচ দিয়ে খেলতে হতো”, উইকসের সরল ব্যাখ্যা ছিল এমন। 

    উইকসের আদতে আক্ষেপ ছিল না। তিনি তো শুধু তার ছোটবেলায় গড়ে ওঠা অভ্যাসই অনুসরণ করছিলেন।

    ক্যারিয়ারে তার নামের পাশে আরেকটা ছয় আছে, ১৯৪৮ সালে কলকাতা টেস্টে। তবে সেটি এসেছিলেন ওভারথ্রো থেকে। 

    ____________


    ভারত সফর শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ গেল ইংল্যান্ডে। 

    এর আগে তিনবার সফর করে একটিও টেস্ট সেখানে জিততে পারেনি ক্যারিবীয়রা। ওল্ড ট্রাফোর্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজ হারলো বড় ব্যবধানে। 

    দ্বিতীয় টেস্টে লর্ডসে তারা জিতলো ৩২৬ রানে। এরপর নটিংহ্যামশায়ার, ওভাল-- ৩-১ ব্যবধানে ইংল্যান্ড জয় করলেন উইকসরা। 

    সিরিজে ওরেল করলেন ২ সেঞ্চুরি, উইকস ও ওয়ালকট একটি করে। তিনজনই ব্যাটিং করলেন ৫০-এর ওপর গড়ে। ট্রেন্টব্রিজে ১ম ইনিংসে ওরেল করেছিলেন ২৬১, উইকস করেছিলেন ১২৯। তবে উইকসের সেঞ্চুরির পরও ডাবল সেঞ্চুরির আগে আউট হয়ে যাওয়া ছিল একরকম বিস্ময়ের। 

    কারণ সে সফরে তার রান করার ধরন। এর আগে টেস্ট ছাড়া অন্য ম্যাচগুলিতে তার স্কোর ছিল এমন- সারের বিপক্ষে ২৩১, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির বিপক্ষে ৩০৪, নটিংহ্যামশায়ারের বিপক্ষে ২৭৯, হ্যাম্পশায়ারের বিপক্ষে ২৪৬*, লিস্টারশায়ারের বিপক্ষে ২০০*। সে ইংলিশ গ্রীষ্মে ৭ সেঞ্চুরি করেছিলেন উইকস, ছুঁয়েছিলেন নিজের হিরো হেডলির রেকর্ড। সফরে মোট করেছিলেন ২৩১০ রান, হেডলির চেয়ে ১০ রান কম। তবে তিনি খেলেছিলেন ৫ ইনিংস কম। 

    উইজডেন লিখেছিল, ‘ব্র্যাডম্যানের পর আর কোনও ব্যাটসম্যান নিজের প্রথম ইংলিশ সফরে এমন বড় স্কোরের নির্মম সংগ্রাহক হিসেবে নিজের ছাপ রাখেনি’। 

    অবশ্য শুধু রানে তো আর সিরিজ জেতা হয় না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের তখনও পেস-রাজত্ব গড়ে ওঠেনি। কিন্তু সে সফরে গিয়েছিলেন ২০ বছর বয়সী দুজন স্পিনার-- বাঁহাতি অর্থোডক্স আলফ ভ্যালেন্টাইন ও অফস্পিনার সনি রামাধিন। দুজন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে নিয়েছিলেন যথাক্রমে ৩৩ ও ২৬টি করে উইকেট। 

    ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত উইকস খেলে গেছেন তার এই বন্ধুদের সঙ্গে। ব্যাটিং করেছেন ওরেল, ওয়ালকটের আশেপাশে, স্লিপ বা কাভারে ফিল্ডিং করেছেন ভ্যালেন্টাইন ও রামাধিনের বোলিংয়ে। 

    ১৯৫১ সালে উইজডেনের পাঁচ বর্ষসেরার চারটি নাম ছিল এমন-- এভারটন উইকস, ফ্র্যাঙ্ক ওরেল, আলফ ভ্যালেন্টাইন, সনি রামাধিন। 

    ____________
     

    উইকস থামলেন না। থামলেন না ওরেল-ওয়ালকটও। 

    উইকস-ওয়ালকটের অভিষেকের পর থেকে এক দশক বিশ্বে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মিডল-অর্ডার ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের। 

    সে দশকে মিডল অর্ডারে গড়ের দিক দিয়ে দুইয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি রান করেছিলেন ৩-৬-এ নামা ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরা। এমনকি স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের অস্ট্রেলিয়ার মিডল-অর্ডারও ১৯২৮-১৯৪৮-এর মাঝে দুইয়ে থাকা ইংল্যান্ডের চেয়ে এগিয়ে ছিল ১৫ শতাংশে। 

    ১৯৪৮-১৯৫৮- এই সময়ের ব্যবধানে মিডল অর্ডারে কমপক্ষে ২০০০ রান করা ব্যাটসম্যানদের মাঝে গড়ের দিক দিয়ে প্রথম ছয়জনের চারজনই ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের-- সোবার্স, ওয়ালকট, উইকস, ওরেল। 
     


    কেনসিংটন ওভালে ওরেল, উইকস অ্যান্ড ওয়ালকট স্ট্যান্ড/উইন্ডিজ ক্রিকেট


    চারে নেমে কমপক্ষে ৩০০০ রান করেছেন, ক্যারিয়ার শেষ করা এমন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে উইকসের (৬৩.৬২) চেয়ে বেশি গড় নেই আর কারও। 

    তবে এই ‘থ্রি ডব্লিউস’কে নিয়েও ওয়েস্ট ইন্ডিজ ঠিক সেই অর্থে সফল হয়নি তখনও, তিনজনই খেলেছেন, এমন টেস্টে মাত্র ৭টিতে জয় পেয়েছিলেন তারা। তবে উইকস ওরেল বা ওয়ালকটের সঙ্গে খেলেছেন, এমন ম্যাচে ১২টিতে জয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিং আক্রমণ ওই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৫০-এর সফর বাদ দিলে সেই অর্থে সফল ছিল না। 

    কিন্তু উইকস-ওয়ালকট-ওরেল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পথ দেখিয়েছিলেন। তৈরি করেছিলেন একটা নিজস্ব ভঙিমা, ‘ব্র্যান্ড’। 

    ____________
     

    ১৯৫০ ইংল্যান্ড সফরের পর উইকস দেশের মাটিতে ভারত ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করলেন ডাবল সেঞ্চুরি, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের মাটিতে টানা তিন ইনিংসে সেঞ্চুরি। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠ ব্রিজটাউনের প্রিয় কেনসিংটন ওভালে করলেন ১৯৭। এ মাঠে তার একমাত্র সেঞ্চুরি। 

    সে সিরিজের তৃতীয় টেস্টে কিংস্টনের স্যাবাইনা পার্কে বার্বাডোসেরই এক বাঁহাতি নিজের প্রথম সেঞ্চুরিকে নিয়ে গেলেন ৩৬৫ পর্যন্ত। স্যার গ্যারফিল্ড সোবার্স তার আগমণী বার্তা দিলেন। 

    আর উইকস থামলেন। 

    ৩৩ বছর বয়সেই বিদায় বললেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে। উরুর চোট ভোগাচ্ছিল, তবে সে সময়টায় নাকি ক্রিকেটকে আর উপভোগ করছিলেন না তিনি। টনি কোজিয়ারকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে পরে বলেছিলেন, সে সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের ম্যানেজমেন্ট নিয়ে খুশি ছিলেন না তিনি।

    ৪৮ টেস্ট, ৪৪৫৫ রান, ১৯ সেঞ্চুরি, ৫৭.৭৮ গড়-- এমন পরিসংখ্যান দেখলে আফসোস হওয়ারই কথা, উইকস যদি আর কটা দিন টেস্ট ক্রিকেটকে ‘উপভোগ’ করতে পারতেন! অবশ্য তেমন না হলেও ওরেল-ওয়ালকটের সঙ্গে উইকস রেখে গেলেন অসাধারণ কিছু সংখ্যা। 

    উইকেটকিপিংয়ের দায়িত্ব সামলেও ওয়ালকটের গড় ছিল ৫৬.১৪ গড়। ওরেল ক্যারিয়ার শেষ করেছিলেন ৪৯.৪৮ গড়ে। বোলিং-ও করতেন তিনি, ইনিংসে ৭ উইকেটও আছে তার। 

    ____________


    উইকস টেস্ট ক্রিকেট ছাড়লেও বার্বাডোসের হয়ে খেলা চালিয়ে গেছেন ১৯৬৪ পর্যন্ত। ১৯৬০ সালে তাদের প্রথম কৃষাঙ্গ অধিনায়ক হয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৫ সালে সফরকারি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বার্বাডোজ ‘কোল্টস’ নামের এক দলকে ২ দিনের এক প্রস্তুতি ম্যাচে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন উইকস। প্রথম দিন চা-বিরতির আগে স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়ার আগে তার নামের পাশে ছিল ১০৫ রান। তার বয়স তখন ৪০। 

    বার্বাডোসের হয় ঘরোয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে টেস্ট, ল্যাঙ্কাশায়ার লিগে বাকাপের হয়ে সাত মৌসুম, উইকস ছিলেন সবখানেই ‘ক্লাস’। 

    ওয়ালকট খেলেছিলনে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত। ব্রিটিশ গায়ানার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়কের পর হয়েছিলেন আইসিসির চেয়ারম্যানও। 

    ওরেল হয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়ক। এরপর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে বিখ্যাত এক সিরিজ খেলেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইতিহাসের প্রথম টাই টেস্ট হয়েছিল যেবার। সে সিরিজের আগে ক্রিকেট ম্যাড়মেড়ে হয়ে পড়ছিল, রিচি বেনোর সঙ্গে ওরেলের নেওয়া ‘আক্রমণাত্মক’ ক্রিকেট খেলার সিদ্ধান্ত নতুন প্রাণ জুগিয়েছিল ক্রিকেটকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেবার দাঁড়ানো অভিবাদন পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের কাছ থেকে। সেই সফরেই অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের ট্রফির নামকরণ করা হয়েছিল ‘ফ্র্যাঙ্ক ওরেল’ ট্রফি, যেটি নিজহাতে বেনোকে তুলে দিয়েছিলেন ওরেল।  

    পরবর্তীতে তিনি হয়েছিলেন সংসদ সদস্যও। 

    ____________


    ক্রিকেট ছাড়ার পর উইকসকে পেয়ে বসেছিল ব্রিজের নেশা। বার্বাডোসের হয়ে আন্তর্জাতিক মেজর টুর্নামেন্টেও খেলেছিলেন তিনি কার্ডের এই খেলায়। খেলেছিলেন একসময়ের ক্রিকেট প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, ভারতের বিপক্ষে। রাতভর খেলতেন, দিনে চলতো অনুশীলন। ব্রিজের পর ঝুঁকেছিলেন পোকারের দিকে। 

    তবে ক্রিকেট অনুসরণ করা বাদ দেননি উইকস। প্রায় ৯০ বছর পর্যন্ত মাঠে গিয়ে খেলা দেখেছেন তিনি।  লাইভ ক্রিকেট হলেই টিভিতে দেখেছেন, দেখেছেন টি-টোয়েন্টিও। 

    কানাডাকে ১৯৭৯ বিশ্বকাপে কোচিং করিয়েছিলেন। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হয়েছিলেন আইসিসির ম্যাচ রেফারি। দীর্ঘদিন রেডিওতে ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন। কোজিয়ার বল-বাই-বল কমেন্ট্রি দিতেন, আর উইকস ওভারশেষে বিশ্লেষণ করতেন। বার্বাডোসে প্রশাসনের হয়েও কাজ করেছেন। 

    কেনসিংটন ওভালে একটা স্ট্যান্ডের নামকরণ করা হয়েছিল ‘ওরেল, উইকস, ওয়ালকট’ স্ট্যান্ড। অন্য দুজনের মতো তিনিও পেয়েছিলেন নাইটহুড। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির টুর্নামেন্টের নাম ‘হেডলি/উইকস ট্রফি’। উইকস এখানেও তার হিরোর সঙ্গে একই ব্রাকেটে বন্দী। 

    ২০১৯ সালে শিল্ড বেরিকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ডাক্তার তার অনেকদিনের রুটিন সাঁতার-- বাড়ির পাশে মায়ামি সৈকতের সাঁতার-- বন্ধ করতে বলেছেন। সে বছরেরই শেষদিকে হার্ট-অ্যাটাক হয়েছিল, এরপর তাকে নিতে হয়েছিল আইসিইউতে। 

    উইকসের ছেলে ডেভিড মারেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলেছেন ১৯টি টেস্ট। স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান ছিলেন, ছিলেন ভাল উইকেটকিপার। আশির দশকের রাজত্ব করা ওয়েস্ট ইন্ডিজের অংশ হতে পারতেন, তবে ১৯৮৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘রেবেল ট্যুর’-এ গিয়ে ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গিয়েছিল তার। 

    ____________
     

    এভারটন উইকস থামলেন। 

    যখন বিশ্ব থমকে থাকা অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন প্রথম দল হিসেবে মহামারির সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে সফরে আছে ইংল্যান্ডে। 

    ১০ রানের জন্য টানা ছয় সেঞ্চুরি না ছুঁতে পারা উইকস জীবনেও থামলেন নড়বড়ে নব্বইয়ে। ৯৫ বছর ১২৬ দিন বয়সে। 

    ফ্র্যাঙ্ক ওরেল থেমেছিলেন ১৯৬৭ সালে, লিউকেমিয়ায় ভুগে। ৪২ বছর ২২৪ দিন বয়স হয়েছিল, ব্যাটিং গড়টাও ছোঁয়া হয়নি তার। ক্লাইড ওয়ালকট তাকে অনুসরণ করেছিলেন ৮০ বছর ২২১ দিন বয়সে, ২০০৬ সালে। ওরেল-ওয়ালকট-উইকস বছরখানেকের ব্যবধানে পৃথিবীতে এসেছিলেন, হয়তো একই ধাত্রীর হাত ধরেই। তাদের অভিষেক হয়েছিল পরপর দুই টেস্টে। বয়সের হিসেবে উইকস এগিয়ে থাকলেন বাকি দুজনের চেয়ে, ব্যাটিং গড়ে যেমন ছিলেন। 

    ব্রিজটাউনের ‘থ্রি ডব্লিউস’ ওভালের একটা জায়গায় ওরেলের পাশেই সমাধিস্থ করা হয়েছিল ওয়ালকটকে। সেখানে একটা জায়গা ফাঁকা রাখা হয়েছিল উইকসের জন্য। 

    পরিবার চাইলে উইকসের শেষ ঠিকানা হবে সেটিই। ‘থ্রি ডব্লিউস’ আবার থাকবেন পাশাপাশি-- ওরেল, ওয়ালকট, উইকস। যেমন নামতেন ব্যাটিংয়ে। অবশ্য তেমন কিছু না হলেও ক্রিকেটে তিনজন তো পাশাপাশি, একসঙ্গে জায়গা করে নিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ব্যাটিং করার সময়ই, তাদের ভিতটা গড়ে দেওয়ার সময়ই।  

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন