• " />

     

    চলে গেলেন "এক টেস্টের বিস্ময়"

    টেস্টে সবচেয়ে বেশী ব্যাটিং গড় কার? স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের নামই বলবেন তো? নাহ্‌! স্যার ডন এ তালিকায় দ্বিতীয়। ডনের নামের সঙ্গে চিরকালীন যে ‘আক্ষেপ’টা চলে আসে, ব্যাটিং গড় তিন অঙ্ক না ছোঁয়া, অ্যান্ডি গ্যান্টেয়ামের সে আক্ষেপটাও নেই! তাঁর ব্যাটিং গড় যে ১১২!

    গ্যান্টেয়ামের আক্ষেপটা অন্য জায়গায়। টেস্টে যে ওই এক ইনিংসই ব্যাটিং করেছিলেন তিনি!

     

    এক টেস্টেই ক্যারিয়ার শেষ, এমন ক্রিকেটারের সংখ্যাটা নেহায়েত কম নয়! তবে একটা দিক দিয়ে আলাদা করা যায় দুজনকে, নিউজিল্যান্ডের রডনি রেডমন্ড আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের অ্যান্ডি গ্যান্টেয়াম। নিজেদের খেলা একমাত্র টেস্টে যে সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন দুজনই! রেডমন্ড অবশ্য দুই ইনিংসেই ব্যাটিং করেছিলেন, তবে গ্যান্টেয়াম সুযোগ পেয়েছিলেন এক ইনিংসেই!

    প্রথম শ্রেনির অভিষেকের আগে কখনোও কোনো কোচের সান্নিধ্য পান নি গ্যান্টেয়াম। সেই তাঁরই প্রথম শ্রেনিতে অভিষেক হয়েছিল ১৯৪১ সালে নিজের ২০তম জন্মদিনের কদিন পরই। ত্রিনিদাদের হয়ে ৮ নম্বরে নেমে করেছিলেন ৮৭। ‘সিভিল সার্ভিস’ এ চাকরি করতেন, কাজের ফাঁকে ফাঁকেই চালিয়ে যেতেন খেলা। শুধু ক্রিকেট নয়, ত্রিনিদাদের ফুটবল দলেও খেলতেন গ্যান্টেয়াম!

    ১৯৪৭-৪৮ মৌসুমে ইংল্যান্ড এলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। গ্যান্টেয়াম বনে গেলেন ওপেনার। সে সময় ক্যারিবীয় দলে উইকেটকিপারদের ওপেনিংয়ে পাঠানো হতো, তাঁরা বল ভালো দেখতে পান এ যুক্তিতে! তবে ব্যাপারটা গ্যান্টেয়ামের চোখে ছিল শুধুই ‘পাগলের কান্ড’! ইংল্যান্ড যখন ত্রিনিদাদে এলো, প্রথম খেলার সুযোগ পেয়ে করলেন ১০১ আর অপরাজিত ৪৭ রান। ম্যাচটা ড্র হলো, তবে তিনি ‘সমালোচিত’ হলেন ধীরগতির ব্যাটিংয়ের জন্য! তখন কে জানতো, এ ধীরগতির ব্যাটিং-ই কাল হয়ে দাঁড়াবে তাঁর!

    পরের ম্যাচে করলেন ৫ আর ৯০ রান। টেস্ট দলে ডাক মিললো না তবুও, গ্যান্টেয়ামের ভাষায়, তাঁর শুধু সেঞ্চুরি করলেই যে হতো না! দৃষ্টি আকর্ষনে করতে হতো আরও কিছুর! গ্যান্টেয়ামার বদলে সুযোগ পেলেন জর্জ ক্যারিউ। ক্যারিউয়ের বয়স তখন ৩৭, শেষ টেস্টটা খেলেছিলেন তারও ১৩ বছর আগে! অবশেষে নিয়মিত ওপেনার জেফ স্টলমেয়ারের চোট এনে দিল গ্যান্টেয়ামের টেস্ট অভিষেকের সুযোগ!

     

    ইংল্যান্ড করলো ৩৬২ রান, বিলি গ্রিফিথের অসাধারন এক ১৪০ রানের ইনিংসের অবদানে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের শুরুটাও হলো ঝড়ো, জর্জ ক্যারিউয়ের সঙ্গে নেমেছিলেন গ্যান্টেয়াম। ক্যারিউ যখন সেঞ্চুরি পান, দলের রান তখন ১৬০। গ্যান্টেয়াম ধীরে খেলছেন, এমন গুঞ্জন তখন প্রকট হচ্ছে। তবে তিনি নিজে অবশ্য ভিন্ন বলেন, তাঁর মতে ক্যারিউকে স্ট্রাইক দিতেই বেশী মনোযোগী ছিলেন তিনি! ক্যারিউ যে তখন ‘গরম’ ছিলেন বেশ! দ্বিতীয় দিনটা দুই ওপেনার মিলেই শেষ করেছিলেন।

     

    সেই বিখ্যাত নোটটা গ্যান্টেয়ামকে দিচ্ছেন ওরেল 

     

    ক্যারিউ গেলেন, প্রথমে এলেন এভারটন উইকস, পরে ফ্র্যাঙ্ক ওরেল। গ্যান্টেয়াম পেলেন সেঞ্চুরি, ত্রিনিদাদের দর্শকদের সামনে প্রথম ত্রিনিদাদিয়ান হিসেবে! তবে সময় লাগলো বেশ, প্রায় সাড়ে চার ঘন্টা! অধিনায়ক গেরি গোমেজ ফ্রাঙ্ক ওরেলকে একটা নোট পাঠালেন। তাতে লেখা ছিল, ‘আমি চাই তোমরা এখন চালিয়ে খেলো। আমরা সময়ের চেয়ে পিছিয়ে আছি, দ্রুত রান করতে হবে।’

    ‘শেষের দিকে অ্যান্ডির ইনিংসটা খেলার ওই পর্যায়ের সঙ্গে খাপ খাচ্ছিল না।’ জেফ স্টলমেয়ার এমন কিছু বললেও গ্যান্টেয়াম অবশ্য স্টলমেয়ার সম্বন্ধে একটু ভিন্নমত পোষন করেন, ‘সে আমার সঙ্গে অনেক বছর ওপেন করেছে। সে চাইলে অবশ্যই আমি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে খেলতে পারতাম’! গ্যান্টেয়ামদের পাঠানো অধিনায়ক গোমেজের নোটটা যে দুই ব্যাটসম্যানকেই উদ্দেশ্য করে পাঠানো, এটাও অবশ্য এড়িয়ে যান স্টলম্যান!

     

    গোমেজের সেই নোট

     

    নোট পাওয়ার পরই মারতে গিয়ে আউট হন গ্যান্টেয়াম। ফ্রাঙ্ক ওরেল ব্যাটিং করেন প্রায় সোয়া তিন ঘন্টা, রান করেন ৯৭। তবে ততক্ষণে ওয়েস্ট ইন্ডিজের লিডটা হয়েছে মোটামুটি বড়ই!

     

    নিজের ধীরগতির ব্যাটিংয়ের জন্য গ্যান্টেয়াম যতোই ক্যারিউকে স্ট্রাইক দেয়া বা ইংল্যান্ডের রক্ষণাত্মক নীতির কথা বলুন না কেন, দায় এসে পড়লো তাঁর ওপরই! ১৪১ রান করতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাতে ছিল ৫৭ মিনিট, তিনটা উইকেট গেলেও তাই সুযোগ পেলেন না গ্যান্টেয়াম! ওয়েস্ট ইন্ডিজ করলো ৭২ রান, ড্র হলো টেস্ট। ঝুলে গেল গ্যান্টেয়ামের ভাগ্যও!

    স্টলমেয়ার তখনও চোটে, তবে তৃতীয় টেস্টে গ্যান্টেয়ামের জায়গায় সুযোগ পেলেন জন গোডার্ড। সিরিজ শুরুর আগেই ঠিক করা ছিল, চার টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক হবেন তিনজন! অধিনায়ক হতেই তাই এলেন গোবার্ড, সরে যেতে হলো গ্যান্টেয়ামকে! গোবার্ড করলেন দুই ইনিংস মিলিয়ে ৪ রান।

     

    সে সিরিজে না খেলা হলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরবর্তী সফরের জন্য ডাক পেলেন গ্যান্টেয়াম। ভারত-পাকিস্তানের জন্য ২৪ সদস্যের দলে ছিলেন। তবে ১৬ সদস্যের দলে জায়গা হলো না! তিনজন ওপেনারের মধ্যে একজন হিসেবে নেওয়া হলো সেই ক্যারিউকে, যিনি ২৪ সদস্যের দলেই ছিলেন না! স্টলমেয়ার গ্যান্টেয়ামের এই সুযোগ না পাওয়াটাকে বলেন ‘দুর্ভাগ্য’!

    ৩৬ বছর বয়সে আবার ডাক পেলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ইংল্যান্ড সফরে। এর আগে কয়েকবছর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ে বলতে গেলে তেমন ক্রিকেটই খেলেননি গ্যান্টেয়াম! সে সময় একেকটা সফরে প্রচুর প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলা হতো, গ্যান্টেয়ামও ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে সে সফরে খেলেছিলেন ১৯টি ম্যাচ! প্রায় ২৭ গড়ে করেছিলেন ৮০০ এর মতো রান, যা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি নির্বাচকদের। আসলে কোনো ওপেনারই সেবার প্রত্যাশা পূরনের মতো খেলেননি, বাধ্য হয়ে ফ্রাঙ্ক ওরেল নিজে ওপেনিংয়ে উঠে এসেছিলেন! সেবারও তাই কোনো টেস্টে সুযোগ পান নি গ্যান্টেয়াম।

     

    এরপর আর দুটি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলেছিলেন। সব মিলিয়ে ৫০ ম্যাচে প্রায় ৩৫ গড়ে করেছিলেন ২৭৮৫ রান। ছিল ৫টা সেঞ্চুরি, ১৭টা ফিফটি। তবে আজীবন ছিলেন ওই ‘এক টেস্টের বিস্ময়’ হয়েই!

     

    গ্যান্টেয়াম যখন সম্মানিত 

     

    তবে শুধুই ধীরগতির ব্যাটিং নয়, প্রশাসকদের সঙ্গে গ্যান্টেয়ামের ‘খুব মধুর সম্পর্ক না থাকা’টাও ছিল বেশ আলোচিত। ওয়েস্ট ইন্ডিজে তখন চলছে ‘এসটাবলিশমেন্ট’ প্রথা, গ্যান্টেয়াম দাঁড়িয়েছিলেন এর বিরুদ্ধেই! হর্তা-কর্তাদের সঙ্গে সম্পর্কটা ঠিক জমে ওঠেনি তাঁর!

    যেমন জমেনি টেস্ট ক্যারিয়ারটাও! পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের নির্বাচক ছিলেন, ছিলেন ম্যানেজার। আর মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী টেস্ট ক্রিকেটার! ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার লিন্ডসে টাকেটের পর বিশ্বেরই সবচেয়ে দীর্ঘজীবী টেস্ট ক্রিকেটার হয়ে!

     

    ত্রিনিদাদেই জীবনের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ইতি ঘটেছে তাঁর, গত বুধবার।

     

    সংক্ষিপ্ততম টেস্ট ক্যারিয়ারে একটা দীর্ঘ ধীরগতির ইনিংস খেলেছিলেন অ্যান্ড্রু গর্ডন গ্যান্টেয়াম। জীবনের ক্যারিয়ারের ইনিংসটা সে কারণেই কিনা, বেশ লম্বাই হলো!

     

    যাওয়ার বেলায় তাঁর সঙ্গী হলো কোনটা? ব্র্যাডম্যানের চেয়েও বেশী গড়ের অন্যরকমের এক প্রাপ্তি, নাকি সেই এক টেস্টের বিস্ময় হয়ে থাকার আক্ষেপ? 

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন