• " />

     

    ফুটবলের নেশায় বাংলাদেশ থেকে স্পেনের ক্লাবে : ১৯ বছর বয়সী তাহসিনের আকাশ ছুঁতে চাওয়ার গল্প

    মাত্র দুইদিন হলো স্পেন পৌঁছেছেন, ভ্রমণক্লান্তি ধীরে ধীরে কাটছে, কিন্তু খাওয়া-দাওয়াটা আপাতত কোনো রকমে চালিয়ে নিতে হচ্ছে। ভাতের দেশ থেকে পাস্তার দুনিয়ায় গেলে অমন হওয়ারই কথা। তাহসিন আহমেদ প্রিয় ১৯-এ পা দিয়েছেন দিন দশেকও হয়নি। এই বয়সে দেশ ছেড়েছেন, পরিবার ছেড়েছেন। পড়ালেখার জন্য নয়, জীবিকার খোঁজেও নয়, ফুটবলের নেশায়। ফুটবলের পাঠ নিয়ে ফুটবলকেই জীবিকা করতে চান তিনি। এই উদাহরণ বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই। তাহসিন একরকম তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। ঢাকার ছেলে পাড়ি জমিয়েছেন স্পেনের ক্লাব মালাগা সিটি এফসিতে। সেই ক্লাবের সঙ্গে তার চুক্তিও হয়েছে ১০ মাসের। বাংলাদেশ থেকে নিজেকে প্রমাণ করেই স্পেনে জায়গা করে নিয়েছেন তাহসিন। এমন গল্প আপনি আগে শোনেননি।

    “ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসিরা তো ১৩ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়ে গেছে। ইউরোপে প্রথম এলাম। আগে একা থাকিনি কখনও। কতোখানি একাকীত্বে ভুগছি, বলে বুঝাতে পারব না। কিন্তু যে স্বপ্ন দেখেছি, সেটা পূরণ করতে হলে এটাই তো রাস্তা!” - তাহসিনের কন্ঠে সাহস। এই বয়সে বিরাট দুঃসাহসেরা উঁকি দেয়। অবশ্য ফুটবলার হতে বাংলাদেশে যিনি এত বড় ‘ঝুঁকি’ নিতে পারলেন তিনি তো সাহসিই হবেন। সাংবাদিকের কঠিন প্রশ্নে সহসায় টলবেন কেন তিনি? তাহসিন আরেকটু অবাক করে দেন, “ভাইয়া, দেশের অনেকেই ভাবছে আমি মালাগাতে খেলতে এসেছি। এটা কিন্তু মালাগা নয়, মালাগা সিটি এফসি। এটা আলাদা একটা একাডেমি। এটা কিন্তু ভুল করবেন না!”

    ****


    তাহসিন আহমেদ প্রিয়/ফেসবুক


    মালাগার মতো মালাগা সিটি এফসিও স্পেনের আন্দালুসিয়ার ক্লাব। ফুটবলের জন্য স্পেনের তীর্থস্থান বলা যায় ওই শহরকে। ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু মালাগা সিটি এফসির। মূল লক্ষ্য খেলোয়াড় তৈরি করা। অনুর্ধ্ব-১৯ থেকে শুরু তাদের কার্যক্রম। এরপর অনুর্ধ্ব-২৩, আর সবশেষ মূল দল। যে দলের নাম আলমুনেকার। গত দুই বছরে দুই প্রোমোশন পাওয়ার পর যারা উঠেছে স্পেনের পঞ্চম ডিভিশনে। ক্লাবের মূল লক্ষ্য খেলোয়াড় তৈরি করে ত্রেসেরা ডিভিশনে খেলোয়াড় বিক্রি করা। ত্রেকেরা স্পেনের তৃতীয় স্তরের ফুটবল, এর ওপরে সেগুন্দা ডিভিশন, তার ওপর প্রিমেরা ডিভিশন। যার সঙ্গে লা লিগা নামে পরিচিত আপনি। ত্রেসেরা ডিভিশনের স্কোয়াডগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক অনুর্ধ্ব-২৩ ফুটবলার থাকতে হয়। নইলে স্প্যানিশ ফুটবলের লাইসেন্স মেলে না। এই দলগুলোকেই মূলত খেলোয়াড় তৈরি করে দেয় মালাগা সিটি এফসি। তাহসিন যোগ দিয়েছেন সেই অনুর্ধ্ব-২৩ দলে।

    ইউয়েফার ‘প্রো’ আর ‘এ’ লাইসেন্সধারী কোচদের অধীনে সপ্তাহে ৬দিন অনুশীলন, নিয়মিত বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবগুলোর বয়সভিত্তিক দলগুলোর বিপক্ষে ম্যাচ, নিয়মমাফিক খাওয়া-দাওয়া, থ্রি বা ফোর স্টার হোটেলে থাকা, ফিজিওদের নিয়মিত চেক-আপ আর বিশ্বমানের অনুশীলন ব্যবস্থা- বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরির কারখানায় যা যা লাগে সবই আছে মালাগা সিটির এই একাডেমিতে। তাহসিন সে ঠিকানা নিজেই খুঁজে নিয়েছেন। কেউ সাহায্য করেনি তাকে, তিনি বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক দলেরও কেউ নন। স্কুলপড়ুয়া ছাত্র ঘরে বসে ইন্টারনেট দিয়েই নিজের পথ তৈরি করে নিয়েছেন।

     

    “আমি জানতাম পেশাদার ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে আমার কাছে একটাই উপায় আছে- অনলাইনে আবেদন করা। লকডাউনে ঘরে বসে নিজের খেলার কিছু ফুটেজ দিয়ে একটা ভিডিও বানিয়েছিলাম। ব্রাউজ করতে করতেই চোখে পড়ল মালাগা সিটির নাম। জুনে আমার সিভি আর ভিডিও ফুটেজ দিয়ে আবেদন করে ফেললাম। কিন্তু আবেদন করার সময়ও ওদের কাছ থেকে সাড়া মেলার কথা  আমার কল্পনাতেও ছিল না!”

    তাহসিনের ওই ভিডিও দেখেই মালাগা সিটি চুক্তিপত্র পাঠিয়ে দিয়েছিল তাকে! ইভান অর্তিজ ক্লাবের অপারেশনস ম্যানেজার। তাহসিনের খেলা দেখে চুক্তি পাঠিয়ে সপ্তাহখানেকের ভেতর তাকে স্পেনে যাওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। কিন্তু সময়টাই তো অন্যরকম। যে লকডাউনে ভিডিও বানানোর বুদ্ধি এসেছিল, সেই লকডাউনে তো ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা বেড়েছে আরও। তাহসিন অবশেষে স্পেনের বিমানে উঠতে পেরেছেন ১৫ অক্টোবর।

    তাহসিনের নতুন ঠিকানা যেখানে


    ****

    “বাসায় রাজি করালেন কীভাবে?”- অনুমিত প্রশ্নটা বেশিক্ষণ আটকে রাখা গেল না। তাহসিনের জবাবটাও অনুমিত, “বাসায় কোনোভাবেই রাজি হচ্ছিল না। বহু কষ্টে বোঝাতে পেরেছি বাবা মাকে। বলেছি এমন সুযোগ বারবার আসে না। চেষ্টা করে দেখি, না হলে না হবে!”

    স্কলাস্টিকা স্কুলের ক্লাস টুয়েলভের ছাত্র তাহসিন দেশ ছেড়েছেন আপাতত ১০ মাসের জন্য। সেখানে গিয়ে এখন স্প্যানিশ শিখতে হচ্ছে তাকে। তাহসিন জানালেন বিদেশ থেকে আসা খেলোয়াড়দের জন্য এই ভাষাশিক্ষা কোর্সে ভর্তি হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু পড়ালেখা ছেড়ে এই বয়সে ১০ মাস থাকার অনুমতি বাংলাদেশি বাবা-মায়ের কাছ থেকে মেলে কী করে? তার একটা ব্যবস্থা তাহসিন করে রেখে এসেছেন। স্কুল তার পাশে দাঁড়িয়েছে। মালাগা সিটির অনুশীলনের পাশাপাশি অনলাইনে তার শিক্ষকরা আইন আর ব্যবসায় শিক্ষায় ক্লাস নেবেন তাহসিনের। এরপর দেশে ফিরলে দিয়ে দেবেন পরীক্ষা।  ওই চুক্তিতে বাবা-মাকে রাজি করিয়েছেন তাহসিন।

    বাবা, মা আর ছোটভাইকে নিয়ে তাহসিন থাকতেন ঢাকার উত্তরায়। চার নম্বর সেক্টরের ওই বাড়িতেই জন্ম। বাসার সামনে বড় মাঠ। সে মাঠেই দিন কাটত তাহসিনের। ক্লাস ওয়ানে ফুটবলে প্রথম লাথি, ওইদিনই নাকি ফুটবলপ্রেমের শুরু! স্কলাস্টিকার হয়ে এরপর নিয়মিত স্কুল টুর্নামেন্টগুলো খেলতেন। নিয়মিত সেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত হতেন। ইউটিউবে আপলোড করা ৩ মিনিট ২০ সেকেন্ডের ভিডিওতে শুরুর দিকেই এসব সাঁটিয়ে দিয়েছেন তাহসিন। আরেকটু বড় হয়ে শুরু করেছিলেন আন্ডারগ্রাউন্ড ফুটবল (স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঢাকায় এসব টুর্নামেন্ট আয়োজন করে আসছেন বহুদিন ধরে।)  

    ****

    রাইট উইং অথবা সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ড- তাহসিন মূলত খেলেন এই দুই পজিশনে। আর অনুসরণ করেন লিওনেল মেসিকে। ফুটবলের প্রতি তাহসিনের ভালোবাসার অনেকটুকু জুড়েই মেসি। নিজেও মেসির পজিশনেই খেলেন। তাহসিনের স্কুল স্কলাস্টিকার ফুটবল দলের কোচ আবার বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার ফয়সাল আহমেদ। তার মতে তাহসিনের আসল পজিশন হলো ‘ফলস নাইন’। ফুটবলে যে পজিশনের আবিষ্কার মেসিকেই দিয়েই!

    “বলতে পারেন আমি মেসিকে পূজণীয় স্থানে বসিয়ে রেখেছি। ও যেভাবে মাঠে খেলে, আমিও সবসময় সেটা অনুকরণ করার চেষ্টা করি। কারণ ওকে দেখেই ফুটবলার হতে চেয়েছি আমি। আমার পরীক্ষা থাক, যে কোনো ধরনের সমস্যাই থাক, মেসির খেলা আমি মিস করেছি এমনটা বিরল!”- টিম হোটেলে গেটাফে-বার্সেলোনা ম্যাচ দেখে রুমে ফিরে এই কথাগুলো বলছিলেন তাহসিন। একটু আগে দল হেরেছে, সেটা নিয়ে খোঁটা দেওয়াতে মনে করিয়ে দিলেন প্রথমার্ধে মেসির শট বারপোস্টে না লাগলে গোলটা পেয়েই যেতেন মেসি!

    “মেসির খেলায় অন্যরকম এক শিহরণ জাগে। আমার জন্য ও আসলে আশার আলোর মতো। ভাগ্য ভালো আমিও ওর মতো বাম পায়ের ফুটবলার!”- নিজের কথায় নিজেই হাসেন সদ্য কৈশোর পেরুনো তাহসিন।


    তাহসিন এর আগে বাংলাদেশেও চেষ্টা করেছিলেন। সেই চেষ্টায় সফল হলে হয়ত পরিবার ছাড়তে হত না তাকে। বসুন্ধরা কিংসের অনুর্ধ্ব-১৭ দলে ট্রায়াল দিয়েছিলেন। তিনি আর তার এক বন্ধু তাতে ‘ইয়েস কার্ডও’ পেয়েছিলেন। ফুটবলার হওয়ার একটা রাস্তা অবশেষ পাওয়া গেল ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন তাহসিন। কিন্তু সেই স্বস্তি উবে যেতেও সময় লাগেনি।

    বসুন্ধরা যখন বয়সভিত্তিক দলের অনুশীলন শুরু করেছে ততোদিনে ১৭ বছর বয়সী তাহসিন পা দিয়েছেন ১৮-তে। ক্লাব তখন ফিরিয়ে দিয়েছে তাকে, বলেছে ১৮ এর কম হতে হবে বয়স। তাহসিন ফিরে এসেছেন স্বপ্ন ভঙ্গের কষ্ট নিয়ে।  অন্য কোনো ক্লাবে যাবেন সে উপায়ও নেই। বাংলাদেশে কোন ক্লাবের বয়সভিত্তিক দল আছে? কে পূরণ করবে তাহসিনদের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন?

    জাতীয় দলের সঙ্গে তাহসিনের পরিচয় নেই তেমন। রাত জেগে ইউরোপিয়ান ফুটবল দেখেন, মেসি-রোনালদোদের খেলা দেখে উৎসাহিত হন। এরপর আগ্রহী হয়ে উঠলে তাদের পথের দিশা মেলে না। যে গুটিকয়েক সমর্থক এখনও বাংলাদেশের ফুটবলের নিয়মিত খবর রাখেন, তাদের একটি অংশ কিছুদিন পর পর বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত খেলোয়াড়দের খোঁজে নামেন। হতাশায় হাতড়ে বেড়ান আশার আলো। তাহসিন যে সাহস করেছেন তা অন্যরা হয়ত করবেন না, অনেকে হয়ত পারবেনও না। এমন অনেক তাহসিন পথ খোঁজেন, পান না, এরপর হারিয়ে যান। তাহসিন তো চোখে আঙুল দিয়েই দেখিয়ে দিলেন, যে কাঠামো তারা চেয়েছিলেন তা পাননি। এরপর তাহসিন একরকম বিপ্লবই ঘটালেন। নিজের পথ বানিয়ে নিলেন নিজেই। গ্রে উডের বিখ্যাত সেই উক্তিটাই মনে করিয়ে দিয়েছেন তাহসিন, “জাহাজ যদি পাড়ে না ভেড়ে, সাঁতরে জাহাজের কাছে যাও।” স্পেনে সেই জাহাজের খোঁজেই গেছেন তাহসিন।

    ****

    ১৯ বছর বয়স। এই বয়সের সাফল্য চাইলেও লুকিয়ে রাখা যায় না। অথচ তাহসিনের ফেসবুক প্রোফাইলের কোথাও তার এই সাফল্যের ছিঁটে-ফোঁটাও নেই। একটা ছবিও শেয়ার করেননি। স্পেন পৌঁছানোর দুইদিন পর হুট করে তাহসিনের ‘ঢেকে রাখা’ খবরটাই এখন সাড়া ফেলে দিয়েছে। সেটা কীভাবে ঘটেছে তা নিজেও জানেন না তাহসিন। দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা, টিভি চ্যানেল সব হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ঘটনা জানতে।

    “সত্যি বলতে আমি এখনও কিছুই করিনি। একটা ক্লাবের একাডেমিতে সুযোগ পেয়েছি মাত্র। তাতেই দেশের মানুষের যে সমর্থন পাচ্ছি তাতে আমি আসলে এখনও কী অনুভব করা উচিত তাই বুঝতে পারছি না। আমি এখনও কিছুই অর্জন করিনি। যতক্ষণ না পর্যন্ত একটা পেশাদার ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে ততোক্ষণ পর্যন্ত কিছু অর্জন করা হয়নি।”

    তাহসিন আপাতত পা মাটিতেই রাখছেন। জানেন, মাত্র উড়তে শুরু করেছেন, যেতে হবে আকাশের সেই উঁচুতে। সেই বারুদ তার আছে, কন্ঠ থেকেই সেটা টের পাওয়া যাচ্ছিল। আর সেটা সত্যি হলে বাংলাদেশের গলিতে গলিতে একদিন হয়তো স্পেনের ত্রেসেরা ডিভিশনের খেলাই দেখানো হবে। বাঙালি যুবক জয় করবে আন্দালুসিয়া, কে জানে হয়তো স্পেনও। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন