• আইসিসি টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০১৬
  • " />
    X
    GO11IPL2020

     

    এক যে "আছে" আফগানিস্তান!

    ১.

    ১৯৯৭ সালের ১৩ এপ্রিলের বিকেলটা মনে আছে? আইসিসি ট্রফি জয়ের আনন্দ মিছিলে জনতার ঢল নেমেছিল ঢাকার রাজপথ গড়িয়ে শহর-মফস্বল হয়ে অজ পাড়াগাঁয়ের মেঠো পথ অব্দি। আফগানবাসীদের জন্যও ‘সম্ভবত’ প্রথমবারের মতো এমন একটা দিন এসেছিল ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর। কাবুলের সড়ক-মহাসড়কে অবস্থান নিয়েছিলেন অগুনিত মানুষ। মুহুর্মুহু স্লোগান আর জয়ধ্বনিতে, ঢোল-বাদ্যে নেচেগেয়ে বরণ করে নেয়া হয়েছিল ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপের টিকিট নিয়ে দেশে ফেরা আফগানিস্তান ক্রিকেট দলকে।

    অবিশ্বাস্য দ্রুততায় উন্নতির স্বীকৃতিস্বরূপ সুযোগ মিলে গিয়েছিল ২০১৪ সালের এশিয়া কাপেও। সে আসরে মোহাম্মদ নবীদের কাছে বাংলাদেশের হেরে যাওয়ার গল্প নতুন করে মনে করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। আফগান ক্রিকেটের চমকের ঠমকটাও কিন্তু সেখানেই থেমে নেই। সপ্রতিভ পারফরম্যান্সে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার টেনেও জায়গা করে নিয়েছেন আসগর স্ট্যানিকজাইরা। ক্রিকেট দুনিয়ায় নবীন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথে আফগানিস্তানের জন্য এটি আরও একটি মাইলফলকই।

     

    ২.

    দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার মাঝামাঝিতে অবস্থিত আফগানিস্তানের ক্রিকেট খেলার প্রচলন উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই। কিন্তু দীর্ঘদিনের যুদ্ধাবস্থা দেশটিতে খেলাধুলা চর্চার মতো পরিবেশ তৈরি হতে দেয় নি। আফগান ক্রিকেটের পটভূমি খুঁজতে তাই আফগানিস্তানে নয়, যেতে হবে পার্শ্ববর্তী দেশ ক্রিকেট দুনিয়ার অন্যতম পরাশক্তি পাকিস্তানে। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েতদের সাথে যুদ্ধের সময় অনেক আফগান শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন শিবিরে। ক্রিকেটপাগল পাকিস্তানিদের সংস্পর্শে খেলাটির প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে শরণার্থী শিবিরগুলোর আফগান শিশুকিশোরদের মাঝে। ১৯৯২ সালে পাকিস্তান ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতলে দেশটিতে ক্রিকেট জ্বর নতুন মাত্রা লাভ করে। প্রতিটি রাস্তা, পাড়া-মহল্লায়, পার্কে দিনভর ক্রিকেট আর ক্রিকেট; সে উত্তাপ এড়াতে পারে নি শরণার্থী শিবিরগুলোওআফগানিস্তান জাতীয় দলের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানদের একজন করিম সাদিকও এমনই এক শরণার্থী শিবিরে বেড়ে উঠেছিলেন। এ যাবত ২৪টি একদিনের ও ৩৩টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক খেলা এই অলরাউন্ডার রাতে কাজ করতেন একটি দেশলাই তৈরির কারখানায় আর দিনে করতেন ক্রিকেট অনুশীলন। এমন অগুনিত করিম সাদিকের নিরলস অধ্যবসায় আর সাধনা আফগান ক্রিকেটের ভিতটা তৈরি করে দেয়।

    শরণার্থী শিবিরের বাতাস একসময় বইতে শুরু করে স্বদেশেও। খেলাধুলা বলতে কেবল ফুটবল বোঝা জাতিটা মনোযোগী হয় ২২ গজের উইকেটে ব্যাট-বলের লড়াইয়ে। তবে সেটাকে 'জাতীয়' রূপ দিতে যে ক’জনের অবদান আফগান ক্রিকেট সবসময় স্মরণ করবে তাঁদের অন্যতম তাজ মালুক। জাতীয় দলের এই সাবেক কোচকে বলা হয় 'ফাদার অব আফগান ক্রিকেট'। গত শতাব্দীর শেষ দশকে আফগানিস্তানকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অংশ করার সাহসী চিন্তাটা প্রথম তিনিই করেন। সে চিন্তা থেকেই উপযুক্ত খেলোয়াড়ের খোঁজে তিনি ঘুরতে শুরু করেন ক্যাম্প থেকে ক্যাম্পে। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরোয় তাদের যে ক্রিকেটার হওয়ার 'সাহেবী বিলাসিতা' মানায় না! ছেলেদের বাবারা তাই তাজ মালুককে শাসাতে শুরু করলেন এসব বন্ধ করতে। কিন্তু আফগান ক্রিকেটের 'পিতা' হিসেবে যিনি ইতিহাসের অংশ হবেন, তাঁর এতো সহজে দমে গেলে চলবে কেন? হুমকি-ধামকি উপেক্ষা করে চললো তাজের অভিযান। প্রাথমিক সাফল্যটাও এলো এক সময়। ১৯৯৫ সালে আফগানিস্তান অলিম্পিক কমিটির অধীনে কাবুলে গঠিত হল আফগান ক্রিকেট ফেডারেশন।

     

    ৩.

    এর অল্প ক'দিন বাদেই ক্ষমতায় এল তালেবানরা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইসলামী শরিয়তের দোহাই দিয়ে চরমপন্থি সরকার ফুটবলসহ প্রায় সব ধরণের খেলাধুলায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও অপেক্ষাকৃত 'শালীন' পোশাকে খেলা ক্রিকেট নিয়ে তেমন আপত্তি তোলে নি। এমনকি অনেক তালেবান নেতাই বিভিন্ন ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পুরস্কার বিতরণ করতেন। দলটির অনেক কর্মী যারা পাকিস্তানে শরণার্থী শিবিরে বড় হয়েছেন তারাও পরবর্তীতে দেশে ফিরে ক্রিকেটের সাথে যুক্ত থেকেছেন। ছয় বছরের তালেবান শাসন তাই আফগান ক্রিকেটকে সেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে নি। বরং বাঁধ সাধলো পরবর্তী 'উদারপন্থী' সরকারই। ২০০১ সালে মার্কিন অভিযানে তালেবানদের পতন হলে দেশটির শাসনভার নেয় যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত কারজাই সরকার। 'বিদেশী' খেলায় কোনরূপ আর্থিক সহযোগিতা করা হবে না, সরকারের এমন ঘোষণায় হুমকির মুখে পড়ে দেশটির ক্রিকেট ভবিষ্যৎ।

    কিন্তু তারপরও থেমে থাকে নি পথচলা। শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুদানে অল্প কিছু প্রাদেশিক দল আর অপেশাদার খেলোয়াড় নিভু নিভু প্রদীপটা জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করে যান। সে বছরই আফগানিস্তান আইসিসির সহযোগী সদস্যপদ লাভ করলে জীর্ণ দশাটা ধীরে ধীরে কেটে যেতে শুরু করে। আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় জাতীয় দল। ২০০৩ সালে মিলে যায় এসিসির (এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল) সদস্যপদও।

     

    ৪.

    এরপরের সময়টা কেবলই এগিয়ে যাওয়ার। ২০০৮ সালে আইসিসির ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লীগে ডিভিশন ফাইভে শুরু, অসাধারণ পারফরম্যান্সে মিলে যায় ২০০৯ সালে '১১ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব খেলার সুযোগ। সে যাত্রা বিশ্বকাপের টিকিট পেতে ব্যর্থ হলেও এলো ২০১৩ সাল অব্দি ওয়ানডে স্ট্যাটাস। পরের বছরই বাছাইপর্ব উৎরে টি২০ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জিত হল। একই বছর প্রথমবারের মতো ইন্টারকন্টিনেটাল কাপের শিরোপাও জেতে আফগানরা। ২০১১ সালে এশিয়া বনাম ক্যারিবিয়ান টি-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, বাংলাদেশ এবং বার্বাডোজকে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি র‍্যাংকিয়ে বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়েকে পিছনে ফেলে ৯ নম্বরে উঠে আসে দলটি। 

    ২০১২ সালের টি-২০ বিশ্বকাপেও অংশ নেওয়া আফগানিস্তান নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের নতুন যুগে পা দিলো '১৩ সালের ৪ঠা অক্টোবর। ওইদিন কেনিয়াকে হারিয়ে ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লীগ ২য় অবস্থানে থেকে শেষ করে দলটি, একইসাথে নিশ্চিত করে ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় একাদশ ক্রিকেট বিশ্বকাপে নিজেদের অংশগ্রহণ।

     

    ৫.

    ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রাথমিক বাছাইপর্বে শুরুটা আশাপ্রদ হয় নি। উপর্যুপরি হারে ভেস্তেই যেতে বসেছিল আরও একটি বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন। তবে শেষ পর্যন্ত একাধিক প্লে-অফ জিতে ছয় দলের মধ্যে পঞ্চম হয়ে মেলে ভারত যাত্রার নিশ্চয়তা। এরপরের সময়টা আফগানিস্তানের জন্য পুনরুত্থানের আরেক অধ্যায়ই। ঘরে-বাইরে জিম্বাবুয়েকে একদিনের সিরিজ হারানোর পাশাপাশি টি-টোয়েন্টি সিরিজ দুটোয় ‘হোয়াইট ওয়াশ’ও করে ফেলেন স্ট্যানিকজাইরা। এরপর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব নামের চূড়ান্ত বাছাইয়ে স্কটল্যান্ড, হংকংয়ের পর জিম্বাবুয়েকে হারিয়ে সুপার টেনে খেলা নিশ্চিত করে আফগানিস্তান।

    সাম্প্রতিক এসব সাফল্য বলছে ইনজামাম-উল-হকের অধীনে পুনর্জাগরণটা মন্দ হচ্ছে না আফগান ক্রিকেটের। দেশটির প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে আইসিসির টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যান র‍্যাঙ্কিংয়ে আট নম্বরে উঠে এসেছেন ওপেনার মোহাম্মদ শেহজাদ। অভিজ্ঞ করিম সাদিকের পাশাপাশি তরুণ নূর আলী জাদরান, উসমান গণিরা টপ অর্ডারে ভিত গড়ে দিচ্ছেন। মিডল অর্ডারে মোহাম্মদ নবীর আস্থার ব্যাটে রসদ যোগাচ্ছেন গুলবাদিন নাইব, নাজিবুল্লাহ জাদরানরা। দলের পেস আক্রমণের দুই পুরোধা হামিদ হোসেন আর শাপুর জাদরানকে ছাড়াই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুটো সিরিজ জয় বলে রিজার্ভ বেঞ্চের শক্তিটাও বাড়ছে একটু একটু করে। 

    ৬ 

    এরপর আর ফিরে তাকানো নয়। আফগান ক্রিকেট এর পরের সিঁড়িগুলো আসলে ভাঙেনি, উড়ে উড়েই পার হয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে আভাস দিয়েছিল, আফগান ক্রিকেট খুব শিগগির নিজেদের অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এই বছরের শুরুতে আইসিসির ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ ছিল আফগানিস্তানের জন্য বড় একটা পরীক্ষা। আইসিসির এই টুর্নামেন্ট সহযোগী দেশগুলোর দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেট সামর্থ্য প্রমাণ করার  মঞ্চ। সেখানে আয়ারল্যান্ডকে ইনিংস ব্যবধানে হারিয়ে আফগানিস্তান জানান দিয়েছে, তার পরের ধাপে যেতে প্রস্তুত। এর মধ্যেই মোহাম্মদ নবী ও রশিদ খান প্রথমবারের মতো সুযোগ পেয়েছেন আইপিএলে। কিছুদিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে তাদের মাঠে গিয়েই হারিয়ে এসেছে আফগানিস্তান। সবকিছুই জানান দিচ্ছিল, আফগানরা এবার ক্রিকেট-কুলীনে নাম লেখাতে প্রস্তুত। টেস্ট স্ট্যাটাস যেন তারই স্বীকৃতি। 

    তবে এ তো কেবল শুরু। স্বপ্নটা যখন আকাশ ছোঁয়ার, সামনে তো অনেক পথ বাকি! 

     

    (পূর্বে প্রকাশিত এবং পরিমার্জিত)

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন