• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    যেভাবে "সারসেলের রোনালদো" মাহরেজ হলেন...

    ১.

    ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া “গোল" সিনেমার কথা মনে আছে আপনাদের? চোখেমুখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে নিউক্যাসল ইউনাটেডের জন্য  ট্রায়াল দিতে  মেক্সিকান সান্তিয়াগো মুনেজ আসে ইংল্যান্ডে । কিন্তু "রাফ অ্যান্ড টাফ" ইংলিশ ফুটবলের সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে স্বপ্নভঙ্গ হতেও বেশি সময় লাগে না তাঁর । তবে ঠিকই একসময় নিজের জাদুকরি স্কিল আর কঠোর পরিশ্রমে সব বাধা পেরিয়ে সফল হয় সে।

    রিয়াদ মাহরেজের সাথে কাকতালীয়ভাবেই এই চিত্রনাট্য প্রায় মিলে যায়। ২০১৪ সালে যখন ফ্রান্সের লিগ-২ এর ক্লাব লে হাভ্রে থেকে মাহরেজ লেস্টারে পাড়ি জমান তখন তার আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধব সবাই একবাক্যে এর বিরোধী ছিলেন। মূল কারণ ছিল মাহরেজের ছিপছিপে গড়ন। ইংলিশ ফুটবলের মতো এমন তুমুল শরীরনির্ভর খেলা মাহরেজের সাথে খাপ খাবে না বলেই তাদের ধারণা ছিল।

    তো শুরুতে অনুশীলনে খেলার সময় মাহরেজ যখন অতিরিক্ত ড্রিবলিং আর বল বেশি সময় ধরে রাখার একের পর ফাউলের শিকার হতেন, রেফারি হিসেবে থাকা তখনকার কোচ নাইজেল পিয়ারসন তাও ফাউলের বাঁশি বাজাতেন না।উদ্দেশ্য ছিল একটাই। ইংলিশ ফুটবলের কাঠিন্যের সাথে তাকে পরিচয় করানো। দাঁতে দাঁত চেপে ফাউল সহ্য করা মাহরেজও কম যাননা। ঠিকই নিজের ক্ষুদ্র লিকলিকে শরীরের বাধা পেরিয়ে, নিজেকে মানিয়ে নেন কঠিনতম ইংলিশ  ফুটবলের সাথে।

     

    ২.

    বাবা আলজেরিয়ান, মা মরক্কোর এবং জন্ম ফ্রান্সে হওয়ায় ৩ টি দেশের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ ছিল মাহরেজের। ২০১৩ সালে আলজেরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করারই সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু তাতেও অনেক জল ঘোলা হয়। ২০১৪ বিশ্বকাপের আলজেরিয়ান দলের প্রাথমিক স্কোয়াডে যখন তিনি ডাক পান, তৎকালীন কোচ হেলিলোযিচ প্রচন্ড সমালোচনার মুখে পড়েন। এমনকি “মাহরেজ তাকে ঘুষ দিয়েছেন” এই অভিযোগও কোচকে শুনতে হয়।

    ভাবা যায়, এই মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের সেরা খেলোয়াড়ের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা একজনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা যে এত কন্টকাকীর্ণ ছিল?

     

    ৩.

    আরেকটু পেছনে ফিরে দেখা যাক। ১৫ বছর বয়সে মাহরেজ  হারান তাঁর বাবাকে । বাবা আহমেদ মাহরেজও আলজেরিয়া ও ফ্রান্সের ক্লাবের হয়ে খেলেছিলেন। বাবাকে আদর্শ মেনে ফুটবল খেলতে করেছিলেন মাহরেজ। নিজের শহরের ক্লাব এএস সারসেলে ৫ বছর কাটিয়ে ২০০৯ সালে ফরাসি চতুর্থ ডিভিশনের ক্লাব কিউম্পার-এ আসেন রিয়াদ। এটিই তার প্রথম পেশাদার ক্লাব। এখানে আসতেও তাকে কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি। কিউম্পারের হয়ে ট্রায়াল দিতে আসা ২০ জনের মধ্যে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দলে সুযোগ পান। কিন্তু এক পর্যায়ে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট তরুণ মাহরেজকে জানিয়ে দেন, মাহরেজকে দলে নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। শুনে সে কি কান্না মাহরেজের! কান্না করতে করতেই মাকে ফোন করেন! মাহরেজের এই আবেগ ছুঁয়ে যায় কিউম্পার কোচকে। ২৪ ঘন্টার মধ্যেই কিউম্পার তাঁকে চুক্তিবদ্ধ করে।

    কিউম্পারে যোগ দেওয়ার ৬ মাসের মাথায় পিএসজি ও মার্শেই এর মতো ক্লাব থেকে প্রস্তাব আসা শুরু করে মাহরেজের কাছে। কিন্তু মাহরেজ তাতে কোন আগ্রহই দেখালেন না। কিউম্পারে এক মৌসুম শেষেই  ২০১০ সালে ফরাসি লিগ-২ এর ক্লাব লা হাভ্রে তে যোগ দেন তিনি। কারণটা ছিল অনুমেয়, এখান  থেকেই পল পগবা,দিমিত্রি পায়েট এর মতো খেলোয়াড়রা উঠে এসেছেন।

     

     

    প্রথমে রিসার্ভ দলের খেলা শুরু করলেও ঠিকই নিজের যোগ্যতাবলে মূল দলে জায়গা করে নেন তিনি। লা হাভ্রের মূল দলের জার্সিতে ৬০ ম্যাচ নেমে ৬ গোল করেন তিনি। তবে ভবিষ্যতের রিয়াদ মাহরেজকে গড়ে দিতে লা হাভ্রের তখনকার কোচ এরিক মোমবায়েরটস এর কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে অনেক বেশি। মাহরেজের প্রতিভাকে তিনিই কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে মাঠে অনূদিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

     

    ৪.

    ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে তখনকার ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপের দল লেস্টারে পাড়ি জমান মাহরেজ। মজার ঘটনা হচ্ছে, লিস্টারের স্কাউটরা তাঁর সম্পর্কে জানতেনই না। মাহরেজের লা হাভ্রে টিমমেট রায়ান মেন্ডেসকে স্কাউটিং করতে এসেই এক স্কাউটের নজরে পড়েন। এরপর মেন্ডেস দুর্ভাগ্যক্রমে ইনজুরিতে পড়লে মাহরেজকেই দলে ভেড়ায় লিস্টার।

    একটু অবিশ্বাস্যই মনে হবে, এর আগে কখনো লেস্টার সিটির নাম শোনেননি মাহরেজ। যখন তার কাছে প্রস্তাব আসে তখন তিনি একে রাগবি ক্লাব ভেবেছিলেন! পরে লেস্টারের ট্রেনিং সুবিধা আর অন্যান্য বিশ্বমানের সুযোগ সুবিধা দেখে আর দ্বিতীয়বার চিন্তা করেননি।

    প্রথম মৌসুমে ১৯ বার মাঠে নেমে ৩ গোল করে লিস্টারের প্রিমিয়ার লিগে প্রমোশনে বড় ভূমিকা পালন করেন তিনি। তবে প্রিমিয়ার লিগে মাহরেজের শুরুটা ভালো ছিল না। যে কারণে আবার সেই পুরনো অভিযোগের তীর তার দিকে ছুটে আসতে থাকে। মাহরেজ কি আদৌ পারবেন ইংলিশ ফুটবলের সাথে মানিয়ে নিতে? কিন্তু সব সংশয় উড়িয়ে দিয়েছেন ধীরে ধীরে। ঠিকই কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে নিজেকে চিনিয়েছেন এই আলজেরিয়ান। এই মৌসুমে মিডফিল্ডারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোল তাঁরই, সব মিলে গোল করেছেন ১৬টি। প্রিমিয়ার লিগে এক মৌসুমে ফরোয়ার্ড নন অথচ অন্তত ষোলো গোল করেছেন, এমন কীর্তি আছে আর মাত্র ছয়জনের- ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, গ্যারেথ বেল, স্টিভেন জেরার্ড, ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড, ইয়াইয়া তোরে, আন্দ্রেই কানচেলকিস। এমনকি পল স্কোলস বা রায়ান গিগসও এটা করতে পারেননি। মাহরেজ গোলও করিয়েছেন শুধু ১১টি, এর চেয়ে এই মৌসুমে বেশি অ্যাসিস্টের রেকর্ড আছে শুধু মেসুত ওজিলের।

     

    ৫.

    ভার্ডির সাথে তার জুটি এখন লিগের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ এবং বিপক্ষ দলের ডিফেন্সের জন্য মূর্তিমান আতংক । লিস্টারের এই মৌসুমের আকস্মিক উত্থানের পেছনে মাহরেজের এই দুর্দান্ত ফর্ম সবচেয়ে বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।প্রথম আলজেরিয়ান হিসেবে প্রিমিয়ার লীগে হ্যাট্রিক এর রেকর্ডও করেছেন তিনি সোয়ানসির বিপক্ষে। আগে মাঠে তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ফিনিশিংয়ে ঘাটতি থাকলেও রানিয়েরির কোচিংয়ে এর ব্যাপক উন্নতি  করেছেন মাহরেজ। এমনকি এই মৌসুমে খেলার ডিফেন্সিভ ডিসিপ্লিন রক্ষায়ও আগের চেয়ে  অনেক বেশি পারদর্শী হয়েছেন।

     

    ৬.

    "আই অ্যাম সো হ্যাপি ফর রিয়াদ। হোয়েন ইউ সি হিম লাইক দিস ইন ইংল্যান্ড, ইন দ্য প্রিমিয়ার লিগ- ইট'স ফেনোমেনাল। আই গেট গুজবাম্পস হোয়েন আই সি রিয়াদ স্কোর অ্যা গোল। আই ফিল লাইক ক্রাইং হোয়েন আই সি হিম প্লে'' 

    কথাটা কে বলেছেন জানেন? মাহরেজের মেন্টর,নাসিম,যিনি পেশায় নাপিত এবং আলজেরিয়ান। ছোটবেলায় সারসেলে থাকার সময় থেকেই তাদের পরিচয়। “সে হচ্ছে সারসেলের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। যদি সে কিছু করে, বাকিরা সবাই তাকে অনুকরণ করে।”- বলেছিলেন নাসিম।

    ৫-৬ বছরের ছেলেরা নাসিমের কাছে ছুটে আসে রিয়াদ মাহরেজের মতো করে চুল কাটানোর জন্য। নাসিমও তৃপ্তির সাথে তাদের খুশি করেন । কে জানে, এদের কেউই হয়তো একদিন মাহরেজের মতো আরাধ্য সেই চূড়ায় পৌছাবে!