• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />

     

    লেস্টারের যে গল্পটা বলা হয়নি...

    গ্যারি পেইন পেশায় একজন রাঁধুনি। গত সতের বছর ধরে লেস্টার সিটি ক্লাবের খাবার রান্নার কাজ সামলাচ্ছেন তিনি। খেলোয়াড়দের জন্য প্রাত্যহিক খাবার রান্না ছাড়াও একটি বিশেষ দায়িত্ব আছে তাঁর; ম্যাচের আগের দিন আপেলের কাস্টার্ড বানানো। ম্যাচ ডে’র আগে তাঁর বানানো আপেলের কাস্টার্ড খাওয়াটা খেলোয়াড়দের অভ্যেস নয়, রীতিতে পরিণত হয়েছে। এর পিছনেও রয়েছে মজার এক রহস্য। লেস্টারের ম্যানেজার তখন মার্টিন ও’নেইল। সেসময় একবার ম্যাচের আগের দিন আপেলের কাস্টার্ড বানিয়েছিলেন পেইন। এরপরের দিন ম্যাচ জিতে যায় ‘ফক্স’রা! সেদিন থেকে ম্যাচের আগের দিন আপেলের কাস্টার্ড খাওয়া ‘লাকি’ হিসেবে ধরা হয় লেস্টার সিটির জন্য।

    লেস্টারের খেলোয়াড়দের আপেলের কাস্টার্ড খাওয়াটা হয়ত অন্ধ বিশ্বাস। তবে সেই ক্ষুদ্র বিশ্বাসটাই ভার্ডি-মাহারেজদের সাহস জুগিয়েছে স্বপ্নের প্রিমিয়ার লীগ শিরোপা জিততে। লেস্টারের ‘ফক্স’দের এভাবে ফিনিক্স পাখির মত পোড়া ছাই হতে জেগে ওঠার কথাই বা কে ভেবেছিলেন? গত ৪০ বছর ধরে লেস্টারের ফুটবলারদের কিট ধোয়ার দায়িত্বে আছেন শিলা কেন্ট। তাঁর কাছেও তো এখনো অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে এই সাফল্যকে। কারণটাও যুক্তিযুক্ত। নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনে লিনেকার, হেস্কিদের কিট ধোয়ার সময়টাতেও এত বড় সাফল্য দেখতে পান নি এই বর্ষীয়ান নারী।

    ১৩১ বছরের পুরনো ক্লাব লেস্টার সিটি। ১৮৮৪ সালে একদল বুড়ো মিলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই ক্লাবটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দীর্ঘ সময়ে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জেতা হয় নি কখনো। তবে ১৯২৮/২৯ মৌসুমে একবার রানার্সআপ হয়েছিল ‘দ্য ব্লু আর্মি’রা। আর ফুটবল লিগ চ্যাম্পিয়নশিপে রয়েছে সর্বোচ্চ ৭ বার শিরোপা অর্জনের রেকর্ড। প্রায় এক দশক পর ‘ফক্স’রা প্রিমিয়ার লিগে ফিরেছিল ২০১৪/১৫ মৌসুমে। তবে তাঁদের মৌসুমটা পার হয়েছে প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকার লড়াই করেই। কিন্তু, রেলিগেশনের মুখ থেকে ফিরে এসেই যেন নতুন করে জেগে উঠেছে ভার্ডি-মাহরেজরা। কে জানে নতুন ম্যানেজার ক্লডিও রানিয়েরি কি মন্ত্র বলে দিয়েছেন তাঁর শিষ্যদের!

    লেস্টারের সাফল্যের নায়ক বলা যায় ভার্ডি-মাহারেজ এবং ম্যানেজার রানিয়েরিকে। তবে ‘ফক্স’দের এই সাফল্যচিত্রের পিছনে রয়েছেন আরো কিছু মানুষ। সে তালিকায় নাম থাকবে ম্যাচ শুরুর আগে মাঠে মাইক্রোফোনে কথা বলা অ্যালান বির্চেনালের। মাইক্রোফোনে যে লোকটির সুরের সাথে তাল মিলিয়ে গান গেয়ে যায় ঘরের মাঠের সকল দর্শক। সাফল্যের কৃতিত্বটা দিতে হবে ফুটবলারদের কিট ধোয়ার দায়িত্বে থাকা শিলা কেন্ট কিংবা ক্লাবটির খাবার রান্নার দায়িত্বে থাকা গ্যারি পেইনকেও।

    লেস্টার সিটির ইতিহাসে গ্যারি লিনেকার, পিটার শিল্টন, গর্ডন ব্যাঙ্কস ও ডন রেভিদের মত খেলোয়াড়রা খেলে গেলেও গত কয়েক যুগে এবারের মৌসুমের অর্জনটাকেই সেরা সাফল্য হিসেবে মানছেন যেকোন ‘ফক্স’ সমর্থক। এই সাফল্যের নেপথ্যে থাকা নায়কেরা কেউই কিন্তু তেমন কোন মহারথী নন। বরং অন্যদলে খেলতে গিয়ে তাঁদের কেউ বাদ পড়েছেন উচ্চতার জন্য কেউবা একটু ধীরগতির হওয়ার কারণে। ভার্ডি, মাহরেজ অথবা এন’গলো কান্তেরা সেই দুর্বলতাকেই শক্তিতে রুপান্তর করেছেন; নিজেদের অস্তিত্বের কথা জানিয়ে দিয়েছেন গোটা ফুটবল বিশ্বকে!

    দলটির ম্যানেজার ক্লডিও রানিয়েরি লেস্টারের দায়িত্ব পাওয়ার আগে বরখাস্ত হয়েছিলেন গ্রীস জাতীয় দলের কোচের পদ থেকে। তাঁর সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন স্বয়ং গ্যারি লিনেকার। কেউ কেউ তাঁকে ঠাট্টা করে ডেকেছেন ‘টিংকারম্যান’। শুনেছেন সবই; জবাব দেয়ার জন্য ছিল সঠিক সময়ের অপেক্ষা। অনেকের ধারণা ছিল, দলটাকে আরো বেশি অগোছালো করবেন রানিয়েরি। কিন্তু, সবার ধারণা ভুল প্রমাণ করে ক্লাবের পুরনো পরিবেশ বজায় রেখেই লেস্টারকে বদলে দিয়েছেন তিনি। এই ভদ্রলোক এমনকি পুরোনো কোচিং স্টাফদেরও বদলান নি। তবুও বদলে গেছে সব; বদলে দিয়েছেন প্রত্যেকটা ফুটবলারদের মানসিকতাকে। নাইজেল পিয়ারসেনের গড়ে যাওয়া দলটিকে ক্লডিও রানিয়েরি দিয়েছেন ‘মিডাসের গোল্ডেন টাচ’! সমালোচকদের ঠাট্টা কিংবা সংশয়ের জবাবটা দিয়েছেন মাঠেই। সময়ের সাথে নামটাও বদলে গেছে এই ইটালিয়ানের; নিন্দুকেরাও আজকাল তাঁকে ডাকেন ‘থিংকারম্যান’ বলে!

    দলটির এই মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতা জেমি ভার্ডি পাঁচ বছর আগেও শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন একটি কারখানায়। আর সাপ্তাহিক বন্ধে আধা-পেশাদার লিগে ফুটবল খেলে আয় করতেন ৫০ ডলার। অন্যদিকে দলটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা রিয়াদ মাহরেজ কয়েকবছর আগেও খেলতেন ফ্রান্সের দ্বিতীয় বিভাগের ফুটবল দলে। সেখান থেকে এই আলজেরিয়ানকে লেস্টারে আনতে যে পরিমান ফি লেগেছিল তা ওয়েন রুনির সাপ্তাহিক আয়ের চেয়ে সামান্যই বেশি!

    ‘দ্য ব্লু আর্মি’দের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া ওয়েস মরগ্যানের অবদানটাও কম নয়। নেতৃত্বের পাশাপাশি নিজের দলের ডিফেন্সকে আগের চেয়ে শক্তিশালী করার পিছনে কৃতিত্ব দিতে হবে অধিনায়ক মরগ্যানকেও। অথচ এই জ্যামাইকানকে পুরনো ক্লাব নটিংহ্যামে প্রথম মৌসুমটা কাটাতে হয়েছিল মাঠে চক্কর দিয়ে; ওজন কমানোর জন্য। পরবর্তিতে অবশ্য ফুটবল লিগের ‘দশক সেরা দল’ এ নিজের নাম লিখিয়েছিলেন এই বিশালদেহী ডিফেন্ডার।

    ‘ফক্স’দের রূপকথার গল্পের আরেকটি অসাধারন চরিত্র হচ্ছেন মিডফিল্ডার এন’গলো কান্তে। ম্যাচের পুরোটা সময়ই সারা মাঠ বিরামহীন ছুটে বেড়ান তিনি; হয়ত দু’পায়ে লুকিয়ে আছে কোন অদৃশ্য ব্যাটারী! প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে সেটা ফরোয়ার্ডদের কাছে পৌছে দেয়াই তাঁর কাজ। ভার্ডি-মাহারেজদের মত তাঁর হয়ত অসংখ্য গোল কিংবা অ্যাসিস্ট নেই। তবে পর্দার আড়াল থেকে ঠিকই একের পর এক উৎসবের মুহুর্ত বয়ে এনে দিচ্ছেন এই ফরাসি। ক’দিন আগেও ফ্রান্সের অষ্টম ডিভিশনে খেলা এই ফুটবলারটিই হয়ে উঠেছেন লেস্টারের মাঝমাঠের ‘প্রাণভোমরা’!

    কান্তে’র মত আড়ালে থেকে লেস্টারের রূপকথার স্ক্রিপ্ট লিখে গেছেন ড্যানি ড্রিঙ্কওয়াটার, শিনজি ওকাজাকি, লিওনার্দো উজ্জোয়া কিংবা মার্ক অলব্রাইটনরা। অন্যদিকে ‘দ্য ব্লু আর্মি’দের গোলপোস্ট রক্ষায় অধিনায়ক মরগ্যানের সাথে ক্রিশ্চিয়ান ফুকস, ড্যানি সিম্পসন এবং রবার্ট হুথরা ছিলেন সদা সজাগ। আর পোস্টের নিচে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় ছিলেন কিংবদন্তি বাবা পিটার স্মাইকেলের সুযোগ্য পুত্র ক্যাসপার স্মাইকেল।

    প্রিমিয়ার লিগের প্রথম নয় ম্যাচের কোনটিতেই ক্লিনশিট রাখতে পারেনি লেস্টার সিটি। কোচ ক্লডিও রানিয়েরি জানতেন গোলপোস্ট রক্ষা না করতে পারলে হাত ফসকে যাবে সকল সম্ভাবনা। দশ নম্বর ম্যাচের আগে ঘোষণা দিলেন, ক্লিনশিট রাখতে পারলেই পিজা খাওয়ানো হবে সবাইকে। ব্যাস, হয়ে গেল ক্লিনশিট! মৌসুমের সর্বোচ্চ ক্লিনশিটের সংখ্যাটা এখন তাঁদের ১৫! রানিয়েরির ‘গোল্ডেন টাচ’ কাজে দিল আরো একবার।

    জয় এসেছে; ইতিমধ্যেই লেখা হয়েছে নতুন এক রুপকথার গল্প। কেউ কেউ বলছেন রুপকথাকেও ছাড়িয়ে গেছে লেস্টারের গল্প। তা হবেই বা না কেন? লেস্টারের ‘সেকেলে’ টাইপের স্ট্রাইকারটাই হয়ে উঠেছেন প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা; গড়েছেন টানা ১১ ম্যাচে গোল দেয়ার রেকর্ড। ফ্রেঞ্চ লিগে সুযোগ না পাওয়া মিডফিল্ডাররাই এখন ইউরোপ সেরাদের তালিকায়। দীর্ঘদেহী শরীরের কারনে খেলার সুযোগ না পাওয়া ডিফেন্ডারটাই এখন রক্ষণভাগের ‘দেয়াল’। আর সেই ফুরিয়ে যাওয়া কোচটাই দিয়ে গেছেন একের পর এক জাদুর স্পর্শ।

    বদলেছে তো লেস্টারের গল্পটাও। আগের মৌসুমেও রেলিগেশনে লড়াই করা দলটাই এবার প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন! তবে অন্যসব চ্যাম্পিয়নদের চেয়ে ভিন্ন এই গল্প। এ গল্পে একদল ব্যর্থ সৈনিকেরাই পোড়া ছাই হতে জেগে উঠেছেন ‘ফিনিক্স’ পাখির মত। ইতিহাসের পাতায় তাই অমলিন হয়ে থাকবে এই কাহিনী। হয়ত, এই গল্প শুনেই আবারো কোন ভার্ডি-মাহারেজরা খুঁজে পাবেন নতুন করে গর্জে উঠার প্রেরণা।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন