• ফ্রেঞ্চ ওপেন ২০১৬
  • " />

     

    ফ্রেঞ্চ ওপেন কি তারকাদের কাছে অভিশাপ?

    রোঁলা গাঁরো কি তবে টেনিস কিংবদন্তীদের জন্য ধাঁধা?

    উত্তর খুঁজে ফেরার আগে চলুন না কিছু পরিসংখ্যান ঘাটাঘাটি করে আসা যাক। ১৯৬৮ সালে ওপেন যুগ শুরু হবার পর ফ্রেঞ্চ ওপেন ২০১৫ পর্যন্ত পুরুষ এককে ২৮ জন চ্যাম্পিয়ন দেখেছে; বাকি গ্রান্ড স্ল্যাম গুলোর চাইতে যেটি সবথেকে বেশি। ফ্রেঞ্চ ওপেন যেন সবসময়ই ফেভারিটদের জন্য একটা গোলকধাঁধা, বাকি তিনটি গ্রান্ড স্ল্যাম কাঁপিয়ে আসার পরও এখানে কেনো যেনো তারারা বারবার হোঁচট খেয়ে যান।

    বাজি ধরে বলতে পারি, রাশিয়ার মারাত সাফিন এর নাম আপনি নিশ্চিতভাবেই শুনেছেন কিন্তু গাস্তন গডিও, হুয়ান কার্লোস ফেরেরো অথবা আলবার্ট কস্তার নাম অনেকের কাছেই অপরিচিত ঠেকতে পারে। সাফিন তো পরে, অনেক বিখ্যাত টেনিস তারকা আছেন যারা রোলা গারোর লাল মাটিতে শিরোপা হাতে উল্লাস করার জন্যে হাপিত্যেশ করে মরেছেন কিন্তু শিরোপা ধরা দেয়নি! আন্দ্রে আগাসির কথাই ধরুন না। ক্যারিয়ারের শুরুতেই উইম্বলডন জিতেছেন, ইউএস ওপেনও জিতেছেন দু'বার; বাকি থাকা অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ছিল তাঁর কাছে ঘরের কোর্টে খেলার মতই, সাফল্যের হার মেলবোর্নের কোর্টেই তাঁর সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ফ্রেঞ্চ ওপেন? ১৫ বার গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল খেলেছেন, কিন্তু শুধু মাটির কোর্ট হিসেব করলে সেই সংখ্যাটা মাত্র তিনে নেমে আসে!

    অথচ মাটির কোর্টে আগাসির সূচনাটা ছিল দুর্দান্ত! ক্যারিয়ারের প্রথম তিনটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনালের দুটিই ছিল মাটির কোর্টে, যদিও একবারও শিরোপায় হাত লাগাতে পারেননি। ১৯৯৯ সালে যখন আবার তিনি ফ্রেঞ্চ ওপেনের ফাইনালে উঠলেন তখন তিনি তার ক্যারিয়ারের একদমই শীর্ষে, কোর্টের বাইরে স্টেফি গ্রাফের সাথে প্রেমটাও ওই বছর দারুণ জমে উঠেছে! কোর্ট আর কোর্টের বাইরে দারুণ সময় কাটানো আগাসির সামনে ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতে ক্যারিয়ার স্ল্যাম অর্জনের হাতছানি। ফাইনালের প্রতিপক্ষ ছিলেন আন্দ্রেই মেদভেদেভ; যেটি ছিল আবার তার ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল! অনভিজ্ঞ সেই মেদভেদেভই ফাইনাল জমিয়ে দিলেন। প্রথম দুই সেট জিতলেন ৬-১, ৬-২ গেমে।

    আগাসির তখন কোন কিছুই ঠিক মত হচ্ছিল না, একের পর একে আনফোর্সড এরর করছিলেন। তবে ফিরে এলেন অবিশ্বাস্যভাবে- পরের তিনটি সেট ৬-৩, ৬-৪, ৬-৩ গেমে জিতে নিয়ে হলেন রোঁলা গাঁরোর নতুন চ্যাম্পিয়ন! শিরোপাটা যে তাঁর কাছে কতোটা আরাধ্য ছিল, জেতার পর চোখের পানিই সেটি বলে দিচ্ছিল! ফ্রেঞ্চ ওপেনের ফাইনাল খেলা আগাসির জন্যে ওটাই শেষ। এরপর অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতেছেন আরো তিনবার; জিতেছেন আরেকটি ইউএস ওপেনও। কিন্তু ফ্রেঞ্চ ওপেনে এসে কোয়ার্টার ফাইনাল বাধাই আর পেরুতে পারেননি। ক্যারিয়ারের শেষ দুই ফ্রেঞ্চ ওপেনে তো বাদ পড়েছেন প্রথম রাউন্ড থেকেই!

     

     

    আগাসি তো তাও শেষমেশ ফ্রেঞ্চ ওপেন জিততে পেরেছিলেন, কিন্তু তাঁর 'রাইভাল' পিট? প্রায় পনের বছরের ক্যারিয়ারে ১৮ বার গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল খেলেছেন এবং হেরেছেন মাত্র চারটিতে! জিতেছেন দুটি অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, ইউএস ওপেন জিতেছেন পাঁচ বার। আর রজার ফেদেরার আসার আগে তো ছিলেন উইম্বলডনের ইতিহাসের তর্কাতীত সেরা। জিতেছেন সাতটি উইম্বলডন। বিস্ময়কর হলেও সত্য এই সাম্প্রাসই ফ্রেঞ্চ ওপেনের ফাইনালে একবারও উঠতে পারেননি। সেরা সাফল্য বলতে ১৯৯৬ সালে সেমিফাইনাল খেলা! লালমাটির কোর্ট সাম্প্রাসের কাছে এতটাই দুর্বোধ্য ছিল যে ১৩ বার অংশ নিয়ে ৯ বারই বাদ পড়েছেন দ্বিতীয় রাউন্ড পেরুনোর আগেই! চৌদ্দবার গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতা সাম্প্রাসের ক্যারিয়ারের এক অন্ধকার অনুচ্ছেদই বলতে হবে ফ্রেঞ্চ ওপেনকে। সাতবার গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতা জন ম্যাকেনরোর কাহিনীটাও এক। ফ্রেঞ্চ ওপেনের ফাইনালে উঠতে পারেননি একবারও! 

     

     

    এখনও খেলছেন এমন খেলোয়াড়দের মধ্যেও তো ফ্রেঞ্চ ওপেন নিয়ে ভয়ানক জুজু কাজ করে। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ছয়বার জেতা হয়ে গেছে, ইউএস ওপেন আর উইম্বলডনও জিতেছেন একাধিকবার। কিন্তু এখনো ফ্রেঞ্চ ওপেন জিততে পারেননি নোভাক জোকোভিচ। গতবারের ফাইনালিস্ট জোকোভিচ হেরে গিয়েছিলেন ভাভরিঙ্কার কাছে, যেটি ছিল আবার ভাভরিঙ্কার প্রথম ফ্রেঞ্চ ওপেন ফাইনাল! 

    তবে রজার ফেদেরারকে আপনি এঁদের কাতারে রাখতে চাইলে বলতে হবে আপনি 'ফেড এক্সপ্রেসের' খেলাই দেখেননি! ফেড ক্যারিয়ারে মাত্র একবার ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতেছেন ঠিক আছে, কিন্তু তিনি ফাইনালও তো খেলেছেন ৫ বার। এর মধ্যে ২০০৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত তো ফ্রেঞ্চ ওপেনের নিয়মই ছিল ফেদেরার-নাদাল ফাইনাল খেলবেন এবং নাদাল জিতবেন! ফেদেরার মাটির কোর্টে ব্যর্থ এটি তাই বলা যায়না, সময়ের সেরা দুইয়ের লড়াইয়ে কাউকেই ছোট কিংবা বড় করে দেখার উপায় নেই। লম্বা সময় ধরে চলা উপভোগ্য ফাইনালগুলোই এটার প্রমাণ।

    সত্যিই কি তবে ফ্রেঞ্চ ওপেন কিংবদন্তীদের জন্য ধাঁধা? ব্যাপারটি নিশ্চিতভাবেই সেরকম নয়। ইভান লেন্ডল যেমন হার্ড কোর্টে খেলে পাঁচটি স্ল্যাম জিতেছেন তেমনি ক্লে কোর্টেও জিতেছেন তিনটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম। অথচ উইম্বলডন একবারও জিতেননি! চৌদ্দবার অংশ নিয়ে সেমিফাইনালের গেরোই মাত্র খুলতে পেরেছেন দুবার। অন্যদিকে বিয়ন বোর্গ, টানা পাঁচবার উইম্বলডন জিতেছেন, ফ্রেঞ্চ ওপেনও জিতেছেন ছয়বার কিন্তু হার্ডকোর্টে চারবার ফাইনাল খেলে চারবারই ব্যর্থ! একইসাথে নাদালের 'ক্যারিয়ার স্লাম' থাকলেও নয়টি ফ্রেঞ্চ ওপেন শিরোপার পাশে তিনটি হার্ডকোর্ট শিরোপাকে 'মাত্র'ই বলতে হয়! 

    ক্লে কোর্টের ব্যাপারটা আসলে কি? তিন ধরণের ক্লে কোর্ট বানানো সম্ভব এবং এদেরকে রঙ দিয়ে খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়। রোঁলা গাঁরোর কোর্ট ইট আর শেলের গুঁড়া দিয়ে তৈরি। মাটির আর্দ্রতাও তাই অন্য যেকোন কোর্টের মাটির চাইতে বেশি। এই কোর্টে বল পড়ার পর বাউন্স হয় বেশি, গতিও কমে যায় অনেক। হার্ড কোর্টের রাজারা সমস্যায় পড়েন আসলে এখানেই।

    মাটির কোর্টের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে এই কোর্টে স্লাইড করা যায়। রাফায়েল নাদালের ভক্তরা এ ব্যাপারটির সাথে নিশ্চিতভাবেই পরিচিত হয়ে থাকবেন! সাম্প্রাস, ম্যাকেনরোর শিরোপা শূন্য থাকাটা তাই 'কুফা' নয়, এটি নিঃসন্দেহে টেকনিকের ঘাটতি। আজকের যুগে ফেদেরার, নাদাল কিংবা জোকোভিচদের সবধরণের কোর্টে রাজত্ব করতে দেখাটা এজন্যেই এযুগের টেনিসপ্রেমীদের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। এই তিনজনের আগে কেউই সব ধরণের কোর্টে রাজত্ব করতে পারেননি, প্রায় নিশ্চিতভাবে এটাও বলা যায় - একই সময়ে এত কিংবদন্তীর আবির্ভাবও ভবিষ্যতে ঘটবে না।

    আপাতত ইতিহাস এখানেই বাদ দিন। এর চাইতে টেনিসের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকুন। জোকোভিচ কি পারবেন এবার ক্যারিয়ার স্ল্যাম পূর্ণ করতে? নাকি রোম মাস্টার্সে জোকোভিচকে হারানো মারে এবার জিতবেন শিরোপা? জোকোভিচের সামনে এবার অনন্য অর্জনের হাতছানি। এটি অলিম্পিকের বছর, ফ্রেঞ্চ ওপেন জিতে ক্যারিয়ার স্ল্যাম পূর্ণ করতে পারলে তার সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাবে 'ক্যালেন্ডার স্ল্যাম'-র স্বপ্নটাও।

    ওহ, নাদাল-ফেদেরার এঁদের কিন্তু আবার বাতিলের খাতায় ফেলবেন না! বয়স চৌত্রিশ হলেও ফেদেরারের র‍্যাকেটের সামনে বিশের উন্মত্ততা আজো হার মানে। আর নাদালের সামনে তো এবার একটি নির্দিষ্ট গ্র্যান্ড স্ল্যামে শিরোপা সংখ্যা দুই অংকে নিয়ে যাবার হাতছানি! আজকেই শুরু হয়েছে রোঁলা গাঁরোর কোয়ালিফাইয়িং রাউন্ড, মূল পর্ব ২১ তারিখ থেকে। এবারের ফ্রেঞ্চ ওপেন কার জন্যে কি লিখে রেখেছে, সেটার উত্তর নাহয় জুনের পাঁচ তারিখের হাতেই তোলা থাকল।         

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন