• ইউরো
  • " />

     

    ইউরোর ব্যবচ্ছেদ- গ্রুপ 'এ'

    ইউরো শুরু হতে বাকী আর মাত্র কয়েকদিন! প্রথমবারের মতো ২৪ টি দেশ নিয়ে শুরু হতে যাওয়া  ইউরোর প্রতিটি গ্রুপের দলগুলো নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী এই লেখা  আজ থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হবে  'প্যাভিলিয়নে '।
    গ্রুপ 'এ' তে স্বাগতিক ফ্রান্স ছাড়াও রয়েছে সুইজারল্যান্ড, রোমানিয়া ও আলবেনিয়া। এক নজরে গ্রুপ 'এ' এর হালচাল...


    ফ্রান্সঃ

    করিম বেনজেমার দলে জায়গা না পাওয়াটাই ফ্রান্স দলের সবচেয়ে বড় চমক। তবে আক্রমণভাগে মারশিয়াল, গ্রিজম্যান, পায়েটদের মতো খেলোয়াড় থাকায় বেনজেমার অনুপস্থিতি দলের পারফরম্যান্সে ফেলার সম্ভবনা ক্ষীণই। উল্টো ফ্রান্সের আক্রমণভাগকে গোটা ইউরোর অন্যতম সেরা বললেও হয়ত ভুল বলা হবে না।

    গ্রিজম্যান আর জিরুর সাথে আক্রমণভাগের তৃতীয় স্থান নিয়ে লড়াইটা বেশ ভালো জমতে পারে মারশিয়াল ও দিমিত্রি পায়েটের মধ্যে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের এই দুই খেলোয়াড় পুরো মৌসুম জুড়েই নিজেদের দলের হয়ে দারুণ খেলেছেন। ধারালো আক্রমণভাগের সাথে মাঝমাঠে আছেন পগবা। সিরি আতে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের পাশাপাশি গত দুই মৌসুমেই দলকে জিতিয়েছেন 'ডাবল'। ২৩ বছর ব্যসী এই মিডফিল্ডারের ওপর ফ্রান্স দলের ভাগ্যটাও নির্ভর করছে অনেকখানি। মাতুইদি, সিসোকোর, স্নাইডারলিনের সাথে  লেস্টার সিটিকে প্রিমিয়ার লিগ জেতাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা কান্তেও আছেন মাঝমাঠে।

    ২০০০ সালের ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে গোল্ডেন গোলে জেতা ওই ইউরোর পর নিজেদের মাটিতে শিরোপা পুনুরুদ্ধারে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় বাধা আসলে তাদের রক্ষণভাগ।  ইনজুরির কারণে রাফায়েল ভারানের দল থেকে বাদ পড়াটাই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ দেশমের জন্য।

    রোড টু ইউরো

    স্বাগতিক দেশ হিসেবে সরাসরি এবারের ইউরোতে জায়গা করে নিয়েছে ফ্রান্স। বাছাইপর্বে নিজেদের ম্যাচ গুলো হোম-অ্যাওয়ে ভিত্তিতে ফ্রেন্ডলি ম্যাচ হিসেবেই খেলেছে দু’বারের ইউরো জয়ীরা। বাছাইপর্বের ম্যাচগুলোর মধ্যে পর্তুগালের বিপক্ষে দুই জয় পেলেও আলবেনিয়ার বিপক্ষে ড্র এবং হারের স্মৃতি পিছু ছাড়ছে না এখনই! 'এ' গ্রুপে ফ্রান্সের সাথে আছে আলবেনিয়াও।

    ডাগ আউটের বস

    ষোল বছর পর ইউরো জয়ের জন্য ২০০০ সালের ইউরো জয়ী ফ্রান্স দলের অধিনায়ক দিদিয়ের দেশমের দিকেই আসলে তাকিয়ে আছে গোটা ফ্রান্স। বেনজেমাকে বাদ দেয়ার মতো কঠোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও তাই প্রতিবাদ নেই তেমন! যিনি বিশ্বজয়ী করেছিলেন দেশকে তাঁর হাত ধরেই আরও একবার ইউরো জয়ের স্বপ্ন বুনছে ফ্রেঞ্চরা। নিজেদের মাটিতে শেষবার ইউরো জেতা দলটির নামও ফ্রান্স (১৯৮৪)!


    ৪-৩-৩ দেশমের পছন্দের ফরমেশন। অবশ্য চার-চার-দুই আর ৪-৩-২-১ এও দলকে সাজিয়েছিলেন বেশ কিছু ম্যাচে। তবে ফলপ্রসূ না হওয়ায় ফিরে গেছেন নিজের পুরনো কৌশলেই।  পায়ে বল রেখে আক্রমন সাজানো ফ্রান্স দলের বৈশিষ্টই বলা যায়। সেক্ষেত্রে প্রায় প্রতিটি জায়গায়ই দেশমের কাছে রয়েছে একাধিক মানসম্পন্ন খেলোয়াড়। তরুণ হলেও তাই দলের শক্তিমতত্ত্বা ইউরো জয়ের জন্য লড়াই করার মতোই।

    তারকা খেলোয়াড়

    জুভেন্টাসের পল পগবা ও আন্টোয়ান গ্রিজম্যানের ওপরই আলাদা করে আলো থাকবে এই ইউরোতে। জুভেন্টাসকে এই মৌসুমে ‘ডাবল’ জেতাতে সাহায্য করা পগবা ও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে খেলা গ্রিজম্যানের ওপরই নির্ভর করছে ফ্রান্সের সাফল্য ব্যর্থতার অনেকটুকুই।


    সুইজারল্যান্ডঃ

    জের্ডান শাকিরি, শাকা, লিচস্টেইনার, রিকার্ডো রদ্রিগেজদের মতো খেলোয়াড় নিয়ে গড়া সুইজারল্যান্ড দল স্বপ্ন দেখছে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নক আউট স্টেজে জায়গা করে নেওয়ার। আর তা করে দেখাতে কোচ ভ্লাদিমির পেটকোভিচের হাতে রয়েছে বেশ কিছু তরুণ খেলোয়াড়ও। ১৯ বছর বয়সী বাসেল স্ট্রাইকার ব্রিল এম্বোলোকে নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল ইউরো শুরু আগে। তবে সুইসদের জন্য সুসংবাদ হল ইউরোর ২৩ সদস্যের দলে জায়গা করে নিয়েছেন তিনিও। সুইস এই স্ট্রাইকার সহ আরও দু'জন ১৯ বছর বয়সী খেলোয়াড় রয়েছেন দলটিতে।

    তবে সুইজারল্যান্ডের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা গোকান ইনলারকে মাঝমাঠে পাচ্ছেন না কোচ পেটকোভিচ। ইনজুরির কারণে দল এবারের ইউরো থেকে ছিটকে পড়েছেন লেস্টার সিটির এই মিডফিল্ডার।

    রোড টু ইউরো

    বাছাইপর্বে ইংল্যান্ডের গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে সরাসরি ইউরোতে জায়গা করে নিয়েছে সুইজারল্যান্ড।  বিশ্বকাপে দশবার জায়গা করে নিলেও ইউরোতে এই নিয়ে মাত্র চতুর্থবারের মতো খেলতে যাচ্ছে তারা।

    টাচ লাইনের বস

    গত ছয় ম্যাচের ৫ টিতেই দলকে ৪-৩-৩ ফরমেশনে খেলিয়েছেন পেটকোভিচ। আক্রমণভাগে দুই উইঙ্গারের সাথে থাকবেন হারিস সাফেরোভিচ অথবা ইরেন ডেরডিয়কের মধ্যে যে কোন একজন। লিগে গোল খরায় ভোগা এই দুই স্ট্রাইকারের মাঝে কাকে বেছে নেন কোচ সেটা অবশ্য রহস্যই থেকে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে স্ট্রাইকার এম্বোলোই হতে পারেন কোচের ট্রাম্পকার্ড।

    তারকা খেলোয়াড়



    শাকিরি নন এবারের ইউরোতে সুইজারল্যান্ড দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় সুইস অধিনায়ক গ্রানিত শাকা। ক’দিন আগে আর্সেনালে নাম লেখানো এই মিডফিল্ডার এরই মাঝে হোল্ডিং মিডফিল্ড পজিশনে নিজের জাত চিনিয়েছেন। সুইজারল্যান্ড দলে অবশ্য আরেকটু সামনে এগিয়ে ‘নাম্বার টেন’ পজিশনে খেলেন সাবেক মশেনগ্লাডবাখ অধিনায়ক। দল ও ক্লাবে অধিনায়কত্ব করায় সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দানের ক্ষমতাটাও আছে শাকার।


    রোমানিয়াঃ

    দলে ইউরোপ মাতানো তেমন নামকরা খেলোয়াড় নেই। তবে এই দলটিই সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে 'এ' গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানের লড়াইয়ে। রোমানিয়া-সুইজারল্যান্ডের ম্যাচটির গুরুত্ব ইউরো শুরুর আগেই তাই আঁচ করা যাচ্ছে।

    দলে রয়েছেন নাপোলির ভ্লাদ চিলিচেস, বোগদান স্টানচু, গাব্রিয়েল তোর্হের মতো খেলোয়াড়েরা। এঁদের মধ্যে অবশ্য চিলিচেস নামটাই বেশি শোনার কথা; স্পার্সের হয়ে দুই মৌসুম ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন এই ডিফেন্ডার।


    রোড টু ইউরো

    বাছাইপর্বে বেশ সহজ গ্রুপেই পড়েছিল এই নিয়ে চতুর্থবারের মতো ইউরোতে অংশ নেয়া রোমানিয়া। গ্রুপে দ্বিতীয় হয়ে ইউরোতে জায়গা করে নিয়েছে ফিফা র‍্যাংকিং এ ১৯ নম্বর দলটি। বাছাইপর্বে বাকী সব দলের চেয়ে রক্ষণটা ভালো সামলেছে রোমানিয়া।  ১০ ম্যাচে মাত্র দুই গোল হজম করে এবারের ইউরো বাছাইপর্বের সবচেয়ে কম গোল খাওয়ার করার রেকর্ডটিও তাদের।

    টাচ লাইনের বস

    তৃতীয় দফায় জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে দলকে নিয়ে এসেছেন এবারের ইউরোর মূল পর্বে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে প্রথম দফায়ই রোমানিয়াকে শেষ আটে উঠিয়ে চমক দেখিয়েছিলেন। স্বর্নালী সময় পেছনে ফেলে আসা রোমানিয়া দলকে ২০০০ সালের পর আবারও ইউরোতে ফিরিয়ে এনেছেন ইয়র্দানেস্কু।

    বাছাইপর্বে রোমানিয়ার ডিফেন্সিভ রেকর্ডই প্রমাণ করে এই দলের মূল শক্তি রক্ষণভাগেই। আক্রমণভাগে সাধারণত একজন স্ট্রাইকারই পছন্দ কোচের। রক্ষণ শক্তিশালী হলেও আক্রমণভাগে রোমানিয়ার দুর্বলতা স্পষ্ট। বাছাইপর্বে ৪৮০ মিনিট কোন গোলের দেখা না পাওয়াটা তারই প্রমাণ।  

    তারকা খেলোয়াড়

     

    নাপোলির ডিফেন্ডার চিরিচেসই দলের মূল তারকা। রক্ষণই যেহেতু রোমানিয়া দলের শক্তি তাই দায়িত্বের ভারটাও বেশি ডিফেন্ডারদের ওপরই। টটেনহ্যাম ছেড়ে গত মৌসুমে নাপোলিতে যোগ দিয়ে অবশ্য খুব একটা ম্যাচ খেলার সুযোগ হয় নি চিরিচেসের। তবে জাতীয় দলের হয়ে বরাবরই উজ্জ্বল এই ডিফেন্ডার।

    আলবেনিয়াঃ

    ইউরোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে আলবেনিয়া। দলে তেমন কোন চমক নেই। ইউরো বাছাইপর্বে নিয়মিত দলে থাকা প্রায় সবাই জায়গা পেয়েছেন আলবেনিয়ার ‘ঐতিহাসিক’ এই ইউরো স্কোয়াডে।  

    রোড টু ইউরো

     

    বাছাইপর্বে পর্তুগালকে হারিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল আলবেনিয়া। ওই গ্রুপে ডেনমার্ক, সার্বিয়াকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় হয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নেয় বলকান দেশটি। লিসবনে পর্তুগালকে হারিয়ে দেয়া ছাড়াও, দুই লেগেই ডেনমার্কের বিপক্ষে ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছিল ডি বিয়াসির দল। বেলগ্রেডে সার্বিয়ার সাথে বাছাইপর্বের গুরুত্বপুর্ণ ম্যাচে কসোভোর পতাকা নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় পন্ড হয়ে যাওয়া ম্যাচ কোর্টের রায়ে ৩-০ গোলে জিতেছিল তারা। এই গ্রুপ থেকে পর্তুগালের পর সরাসরি জায়গা করে নিয়ে সবাইকে চমকে দেয় আলবেনিয়া।   

    টাচ লাইনের বস

    ইতালিয়ান কোচ জিওভান্নি ডি বিয়াসি দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ২০১১ সালে। বেশ কিছু অভিজ্ঞ  খেলোয়াড়ের অবসরের পর আলবেনিয়া দলে ছিলনা তেমন ভারসাম্য। ইউরোতে জায়গা করে নেয়ার চেয়ে দল গঠনেই বেশি মনোযোগী হন কোচ। ফলটাও আসে হাতে নাতেই। সেই দলকে নিয়েই আলবেনিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দলকে ইউরোতে নিয়ে যান ডি বিয়াসি। উপহারস্বরুপ আলবেনিয়া সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়াও আলবেনিয়ার নাগরিত্বও দেয়া হয় বিয়াসিকে। 

    1
                

    ইউরো বাছাই পর্বে চার-চার-দুই ফরমেশনে বদলে ৪-৩-৩ এ খেলান দলকে খেলান শুরু ইতালিয়ান কোচ। বল দখলে পিছিয়ে থাকলে দলের কৌশল বদলে ৪-৫-১ ফরমেশনে খেলাতে পছন্দ করেন ডি বিয়াসি। আর তাঁর এই সিদ্ধান্তই বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ণ ম্যাচে জয় এনে দিয়েছে আলবেনিয়াকে। কোচের সিদ্ধান্ত গুলোয় মাঠে টনিকের মতো না হলে অমন অখ্যাত দল ইউরোতে জায়গা করে নেয় কি করে!

    তারকা খেলোয়াড়

    বাকী ছোট দলগুলোর মতোই আলবেনিয়ার শক্তিও তাদের রক্ষণে। ৩২ বছর বয়সী ডিফেন্ডার ও দলের অধিনায়ক লরিন ক্যানাই আসলে দলের সবচেয়ে বড় তারকা। আলবেনিয়ার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এই সেন্ট্রাল ব্যাক এক মৌসুম ছিলেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল সান্ডারল্যান্ডেও। পিএসজির তরুন দল থেকে উঠে আসা এই ডিফেন্ডারের লাতসিও, গালাতাসারেই মতো দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। স্বাগতিক ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটা পালন করতে হবে তাঁকেই।   

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন