• " />

     

    "মানুষ" আলী, "দেবতা" আলী

    ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারির এক রোদ ঝলমলে দিন। বিমান থেকে বাইরে উঁকি দিয়ে মুশকো লোকটার মুখে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। লোকটার চোখে মানানসই একটা রোদচশমা। সেটি কতটা তিন দিন আগে লিওনে স্পিংসের কাছে হেরে যাওয়ার ক্ষত আড়াল করতে, আর কতটা বাংলাদেশের তাঁতানো রোদ থেকে বাঁচতে, বলা কঠিন। বাইরে তখন আক্ষরিক অর্থেই অগুনতি মানুষ লোকটার নাম ধরে চেঁচাচ্ছে। অনেকেই নিয়ে এসেছিল পোস্টার। দুর্বোধ্য ভাষাটা না বুঝলেও লোকটার বুঝতে কষ্ট হলো না, স্লোগানটা তাঁর নাম ধরেই হচ্ছে। সেদিন ঢাকার বিমানবন্দরে কত লোক এসেছিলেন? অনেকের মতে, বিমানবন্দর থেকে হোটেল পর্যন্ত তাঁকে দেখার জন্য ২০ লাখ লোক জড়ো হয়েছিল। ২০ লাখ লোক! একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে না? মানুষটা যখন মোহাম্মদ আলী, সেই সংখ্যাটা আসলে খুব বেশি নয়!

     

    বাংলাদেশ তখন একটা ক্রান্তিকাল পার করছে। যুদ্ধের ক্ষত তখনো পুরোপুরি শুকোয়নি, রাজনীতির মানচিত্রে প্রতিনিয়ত নতুন করে চলছে কাটাছেঁড়া। মাত্রই হামাগুড়ি দিতে শুরু করে দেশটির জন্য মোহাম্মদ আলীর মতো একজনের সফর ছিল অবিশ্বাস জাগানোর মতো। মোহাম্মদ আলী! সনি লিস্টনকে ধরাশায়ী করে ফেলা সেই মোহাম্মদ আলী! রাম্বল অব দ্য জাঙ্গলে জর্জ ফোরম্যানকে হারিয়ে দেওয়া সেই মোহাম্মদ আলী! থ্রিলা ইন ম্যানিলায় জো ফ্রেজিয়ারকে নাকাল করা সেই আলী!  ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করে তোলপাড় ফেলে দেওয়া সেই লোক! ক্যাসিয়াস ক্লে নামটা বদলে ফেলেছেন আরও আগে। ফর্মের তুঙ্গে থেকেও বক্সিং রিং থেকে তিন বছরের জন্য একরকম নির্বাসনও ততক্ষণে হয়ে গেছে। এরপর ফিরে হেভিওয়েট বক্সিংয়ের শিরোপাও জিতেছেন আবার। আলী মানে তখন অন্যরকম একটা উন্মাদনা, আলী নামটাই যেন জ্বলন্ত একটা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। সেই আগুনের টানেই লাখ লাখ মানুষ এসেছিল পুরাতন এয়ারপোর্টে। আলীর মতো একজন মহাতারকা বাংলাদেশে এসেছেন, সেটা তো ভাবনারই অতীত।

     

    প্রথম সংবাদ সম্মেলন বিমানবন্দরেই হলো। চোখের সামনে মহানায়ককে দেখার ঘোর-বিস্ময়-ধাক্কা থেকেই হয়তো, সাংবাদিকেরাও “সকালে নাস্তার সময় আস্ত গরু বা খাসি খান কিনা” জাতীয় উদ্ভট সব প্রশ্নও করে ফেললেন। আলী সেসবের কিছুই বুঝতে পারেননি, তবে বুঝেছিলেন এই দেশে তাঁর স্থান অন্য জায়গায়, একদম মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি। নইলে “আমেরিকা থেকে কোনোদিন যদি তাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমার দ্বিতীয় ঠিকানা আমি পেয়ে গেছি''-র মতো কথা বাংলাদেশে এসে নিশ্চয় বলতেন না!

     

    পরদিন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম লোকে লোকারণ্য। মোহাম্মদ আলীকে একনজর দেখার জন্য তিল ধারণের ঠাঁই নেই। পরে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো পল্টনে। সেখানে নতুন বক্সিং স্টেডিয়ামের নাম রাখা হলো তাঁর নামে। আলী আসবেন, আর বক্সিং রিংয়ে তাঁর বিখ্যাত সেই লেফট হুক বা রাইট পাঞ্চের দুয়েকটি দেখা যাবে না, সেটা কী হয়? কিন্তু আলী জানিয়ে দিলেন, কোনো পেশাদার বক্সারের সঙ্গে লড়বেন না। রিংয়ে নামার সৌভাগ্য হলো গিয়াসউদ্দিন নামে এক আনকোরা কিশোরের। বক্সিং রিংয়ে সেই মৌমাছির মতো উড়ে চলা কিংবদন্তীকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হলো বাংলাদেশীদের। গিয়াসের একটা ঘুষিতে যেন পড়েও গেলেন রিংয়ে। দর্শকসারি থেকে উঠলো উল্লাসের হুল্লোড়। আলীর মুখের মুচকি হাসিটা কি তখন কেউ দেখেছিলেন ? কেউ দেখেনি, কখন অলক্ষ্যে একটা গোটা জাতির হৃদয় নিজের গ্লাভসের ভেতর পুরে ফেলেছেন মহানায়ক। সম্মানসূচক বাংলাদেশি নাগরিকত্ব আলীর পরেও আরও কয়েকজনকে দেওয়া হয়েছে। সামনেও হবে। কিন্তু আলীর মতো ক'জন একটা লাল-সবুজ পতাকা হৃদমাঝারে নিয়ে দেশে ফিরে গেছেন?

     

    খুব সম্ভবত মোহাম্মদ আলী এই কারণেই বাকিদের চেয়ে আলাদা। তাঁর নিজের ভাষায়, আমি গ্রেটেস্ট নই, ডাবল গ্রেটেস্ট। নিজেকে আকাশছোঁয়া উচ্চতায় নিয়ে গিয়েও তাই মানুষের খুব কাছের। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবার অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করল, তখন আলী স্পষ্ট করেই তাঁর অক্ষমতা জানিয়ে দিলেন। সে সময় যা বলেছিলেন, সেটা ঠাঁই পেয়ে গেছেন ইতিহাসের পাতায়।

     

    “কেন ওরা আমাকে ইউনিফর্ম পরে ১০ হাজার মাইল দূরের ভিয়েতনামে গিয়ে বোমা ফেলতে বলল? অথচ লুইসভিলে তথাকথিত সেই কালোদের সঙ্গেই তো কুকুরের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। আমি দেশ থেকে ১০ হাজার মাইল দূরের কোনো নিরীহ দেশকে ধ্বংস করতে যাচ্ছি না। আমি জানি, সাদাদের বাকি বিশ্বের ওপর রাজত্ব কায়েমের চেষ্টা ছাড়া এটা আর কিছুই নয়। এই নারকীয়তা কোনোভাবেই চলতে দেওয়া যায় না। আমাকে অনেকবারই বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে আমি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার হারাতে পারি। কিন্তু আমি আগেই বলেছি এখনো বলছি, আমাদের আসল শত্রু এখানেই।  বিচার, স্বাধীনতা আর সমতার জন্য যারা লড়ছে, তাদেরকে বন্দি করার জন্য আমি নিজের ধর্ম, মানুষ বা নিজেকে অপমান করতে পারি না। আমাকে যদি বলত, এই যুদ্ধের পর আমাদের আড়াই কোটি মানুষের বৈষম্য ঘুচবে, তাহলে আমি যোগ দিতে এতটুকু দ্বিধা করতাম না। নিজের বিশ্বাস রক্ষার জন্য আমার তো হারানোর কিছু নেই। আমাকে বলা হচ্ছে আমি নাকি কারাগারে যেতে পারি। আরে, ৪০০ বছর ধরেই তো আমরা কারাগারে বন্দি আছি! ”

     

    রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়িয়ে সংশপ্তকের মতো এমন বলিষ্ঠ উচ্চারণ কে করতে পেরেছে? অস্বীকৃতির জন্য কম মূল্য তো দিতে হয়নি। জেলে যাওয়ার ভয় দেখানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যেতে হয়নি, কিন্তু অনেক কিছুই হারাতে হয়েছে। তিন বছর রিংয়ে নামতে পারেননি। কোটি টাকার প্রলোভন, বিজ্ঞাপনের দেদার টাকা- সব উপেক্ষা করেছেন। একটা সময় ভেবেছিলেন গ্লাভসজোড়া বোধ হয় আর কখনো হাতে গলা হবে না। কিন্তু পরে আবার ঠিকই ফিরেছেন রাজার বেশে, আবার সেই মৌমাছির নাচন দেখেছে বিশ্ব।

     

    রসবোধ ছিল তাঁর দুর্দান্ত। বক্সিং রিংয়ে নামার আগেই ফোটাতে থাকতেন কথার হুল। পাঞ্চ, জ্যবা বা হুকের চেয়ে সেই হুলে বিষ খুব একটা কম ছিল না । রাম্বল ইন দ্য জাঙ্গলে যেমন জর্জ ফোরম্যানকে শুরু থেকেই বলতে থাকেন, “ফোরম্যানকে আমি শ্যাডো বক্সিং করতে দেখেছিলাম। ছায়াটাই জিতেছিল।” থ্রিলা ইন ম্যানিলার সময় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী জো ফ্রেজিয়ারকে যেমন তাঁতিয়ে দিয়েছিলেন, “ফ্রেজিয়ার দেখতে এতোটাই কুৎসিত, ও কাঁদলেও চোখের জল ঘৃণায় মাথার পেছন দিকে চলে যায়।” “কাল রাতে আমি এতটাই দ্রুত ছিলাম, হোটেল রুমে বাতির সুইচ বন্ধ করার পর আলো নিভে যাওয়ার আগেই বিছানায় পৌঁছে গেলাম” - এমন কথা বোধ হয় শুধু আলীর পক্ষেই বলা সম্ভব!
     

    বিমানে উড়তে শুরু দিকে বেশ ভয় পেতেন। একবার যেমন সিট বেল্ট না বেঁধেই চড়ে বসেছিলেন। ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট বার বার অনুরোধ করার পর ভুরু কুঁচকে বলেছলেন, “সুপারম্যানদের সিট বেল্ট বাঁধা লাগে না।” ওই সুরসিকা বিমানবালাও নাকি পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন, “সুপারম্যানদের তো বিমানেও চড়তে হয় না। ওই দফায় হার আলির হার স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না!

     

    এই ভুল স্বীকার করে নেওয়ার ব্যাপারটাই আলীকে আরও বেশি রক্ত-মাংসের মানুষ করে তুলেছে। বার বার করে বুঝিয়েছে, দূর আকাশের তারা নন, আলী আর সবার মতোই। ১৯৬৪ সালে খ্রিস্টধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে নেশনস অব ইসলামে যোগ দিয়েছিলেন। ক্যাসিয়াস ক্লে তখনই নাম পালটে মোহাম্মদ আলী হয়ে যান। ওই সময় কৃষ্ণাঙ্গ নেতা ম্যালকম এক্স এর সাথে দারুণ ঘনিষ্ঠতা আলীর। পরিচয় হলো নেশনস অব দ্য ইসলামের নেতা এলাইজাহ মুহাম্মদের সঙ্গে। মোহাম্মদ আলী নামটা তাঁরই দেওয়া। শ্বেতাঙ্গদের প্রতি আলির তখন তীব্র ঘৃণা। “বক্সিং রিং হচ্ছে এমন একটা জায়গা যেখানে দুজন কালো মানুষ লড়াই করে আর সাদারা বসে তালি দেয়”- এমন কথাও বলেছিলেন।


    কিন্তু একটা সময় গিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন, বুকের ভেতর ঘৃণার খান্ডবদাহন নিয়ে থাকা যায় না। একটু একটু করে নেশনস অব ইসলামের কাঁটাভরা পথ থেকে সরে এলেন। ১৯৭৫ সালে সুন্নি ইসলামেই দীক্ষিত হলেন। সেই বিশ্বাস বয়ে বেরিয়েছেন আমৃত্যু। কিন্তু ওই দীর্ঘ দশ বছর ভুল বিশ্বাসের গরল পান করার জন্য পরে অনেকবারই আফসোস করেছেন, ক্ষমাও চেয়েছেন।

     

    কিন্তু সেই বিশ্বাসের ভাইরাস তো আলীর মধ্যে একদিনে বোনা হয়নি। আলির জননী যেমন তাঁর শৈশবের একটা ঘটনা বলছিলেন, “ক্যাসিয়াস তখন খুব ছোট। আমরা ডাউনটাউনে একটা দোকানে গিয়েছিলাম। সে এক গ্লাস পানি চেয়েছিল, কিন্তু গায়ের রঙের কারণে ওরা সেটা দেয়নি। সে বড় একটা ধাক্কা খেয়েছিল। কান্না শুরু করে দিয়েছিল।” এর পর ১৮ বছর বয়সে রোম থেকে অলিম্পিকের সোনা জিতে বাড়ি ফিরলেন। ক্লে তখন নিজেকে কল্পনা করে নিয়েছেন জাতীয় বীর হিসেবে। কিন্তু একটা ঘটনায় সেই স্বপ্নরাজ্য ভেঙে খান খান হয়ে গেল। বন্ধুকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিলেন। কিন্তু গায়ের রঙের জন্য তাঁর অর্ডারই নেওয়া হয়নি। পরে রাগ করে অলিম্পিকের পদকটা ওহাইও নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন বলে গুজব শোনা যেতো! পরে অবশ্য জানা গেছে, পদকটি চুরি গিয়েছিলো। নিজের গাত্রবর্ণ নিয়ে যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল, সেটির বিস্ফোরণ এরপর আরো অনেকভাবেই হয়েছে। কালো মানুষদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে আলীই ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে সোচ্চার কন্ঠস্বর।

     

    সিয়াটলে ফাইটার অব দ্য সেঞ্চুরির পদক নেওয়ার জন্য একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। সেখানে এক বক্সার একটু ইতস্তত করে এসে বসলেন আলীর পাশে। দ্বিধা নিয়ে বললেন, “জানেন, সত্যি কথা হচ্ছে রিংয়ে নামার সময় আমি খুব নার্ভাস থাকি। তখন আমি মনে মনে বলি, আমি মোহাম্মদ আলী, আমি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। কেউ আমাকে হারাতে পারবে না।” মুচকি হেসে আলী বললেন, “রিংয়ে নামার সময় আমিও তাই বলি।”

     

    আলী নামটাই যেন একটা ম্যাজিক,যেন উত্তাল সমুদ্রে দূরের বাতিঘর। যাঁর পারকিনসন্স রোগাক্রান্ত কম্পমান হাতে অলিম্পিকের শিখা ছড়ায় প্রেরণার আলো। যাঁর নামটাই যুগে যুগে কাজ করে যাচ্ছে একটা টনিকের মতো। যিনি সবসময় মনে করিয়ে দেন, হারার আগে হার মানা যাবে না, হোঁচট খাওয়া মানে থেমে যাওয়া নয়। যাঁর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, নিজের নীতি-আদর্শ রক্ষার জন্য হাসতে হাসতে জাগতিক সবকিছু তুচ্ছ করা যায়। আলী বলেই তিনি দেবতাতুল্য হয়েও আমাদেরই মতো রক্তমাংসের মানুষ।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন