• " />

     

    দুয়ো শুনেও ফিরেছেন যাঁরা...

    যেতে নাহি দেব হায়, তবু যেতে দিতে হয়... ক্লাব ফুটবল সমর্থকদের প্রায়ই এমন অমোঘ সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কখনো সমর্থকদের ভালোবাসা উপেক্ষা করে অন্য ক্লাবে পাড়ি জমান প্রিয় খেলোয়াড়। তাদের কেউ কেউ আবার পরিণত হয়েছেন সমর্থকদের চক্ষুশূলে। কী অদ্ভুত, তাদেরই কেউ আবার সেই ভালোবাসার টানে ফিরেছেন পুরনো ঠিকানাতেই। মাত্র এক মৌসুম আগেও যে মারিও গোটজে ডর্টমুন্ড সমর্থকদের কাছ থেকে দুয়ো শুনলেন, তিনিই যেমন আবার ফিরলেন সেই ডর্টমুন্ডেই। শুধু গোটজে নয়, সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে আরও বেশ কয়েকজনের।

     

    ১) হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন (এস্তুদিয়ান্তেস)

    আধুনিক আর্জেন্টিনার অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার ভেরনের ক্যরিয়ারটা শুরু হয়েছিল স্বদেশী এস্তুদিয়ান্তেসেই। দু’বছর পর ইউরোপে পাড়ি জমান ‘ছোট ডাইনি’ খ্যাত এই মিডফিল্ডার। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত সহজে মেনে নিতে পারেননি এস্তুদিয়ান্তেস সমর্থকেরা। যদিও, যাবার সময় তার বিদায়ী চিঠিতে ইউরোপের রাঘব-বোয়ালদের মাঝে নিজেকে প্রমাণ করাটাকেই মূল কারণ হিসেবে দর্শান ভেরন। ফিরে আসার কথাও বলে যান নিজ শহরের সমর্থকদের। সাম্পদোরিয়া, লাজিও, পারমা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, ইন্টার মিলান খেলার পর ২০০৬-০৭ সালে প্রস্তাব ছিল বোকা জুনিয়র্স, রিভার প্লেট থেকে।  কিন্তু নাড়ির টানে ৩২ বছর বয়সে সেই এস্তুদিয়ান্তেসেই ফিরে আসেন ভেরন ।

     


    ফিরে এসেই দলকে সুদীর্ঘ ২৩ বছর পর জেতান আর্জেন্টাইন লিগ। ২০০৭ সালে ডিসি ইউনাইটেডের প্রেসিডেন্ট কেভিন পেইনের লোভনীয় প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে নিজ দেশেই থেকে যান ভেরন। এস্তুদিয়ান্তেস সমর্থকেরা ততদিনে আগের সেই বিদ্বেষ ঝেড়ে ফেলেছেন। ভেরনও মাঠে এই ফিরে পাওয়া ভালবাসার প্রতিদান দিতে থাকেন। দলের হয়ে ২০০৯ সালে জেতেন কোপা লিবার্তোদোরেস। ২০০৮ এবং ২০০৯-এ লাতিন আমেরিকার সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হন টেকো মাথার এই মিডফিল্ড জেনারেল। এরপর আর্জেন্টিনারই আরেক ক্লাব ব্রান্ডসেনে এক মৌসুম কাটিয়ে আবারো ফিরে আসেন এস্তুদিয়ান্তেসে।

     

    ২) টেডি শেরিংহাম (টটেনহ্যাম স্পার্স)

    ’৯৯ এর ট্রেবলজয়ী ইউনাইটেড দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় শেরিংহাম একজন ‘স্পার্স’ কিংবদন্তী। প্রিমিয়ার লিগ নামকরণের পর প্রথম মৌসুমেই হয়েছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। ৯৩-৯৪ মৌসুমে ইনজুরির কারণে মাত্র ১৯ ম্যাচ খেলেও ১৪ বার লক্ষ্যভেদ করেন শেরিংহাম।

    ৯০-এর দশকে স্পার্স সমর্থকদের অন্যতম প্রিয়মুখ এই শেরিংহাম গোলের পর গোল করলেও দলের হয়ে কিছুই জিততে পারছিলেন না। একাধিকবার বড় ক্লাবের লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রস্তাব আর ফেরাতে পারেননি ‘শেরি’। যোগ দেন স্যার অ্যালেক্সের দলে। শিরোপার জন্য দলকে ছেড়ে চলে যাওয়াতে স্পার্স সমর্থকদের চক্ষুশূলে পরিণত খুব একটা সময় লাগেনি এই ইংলিশ স্ট্রাইকারের। এরপর থেকে স্পার্স-ইউনাইটেড খেলায় শেরিংহামের পায়ে বল যাওয়া মানেই ছিল স্পার্স সমর্থকদের জোরালো দুয়ো। নিজের এককালীন সমর্থকদের দুয়ো পেলেও যে উদ্দেশ্যে ইউনাইটেডে এসেছিলেন তিনি, সেই ‘শিরোপা খরা’ ঘুচিয়েছেন। সফল চার চারটি মৌসুম কাটানোর পর যখন দেখছিলেন বেঞ্চ গরম করেই পঞ্চম মৌসুম কাটাতে হবে, তখন ইউনাইটেডের নতুন চুক্তিতে সই না করে ফিরে আসেন হোয়াইট হার্ট লেনে। ঐ মৌসুমেই স্পার্সকে নিয়ে যান লিগ কাপের সেমিতে এবং প্রিমিয়ার লিগ মৌসুম শেষ করেন নবম স্থানে। লন্ডনের ক্লাবটির জন্য বিগত দশকের সবচেয়ে ভাল মৌসুম ছিল ওটাই।

     

    ৩) ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড (আয়াক্স):

    ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ডাচ মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল আয়াক্সেই। সব ঠিকঠাকই যাচ্ছিল, আয়াক্স শিরোপা জিতছিল, ইউরোপের অন্যতম ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিল ক্রুইফ শিষ্যরা। কিন্তু বাগড়া বাঁধলো রাইকার্ডের ব্যক্তিগত সপ্তম এবং ক্রুইফের অধীনে তৃতীয় মৌসুমে। ট্রেনিংয়ে ঝগড়ার পর ক্রুইফের অধীনে আর না খেলার ঘোষণা দিয়ে দেন ঝাঁকড়া চুলের এই মিডফিল্ডার। রাইকার্ড নিজে ততদিনে আয়াক্সের কিংবদন্তী হয়ে গেলেও ক্রুইফের মত এক মহীরূহের সাথে ঝামেলা বাঁধানোয় আয়াক্স সমর্থকেরা তাকেই দোষারোপ করেন। নিজ সমর্থকদের কাছ থেকে এহেন অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে অভিমান করে ক্লাব ছাড়ার ঘোষণা দেন রাইকার্ড। ধারে স্পোর্টিং লিসবনে পাঠানো হলেও তার নাম রেজিস্ট্রার করতে দেরি হওয়ায় পর্তুগালে আর খেলা হয়নি তার।

    কিংবদন্তীতুল্য এবং ঐ আমলের অন্যতম সেরা এই মিডফিল্ডারের হঠাৎ দুর্দিনে পাশে এসে দাঁড়ায় এসি মিলান এবং আরিগো সাচ্চি। রাইকার্ড, গুলিত ও ভ্যান বাস্তেনকে নিয়ে গড়ে তোলে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর এক ত্রয়ী। মিলানে থাকাকালীন সময় আয়াক্স-মিলান ম্যাচ হয়েছিল তিনবার, দু’বার আয়াক্সের মাঠে। সেসময় গুরু ক্রুইফের সাথে হাত না মেলানোয় তাকেও শেরিংহামের মতই নিজ সমর্থকদের কাছ থেকে দুয়ো পেতে হয়। মিলানে পাঁচটি বর্ণীল মৌসুম কাটানোর পর ক্রুইফ আয়াক্সের ম্যানেজার পদ ছেড়ে দিলে আবারো প্রিয় ক্লাবে ফেরার ইচ্ছা পোষণ করেন রাইকার্ড।

    তাঁর প্রস্তাবে সাড়া দেন তৎকালীন আয়াক্স কোচ লুই ভ্যান গাল। ফিরে এসেই বন্ধু ড্যানি ব্লিন্দের (বর্তমান ম্যান ইউনাইটেডের ডাচ তারকা দালি ব্লিন্দের বাবা) সাথে আয়াক্সের মধ্যমাঠ নিজেদের করে নেন। তিন মৌসুমে দু'বার ডাচ লিগ (৯৪-৯৫ মৌসুমে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন) জিতেয়েছেন। ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে নিজের পুরনো দল এসি মিলানকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে ইতি টানেন বর্ণাঢ্য এক ক্যারিয়ারের। আয়াক্স সমর্থকেরাও আগের সেই ক্ষোভটা ততদিনে মুছে ফেলেছেন।

     

    ৪) মারিও গোটজে (বরুশিয়া ডর্টমুন্ড)

    সেই আট বছর বয়স থেকে পথচলা। ১২-১৩ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমি ফাইনাল দ্বিতীয় লেগে এসে প্রথম দৃশ্যের সমাপ্তি। এই মৌসুম শুরু আগেই চুক্তি নবায়ন করে জানান দিলেন ডর্টমুন্ডে দীর্ঘদিন থাকার তীব্র ইচ্ছা। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে চিরশত্রু বায়ার্নের কাছে হারের পরই সেই বাভারিয়ানরাই দলে ভেড়ালো তাকে। এককালের চোখের মণিকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের দলে চলে যাওয়াটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারলেন না ডর্টমুন্ড সমর্থকেরা। গোটজের জার্সি পুড়িয়ে, ‘জুডাস’ খেতাব দিয়ে গোটজেকে অচ্ছ্যুৎই বানিয়ে দিল তারা।

    অর্থ এবং সাফল্যের লালসা গোটজেকে অন্ধ করে দিয়েছে- এমনটাই ধারণা ছিল ফুটবলবিশ্বের। কিন্তু বায়ার্নের হয়ে চুক্তি সই করে যতটা খুশি ছিলেন এই জার্মান বিস্ময়, ঠিক ততটাই হতাশ হতে থাকলেন সময়ের সাথে। কারণ, সেসময়ের সবচেয়ে দামী জার্মান ফুটবলার (আর্সেনাল ওজিলকে কেনার পর এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামী) কি না সুযোগই পাচ্ছেন না নতুন দলে! এর মধ্যে ডর্টমুন্ডের সাথে নিজের প্রথম ম্যাচে যখন নামলেন বদলি হিসেবে, তখন সমগ্র সিগনাল ইদুনা পার্ক যেন দুয়োতে ফেটে পড়ছিল। অবশ্য সেউ দুয়োর জবাব দিতে বেশি সময় লাগেনি গোটজের। নেমেই গোল করলেন, কিন্তু নীরব উদযাপনে জানান দিলেন, ডর্টমুন্ডকে এখনো ভুলে যাননি।

    তাকে বিক্রি করে আর্মেনিয়ান তারকা হেনরিখ মিখিতারইয়ানকে কিনেছিল ডর্টমুন্ড। কী অদ্ভুত, তিন বছর পর সেই মিখিতারইয়ান ইংল্যান্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে চলে যাওয়ার পর আবার সেই গোটজেকেই ফেরত আনলো ডর্টমুন্ড। বায়ার্নে বিভীষিকার মত তিনটি মৌসুমের পর নাড়ির টানে ফিরে এলেন ডর্টমুন্ডে। একত্রিত হলেন প্রিয় বন্ধু মার্কো রয়েসের সাথে। তার আগমনের পর ডর্টমুন্ড খেলোয়াড়দের সোশ্যাল মিডিয়ায় করা পোস্ট দেখে বোঝাই যাচ্ছে, এককালীন সতীর্থকে আবার বরণ করে নিতে কোনো অসুবিধা নেই তাদের। দেখা যাক, সমর্থকরা কিভাবে স্বাগত জানায় গোটজেকে। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন