• " />

     

    অল্প গল্পে অলিম্পিক-৭: অলিম্পিকের চোকার এবং একটি 'ফ্লপ'

    আরো পড়ুনঃ

    অল্প গল্পে অলিম্পিক - ৬ঃ যে রেকর্ড ভাঙ্গেনি ৪৮ বছরেও

    অল্প গল্পে অলিম্পিক - ৫ঃ দ্বৈরথ, বিতর্ক আর আকাশ ছোঁয়ার গল্প


    অলিম্পিকের 'চোকার'

    অলিম্পিকের প্রথম আসরে প্রথাগত দলীয় খেলাগুলোর কিছুই ছিল না। দলগত ইভেন্ট হিসেবে ফুটবলের প্রথম অন্তর্ভুক্তি ঘটে এরপরের অলিম্পিকে। আপনি রেকর্ডবুক ঘাটলে প্যারিস ১৯০০ অলিম্পিকের সোনা-রূপা-ব্রোঞ্জজয়ী হিসেবে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামের নাম পাবেন; যদিও ঐ আসরে ফুটবলটা দেশ বনাম দেশ হয়নি, বরং হয়েছিল ক্লাব বনাম ক্লাব (ব্রিটেনের আপটন পার্ক এফসি, ফ্রান্সের ফ্রেঞ্চ অ্যাথলেটিকো ফুটবল ইউনিয়ন একাদশ আর বেলজিয়ামের ব্রাসেলস বিশ্ববিদ্যালয় একাদশ)। এর মধ্যে আবার ফরাসি ক্লাবটি দুই দলের সাথে খেললেও ব্রিটেন আর বেলজিয়ামের দলটি নিজেদের মধ্যে মুখোমুখিই হয়নি! ব্রিটেন ফ্রান্সকে ৪-০ গোলে হারানোর পর ফ্রান্স বেলজিয়ামকে ৬-২ গোলে পরাজিত করে। পদকের নিষ্পত্তি এই দুই ম্যাচ থেকেই হয়ে যায়! এখানে অবশ্য একটি শুভঙ্করের ফাঁকি আছে; ঐ আসরে ফুটবলের জন্য কোন পদকই দেয়া হয়নি! অলিম্পিক উপলক্ষ্যে হওয়া দুটি খেলাই ছিল প্রীতিম্যাচ। অনেক বছর পর আইওসি খাতা-কলমে পদকের হিসেব মেলাতে ব্রিটেনকে সোনাজয়ের কৃতিত্ব দিয়েছে। খাতা-কলমের এই হিসেবকে ফিফা এজন্যেই কোন স্বীকৃতি দেয়নি, ফিফার ওয়েবসাইটে অলিম্পিকের 'রোল অব অনার' তাই সেন্ট লুইসের ১৯০৮ অলিম্পিক থেকেই শুরু!
     


    প্যারিসের ঐ অলিম্পিকেই ক্রিকেটের অন্তর্ভুক্তি ঘটে এবং দুর্ভাগ্যজনক ভাবে সেবারই অলিম্পিক শেষবারের মত ক্রিকেট দেখেছিল। এই ক্রিকেট হবার ঘটনাটিও স্বাভাবিক নয়। ডেভন এবং সমারসেটের বিভিন্ন ক্রিকেট স্কুলের খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া একটি দল ঐ অলিম্পিকের সময় প্যারিস সফর করছিল। প্যারিসে বসবাসরত প্রবাসী ব্রিটিশরা ঐ দলের বিপক্ষেই মাঠে নেমে যান ফ্রেঞ্চ অ্যাথলেটিকো ইউনিয়ন ক্রিকেট একাদশ নাম দিয়ে! তখন তো টাইমলেস টেস্টের যুগ, ওয়ানডে ক্রিকেট তখন অকল্পনীয় জিনিস। খেলার নিষ্পত্তির জন্যে তাই দুইদিন খেলা হবে এই পরিসীমা বেঁধে দেয়া হয়- খুব সম্ভবত ইতিহাসে প্রথমবারের মত এরূপ ঘটনা ক্রিকেট অবলোকন করে। দুই দলের অধিনায়কের সম্মতিতে সেই ম্যাচে দুই দলে খেলেছিলেন ১২ জন করে! অদ্ভুত সেই ম্যাচে জেতে ব্রিটেন, শৌখিন খেলোয়াড়দের সে দলটিই এখন পর্যন্ত ইতিহাসের একমাত্র অলিম্পিক পদকজয়ী ক্রিকেট দল হিসেবে টিকে আছে!
     


    অলিম্পিকে এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য দলগত খেলাও যুক্ত হয়েছে। হকির অন্তর্ভুক্তি ১৯০৮ সালে, আইস হকি শুরু হয় ১৯২০ সালে আর ১৯৩৬ সালে শুরু হয় বাস্কেটবল। তবে ফুটবলের মত দর্শক টানতে আর কোন দলগত খেলাই পারে নি। ১৯০০ সাল থেকে প্রতি অলিম্পিকেই এজন্যে ফুটবল হয়েছে এবং ধীরে ধীরে অংশ নেয়া দলের সংখ্যাও বেড়েছে। তবে ১৯৩২ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস আসরে একটি উদ্ভট কারণে ফুটবল ছিলনা। আমেরিকাতে ফুটবল হলে ‘আসল’ আমেরিকান ফুটবল (রাগবি) এর জনপ্রিয়তা কমে যেতে পারে এই ভয়ে আয়োজকেরা ফুটবল রাখেনই নি!

    প্রকৃত ফুটবল পরাশক্তিদের কাছে অলিম্পিক চিরন্তন ধাঁধা। চারবার করে বিশ্বকাপ জয়ী জার্মানি-ইতালি অলিম্পিকে সোনা জিতেছে মাত্র একবার করে। ইতালির সোনা জয়ের কৃতিত্বটাও ‘মাত্র’ আশি বছরের পুরনো! আর দুই জার্মানি এক হবার আগে পূর্ব জার্মানি সোনা জিতেছিল সেই ১৯৭৬ মন্ট্রিল অলিম্পিকে। ফ্রান্স-স্পেন স্বর্ণ পেয়েছে একবার করে। 

    বিশ্বকাপের দুর্ভাগা দল হাঙ্গেরি অলিম্পিকে কিন্তু সবচেয়ে সফল। তারা এ পর্যন্ত তিনবার (১৯৫২, ১৯৬৪, ১৯৬৮) সোনা জিতেছে। গ্রেট ব্রিটেনেরও সোনা জয়ের কৃতিত্ব তিনটি (১৯০০, ১৯০৮, ১৯১২)। তবে এর একটি সেই ১৯০০ সালের প্যারিস অলিম্পিকে বলে ফিফার মতে হাঙ্গেরিই এখন পর্যন্ত অলিম্পিকের সেরা। ব্রিটেন-হাঙ্গেরি ছাড়া টানা দুই আসরে সোনা জিতেছে আর্জেন্টিনা (২০০৪,২০০৮) আর উরুগুয়ে (১৯২৪, ১৯২৮)। 

    বিশ্বজয়ীদের সাথে অলিম্পিক ফুটবলের এই চিরন্তন শত্রুতার নির্মম শিকার হচ্ছে ব্রাজিল! ফুটবলে নিঃশ্বাস নেয়া এই দেশটি বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা দল হয়েও এখন পর্যন্ত অলিম্পিকে সোনা জিততে পারেনি। অবশ্য তিনবার রূপা আর দুইবার ব্রোঞ্জ জিতেছে সেলেকাওরা। এমনকি মেয়েদের ফুটবলেও দুইবার রূপা জিতেই খুশি থাকতে হয়েছে ব্রাজিলকে। 

    মাত্র একবার বিশ্বকাপে গিয়ে তিন ম্যাচেই হেরে আসা কানাডারও অলিম্পিকে সোনা আছে (১৯০৪); সোনা জিতেছে চেকোশ্লোভাকিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন, সুইডেন, পোল্যান্ড এসব দেশও। এমনকি কখনো বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল পার হতে না পারা ক্যামেরুন, নাইজেরিয়াও অলিম্পিকে সোনা জিতেছে। আর গত অলিম্পিকের সোনা তো জিতল মেক্সিকো, তাও থিয়াগো সিলভা-নেইমার-অস্কার-পাতোদের ব্রাজিলকে হারিয়েই! এবার ঘরের মাটিতে যদি ব্রাজিল সোনা না জিততে পারে তাহলে বলতেই হবে অলিম্পিক ফুটবল বিশ্বজয়ীদের পছন্দই করে না! কোপা আমেরিকায় নেইমারকে বাদ দিয়ে রিও অলিম্পিকের জন্য ফিট রাখাটাই প্রমাণ করে এই একটা পদকের জন্য ব্রাজিলিয়ানরা কতটা মরিয়া এবার!
     

     

    'ফসবুরি ফ্লপ'


    ‘আমি যখন হাইস্কুলে তখন একজনের সাথে বাজি লেগেছিলাম যে সোফার উপর দিয়ে হাই জাম্প দিব। বাজিতে হেরেছিলাম, সাথে ভেঙ্গে গিয়েছিল আমার কনুইটাও’। ডিক ফসবুরি আমেরিকান হাই জাম্পার, অনেক বছর পর যখন দ্য গার্ডিয়ানকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন তখন হাইজাম্পে আসার কারণ হিসেবে এই কথাটাই বলেছিলেন। ‘ঐ ঘটনার পরই আমার জিদ চেপে যায়, ঐ হাইস্কুল সেরা হাইজাম্পার বন্ধুটিকে হার মানানোর জন্যেই আমার হাই জাম্পে আসা’।

    ডিক ফসবুরি যখন ট্রেনিং শুরু করেন তখন হাইস্কুলের কোচ বলেছিলেন তাঁকে দিয়ে হবে না। হাই জাম্পের কৌশল তখন ভিন্ন ছিল, দৌড়ে এসে জাম্পাররা বারের উপর দিয়ে এমনভাবে পার হতেন যাতে মুখমন্ডল ভূমির দিকে মুখ করা থাকে। লেখার মাধ্যমে আসলে এটি বুঝানো সম্ভব নয়, কৌশলটি বুঝতে চাইলে নিচের ভিডিওটি দেখতে পারেন।
     


    ফসবুরির কোচও এই টেকনিকে অনুশীলন করাতেন, যার কেতাবি নাম 'স্ট্রাডল' অথবা 'ওয়েস্টার্ন' রোল। ফসবুরির ব্যক্তিগত সেরা লাফ ছিল ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি, জাতীয় পর্যায়ে পদক জেতা তো পরে, ফাইনালে উঠার জন্যেই যেটা যথেষ্ট নয়। ফসবুরি বুঝছিলেন তাঁকে দিয়ে হবে না, তবে আশাও ছাড়তে পারছিলেন না। এই অবস্থাতেই পড়তে গেলেন ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ে, আর সেখানেই ঝোঁকের মাথায় বের করে ফেললেন নতুন একটি কৌশল। এই কৌশলে মুখমন্ডল নিচের দিকে রেখে নয়, ফসবুরি বার পার হলেন আকাশের দিকে চেয়ে, ল্যান্ডিং করলেন তাঁর হিপ আর মেরুদন্ডের উপর ভর করে। এবং আশ্চর্যজনকভাবে এতে তাঁর ব্যক্তিগত সেরা এক লাফে ৬ ইঞ্চি বেড়ে গেল! হাই জাম্পে যেখানে আধ ইঞ্চি উচ্চতা বাড়ানোও বিশাল সফলতা সেখানে ঝাড়া আধফুট বেশি লাফানোর সাফল্য ফসবুরিকে দারুণভাবে উদ্বেলিত করল।

    কোচকে এই কৌশকে লাফ দিয়ে দেখানোর পর অবশ্য সম্মুখীন হলেন তিরস্কারের। এই হাস্যকর কৌশলের একগাদা ত্রুটি কোচ বের করে দেখালেন। ফসবুরি প্রথম দিকে কোচের কথা মেনেও নিয়েছিলেন, কিন্তু সাফল্যের দেখা না পাওয়ায় আবার অনুশীলন শুরু করেন তাঁর আবিষ্কৃত টেকনিকে। আস্তে আস্তে তাঁর ব্যক্তিগত সেরা উচ্চতা বাড়তে থাকায় কোচও আর মানা করেন নি, তবে উৎসাহও দেননি। তবে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় চোট। ক্রমাগত পিঠের উপর ল্যান্ড করার ফলে দুটি কশেরুকায় চিড় ধরা পরে। সেটা অলিম্পিকের আগের বছর, ১৯৬৭ সাল।

    ডাক্তারের বারণ, কোচের নিরুৎসাহিতা এসব সঙ্গে নিয়েই ফসবুরি পরের বছর গেলেন অলিম্পিক ট্রায়ালে। সবার শেষে থেকে জায়গা করে নিলেন মেক্সিকো সিটিগামী অলিম্পিক দলে।

    ডিক ফসবুরি নিজেও জানতেন তাঁর পদক জয়ের আশা নেই, অলিম্পিককে তিনি তাই নিয়েছিলেন উপভোগের আসর হিসেবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগের রাতে জ্যাভলিন থ্রোয়ার গ্যারি স্টানলুন্ডকে নিয়ে গিয়েছিলেন আজটেক পিরামিড দেখতে, সাথে ছিলেন আরো দুজন প্রমীলা সাঁতারু। সেখানে গিয়ে সারারাত পার্টি করলেন, গলা পর্যন্ত বিয়ার খেলেন, ঘুমালেন পিরামিডের ভিতরে! সকাল বেলায় মেক্সিকো সিটির ‘বিখ্যাত’ ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে মিস করলেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটাও।

    ইভেন্টের দিন অবশ্য ফসবুরি বেশ ‘সিরিয়াস’ ছিলেন। প্রথম দিকে তাঁর হাস্যকর আর ব্যতিক্রমী লম্ফ দেখে অ্যাজটেক স্টেডিয়ামের সবাই প্রবল হাসাহাসি করছিলেন, কিন্তু একে একে সব প্রতিযোগী ঝরে যাবার পরও সেরা তিনে যখন তিনি টিকে রইলেন তখন দর্শকদের সব মনোযোগ চলে গেল তাঁর দিকে। পুরো ইভেন্টে ফসবুরি প্রতিটি ধাপ একবারে পার হয়ে এসেছেন, যেখানে সেরা তিনে আসা অপর দুই প্রতিযোগীর বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় সফল হতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সোনা জিতলেন ফসবুরিই; জেতার পর তাঁর মুখভঙ্গিই বলে দিচ্ছিল এই সাফল্য তাঁর নিজের কাছেও কতটা অপ্রত্যাশিত ছিল!
     


    ফসবুরির ঐ সাফল্য কতটা আশাতীত ছিল তা আপনি পরের মিউনিখ অলিম্পিক থেকে বুঝতে পারবেন- তিনি '৭২ অলিম্পিকগামী দলেই জায়গা করতে পারেন নি। এই ব্যর্থতা অবশ্য তাঁর আগের অলিম্পিকের কৃতিত্বকে একটুও খাটো করতে পারবে না। তিনি বরং ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন তাঁর এই অদ্ভুত লাফের জন্যেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে- এখন যত হাই জাম্পার লাফ দেন তারা এই ফসবুরির অদ্ভুত টেকনিকটিই অনুসরণ করেন। ১৯৬৮ সালের পর 'স্ট্রাডল' কৌশলটিই ফসবুরির কল্যাণে জাদুঘরে চলে গেছে। এখনকার সকল জাম্পই হয় ‘ফসবুরি ফ্লপ’ টেকনিকে, সব বিশ্বরেকর্ড, অলিম্পিক রেকর্ডও হয়েছে এই টেকনিক অনুসরণ করে!

    সাধারণভাবে বড় হওয়া, কখনোই তারকা খ্যাতি না পাওয়া ফসবুরি সোনা জয়ের পর মিডিয়ার প্রবল আগ্রহের শিকার হলেন। এত ভার সইতে না পেরে তিনি পালালেন গেমস ভিলেজ থেকে, সত্যিকার অর্থেই পালালেন। মেক্সিকোর জঙ্গলে দুই দিন ক্যাম্পিং করে লোকচক্ষুর আড়ালে ফিরলেন দেশে। মিশে যেতে চাইলেন আগের জীবনে। সেটা অবশ্য পারেন নি। আমেরিকানরা শুধু নয়, গোটা ক্রীড়াবিশ্বই তাঁকে মনে রেখেছে হাইজাম্পে নতুন ধারা সংযোজনের জন্য। যতদিন হাইজাম্প থাকবে ‘ফসবুরি ফ্লপ’ এর মাধ্যমে ডিক ফসবুরিও চিরকাল বেঁচে থাকবেন।


    পরবর্তী পর্বঃ অল্প গল্পে অলিম্পিক - ৮ঃ 'ইটি'র উৎসাহ আর বিশ্বসেরার দাম্ভিকতা


     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন