• ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ
  • " />
    X
    GO11IPL2020

     

    আবার হবে "লেস্টার জলসা"?

    ২০১২-১৩ মৌসুমের চ্যাম্পিয়নশিপ প্লে-অফ দ্বিতীয় লেগ। ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে পেনাল্টি পায় লেস্টার। অ্যান্থনি নকহার্টের পেনাল্টি মিসের পর পাল্টা আক্রমণে ট্রয় ডিনির গোল! কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় এক দশক পর প্রিমিয়ার লিগে ফেরার স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ হয়ে গেল লেস্টারের। কিন্তু পরবর্তী মৌসুমে আর প্লে-অফ নয়, এবার একেবারে ইংলিশ ফুটবলের দ্বিতীয় বিভাগের চ্যাম্পিয়ন হয়েই প্রিমিয়ার লিগে ফিরে আসে লেস্টার সিটি। 

    যদিও প্রত্যাবর্তনের শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না। কিন্তু শেষভাগে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত অবনমন এড়ায় নাইজেল পিয়ারসনের শিষ্যরা। পরবর্তী মৌসুমে রানিয়েরির অধীনে তারকা ও অর্থে ঠাসা ইংলিশ মহীরূহদের হারিয়ে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা ঘরে তোলে লেস্টার। বিভিন্ন দলে ব্রাত্য একজন, একজন ফ্যাক্টরি শ্রমিক, একজন শরণার্থী এবং সর্বোপরি এক প্রৌঢ় ইতালীয়ানের একাত্মতায় ক্লাবটি জন্ম দেয় প্রিমিয়ার লিগের সর্বকালের সেরা ‘আন্ডারডগ’ রূপকথার। আসন্ন মৌসুমে নিজেদের শিরোপা রক্ষায় নামতে যাওয়া লেস্টারের কাজটা হতে যাচ্ছে পর্বত সমতুল্য। 


    ভরসার নাম ক্যাসপার স্মাইকেলঃ 


    বাবার পর পেরেছেন ছেলেও। পিটার স্মেইকেলের পর নিজের ট্রফি ক্যাবিনেটেও প্রিমিয়ার লিগ জয়ের গোল্ড মেডেলটা রাখতে সক্ষম হয়েছেন ক্যাসপার। গত মৌসুমে লেস্টারের লিগ জয়ে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতার সাথে গোলবার সামলানোর দায়িত্বটা পালন করেছেন ‘ছোট’ স্মেইকেল। মৌসুমজুড়ে করা একাধিক অসাধারণ সেভে অনেকেই খুঁজে পেয়েছেন পিটারের ছায়া। কান্তের মত অর্থমোহে আকৃষ্ট না হয়ে জেমি ভার্ডির পথেই হেঁটেছেন ডেনিশ এই গোলরক্ষক। কিছুদিন আগেই চুক্তিটা আর পাঁচ বছরের জন্য নবায়ন করেছেন ক্যাসপার।

    ক্যাসপারের ‘নাম্বার টু’ হিসেবে হ্যানোভার থেকে নিয়ে আসা হয়েছে জার্মান কীপার রন-রবার্ট জীলারকে। দুই গোলকিপারের কারোরই সামর্থ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র প্রশ্ন না থাকায় আগামী মৌসুমে গোলকিপারদের নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে হবে না ‘দ্যা টিংকারম্যান’কে।
     

    বয়স্ক ডিফেন্সেই আস্থাঃ


    প্রিমিয়ার লিগের মত গতির খেলায় মরগ্যান-হুথ-ফুকসদের মত ‘বুড়ো’রা ঠিক মানিয়ে নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মাঝে বিরাজমান আশঙ্কা গত মৌসুমেই উড়িয়ে দিয়েছেন এই তিনজন। মরগ্যান-হুথের অসাধারণ বোঝাপড়া, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং দলের প্রয়োজনে গোল করা-বিগত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের তৃতীয় সেরা (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও টটেনহামের পর) ডিফেন্স হওয়ার পেছনে এই দুইজনের অবদান অনস্বীকার্য। ফিটনেস বজায় রাখতে পারলে আবারো হুথ-মরগ্যান জুটিকেই মৌসুমের সিংহভাগ জুড়ে দেখা যাবে লেস্টারের ডিফেন্সের কেন্দ্রে।

    ফুলব্যাক পজিশনে ফুকস ও সিম্পসনের দৃঢ় ডিফেন্স এবং ভার্ডি, মাহরেজদের সাথে দারুণ কম্বিনেশনের দরুণ লেস্টারের ডিফেন্সে আগের মৌসুমের সেই পঞ্চপান্ডবকেই আশা করা যায়। আর বিকল্প হিসেবে চিলওয়েল, ওয়াসেলেস্কি, শ্লুপরাও নিজেদের জাত চেনাতে তৎপর থাকবেন দলের প্রয়োজনে।

     

    দুশ্চিন্তার নাম ডিফেন্সিভ মিডঃ

    মরগ্যান-হুথ এবং ভার্ডি-মাহরেজের জোরে লেস্টারের শিরোপাজয়ের পেছনের আরো এক জুটিকে কিছুটা হলেও পাদপ্রদীপের আলোয় কম দেখা যেত। তারা হলেন (নাকি ছিলেন?) মধ্যমাঠের দুই ‘আনসাং হিরো’ ড্যানি ড্রিঙ্কওয়াটার এবং এনগোলো কান্তে। চেলসির ৩৮ মিলিয়ন ইউরোর প্রস্তাবে কান্তেকে বিক্রি করে এখন ড্রিঙ্কওয়াটারের যোগ্য সঙ্গী খোঁজাটাই রানিয়েরির এই মৌসুমের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

    প্রাক-মৌসুমে খেলানো দলের কথা চিন্তা করলে ড্রিঙ্কওয়াটারের সঙ্গী হিসেবে আসন্ন মৌসুমে ড্যানিয়েল আমারটিকেই দেখা যেতে পারে, যদি না রানিয়েরি কোনো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে দলে ভেড়াতে পারেন। অথবা গত মৌসুমের প্রায় পুরোটা সময় বেঞ্চ গরম করা সুইস অধিনায়ক গোখান ইনলারকেও দেখা যেতে পারে মধ্যমাঠে। দলবদলে এখনো কোনো ডিফেন্সিভ ঘরানার খেলোয়াড় না কেনায় সমর্থকদের কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তাতেই রেখেছেন এই ইতালিয়ান। অবশ্য যার হাত ধরে এসেছে নিজেদের প্রথম লিগ শিরোপা, তার চিন্তাভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার গোয়ার্তুমি লেস্টার সমর্থকদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না এমনটাই স্বাভাবিক।
     

    ভরসার নাম ভাহরেজঃ

    ডিফেন্স যতটাই দৃঢ় হোক না কেনো, বল জালে জড়াতে না পারলে কোনো লাভই হবে না। এটাই ফুটবল। গত মৌসুমে মরগ্যান-হুথ, কান্তে-ড্রিঙ্কওয়াটারের অসাধারণ ডিফেন্সের পাশাপাশি গোলের পর গোলের করে লেস্টারের শিরোপাজয়ের অন্যতম প্রধান দুই তারকা মাত্র পাঁচ বছর আগেও ফ্যাক্টরিতে কাজ করা জেমি ভার্ডি ও ফ্রেঞ্চ লিগের দ্বিতীয় বিভাগে খেলা রিয়াদ মাহরেজ। গোল, অ্যাসিস্ট, ড্রিবল, নিচে নেমে ডিফেন্সে সাহায্য করা- সব মিলিয়ে লেস্টার সমর্থকদের মধ্যমণি হতে খুব একটা সময় লাগেনি ‘ভাহরেজ’ এর।
     


    আর্সেনালে যাওয়া প্রায় পাকা হয়ে যাওয়ার পরেও সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে লেস্টারের সাথের চুক্তিটা আরো চার বছরের জন্য নবায়ন করে বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিয়েছেন ভার্ডি। একাধিক ক্লাবের প্রস্তাবের পরও লেস্টারেই থেকে যাবেন মাহরেজ- এমনটাই আশ্বাস দিয়েছেন গুরু রানিয়েরি।

    অবশ্য আগেরবারের চেয়ে এবার ভাহরেজের ‘সাপোর্টিং কাস্ট’ বেশ শক্তই বলা চলে। সিএসকেএ মস্কো থেকে ক্লাবের ট্রান্সফার রেকর্ড গড়ে নিয়ে আসা আহমেদ মুসা প্রীতি ম্যাচে বার্সার বিপক্ষে দুই গোল করে ইতোমধ্যেই নিজের জাত চেনানো শুরু করেছেন। আর আগের মৌসুমের মার্ক অলব্রাইটন এবং জাপানিজ স্ট্রাইকার শিঞ্জি ওকাজাকি তো আছেনই।


    সম্ভাব্য ফরমেশনঃ ৪-৪-২, ৪-৪-১-১

    কথায় আছে, ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন’। লেস্টারের প্রিমিয়ার লিগ জেতা যতটা না কঠিন ছিল, শিরোপা ধরে রাখা যে আরো কষ্টসাধ্য হবে, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষত যখন লেস্টারের প্রতিপক্ষদের একেক খেলোয়াড়ের পেছনে ব্যয় করা অর্থ লেস্টারের সর্বমোট খরচেরও কয়েকগুণ বেশি। শিরোপা ধরে রাখার জন্য আবারো রানিয়েরির কৌশল, মরগ্যান-হুথের নেতৃত্ব এবং সর্বোপরি 'ভাহরেজ' ও মুসার আক্রমণ দক্ষতার ওপরই নির্ভর করছে সবকিছু। রানিয়েরি নিজেই বলেছেন, ‘আগের মৌসুমে লেস্টারের শিরোপাজয়ের পক্ষে বাজির দরটা ৫০০০/১ হলে এবার তা হবে ৬০০০/১!”

    নিজেদের ‘ফিয়ারলেস ফক্সেস’ বলে দাবি করা ক্লাবটা কি পারবে অসাধ্য সাধন করে দেখাতে? লেস্টারের শেয়ালরা কি পারবে গুরু রানিয়েরির হাত ধরে রূপকথার দ্বিতীয় ভলিউমটি লিখতে? নাকি ব্ল্যাকবার্নের মত এক মৌসুম পরই হারিয়ে যাবে কালের অতল গর্ভে? এহেন হাজারো প্রশ্নের উত্তর মিলবে '১৬-'১৭ প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমের পর্দা নামার পর।


    আরো পড়ুনঃ লেস্টারের যে গল্পটা বলা হয়নি 


     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন