• সিরি আ
  • " />
    X
    GO11IPL2020

     

    "দ্য কিউরিয়াস কেস অব মারিও বালোতেল্লি"

    “ওকে নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। ওর সম্পর্কে আমার কথাও ফুরিয়ে গেছে। একজন ফুটবলার ও ব্যক্তি হিসেবে আমি ওকে ভালোবাসি। সে মানুষ হিসেবে খারাপ নয়। দারুণ একজন খেলোয়াড়ও । ...কিন্তু, এই মুহূর্তে তাঁর জন্য আমি দুঃখিত। সে তার মেধার অপচয় ছাড়া কিছু করছে না। আশা করি সে বুঝতে পারবে, সে ভুল পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে সে তাঁর ব্যবহার বদলাতে পারে। কিন্তু, তাঁর ব্যাপারে আমি আর কথা বলতেও রাজি না।” (এপ্রিল, ২০১২)

    কথাগুলো কোচ রবার্তো মানচিনির। শিষ্য মারিও বালোতেল্লির আচরণ সম্পর্কে নিজের আক্ষেপ এভাবেই প্রকাশ করেছিলেন ম্যানচেস্টার সিটির ওই সময়ের কোচ। একজন প্রতিভাবান ফুটবলার নিজ হাতে কিভাবে নিজের ক্যারিয়ারকে ধ্বংস করতে পারে, সেটার সম্ভবত সবচেয়ে বড় উদাহরণ এই খ্যাপাটে ইতালিয়ান। ফুটবলার হিসেবে বালোতেল্লি দারুণ এক প্রতিভা; ভক্তদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন ‘সুপার মারিও’। কিন্তু, খামখেয়ালিপনার কারণে এই ইতালিয়ান এখন সবার কাছে নিগ্রহের পাত্র। একটা সময় ইন্টার মিলান, ম্যান সিটি, এসি মিলান, লিভারপুলে খেলার পর এবার তাঁকে দলে নিতে চাইছিল না কোনো ক্লাবই। শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হয়েছে ফ্রেঞ্চ ক্লাব নিসে।

    মাত্র ১৫ বছর বয়সে সিনিয়র লেভেলে ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেন বালোতেল্লি। গত দশ বছরে যে ক্লাবেই গিয়েছেন, বিতর্ক ছিল তাঁর নিত্য সঙ্গী। প্রথম ক্লাব লুমেজেনে এক মৌসুম কাটিয়েই বালোতেল্লি পাড়ি জমিয়েছিলেন রবার্তো মানচিনির ইন্টার মিলানে। তবে মানচিনির বিদায়ের পর নতুন কোচ হোসে মরিনহোর সাথে প্রায়শই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তেন এই ইতালিয়ান। অনুশীলনে ফাঁকি, খেলা শেষে জার্সি ছুড়ে ফেলা, টিভি শো-তে চিরপ্রতিপক্ষ এসি মিলানের জার্সি গায়ে দিয়ে যাওয়াসহ নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। স্পেশাল ওয়ানের কাছে বালোতেল্লি হয়ে উঠে ছিলেন ‘অনিয়ন্ত্রণযোগ্য’। তাছাড়া তাঁর উপর ক্ষুব্ধ ছিল মাতেরাজ্জি ও জানেত্তিসহ দলের অনেক সিনিয়র খেলোয়াড়ই।

    অবশেষে ২০১০ সালে ইন্টার মিলান ছেড়ে বালোতেল্লি পাড়ি দিয়েছিলেন ম্যানচেস্টার সিটিতে; পুরনো গুরু রবার্তো মানচিনির সান্নিধ্যে। তবে নতুন ক্লাবেও পুরনো স্বভাব বদলাতে পারেননি সুপার মারিও। প্রিমিয়ার লিগে নিজের প্রথম গোলের ম্যাচেই প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের সাথে হাতাহাতি করে লাল কার্ড দেখেছিলেন তিনি। তাছাড়া ২০১২ তে টটেনহ্যামের স্কট পার্কারকে লাথি মেরে চার ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন এই ইতালিয়ান। ওই মৌসুমেই মোট চারবার লাল কার্ড দেখেছিলেন ‘দ্য ব্যাডবয়’; নিষেধাজ্ঞার কারণে খেলতে পারেন নি ১১ ম্যাচ! শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে তাঁর দুই সপ্তাহের বেতন কেটে রেখেছিল ম্যান সিটি। তবে এই সিদ্ধান্তও সহজে মেনে নিতে পারেননি মারিও, ক্লাবের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করেছিলেন তিনি। যদিও পরে তা প্রত্যাহার করেছিলেন। প্রিয় শিষ্যের আচরণে এবার ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন কোচ মানচিনি। মারিওকে তাই এসি মিলানের কাছে বিক্রি করতে একপ্রকার বাধ্য হন ম্যান সিটির কোচ।

    পরের দুই মৌসুমে খুব বড় কোনো অঘটনে জড়াননি বালোতেল্লি। এরপর মিলান ছেড়ে লিভারপুলে গিয়ে আবার বিতর্কের সাথে জড়িয়ে পড়েন এই স্ট্রাইকার। চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে হাফ টাইমে পেপের সাথে জার্সি বদলানোয় কোচ ব্রেন্ডন রজার্সের সমালোচনায় পড়েন। তাছাড়া ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সামাজিক মাধ্যমে ইহুদিবিরোধী ও বর্ণবাদমূলক ছবি দেয়ায় এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি পঁচিশ হাজার ইউরো জরিমানা দিতে হয় তাঁকে। মাঠেও ওই মৌসুমে একেবারেই বিবর্ণ ছিলেন, ২৮ ম্যাচে মাত্র ৪ গোল দেয়া বালোতেল্লিকে ধরা হয়েছিল ঐ মৌসুমের অন্যতম ব্যর্থ ট্রান্সফার হিসেবে।

     

    ২০১২ ইউরোতে জার্মানির সঙ্গে গোলের পর...

     

    পরের মৌসুমেই মারিওকে ধারে মিলানে পাঠান ব্রেন্ডন রজার্স। তবে মিলানে এসে ভাগ্য ফিরেনি তাঁর। সিরি আ তে পুরো মৌসুমে ২০ ম্যাচে গোল করেন কেবল ১টি! আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ইতালির হয়ে বালোতেল্লির অন্যতম সাফল্য ইউরো’১২ তে ফার্নান্দো টরেসের সাথে যুগ্মভাবে সর্বাধিক গোলদাতা হওয়া। সেমিফাইনালে জার্মানির সাথে জোড়া গোল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম হাইলাইটস হয়েই থাকবে। তাছাড়া ব্রাজিল বিশ্বকাপের বাছাইপর্বেও ইতালির হয়ে সর্বাধিক (৫টি) গোল করেছিলেন। কনফেডারেশন্স কাপেও ছিলেন সপ্রতিভ। তবে বিশ্বকাপ মঞ্চে নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন সুপার মারিও। এরপর ইতালির জার্সি গায়ে আর খেলা হয়নি তাঁর। 

    মাঠের বাইরে বিভিন্ন উদ্ভট ঘটনায় নিয়মিত পত্রিকার সংবাদ হয়েছেন ‘দ্য ব্যাডবয়’। একবার তো বন্ধুদের নিয়ে মিলানের পিৎজা ডেলা রিপাবলিকায় রীতিমত পিস্তল নিয়ে গুলি ছুড়েন তিনি। তাছাড়া দু’জন কুখ্যাত মাফিয়া ডনের কোম্পানিতেও দেখা যায় তাঁকে। মহিলা জেলে গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়া, আতশবাজি জ্বালাতে গিয়ে বাড়িতে আগুন লাগানো কিংবা কারফিউ অমান্য করে রাস্তায় নেমে পড়ার মতো কাণ্ডও করেছেন! ক্যারিয়ারে ইন্টার মিলান এবং ইতালির হয়ে খেলতে নেমে বেশ কয়েকবার বর্ণবাদেরও স্বীকার হয়েছেন এই স্ট্রাইকার। আর তাই পত্রিকার পাতায় আলোচনা-সমালোচনায় বালোতেল্লি ছিলেন নিয়মিত বিষয়বস্তু।

    পত্রিকায় নিয়মিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও সম্প্রতি অনেক ক্লাবই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তাঁর দিক হতে। কারণটাও যুক্তিযুক্ত; একজন বিশৃঙ্খল ও পারফরম্যান্সহীন ফুটবলারকে কে-ইবা চাইবে কিনতে? ক’দিন আগে বালোতেল্লির ট্রান্সফার নিয়ে ঠিক এরকম কিছুই জানিয়েছিলেন বোলোনিয়া এফসি’র চেয়ারম্যান, “আমরা শুধুমাত্র প্রচারের জন্য কাউকে কিনতে পারি না।”

    বালোতেল্লির এই খ্যাপাটে আচরণের সবচেয়ে মোক্ষম উদাহরণ দিয়েছেন হোসে মরিনহো। ইন্টার মিলানে এই স্ট্রাইকারকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। ঘটনাটা তাঁর মুখেই শুনুনঃ 

    “কাজানের সঙ্গে আমাদের চ্যাম্পিয়নস লিগের একটা ম্যাচ ছিল। ওই ম্যাচে আমাদের সব স্ট্রাইকারই চোটাঘাতে ছিল। ইতো, মিলিতো কেউই ছিল না। বালোতেল্লি ছিল আমার একমাত্র ভরসা।

    কিন্তু ৪২ মিনিটে মারিও একটা হলুদ কার্ড খেল। বিরতির সময় আমি যে ১৫ মিনিট পেলাম, ১৪ মিনিটই ওকে বোঝানোর পেছনে খরচ করলাম। আমি ওকে বললাম, “মারিও, আমার হাতে আর কোনো স্ট্রাইকার নেই, তোমাকে পুরো ম্যাচই খেলতে হবে। তোমার কাউকে ছোঁয়ারও দরকার নেই, শুধু নিজের খেলা খেলে যাবে। কেউ কিছু বললে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। রেফারি কিছু বললেও না। বল হারালেও মেজাজ হারাবে না।”

    ঠিক ৪৬ মিনিটেই ও লাল কার্ড খেল।”

     

    বালোতেল্লিকে নিয়ে এরপর বোধ হয় আর কিছু বলার নেই!

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন