• সেরা ফুটবল ক্লাব
  • " />
    X
    GO11IPL2020

     

    "ফিনল্যান্ডের লেস্টারের" ফুটবল বিপ্লব

    অল্যান্ড আইল্যান্ড। সুইডেন আর ফিনল্যান্ডের মাঝে বাল্টিক সাগরের দ্বীপপুঞ্জটিতে সর্বসাকুল্যে ২৯ হাজার মানুষের বাস। ফিনল্যান্ডের চেয়ে বরং সুইডেনের দূরত্বটাই কম অল্যান্ড থেকে। তবুও দ্বীপরাষ্ট্রটি ফিনল্যান্ডেরই অংশ। এর অভিবাসীরা অবশ্য মন থেকে নিজেদের ফিনিস জাতীয়তাবাদের ‘ফিনিশ’ ঘটিয়েছেন অনেক আগেই। শিল্প, সংস্কৃতিতে সুইডেনের আধিপত্যই বেশি অল্যান্ডে। এমনকি বেশিরভাগ মানুষের মুখের ভাষাটাও সুইডিশ।

    ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যার মাত্র ০.৫০ শতাংশ মানুষের বসবাস এখানে। মোট জায়গার ভাগে আরও কম অল্যান্ড। ছোট্ট এই দ্বীপের আছে নিজস্ব সরকার ব্যবস্থা। আছে আলাদা পুলিশ বাহিনীও! ফিনল্যান্ডের মাঝেই যেন আলাদা আরেক দেশ ‘অ-ল্যান্ড’!

    এই দ্বীপেরই এক ফুটবল ক্লাব ইতিহাস গড়েছে গত সপ্তাহে। ফিনল্যান্ডের সব বড় ক্লাবকে হটিয়ে জিতেছে ফিনল্যান্ডের ফুটবল লিগ শিরোপা। অল্যান্ডের প্রথম ক্লাব হিসেবে ফিনল্যান্ড ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করাটা শান্তির দ্বীপে নিয়ে এসেছে উৎসবের উপলক্ষ্য।   

    লেখার প্রথমে ভৌগলিক রুপ-বৈচিত্র্যের বর্ণনা শুনে যদি আইসল্যান্ডের কথা মনে পড়ে গিয়ে থাকে, তবে গল্পের পরের অংশটা আরও শিহরণ জাগানিয়া হতে যাচ্ছে আপনার জন্য। অল্যান্ডের ক্লাবের গল্পটা যে আইসল্যান্ড আর লেস্টার সিটির রূপকথার এক অনবদ্য সংমিশ্রণ!  
                                     
                                                                                  *****

    উইকলফ হোল্ডিং এরিয়া- নাম শুনে ইউরোপের আর দশটা নামকরা স্টেডিয়াম মনে হতে পারে। স্টেডিয়ামই বটে; নামকরা নয়। মাত্র চার হাজার ধারণ ক্ষমতার স্টেডিয়ামের সুখ্যাতি না থাকাটাই স্বাভাবিক। অল্যান্ডের রাজধানী ম্যারিহ্যামে ১১ হাজার মানুষের বাস। তাঁদের এক তৃতীয়াংশের বেশি তো এই ফুটবল মাঠেই এঁটে যায়!  

    ভদ্রলোক উইকলফ একজন নামকরা ব্যবসায়ী। খেলার প্রতি টান থাকায় এই স্টেডিয়ামটা নিজের টাকায় কিনে ‘দান’ করেছিলেন নিজ শহরের ক্লাব আইএফকে ম্যারিহ্যামকে। অল্যান্ডের একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে প্রতিনিধিত্ব করে আইএফকে ম্যারিহ্যাম। তাঁদের জন্য এটুকু করতেই পারেন উইকলফ! ক্লাবটা তো শুধু ম্যারিহ্যাম নয়, গোটা অল্যান্ডেরই গর্ব!
                                
                                                                               *****

    স্ক্যাণ্ডিনেভিয়ান অনেক দেশের মতোই শীত আসার আগে অক্টোবরের মাঝেই লিগ শেষ করার রীতিটা চালু আছে ফিনল্যান্ডেও। মূলত গ্রীষ্মের শুরু থেকে-অক্টোবর পর্যন্ত চলে এখানকার লিগগুলো। ভেইক্কাস লিগা- ফিনল্যান্ডের সর্বোচ্চ স্তরের ফুটবল লিগও ব্যাতিক্রম নয়। 

    উইকলফের ওই স্টেডিয়াম ঘিরেই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে স্বপ্ন বুনছেন অল্যান্ডবাসী। লিগ শিরোপা দূরে থাক, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের মতে রেলিগেশন অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করবার কথা ছিল আইএফকে ম্যারিহ্যামের। অথচ অক্টোবরের শুরুর দিকে সেই ম্যারিহ্যামই শিরোপা দৌড়ে এগিয়ে সবার চেয়ে! স্বপ্নবিলাসী না হয়ে উপায় কি অল্যান্ডবাসীর? লিগ শেষের দু’সপ্তাহ আগে শিরোপা প্রতিদ্বন্দ্বী চার দলের মাঝে একটি আইএফকে ম্যারিহ্যাম। শেষ ম্যাচের আগে এক দলের নাম বাদ। ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে ধনী দুই ক্লাব আর এইচএফকে হেলসিনকি আর এসএফকে সেইনাজোকির সাথে শিরোপা লড়াইয়ে টিকে থাকল ম্যারিহ্যাম! লিগ শিরোপা ঘরে তুলতে শেষ ম্যাচে জিততেই হবে তাঁদের!  

    হেলসিনকি আর সেইনোজোকি- ভাগ্যের ফেরে লিগের শেষ ম্যাচটাও এই দুই দলের। আর ম্যারিহ্যাম খেলবে ইলভেসের বিপক্ষে। ম্যারিহাম পয়েন্ট খোয়ালেই 'দুই মোড়লের' ম্যাচে জয়ী দলই হাসবে শেষ হাসি। শেষ মুহুর্তের চাপ ধরে না রাখতে পেরে পয়েন্ট খোয়াবে অল্যান্ডের অখ্যাত দলটি আর নিজেদের ম্যাচের জয়ী দল ঠোঁট ছোঁয়াবে শিরোপাতে- এমনটাই আশা ছিল হেলসিনকি আর সেইনোজোকি ক্লাবের।

    অন্যদিকে সব ভুলে নিজেদের খেলায় মন দিতে চাইছে ম্যারিহ্যাম। তবে চাইলেই কি হয়? পুরো শহর জুড়ে উৎসবের প্রস্তুতি। গ্যালারিতে উপস্থিত হয়েছেন তাঁদের একটা অংশ মাত্র! মাঠের খেলাতে মনযোগ দিয়ে তাঁদের উৎসবের উপলক্ষ্যও এনে দিয়েছিল ম্যারিহ্যাম। প্রথম আনন্দ এসেছিল এক সুইডিশের হাত ধরে! ম্যাচের প্রথম মিনিটেই ডিফেন্ডার ববি ফ্রিডবার্গের হেড প্রতিপক্ষ ইলভসের জালে জড়ালে অল্যান্ডবাসী চলে যায় স্বপ্নের আরেকটু কাছে!

    ২৪ মিনিটে গোল হজম করে চোখ রাঙাচ্ছিল দুঃস্বপ্ন! ১-১ গোলে সমতা তখন ম্যাচে। স্বপ্নের খুব কাছে গিয়েও খালি হাতে ফেরত আসার চেয়ে খারাপ কিছু বোধ আর নেই! বিধাতা যেন উৎসবে বাড়তি রঙ চড়াতেই ‘সাসপেন্স’ টিকিয়ে রেখেছিলেন। তা না হলে ৬৬ মিনিটে মাঠে নামা ডিয়েগো আসিসই কেন হবেন ত্রাণকর্তা? এই ব্রাজিলিয়ানই গতবার কাপ ফাইনালে জোড়া গোল করে এনে দিয়েছিলেন ম্যারিহ্যামের ইতিহাসের প্রথম শিরোপা! এবার তিনি এনে দিলেন ‘আস্ত’ লিগ শিরোপাটাই। ৭৫ মিনিটে গোল করে আনন্দে ভাসালেন একটা দ্বীপকে; ম্যাচশেষে অশ্রু হয়ে ঝরল নিজের আনন্দ। লিগের শেষ ম্যাচটা ২-১ গোলে জিতে প্রথমবারের মতো ভেইক্কাসলিগা শিরোপা ঘরে তুলল আইএফকে ম্যারিহ্যাম। আর এইচজেকে- এসএফকের ম্যাচটা হল গোলশূন্য ড্র। তিন পয়েন্টে এগিয়ে থেকে লিগ জিতে ইতিহাস গড়ল আইএফকে।

    এই আনন্দটা শুধু লিগ জয়েরই নয়! সাথে মিশে ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পারার তৃপ্তিও। ইউরোপের নামকরা সব ক্লাবদের সাথে এক কাতারে এখন থেকে উচ্চারিত হবে ম্যারিহ্যামের নামটিও। কে জানে? হয়ত পরের মৌসুমেই রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনার মতো ক্লাব খেলতে আসবে এই চার হাজার ধারণ ক্ষমতার স্টেডিয়ামটায়! 

    লিগ জেতার উচ্ছ্বাসটা বাধভাঙাই হবে অল্যান্ডবাসীর জন্য।
     



                                                                                 *****

    উইকলোফ হোল্ডিং এরিয়ায় এই স্বপ্নটাই এতোদিন দেখতেন অল্যান্ডের লোকজন। লিগ জিতে শিরোপা উঁচিয়ে ধরবেন ঘরের ছেলে ইয়ানি লিস্কি। যার বাবার হাত ধরে ২০০৩ সালে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভেইক্কাসলিগায় পদার্পণ যাদের।

    পেক্কা লিস্কি। ম্যারিহ্যামের এই ক্লাবটায় ১৩ বছর কাটিয়ে গত মৌসুম শেষে অবসর নিয়েছেন তিনি। তৃতীয় স্তর থেকে ফিনল্যান্ডের সর্বোচ্চ পর্যায় ভেইক্কাসলিগায় দলকে উঠিয়ে এনেছিলেন তিনিই। গত মৌসুমে আইএফকে ম্যারিহ্যামকে শিরোপা এনে দিয়ে নিজের দায়িত্বটা তিনিও শেষ করেছিলেন ফিল্মি স্টাইলেই! এই ক্লাব তো তার হাতেই গড়া! ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অ্যালেক্স ফার্গুসনের চেয়ে তিনি কোনো অংশে কম না ম্যারিহ্যামের লোকদের কাছে!   

    এই মৌসুম শুরুর আগে পেক্কা লিস্কির জায়গায় দলের কোচ হয়ে এসেছিলেন দু’জন। পিটার লুন্ডবার্গ আর ক্যারি ভির্তানেনের যুগলবন্দীর সাথেও চাইলে মিল খুঁজতে পারেন আইসল্যান্ডের। একজন নয় এক ‘জোড়া’ হেডকোচ নিয়েই তো তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তাঁরা। ভাইকিংসদের ছায়া তো পড়েছিল অল্যান্ডের ওপরও!

    তবে লুন্ডবার্গ আর ভির্তানেনের ওপর শুরুতে তেমন ভরসা করতে পারছিলেন না ম্যারিহ্যামের সমর্থকেরাই। ১২ দলের লিগে পাচ-ছয় নম্বরে শেষ করতে পারাটাই সাফল্য-এমনটাই ভেবেছিলেন অল্যান্ডাররা।

    আর ফিনল্যান্ডের সংবাদ মাধ্যমের যেন খেদই ছিল এই দুই কোচের ওপর। তাঁরা প্রথম থেকেই সমালোচনা করে আসছিল এই দুই কোচের ‘সুইডিশ ঘরানার’ ফুটবল দর্শনের! অথচ সেই পেক্কা লিস্কির দর্শন ভিত্তি করেই অসাধ্য করল ম্যারিহ্যাম। ‘সুইডিশ ঘরানার’ দুই কোচ শুধু সাথে ডিফেন্ডিংয়ের সাথে সাথে হাই প্রেসিং গেম "ব্লেন্ড" করে দিলেন! আর তাতেই বলে দখল বাড়ল ম্যারিহ্যামের, সাথে গোলের সুযোগও তৈরি হল আগের চেয়ে বেশি। ফলাফল, সবাইকে চমকে দিয়ে ইতিহাস গড়ে ফেলা! ‘ফিনিশ লেস্টার সিটি’ – নামটার সার্থকতা এখানেই।

                                                                                *****  

    মাঠের কৌশলে নতুন কোচদের শতভাগ অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। মাঠে খেলোয়াড়দের ‘এক দল’ হয়ে খেলাটাই আসলে আইএফকের অসাধ্য সাধন করতে পারার কারন। একাত্ম হয়ে খেলার এই অভ্যাসটা আর যাই হোক কোনো কৌশলে অবলম্বনে মেলে না! পুরোটাই পারিপার্শ্বিক।

    ম্যারিহ্যামের সাফল্যের কারনও এর বাইরে নয়। ছোট দ্বীপ হওয়ায়, এখানকার মানুষের আত্মার সম্বন্ধটা গাঢ়। দলেও আছে এর প্রভাব। স্কোয়াডের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ের জন্মই অল্যান্ডে। তাই ক্লাব ফুটবলের আদি ঐতিহ্যের অকৃত্রিম প্রতিফলনটা অটুট আছে এখানে এখনও।

    নিজের শহরের খেলোয়াড় দিয়ে দল ভারী করার এই রীতিটা অনেক ধরেই বজায় আছে আইএফকেতে। বড় বাজেটের দল না হওয়ায়, বিদেশী খেলোয়াড়ের আধিক্য কম। যে ক’জন আছেন তাঁদের অনেকেই পৃথিবীর সেরা লিগে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন কোনো না কোনো কারণে। মূলত খরচ বহন করা সহজ বলেই এমন খেলোয়াড় বাছাই করে ক্লাব কর্তৃপক্ষ নিজেই!

    ঘরের খেলোয়াড়দের সাথে বিদেশীদের তাই মিলটা একেবারে মন্দ হয় না! সময়ের সাথে বন্ধুত্বে রূপ নেয় অল্যান্ডের ভৌগলিক অবস্থার কারনেই! সেই ব্যবস্থাটাও ক্লাব নিজেই করে।

    লিগের ১৬ টি অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে ফিনল্যান্ডের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতে হয় পুরো দলকে। বেশির ভাগ সময়ই ফেরীতে করে পুরো দল রওয়ানা হয়ে যায় হেলসিনকি অথবা সেইনোজোকির উদ্দ্যেশে। পুরো দল এক সাথে পাঁচ-ছয় ঘন্টার নিয়মিত নদী ভ্রমণেও যদি বন্ধুত্বটা গাঢ় না হয়ে উপায় কি? এমনও আমোদ প্রমোদেও যদি বন্ধু না জোটে আপনার কপালে, তবে আপনার শত্রুর তালিকাটা তো বেশ লম্বাই হবার কথা!

    এই বন্ধুত্বের জোরেই তো অনুপম এক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে আইএফকে ম্যারিহ্যাম। অসম্ভবকে সম্ভব করার এক ফুটবল মৌসুমে এই গল্পগুলোই প্রেরণা হয়ে থাকল অখ্যাত কোনো এক ফুটবল দলের জন্য।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন