• ইংল্যান্ড-বাংলাদেশ সিরিজ
  • " />
    X
    GO11IPL2020

     

    "এ পরাজয় লজ্জার নয়"

    বাংলাদেশের কাছে টেস্টে হারের পর ইংল্যাণ্ড মিডিয়ায় কুকদের চলছে মুন্ডুপাত। সবাই দলের সমালোচনায় মুখর হলেও টেলিগ্রাফের সাংবাদিক রব বাগসি ব্যাপারটা দেখছেন অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে। সেই লেখাটাই এবার প্যাভিলিয়ন পাঠকদের জন্য অনূদিত হলো...


    বাংলাদেশের কাছে ইংল্যান্ডের পরাজয়ের পর আবারও শুরু হয়েছে ‘লজ্জার’ খেলা। এমন পরাজয়কে কেবল হতাশাজনক নয়, আখ্যা দেয়া হচ্ছে মানহানিকর হিসেবে। বলা হচ্ছে এ হলো জাতীয় লজ্জা ও অমর্যাদা, যার কারণে খেলোয়াড়দের শাস্তির মুখোমুখি করা উচিৎ। কথাগুলো যেমন ভাষা হিসেবে কদর্য তেমনি স্ফূরিত হয়েছে তাৎক্ষণিক আবেগের বল্গাহীন প্রকাশ হিসেবে। শুধু তাই নয়, এটা ক্রিকেট নিয়ে বিতর্ককেও করেছে দ্ব্যর্থহীনভাবে নিম্নগামী।

    ১৮৮২ সালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে এমনই এক পরাজয়ের পর স্পোর্টিং টাইমস পত্রিকা ছেপেছিল ক্রিকেটের মৃত্যুর দুঃখময় বয়ান, যা পরের বছর ‘অ্যাশেজ পুনরুদ্ধার’ এর বীজমন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল ইংল্যান্ড অধিনায়ক ইভো ব্লিগকে। সে আগুন জ্বলছে এখনো।

    অবশ্য প্রতিক্রিয়ার বাড়াবাড়ির জন্য আমাদের অতটা দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ১৯৫৪ সালে ওভালে পাকিস্তানের কাছে প্রথমবারের মতো হেরে বসে ইংল্যান্ড। এর মাত্র সাত বছর আগে দেশটির জন্ম হয়েছিল। সে দলের অন্তত সাতজন ক্রিকেটারকে সর্বকালের সেরা ইংল্যান্ড দলের শীর্ষ ত্রিশে রাখা যায়। কিন্তু সেই তারাই কী না ফজল মাহমুদের তোপের মুখে অলআউট হয় ১৩০ ও ১৪৩ রানে।

    তখন কী ডেইলি টেলিগ্রাফের কিংবদন্তি সাংবাদিক ই ডব্লিউ সোয়ানটন দলের মুণ্ডুপাত করেছিলেন? না, তিনি তা করেন নি।  শুধু বলেছিলেন ইংল্যান্ড দলে প্রাণ চাঞ্চল্যের অভাব। বলেছিলেন কারণ বেশিরভাগ মানুষ ইংল্যান্ড ক্রিকেট সম্পর্কে যে বাড়াবাড়ি রকম উচ্চ ধারণা পোষণ করতো, তা খানিকটা মিইয়ে দিতে। পরম সুহৃদের মতো লিখেছিলেন, ‘এই ম্যাচটি ক্রিকেটের নবীনতম দলটির জন্য অনেক ইতিবাচক হবে।’

    সোয়ানটন যে জিনিসটা বুঝেছিলেন তা হলো প্রতিটি ক্রিকেট দলকে কোনো না কোনো সময় জিততে হবে। টেস্ট ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ইংল্যান্ডের নয়, দরকার বাংলাদেশের বিজয়। ইংল্যান্ডকে হারাতে দক্ষিণ আফ্রিকার সময় লেগেছে ১৭ বছর, ভারতের কুড়ি বছর, ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুবছর, নিউজিল্যান্ডের ৪৮, শ্রীলঙ্কার ১১ ও বাংলাদেশের ১৩ বছর।এদের মধ্যে প্রথম পাঁচটি পরাজয়ে নিশ্চয়ই অগ্নিশর্মা প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কিন্তু সে সব ক্ষেত্রে তেমন হাহাকারের প্রমাণ কিন্তু মেলে না। যদিও আমাদের কিছু গোঁড়া সমর্থক চান ইংল্যান্ড প্রতিটি খেলাতেই জিতুক কিন্তু বেশিরভাগের চাওয়া ক্রিকেট খেলাটির জয়। আমরা যেন ভুলে না যাই সিরিজে দুটি দলের পারফরম্যান্সই ছিল মনোমুগ্ধকর। ছিল সমানে সমান। চট্টগ্রাম ও মিরপুরের রুদ্ধশ্বাস আট দিনের পর যে কোনো মনোযোগী দর্শক দুদলকেই মাথা নুয়ে কুর্নিশ করবেন।

    এখানে আরো কিছু দারুণ ব্যাপার রয়েছে। জিম্বাবুয়ে ও ভগ্ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর ইংল্যান্ডই প্রথম দল যাকে বাংলাদেশ হারিয়েছে। বিগত দশ বছরে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোনো টেস্ট খেলেনি, ২০১০ সালের পর ভারতের সঙ্গে টেস্ট খেলেছে একবার-যা ড্র হয়েছিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে খেলেছিল দুটি টেস্ট যা ভেসে গিয়েছিল বর্ষার অঝোর জলে।

    ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ঢাকার আর্দ্র আবহাওয়ায় একটা স্পিনিং উইকেটে হেরে বসার চেয়ে খারাপ ঘটনা ঘটেছে। প্রতারক ব্যবসায়ী অ্যালান স্টানফোর্ডের সঙ্গে গাঁটছাড়া বাঁধার  মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা যেমন ঘটেছে তেমনি ‘রেবেল ট্যুর’ এর নাম করে বর্ণবাদে জর্জরিত দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করার মতো অবিবেচক সিদ্ধান্তও নিয়েছেন দলের কিছু ক্রিকেটার। ভব্যতার সঙ্গে সঙ্গে অবলীলায় পায়ে লুটিয়েছেন ইংল্যান্ড দলের প্রতি আনুগত্য।

    মাঠের কোনো বিপর্যয়ের সঙ্গে আসলে এসব কাজের কোনো তুলনা চলে না। কিন্তু মাঠেও এমন কিছু পরাজয় ঘটেছে যা বাংলাদেশের কাছে তিন দিনে পরাজয়ের চেয়ে কোনো অংশেই কম লজ্জাজনক নয়।  ২০০৬-০৭ ও ২০১৩-১৪ সালের অ্যাশেজে ৫-০ ব্যবধানে পরাজয়ের লজ্জা আছে। লজ্জার নিম্নতম পর্যায়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ছিল ১৯৮৮ সালে প্রধান নির্বাচক পিটার মে’র ‘ধর্মপুত্র’ ক্রিস কাউড্রেকে অধিনায়ক বানিয়ে ডেসমন্ড হেইন্স, ম্যালকম মার্শাল, কার্টলি অ্যামব্রোস ও কোর্টনি ওয়ালশের সামনে ঠেলে দেয়া।

    ফিল্ডিংয়ের জন্য ইংল্যান্ডের সমালোচনা করা যেতে পারে। সমালোচনা করা যেতে পারে বোলারদের অধারাবাহিকতা কিংবা ব্যাটিংয়ে চেনা ধসের জন্য। চট্টগ্রামে অলরাউন্ডাররাই ইংলিশদের জিতিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ঢাকায় সেটা ছিল তাঁদের সাধ্যের বাইরে। বাংলাদেশ লর্ডস ও চেস্টার লি স্ট্রিটের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছে এতো দিনে এসে। এটা সত্যি যে পরাজয়টি খুব একটা গৌরবের নয় কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য এটা হয়তো মোটেই খারাপ নয়। একমাত্র লজ্জার বিষয় হবে এখান থেকে শিক্ষা না নেয়া এবং অকারণ আফসোসের ঝড় তুলে বাস্তবতার পথে না হাঁটা।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন