• ফুটবল

যে শোক এখনো ভুলতে পারেনি ব্রাজিল...

১.

১৯৫০ বিশ্বকাপ কথা। এখনকার মত নক আউট নয়, সেবারের বিশ্বকাপটা হয়েছিল রাউন্ড রবিন নিয়মে। প্রত্যেক গ্রুপ থেকে দুটো করে দল নিয়ে পরবর্তী রাউন্ডে। ফাইনালের আগে পুরো টুর্নামেন্টে ৬ ম্যাচে ২২ গোল করলো ‘সেলেসাও’রা। পয়েন্ট টেবিলের এগিয়ে থাকার সুবাদে ড্র করলেই শিরোপা নিশ্চিত, পুরো দেশ ছিল উৎসবের অপেক্ষায়। ব্রাজিলের রিও-র 'ও মুন্ডো' পত্রিকায় ম্যাচের আগের দিনই ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের ছবি ছাপিয়ে ক্যাপশনও দিয়ে দেয়া হয়েছিল- 'এরাই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন'!অতি উৎসাহে দলকে আগাম শুভেচ্ছাটাও জানিয়ে রেখেছিলেন দেশটির তৎকালীন মেয়র। এমনকি জুলে রিমেও তাঁর নামাঙ্কিত ট্রফি দেয়ার সময় শুভেচ্ছা বক্তব্যের খসড়াতেও ব্রাজিলিয়ানদের বিজয়ী ভেবেই বক্তব্য সাজিয়েছিলেন। বিশেষ টি-শার্ট আর বিজয় মিছিল নিয়ে তৈরি ছিল রিওবাসী। এতে অবশ্য প্রচন্ড চটেছিলেন উরুগুইয়ের তখনকার অধিনায়ক অবদুলিও ভারেলা। ম্যাচের আগে দলের উদ্দেশ্যে রক্ত গরম করা এক বক্তৃতা দিয়েছিলেন ভারেলা। বক্তৃতা শেষে ‘ও মুন্ডো’র ওপর মূত্র বিসর্জন করেছিলেন উরুগুইয়ের খেলোয়াড়েরা। কে জানতো, ভারেলার বক্তব্যটি এমনভাবে কাজে দিবে...

 

২.

মারাকানায় সেদিন আসন্ন বিশ্বকাপ জয়ের সাক্ষী হতে নেমেছিল দর্শকের ঢল। জয়টা  দেখতে প্রায় পৌনে দুই লাখ সমর্থক এসেছিলেন মারাকানায়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোল দিয়ে ব্রাজিল এগিয়েও গিয়েছিল। এরপর উরুগুয়ে সমতা আনার পরও বিচলিত হননি ব্রাজিলিয়ানরা, স্রেফ একটা ড্র-ই তো। কিন্তু ম্যাচের মিনিট ১১ বাকি থাকতে ঘটলো বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটন। প্রথম গোলটা এসেছিল তাঁর পাস থেকেই। প্রতি আক্রমণে ব্রাজিলের ফুলব্যাক বিগোদেকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকলেন ঘিগিয়া। ক্রস আসবে ভেবে কিছুটা ডানে চেপে গেলেন কিপার মোকাইর বারবোসা। কপাল পুড়লো এতেই। জোরালো শটে বারবোসাকে ‘নিয়ার পোস্টে’ পরাস্ত করলেন ঘিগিয়া। ২-১ গোল এগিয়ে গেল উরুগুয়ে। উরুগুয়ের লিডে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ব্রাজিল গোলশোধ করতে পারলো না বাকি সময়টায়। বলা হয়, রেফারির শেষ বাঁশির পর মাঠে ও ব্রাজিলজুড়ে শতাধিক মানুষ হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ১৯৫০ সালের ১৬ জুলাইয়ের এই ঘটনাটিই ফুটবল ইতিহাসে পরিচিত ‘মারাকানাজো’ নামে, যা এখনো ব্রাজিল সমর্থকদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। ফাইনালে সমতাসূচক গোল করা শিয়াফিনোর ভাষ্যমতে, সেদিন মারাকানা যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। উরুগুয়ের খেলোয়াড়দের উদযাপন দেখে ব্রাজিলের ক্ষুদ্ধ্ব জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিপক্ষের ওপর। সমর্থকদের এলোপাথাড়ি আঘাতে আহত হন ঘিগিয়া, দেশে ফিরতে হয় ক্রাচে ভর করে।’১৪ বিশ্বকাপে বেলো হরিজন্তেতে জার্মানীর কাছে ৭-১ গোলে সেমিফাইনাল হারের কষ্ট ‘মারাকানাজো’র কাছে নস্যিই মনে হয়।

 

 

৩.

‘মারাকানাজো’র প্রায় অর্ধশতক পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন পর ব্রাজিলে আসলেন ঘিগিয়া। রিওর কাস্টমসে পাসপোর্ট চেকার তরুণী তাঁকে শুধালেন, “আপনি কি সেই ঘিগিয়া?” প্রত্যুত্তরে হ্যঁ-সূচক জবাব দিলেন এই উরুগুইয়ান। সাথে বললেন, “কিন্তু সেটা তো অনেক পুরনো কথা”। ঘিগিয়া কথা শেষ করতেই বুকের বামপাশে হাত রেখে তরুণী বললেন, “না, মারাকানাজো এখনো আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। এটা ভুলবার নয়। কোনো ব্রাজিলীয়ানই কখনোই এটা ভুলতে পারবে না”।

 

মাত্র তিনজন লোক মারাকানাকে স্তব্ধ করে দিতে পেরেছিলেন। পোপ জন পল আর ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা তার মধ্যে দুজন। তবে অ্যালসিডেস ঘিগিয়া ব্রাজিলকে যেভাবে শোকস্তব্ধ করেছিলেন, তার অভিশাপ আরও অনেকদিন বয়ে বেড়িয়েছে সেলেসাওরা। ঘিগিয়ার ওই গোলের মূল দায়টা নিতে হয়েছিল বারবোসাকে, পরের জীবনটা অভিশপ্ত হয়ে উঠেছিল এই গোলরক্ষকের। সমাজ থেকে একঘরে করে দেয়া হয়েছিল তাকে। ব্রাজিলের হয়ে এরপর আর খেলতে পারেননি। কোচিং কিংবা ধারাভাষ্যকার, কোনো চাকরিই জুটেনি। ’৯৪ বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের গোলরক্ষকদের পরামর্শদাতা হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন বারবোসা। কিন্তু তৎকালীন কোচ মারিও জাগালো বিনয়ের সাথে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিলেন। কোথাও গেলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হতো, “এই লোকের জন্যই ওই ম্যাচে ব্রাজিল হেরেছে।” বারবোসা জীবনের শেষদিকে দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলেছিলেন, "ব্রাজিলে কোনো অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ৩০ বছর, আর না করা এক অপরাধের জন্য আমি শাস্তি পেয়ে গেলাম জীবনের বাকি ৫০ বছর। কেবল আমাকেই দায়ী করা হয়, অথচ মাঠে আরো দশজন ছিলাম আমরা। এমনকি অপরাধীও অনেক সময় দন্ড দিয়ে মুক্তি পায়, কিন্তু আমি কারো কাছে ক্ষমা পাইনি কখনো।"

 

                         আমৃত্যু ওই অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হয়েছে বারবোসাকে 

বারবোসার পাশাপশি আরো দুজনকে এখনো ক্ষমা করেনি ব্রাজিলবাসী। এর একজন হলেন ব্রাজিলের তৎকালীন মেয়র। ব্রাজিলবাসীর বিশ্বাস, মেয়রের আগাম শুভেচ্ছার কারণেইদল হেরেছিল। আরেকজন অ্যালসিডেস গিঘিয়া।সেবারের নীল কলারের সাদা জার্সি দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় ব্রাজিল এমন জার্সিতে আর কখনোই খেলতে নামেনি।

 

এক বিশ্বকাপ দিয়ে কিংবদন্তী হয়ে যাওয়া এই গিঘিয়া উরুগুয়ের হয়ে খেলেছিলেন মাত্র ১২টি ম্যাচ। গোল করেছিলেন ৪টি, সবকটিই ’৫০ বিশ্বকাপেই। ১৯২৬ সালে উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে জন্মগ্রহণ করেচন গিঘিয়া। তরুণ বয়সেই গতি ও ড্রিবলিং দিয়ে নজর কাড়েন একাধিক ক্লাবের। ক্লাব সুদা আমেরিকায় বছর দুয়েক কাটিয়ে যান উরুগুয়ের সেরা ক্লাব পেনারোলে। ‘লস মিরাসোলেস’ দের হয়ে ধারাবাহিকতার সুবাদে ইউরোপের ক্লাবগুলোর চোখে পড়েন। ইতালীয়ান জায়ান্ট রোমায় কাটিয়ে দেন ক্যারিয়ারের আট বছর। এরপর এসি মিলানে বছরখানেক খেলে ফিরে আসেন স্বদেশে। দানুবিওতে ৫ বছর খেলে ইতি টানেন বর্ণাঢ্য ও বর্ণীল এক ক্যারিয়ারের।

 

কথায় আছে, সময় সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। ব্রাজিল ও ঘিগিয়ার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। ২০০৬ সালে উরুগুয়ের রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়ার চার বছর পর সেই মারাকানাতেই জাঁকজমকপূর্ণ এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘিগিয়াকে সম্মান জানায় ব্রাজিল। সেই অনুষ্ঠানেই ঘিগিয়ার পায়ের ছাঁচ নিয়ে ফ্রেমে বন্দি করে ঝোলানো হয় মারাকানার ‘ওয়াল অফ ফেম’-এ,  পেলে, ইউসেবিও, বেকেনবাওয়ারদের পায়ের ছাপের সাথে।

 

ব্রাজিল নিয়ে কখনোই ক্ষোভ ছিল না ঘিগিয়ার, এমনকি ফাইনালের পরেও না। তবে ব্রাজিলীয়ানদের তাঁর প্রতি বিদ্বেষটা ঠিকই বুঝতেন। এক সাংবাদিকের এ বিষয়ে প্রশ্নে  বলেছিলেন, “ব্রাজিলের সমর্থকদের জায়গায় আমি থাকলে আমি এমনটাই করতাম খুব সম্ভবত”। ৮৫ বছর বয়সে মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে কোমায় ছিলেন মাসখানেক। মৃত্যুর কবল থেকে ফিরেও এসেছিলেন, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েই। অবশ্য ফুটবলপাগল এক জাতিকে একা যিনি কাঁদিয়েছিলেন, তাঁর জন্যে কোমা থেকে ফিরে আসা কি খুব অসম্ভব কিছু?

 

১৬ জুলাই, ২০১৫। নিজ বাসভবনে ছেলের সাথে ফুটবল নিয়ে কথা বলছিলেন ঘিগিয়া। হঠাৎই শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় তাঁর। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তাররা ঘিগিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। ’৫০ বিশ্বকাপ ফাইনালের খেলোয়াড়দের মধ্যে এতদিন কেবল ঘিগিয়াই বেঁচে ছিলেন। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য, যেই ম্যাচ তাঁকে কিংবদন্তী বানিয়ে দিয়েছিল, সেই ‘মারাকানাজো’র ৬৫তম বর্ষপূর্তিতেই পরলোকগমন করেন ঘিগিয়া। মৃত্যুবরণের সময়ে সর্বজ্যেষ্ঠ বিশ্বকাপজয়ী ছিলেন তিনিই। ঘিগিয়ার মৃত্যুর সঙ্গেও তাই বাঁধা পড়েছে সেই মহাকাব্যিক ম্যাচের স্মৃতি।