• ফুটবল

একজন "সুকারম্যানের" গল্প

পোস্টটি ২৫০০ বার পঠিত হয়েছে

১.
’৯৬ ইউরোর কথা। বছর পাঁচেক আগে ইয়ুগোস্লাভিয়া ভেঙ্গে স্বাধীন হওয়া দেশ চারটির একটি ছিল ক্রোয়েশিয়া। ইউরোর ১০ম আসরটি ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ক্রোয়েশিয়ার অভিষেক। জার্মানীর কাছে হেরে যাত্রাটা কোয়ার্টার ফাইনালেই থেমে গিয়েছিল জার্নি, ভ্লাওভিচদের। তবে সেবার ’৯২-এর চ্যাম্পিয়ন ডেনমার্ককে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ঠিকই নজর কেড়েছিল ‘লা ভাত্রেনী’রা। ৩ গোল করে আলোটা সবচেয়ে ছড়িয়েছিলেন স্ট্রাইকার ডেভর সুকার, বছর দুয়েক পরেই যার নাম স্বর্ণখচিত হতে যাচ্ছিল ফুটবলীয় রূপকথায়।

 

২.
‘৯৬ ইউরোতে সাড়া জাগানো ক্রোয়েশিয়া ফ্রান্স বিশ্বকাপের টিকেট পায় প্লে-অফে ইউক্রেনকে হারিয়ে। গ্রুপপর্ব পেরিয়ে রোমানিয়াকে হারিয়ে কোয়ার্টারেও চলে গেল ক্রোয়েশিয়ানরা। প্রতিপক্ষ? সেই জার্মানীই। তবে এবার আর স্বপ্নভঙ্গ হয়নি ‘ডি ম্যানশ্যাফট’দের কাছে। ৩-০ গোলে জার্মানদের রীতিমত ধসিয়ে দিয়েই সেমিতে চলে যায় সুকারের দল। সেমিতে স্বাগতিক ফ্রান্সের বিপক্ষে এগিয়েও গিয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু লিলিয়ান থুরামের জোড়া গোলে ফাইনালে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়নি ক্রোয়েশিয়ার। অবশ্য নেদারল্যান্ডকে হারিয়ে তৃতীয় স্থানটা ঠিকই নিজেদের করে নিয়েছিলেন সুকাররা। ৮৫ মিনিটে দুর্দান্ত এক চিপে জয়সূচক গোল করেছিলেন তিনি, যা এখনো ইউরোর সর্বকালের অন্যতম সেরা গোল। বাছাইপর্বে ৫ গোলের পাশাপাশি মূলপর্বে করলেন ৬ গোল। বাতিস্তুতা, অঁরি, রোনালদোদের টপকে ’৯৮ বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটটা জিতেছিলেন ক্রোয়েশিয়ার ‘সুকারম্যান’ই।

গোলের সাথে সখ্যটা তাঁর ছেলেবেলা থেকেই। ক্যারিয়ারটা শুরু হয়েছিল স্বদেশী ক্লাব ওসিয়েকে। সেখানে পাঁচ মৌসুম কাটানোর পর যোগ দেন ক্রোয়েশিয়ান জায়ান্ট ডায়নামো জাগ্রেবে। ক্রোয়েশিয়ান লিগে ঐ সময়ে ম্যাচ খেলেছিলেন শ’ দুয়েকের মত, গোল করেছিলেন প্রায় দেড় শতাধিক! ক্রোয়েশিয়ার স্বর্ণযুগের প্রধান সেনানী হিসেবে সুকারের নামটাই আসে সবার আগে। জাগ্রেবের হয়ে মাঠ কাঁপানোর পর পাড়ি জমান সেভিয়ায়। ক্রোয়েশিয়ান লিগে নিজেদের প্রিয় ‘সুকারম্যান’ এর শেষ ম্যাচের দিন তাঁকে অশ্রুসজল নয়নে বিদায় জানিয়েছিল জাগ্রেব সমর্থকেরা। 

স্প্যানিশ লিগে মানিয়ে নিতে সময় নেননি মোটেও। সেভিয়ার হয়ে ৫ বছরে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনবার, বর্ষসেরা খেলোয়াড়ও হয়েছেন দুবার। স্পেনের রাঘব বোয়ালদের (বার্সা, রিয়াল) বিপক্ষে লক্ষ্যভেদ করাটা যেন সুকারের ‘বাঁ হাতের খেল’ই ছিল। রিয়াল মাদ্রিদ কিংবদন্তী হিয়েরো তো বলেই দিয়েছিলেন, সুকারের মত আর কেউই তাঁকে এতবার এমন কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারেননি। গতি, ড্রিবলিং, প্রেসিং, হেডিং- একেবারে যেন ‘কমপ্লিট প্যাকেজ’ই ছিলেন সুকারম্যান।


সেরা তারকাদের দলে ভেড়ানোয় রিয়াল মাদ্রিদের জুড়ি মেলা ভার। ’৯৬-এ সুকারকে কিনে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। এক্ষেত্রে অবশ্য টাকার গরমের চেয়েও আরেকটি বড় বিষয় ছিল। ছোটবেলা থেকেই রিয়ালের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন সুকারের পরিবার। রিয়ালের অফার শুনেই বলতে গেলে এক পায়েই খাঁড়া ছিলেন সুকার। ‘৯৬-এ সেভিয়া পাট চুকিয়ে ‘লস ব্লাঙ্কোস’ শিবিরে যোগ দেন সুকার। 

রিয়ালে আসার আগে ক্যারিয়ারে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের দেখা পেয়েছিলেন। রিয়ালেই ক্যারিয়ারের প্রথম লিগ শিরোপার দেখা পান। ২৪ গোল করে রিয়ালের ২৭তম লিগ শিরোপা জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছিলেন সুকারই। একই মৌসুমে স্প্যানিশ সুপারকাপটাও জিতে নেয় রিয়াল। পরবর্তী মৌসুমে আসে ক্লাব ক্যারিয়ারে সুকারের শ্রেষ্ঠ মুহুর্ত। বার্সেলোনার কাছে লা লিগা হারালেও ৭ম বারের মত সেবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগটা জিতে নেয় রিয়াল। একই মৌসুমে ভাস্কো দা গামাকে হারিয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপও ঘরে তোলে রিয়াল। রিয়ালে তিন মৌসুম ছিলেন এই কিংবদন্তী ‘হিটম্যান’। চিরপ্রতিদ্বন্দী বার্সাকে পেলেই জ্বলে ওঠায় অল্প সময়েই বার্নাব্যুর প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন সুকার। বার্সার বিপক্ষে রিয়ালের হয়ে ম্যাচ খেলেছিলেন ৮টি, যার মধ্যে গোল করেছেন ৫টিতেই, বাকি দুটিতে পেয়েছিলেন অ্যাসিস্ট। কেবল এক ম্যাচেই সুকারের হাত থেকে ‘রক্ষা’ পেয়েছিল কাতালানরা। সেভিয়া, রিয়াল মিলিয়ে মোট আট বছর স্পেনে ছিলেন সুকার। সাড়ে তিনশোর মত ম্যাচে খেলে গোল করেছিলেন প্রায় দু’ শতাধিক। ‘বিগ গেম প্লেয়ার’ হওয়ার কারণে অচিরেই লা লিগার সর্বকালের সেরা বিদেশীদের কাতারে চলে আসেন সবার প্রিয় ‘সুকারম্যান’।

 


১৯৯৮ সালটা বলতে গেলে স্বপ্নের মতই কেটেছে সুকারের। ক্লাব পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউয়েফা সুপার কাপ জিতে ক্রোয়েশিয়ার প্রথম বিশ্বকাপের দলেও জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। বাছাইপর্বে ৫ গোল করা সুকার মূলপর্বে জ্বলে ওঠেন আরো প্রবলভাবে। টুর্নামেন্টে খেলা ৭ ম্যাচের ৬টিতেই গোল পেয়েছিল ক্রোয়েশিয়া, এর প্রতিটিতেই গোল করেছিলন সুকারও। শেষ ষোল(রোমানিয়া), কোয়ার্টার ফাইনাল(জার্মানী), সেমিফাইনাল(ফ্রান্স), তৃতীয় স্থান নির্ধারণী(নেদারল্যান্ড)- ক্যারিয়ারজুড়ে বয়ে বেড়ানো ‘বড় ম্যাচের খেলোয়াড়ের’ তকমাটার সুবিচার করেছিলেন নিজের ও দেশের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টে। সেমিতে থুরামের জোড়া গোলে স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার পর সুকারের কান্না আজো ক্রোয়েশিয়া সমর্থকদের নাড়া দেয়।

 

’৯৮ বিশ্বকাপ দুহাত ভরে দিয়েছিল সুকারকে। গোল্ডেন বুট, সিলভার বল, বিশ্বকাপের অলস্টার দলে জায়গা, ব্যালন ডি’অর রানার আপ, ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের প্রতিযোগীতায় তৃতীয়, ক্রোয়েশিয়ার বর্ষসেরা ফুটবলার- কী জেতেননি সুকার! কিন্তু এখনো ফ্রান্স বিশ্বকাপের ফাইনালে যেতে না পারাটা পোড়ায় সুকারকে। ক্রোয়েশিয়ার হয়ে ৬৯ বার মাঠে নেমেছিলেন সুকার। গোল করেছেন ৪৫টি, যা এখনো টপকাতে পারেনি কেউই।

ফ্রান্স বিশ্বকাপের কিছু পরেই আনেলকার সাথে ‘সোয়্যাপ ডিলে’ রিয়াল ছেড়ে আর্সেনালে পাড়ি জমান সুকার। আর্সেনালে ছিলেন এক মৌসুমই। ইঞ্জুরি জর্জরিত এক মৌসুমেও ১৫ ম্যাচে ১০ গোল করেছিলেন সুকার। গালাতাসারায়ের কাছে পেনাল্টিতে না হারলে ’০০ ইউয়েফা কাপটাও ঘরে তুলতে পারতেন সুকার। পরের মৌসুমেই লন্ডনের আরেক ক্লাব ওয়েস্ট হ্যাম ও পরবর্তীতে ১৮৬০ মিউনিখে গেলেও আগের মত আলো ছড়াতে পারেননি সুকার। বয়সের ভার ও ইঞ্জুরি ঝামেলায় ২০০৩ সালেই বুটজোড়া তুলে রাখেন। 

২০১২ থেকে নিজদেশের ফুটবলের ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন সুকার। ‘ওয়ার্ল্ড সকার’ এর বিংশ শতাব্দীর সেরা ১০০ খেলোয়াড়ের তালিকায় সুকারের নামটা আছে প্রথম দিকেই। ‘ফিফা ১০০’ লিস্টেও আছেন তিনি। ২০০৪ সালে ইউয়েফার কাছ থেকে পেয়েছিলেন ‘ক্রোয়েশিয়ার শ্রেষ্ঠ সন্তান’ এর উপাধি। পেলের ‘সেরা ১২৫ কিংবদন্তী’র তালিকাতেও আছেন সুকার। যেকোনো বিশ্বকাপে কোনো খেলোয়াড়ের একক নৈপুণ্য বিচার করলে শুরুর  দিকেই থাকবথাকবে সুকারের ’৯৮ বিশ্বকাপ। ক্লিন্সম্যান, সামারদের জার্মানীকে প্রায় একাই হারিয়ে দিয়েছিলেন সুকার। নব্বইয়ের দশকটাকে বলা হয় ক্রোয়েশিয়ার স্বর্ণযুগ। মদ্রিচ, রাকিটিচ, পেরিসিচদের হাত ধরে আরো এক স্বর্ণযুগের স্বপ্ন দেখছে ক্রোয়েশিয়া। তবে এখনো সুকারের কোনো যোগ্য উত্তরসূরি পায়নি তারা। কোচ কাচিচের মতে, “সুকারের মত আর কেউ কখনো আসেনি, আর কখনো আসবেও না”।

ডেভর সুকারের মাহাত্ম্য এখানেই। এজন্যই সুপারম্যানের নামের সাথে মিলিয়ে ফুটবল অনুরাগীদের কাছে তাঁর পরিচয়টা ‘সুকারম্যান’ নামেই।