• " />

     

    দীপ জ্বেলে যাই...

    তখনও ভূমিষ্ঠ হননি। মায়ের গর্ভে থাকার সময়েই ডাক্তাররা নিজেদের আশংকার কথাটা জানিয়েছিলেন পরিবারকে। শেষ পর্যন্ত ডাক্তারদের শঙ্কাটাই সত্য হলো। দাদি, খালা ও মায়ের মতো অন্ধ হয়েই জন্ম নিলেন। পুত্রসন্তান হওয়ার আনন্দটা মুহূর্তেই উবে গেলো হতদরিদ্র পরিবারটির। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে কীভাবে টিকে থাকবে ছেলেটি? বড় হয়ে পরিবারের হালই বা ধরবে কীভাবে? কিন্তু ‘চোখের আলো’ নেই তো কী হয়েছে, ‘মনের আলো’ দিয়েই বিশ্বজয় করেছেন শেখর নায়েক। প্রথম প্রতিবন্ধী ক্রিকেটার হিসেবে জিতে নিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘পদ্মশ্রী’।

     

    তাঁর জীবনটা রুপালী পর্দার যেকোনো নায়কের গল্পকেও হার মানায়। কর্ণাটকের সিমোগায় বসবাস করা পরিবারের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ অবস্থা। ছোটবেলা থেকেই শেখর বুঝে গিয়েছিলেন, সবার কাছে অনেকটাই ‘বোঝা’ তিনি। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজনদের ঠাট্টা তামাশা হজম করেই পার করেছেন শৈশব। পড়াশুনার প্রচণ্ড ইচ্ছে ছিল, ইচ্ছে ছিল বন্ধুদের মতো ব্যাট-বল হাতে মাঠ দাপিয়ে বেড়ানোর। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।  

     

     

    কিন্তু ওই যে বলেছিলাম, তাঁর গল্পটা সিনেমার নায়কের মতো! ৮ বছর বয়সে দুর্ঘটনাবশত বাড়ির পাশের খালে পড়ে যান। আহত হওয়ায় ব্যাঙ্গালুরুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর একজন চোখের ডাক্তারের সাথে দেখা হয় শেখরের পরিবারের। তাঁর সাহায্যেই অনেক প্রচেষ্টার পর ডান চোখের কিছুটা দৃষ্টি ফিরে পান। তবে বাঁ চোখের কোনো সুরাহা করা যায়নি। ১৯৯৬ সালে অন্ধদের জন্য তৈরি ‘শ্রী শারদা দেবী’ স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন নায়েকের মা। সেখানেই ক্রিকেটের হাতেখড়ি, সেখানেই স্বপ্নযাত্রার সূচনা।

     

    মাত্র এক বছরেই নিজের আগমনী বার্তা জানিয়ে দেন। উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান নায়েকের খেলায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে রাজ্য দলে নেওয়া হয়। কিন্তু খুব একটা খেলার সুযোগ হতো না, বেশিদূর এগোতেও পারছিলেন না। একটা সময় তো মনে মনে ভেবেই নিয়েছিলেন, কখনোই হয়তো জাতীয় দলে খেলতে পারবেন না। অবশেষে ২০০৬ সালে ভাগ্যদেবী মুখ ফিরে তাকান। কর্ণাটকের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া নায়েক নিজের প্রথম সিরিজেই ম্যান অফ দা সিরিজ হন। ভারতের আকাশী-নীল জার্সি গায়ে মাঠে নামার স্বপ্ন পূরণ হয়, দূর হয় অন্ধ হওয়ার হতাশাও। ২০১২ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যও ছিলেন।

     

     

    একটা স্বপ্ন কিন্তু তখনো বাকি ছিল। ভারতের অধিনায়ক হয়ে বিশ্বকাপ ট্রফিটা তুলে ধরা। ২০১৪ সালে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে হারিয়ে অন্ধ ক্রিকেট বিশ্বকাপের চতুর্থ সংস্করণ জিতে নেয় ভারত। ম্যাচের পর অধিনায়ক নায়েক জানান, সম্পূর্ণ নিজেদের পরিশ্রমের ফলেই এই জয়টা এসেছে। বোর্ডের প্রতি নিজের ক্ষোভটাও উগরে দেন। দেওয়াটাই স্বাভাবিক, তাঁদের মাসিক বেতন যে মাত্র ১৩ হাজার রুপি! যেখানে অন্য সবখানে টাকার ছড়াছড়ি, সেখানে তাঁদের সাথে কেন এই বৈষম্য?

     

    'কেন এই বৈষম্য', সেবার শেখর এই প্রশ্নের কোনো উত্তর পাননি। নীরবে সবকিছু সয়েই খেলা চালিয়ে গিয়েছেন। তবে এই বছর তাঁর সাথে কোনো ‘বৈষম্য’ হয়নি।  দেশকে বহু সাফল্য এনে দেওয়া  ভারতের জাতীয় দলের অধিনায়ক বিরাট কোহলির সাথে তিনিও মনোনীত হন ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারের জন্য। এখন শুধু অপেক্ষা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরষ্কার নেওয়ার মুহূর্তের।

     

     

    কঠিন এক যাত্রা পাড়ি দিয়েছেন। শেখরের এখন একটাই লক্ষ্য, পুরো ভারতের অন্ধ ক্রিকেটারদের সাহায্য করবেন, তাঁদেরকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাবেন। এই লক্ষ্যে ২০০৫ সাল থেকে ‘সমর্থন’ নামের একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। অভাবের কারণে কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে সেজন্য আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থাও করেছেন।


    অন্য দশজনের মতো পৃথিবীর আলো দেখার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। আজীবন অন্ধকারে থাকা মানুষটা ঠিকই নিজের জীবনকে 'আলোকিত' করেছেন। এখন অন্যদের জীবনেও আলো আনছেন। অন্ধকার ভুবনে ক্রিকেটের 'দীপ জ্বেলে যাওয়াই' শেখর নায়েকের জীবনের প্রতিচ্ছবি।

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন