• চ্যাম্পিয়নস লিগ
  • " />

     

    পিএসজির যত ভুল...

      শেষ বাঁশি বাজতেই হাঁটু গেড়ে মাঠে বসে পড়লেন কেভিন ট্র্যাপ। একবার, দুইবার নয় তাঁর জালে আজ বল জড়িয়েছে ছয় বার। মার্কো ভেরাত্তির দশাও একইরকম। বসে মুখটা আড়াল করতে চাইছেন বারবার।  যে মাঠে রাজ্যের হতাশা নিয়ে আক্রোশে মুখ লুকাতে চাইছেন পিএসজি খেলোয়াড়েরা সেখানেই তখন চলছে বাঁধভাঙা উল্লাস। ফুটবল মাঠে এই চিত্র নতুন কী? কিন্তু ন্যু ক্যাম্পে যা ঘটে গেল তা তো নতুনই। বার্সেলোনা সেই গৌরবগাঁথার সাক্ষী আর পিএসজি তার শিকার।



      কিন্তু ওই একটা মুহুর্ত, একটা ক্ষণ- বদলে দিল সব হিসেব নিকেশ। পাল্টে গেল ফল, হয়ে গেল ইতিহাস। অথচ প্রথম লেগের পর এই দলটার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল সবাই। ঠিক এই দলটাই বার্সেলোনাকে সেদিন দুমড়ে মুচড়ে ধ্বংস করে দিয়েছিল প্যারিসে। এই উনাই এমরির ‘মাস্টারপ্ল্যানই’ সেদিন সশব্দে চপোটাঘাত করেছিল লুইস এনরিকের খেলার ধরণকেই। অথচ মাত্র দু’ সপ্তাহের ব্যবধানে কেমন বদলে গেল সবকিছু! ক্যামেরা যখন বারবার খুঁজে ফিরছে মাঠে উন্মাতাল উদযাপনরত এনরিকে কে, তখন উনাই এমরিকে খুঁজে পাওয়াই গেল না! ডাগআউট থেকে ড্রেসিংরুমের পথটা বোধ হয় এর চেয়ে লম্বা কখনও মনে হয়নি এমরির কাছে। আর মাঠে থেকে ডি মারিয়া, কাভানিরা হয়ত অনন্তকাল ধরেই পাড়ি দিয়েছিলেন ওই পথটুকু!

    কেন এমন হল? কি এমন হল যে চার গোলের লিডও ধরে রাখা গেল না? ড্রেসিংরুমে পৌঁছে অবধারিত এই প্রশ্নের উত্তর কি কেউ খুঁজতে চেষ্টা করেছিলেন সে রাতে?

    এই প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যাবে আমাদের কাছে। তবে পিএসজির ভরাডুবি ব্যাখ্যা করতে রকেট সায়েন্স জানবার প্রয়োজনও নেই! একেবারেই মৌলিক কিছু বিষয় দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায় পিএসজির এমন হার। কী ভুল ছিল প্যারিসের সেন্টদের?



    গোড়ায় গলদঃ

    পাহাড় সমান বাধা পাড়ি দেবার ‘দুরাশা’ নিয়ে এক হাইব্রিড ফরমেশন নিয়ে খেলতে নেমছিলেন লুইস এনরিকে। ক্রুইফের ডায়মন্ড আর ৩-৫-২ এর এক বিটকেলে মিশ্রণ। তিনজন ডিফেন্ডারের সাথে তিন মিডফিল্ডার আর উপরে চারজন! লা লিগায় গত সপ্তাহের সেল্টা ভিগোর বিপক্ষে বার্সার ম্যাচ রিভিউতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেও আগে থেকে আন্দাজ করা সম্ভব ছিল এনরিকের তিন ডিফেন্ডার খেলানোর পরিকল্পনার কথা। এনরিকের চারজনের জায়গায় তিন মিডফিল্ডার নিয়ে খেলতে নামাটাই যা একটু ভ্রু কুঁচকে দেয়ার সামর্থ্য রাখে!

    ওদিকে ম্যাচের আগেই নিজেদের এক ধাপ নামিয়ে নিল পিএসজি প্রথম লেগের ফরমেশন বদলে। ৪-৩-৩ এর বদলে নামল ৪-৫-১ এ। চার গোলে এগিয়ে থেকে, প্রতিপক্ষের তিন ডিফেন্ডার খেলানোর গ্যাম্বলিংয়ের কথা জেনেও রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে নামাটাই ছিল এমরির ভুল। সেই ভুল প্রমাণ হতে সময় নিল মাত্র তিন মিনিট।

    কিক অফ থেকেই এক কাভানি বাদে বাকি সব পিএসজি খেলোয়াড় চলে গেলেন নিজেদের অর্ধে। প্রতিপক্ষকে আক্রমণের আমন্ত্রণটা তখন থেকেই দিয়ে রাখলেন উনাই এমরি। সেই দাওয়াতে সায় দিয়ে গতি, আক্রমণাত্মক মনোভাব আর জয়ের তীব্র আশা নিয়ে প্রথম মিনিট থেকেই একরকম ঝাপিয়ে পড়ল বার্সা।

    সুয়ারেজের হেডে করা ওই গোলে তেমন কোনো কৌশল বা ফরমেশনের মারপ্যাঁচ ছিল না। গোল করতে মরিয়া এক দলের, ভুল কৌশল নিয়ে খেলতে নামা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ছোট একটা যুদ্ধ জয় ছিল সেটা।

    তিন মিনিটের ওই গোলের পর ‘ভয়’টা সত্যিকারভাবেই জেঁকে বসে পিএসজি খেলোয়াড়দের মনে। প্রথমার্ধের বাকিটা সময়ও ওই ‘জুজুর’ ভয়ে নিজেদের অর্ধ ছেড়ে বের হওয়ার সাহস কমই দেখিয়েছিল পিএসজি! অথচ প্রতিআক্রমণে পাওয়া পিএসজির দু একটা কর্নারেও চিড় ধরে যাচ্ছিল বার্সা রক্ষণে। এমন সময় বার্সার হাই প্রেসিং গেমের বিপক্ষে এমরির কৌশল ছিল নিজেদের অর্ধে বসে কোনোমতে বল ক্লিয়ার করা!

    তিন গোল হজম করার পর টনক নড়ে পিএসজির! দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে প্রতিরোধের সাথে প্রতিবাদ করে প্রতিপক্ষকে যে একটু শাসিয়েও দিতে হয় সেই জ্ঞানটা এলো পঞ্চাশ মিনিটের পর! আর ফল মিলতে অপেক্ষা করতে হল মাত্র বারো মিনিট। কাভানির ওই গোলই তো খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছিল বার্সাকে।

    বড় ম্যাচ খেলার অনভিজ্ঞতা?

    ডি মারিয়া মাঠে নামার পর বদলে যায় পিএসজির ধরণ। দারুণভাবে ম্যাচে ফেরে প্যারিসের দলটি। এডিনসন কাভানির মারকুটে ফিনিশে প্রত্যাশিত সেই গোলের দেখাও মেলে। টাচলাইনে পিএসজি কোচের উদযাপনও বলে দিচ্ছিল এই গোল দিয়েই বার্সার সব উত্তেজনায় জল ঢেলে দেয়া গেল! ম্যাচটা তো মৃত্যুবরণ করেছিল সেখানেই!




    এরপরও আরও দুই বার এগিয়ে নিতে পারতেন কাভানি- ডি মারিয়া। পারেননি। শেষ দিকে তাই হারার আগেই হেরে বসে তারা। শেষ ৭ মিনিটে তিন গোল হজম করা স্রেফ মনস্তাস্ত্বিক লড়াইয়ের কাছে হার মানা ছাড়া আর কিছুই নয়।

    এই দায় কার উপর বর্তায়? খেলোয়াড়? ম্যানেজার? না ফ্রেঞ্চ লিগে নিজেদের চেয়ে কয়েক গুণ নিচু মানের দলগুলোর সাথে একের পর এক নিরুত্তাপ ম্যাচ খেলার উপর?

    কোথায় গেল সেই মিডফিল্ড?

    প্রথম লেগে ভেরাত্তি, রাবিওট আর মাতুইদির সমন্বয়ে গড়া সেই মিডফিল্ডটাই আসলে ধস নামিয়েছিল বার্সেলোনার। অথচ এই ম্যাচে অন্য এক কৌশল নিয়ে নামলেন এমরি! সবচেয়ে বড় ভুল ছিল বোধ হয় এটিই।

    ডিফেন্সের অস্বস্তিটা এসে ভর করেছিল মিডফিল্ডেও। বিশেষ করে নেইমারকে সামলাতে আন্দ্রিয়ান রাবিওটের হিমশিম খাওয়াটা ছিল চোখে লাগার মতোই। আগের ম্যাচের সেই ভেরাত্তিও ছিলেন অনুপস্থিত। ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার সিলভার মতো তার স্বদেশী লুকাস মউরাও হতাশ করেছেন। মেসিকে আটকে রেখে নিজের কাজটা শুধুমাত্র করতে পেরেছেন ব্লেইস মাতুইদি।

    সুয়ারেজের প্রথম গোলের পর রক্ষণের মতো পিএসজির মাঝমাঠকেও মনে হয়েছে দিশেহারা, দিকনিশানাহীন। প্রথমার্ধের পুরোটা সময় নিজেদের অর্ধের এক তৃতীয়াংশ পার হতেই হিমশিম খেতে হয়েছে ৫ মিডফিল্ডার নিয়ে খেলতে নামা পিএসজিকে। যতবার বার্সার অর্ধে বল গড়িয়েছে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে পিকে অথবা রেজিস্তা পজেশনে খেলা বুসকেটস আবার সেই বল যোগান দিয়েছেন মেসি, নেইমারদের। প্রতি আক্রমণেও তাই ভুগতে হয়েছে পিএসজিকে।

    বডিলাইনে ডান দিক দিয়ে রাফিনহা সতীর্থ নেইমারের মতো ত্রাস সৃষ্টি না করতে পারলেও পিএসজির মাঝমাঠের ফাঁকা জায়গা বের করে দেয়ার কাজটা ভালোই করছিলেন। অন্যদিকে নেইমার তো পুরো ম্যাচ জুড়েই ছিলেন সপ্রতিভ।

    মেসিকে কড়া মার্কিংয়ে রেখেও তাই শেষ পর্যন্ত লাভ হয়নি; মাতুইদির সব কষ্টই গেছে বিফলে! দলের প্রয়োজনেই মাঠে মেসির স্বভাবসুলভ স্বাধীনতাটা এই ম্যাচে ভোগ করেছেন নেইমার। আর ম্যাচটাও শেষ পর্যন্ত বের করে এনেছেন তিনিই।  

    “এনিথিং দ্যাট ক্যান গো রঙ, উইল গো রঙ”

    মারফির ‘ল’- টাই আসলে ম্যাচ শেষে প্রমাণ হয়েছে আরেকবার পিএসজির জন্যে। ম্যাচ ফিটনেসের জন্যে শুরুতেই একাদশে জায়গা হারালেন ডি মারিয়া। আগের ম্যাচ জয়ের নায়ক যিনি। ৫৫ মিনিটে মাঠে নামার পর তিনিই দেখিয়ে দিয়েছিলেন বার্সার ‘থ্রি ম্যান’ ডিফেন্স আসলে কতোটা ঠুনকো! ডি মারিয়া শুরু থেকেই দলে থাকলে হয়ত গল্পটা অন্যরকমও হতে পারত!

    উনাই এমরির কৌশল তো বটেই, মাঠের ‘ফিফটি-ফিফটি’ লড়াই গুলোতেও হাই প্রেসিং গেমের কাছে পরাজয় মেনে নিতে হয়েছে পিএসজিকে। সব বিপক্ষে যাওয়ার দিনে রেফারির নেয়া সিদ্ধান্তগুলোও গেছে পিএসজির বিপক্ষেই! প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের গায়ে লেগে নেইমারের মতো পড়ে যাওয়ার ঘটনায় হয়ত সবসময় স্পট কিকের বাঁশি বাজান না রেফারিরা। অথবা ৯০ মিনিটে মার্কিনহোসের হাতের আলতো ছোঁয়ায় হুড়মুড় করে সুয়ারেজের পড়ে যাওয়াটাও হয়ত রেফারিরা সবদিন ভালো চোখে দেখেন না! অজুহাত দাঁড় করানো যায়, হয়ত যুক্তিযুক্ত কারণও খোঁজা যায়। কিন্তু চার গোলে এগিয়ে থেকেও পরের লেগে শুধু ‘রেফারির সিদ্ধান্তে’ ছয় গোল হজম করার যুক্তিও ধোপে টেকে না।  

    দিন যখন খারাপ যায়, সেদিন বোধ হয় ভালো কিছুর আশা না করাই শ্রেয়! বার্সেলোনার অভাবনীয় জয়ের মতো ঠিক ততোটাই অবিশ্বাস্য আসলে পিএসজির হারটাও। 

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন