• " />

     

    তিনি একা পথে...

    ১.

    একটা বেল তুলে নিয়ে ব্যাটের হাতল দিয়ে টোকা মারছেন পিচে। গর্ত হচ্ছে ক্ষুদ্রাকায়। সেই ব্যাটসম্যান আদতে নিচ্ছেন গার্ড। কোন ব্যাটসম্যান, তা কি বলতে হবে?

     

    ২.

    এই ইংলিশ গ্রীষ্মেই বয়স হবে ৪৩। হ্যাঁ, ৪৩। ছেলে শুধু বড় হয়নি, রীতিমতো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে। শুধু কি তাই! বাপ-বেটাতে একই ইনিংসে ফিফটি করেছেন এইতো গত মাসে। শিবনারাইন ও তেজনারাইন চন্দরপল যেন ক্রিকেটকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই কবেকার দিনে!

    প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে একই ইনিংসে পিতা-পুত্রের ফিফটি করার ঘটনা শেষ ঘটেছিল প্রায় ৮৬ বছর আগে। চন্দরপল পরিবারের আগে শেষ পিতা-পুত্রের একসাথে খেলার ঘটনারও প্রায় ২১ বছর পেরিয়ে গেছে। হিথ স্ট্রিকের সঙ্গে বাবা ডেনিস স্ট্রিক মাটাবেলেল্যান্ডের হয়ে নেমেছিলেন বুলাওয়েতে, ১৯৯৬ সালে।

    তবে এই গল্পটা অবশ্য পিতা-পুত্রের নয়। শুধুই পিতার। শুধুই শিবনারাইন চন্দরপলের।

     

    ৩.

    ওভালের ওপর লন্ডনের বিষণ্ণ আকাশ। বিষণ্ণ ল্যাঙ্কাশায়ারের ইনিংস। বিষণ্ণ লিয়াম লিভিংস্টোনের মনও। মেঘাচ্ছন্ন আকাশে ব্যাটিং নিয়ে ধুঁকতে থাকলে কোন অধিনায়কেরই বা মন ভাল থাকে! লাঞ্চের আগেই ‘রেড-রোজ’দের অর্ধেক উইকেট শেষ! জর্ডান ক্লার্ক যখন নামছেন, ১২২ রানে গেছে ষষ্ঠ উইকেটটা। ক্লার্কের ক্যারিয়ারে সেঞ্চুরি নেই একটিও।

    ক্লার্কের সঙ্গী চন্দরপল। যিনি বলকে বেশ দেরিতে খেলেন, খেলেন কতোই না যত্ন নিয়ে! এর চেয়েও বড় কথা, তিনি জানেন কখন বলটা খেলা যাবে না! তাঁর বয়স এই গ্রীষ্মেই ৪৩ হবে। তবে ক্লার্কের বয়স কম। তাঁর ব্যাটিং টি-টোয়েন্টি প্রজন্মের পরিচায়ক। টি-টোয়েন্টি অভিষেকেরও প্রায় বছর চারেক পর প্রথম শ্রেণির অভিষেক হয়েছিল তাঁর। ক্লার্ক পুল করলেন, ড্রাইভ করলেন। ৮২ রান থেকে সেঞ্চুরিতে পৌঁছালেন মাত্র পাঁচ বলের ব্যবধানেই।

     

    তাঁর গ্রে নিকোলসে বাড়লো আরেকটা লাল দাগ 

     

    ‘চন্দরপলের সাথে ব্যাটিং করার একটাই চাপ থাকে। আপনি নিজের উইকেটটা শুধু শুধুই বিলিয়ে দিয়ে আসতে পারবেন না। আপনাকে অনেক খাটতে হবে এজন্য। আপনি যে তাঁকে দিনের পর দিন ব্যাটিং করে যেতে দেখেছেন!’, জর্ডান ক্লার্ক যখন দিনশেষে এসব বলছেন, ল্যাঙ্কাশায়ারের ব্যাটিং ইনিংসে তখন রোদের আভা। চন্দরপল অপরাজিত ৮৫ রানে। ১৭২ রানের অপরাজিত জুটি দুজনের।

     

    ৪.

    এ শতাব্দীতে এই মাইলফলকটা ছুঁয়েছিলেন শুধু দুইজন ইংলিশঃ গ্রায়েম হিক ও মার্ক রামপ্রকাশ। প্রথম শ্রেণিতে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি, আর কেউ কি করবেন! হিক ও রামপ্রকাশ, দুজনের অভিষেকও হয়েছিল একই টেস্টে। ক্যারিয়ারজুড়েই 'হতাশ' করেছিলেন দুজনই। হিকের টেস্ট সেঞ্চুরি ছয়টা, রামপ্রকাশের দুইটা!

    রামপ্রকাশ ২০০৮ সালে শততম সেঞ্চুরিটা করেছিলেন। এই ব্যাপারটা আবার কবে ঘটবে, সেটা অনিশ্চিত। না ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। যদি ঘটে থাকে, যদি কখনও ঘটে থাকে কারও দ্বারা, তবে সবার আগে আসবে একটাই নামঃ শিবনারাইন চন্দরপল! এই বিয়াল্লিশ পেরুনো বয়সেও তিনি যে খেলেই যাচ্ছেন! কাউন্টি প্রথম চন্দরপলকে দেখেছিল ১৯৯৪ সালে। দেখছে এখনও।

     

    আরেকবার, ব্যাট উঁচিয়ে ধরছেন 

     

    ১৯৯০ সালের পর ক্যারিয়ার শুরু করেছেন, এমন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে চন্দরপলের চেয়ে সেঞ্চুরি সংখ্যায় এগিয়ে আছেন জাস্টিন ল্যাংগার (৮৬), রিকি পন্টিং (৮২), ম্যাথু হেইডেন (৭৯), ক্রিস রজার্স (৭৬)। এখনও খেলছেন এমন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে শীর্ষে অ্যালেস্টার কুক, ইউনুস খান, কুমার সাঙ্গাকারা। তিনজনেরই সেঞ্চুরি ৫৬টা করে। চন্দরপলকে ছুঁতে ঢের দেরি তাঁদের, পাড়ি দিতে হবে সুদীর্ঘ পথ! তার চেয়েও বড় কথা, চন্দরপলের পথচলাও যে শেষ হয়নি এখনও!

     

    ৫.

    ল্যাঙ্কাশায়ার ডেকে পাঠালো তাঁকে। বরং বলা ভাল, দ্বারস্থ হলো তাঁর। শেষ মৌসুমে ডিভিশন ‘টু’-তে রেলিগেটেড হতে হতেও হয়নি রেড-রোজরা। চন্দরপল এলেন, কেউ যে নাক সিঁটকালেন না, তাও কিন্তু নয়!

    প্রথম ম্যাচে সুযোগ পেলেন এক ইনিংসে ব্যাটিং করার। করলেন ১৫। হলেন রান-আউট। চন্দরপল হতাশই হলেন। তাঁকে ডেকে পাঠানোর সার্থকতা দেখাতে বেছে নিলেন ওভালকে। সারের সঙ্গে ম্যাচটিকে। দ্বিতীয় দিনে দুপুরের আগে আগে মার্ক ফুটিটকে ফ্লিক করে দ্বিতীয় রানটা নিলেন চন্দরপল। পূর্ণ করলেন তাঁর ৭৪তম প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরি। সবচেয়ে বেশী বয়সী ক্রিকেটার হিসেবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলছেন, ১৯৯৬ সালে গ্রাহাম গুচের পর তিনিই হয়ে গেলেন সবচেয়ে বয়স্ক প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরিয়ান!

    তবে এই ম্যাচেই ল্যাঙ্কাশায়ারের আস্থার প্রতিদান তখনও কিছুটা দেয়া বাকি ছিল তাঁর। অষ্টম উইকেটে স্টিফেন প্যারিকে নিয়ে ৪২ রানের জুটির পর শেষ উইকেটে সাইমন কেরিগানকে নিয়ে করলেন ৬৩ রান! শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হলেন তিনিই। নিজের রান ১৮২, দলের ৪৭০। আট ঘন্টা ব্যাটিং করে চন্দরপল থামলেন। তাঁর গ্রে নিকোলসে বাড়লো আরও কিছু লাল দাগ! ওভাল উঠে দাঁড়ালো। এমন একটা ইনিংসকে অভিনন্দন না জানিয়ে কি থাকা যায়!

    ‘তাকে বোলিং করাটা হতাশার। সে এখনও বিশ্বমানের ক্রিকেটার। অফস্ট্যাম্প লাইনের বল এতো ভাল খেলে, সুযোগ প্রায় দেয়না বললেই চলে। দ্বিতীয় ইনিংসে তার জন্য ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে নামতে হবে আমাদের।’ ইনিংসের সেরা বোলার মার্ক ফুটিটের কন্ঠে হতাশার চেয়ে কি চন্দরপল বন্দনাটাই বেশি ফুটে ওঠে না?

     

    ৬.

    এখন অনেক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানই কাজটা করেন। হয়তো আগেও করতেন কেউ।

    তবে ব্যাটের হাতল দিয়ে বেলে টোকা মেরে গার্ড নেয়ার কোনো ছবি দেখলেই আপনার সবার আগে মনে আসবে একটা নামঃ শিবনারাইন চন্দরপল।

    এবং এই গার্ড নেয়ার ব্যাপারটা শেষ হয়নি এখনও। চন্দরপলের পথচলা শেষ হয়নি এখনও। আমরাও তাই দেখছি, তাঁকে দিনের পর দিন ব্যাটিং করে যেতে!

     


    আরও পড়ুন 
    শিব-শ্রমিকের গান 



     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন