• সিরি আ
  • " />

     

    রোমের সম্রাটকে যেমন দেখেছি...

    প্রিয় টট্টি,

    এখন কি একটু ধাতস্থ হয়েছ?  চোখের জল শুকিয়ে কি এখন হৃদয়ে বাসা বেঁধেছে বিষণ্ণতার কালো বরফ? আজ ধীর পায়ে, প্রায় নিঃসাড়ে যখন তুমি এগিয়ে গেলে স্তাদিও অলিম্পিকোর বিহবল গ্যালারির দিকে; ড্যানিয়েলে ডি রসির চোখে তখন অশ্রু টলোমলো। কাঁদছেন স্টেফান এল শারাউয়ি, আলেসান্দ্রো ফ্লোরেঞ্জি। কাঁদছে তোমার স্ত্রী, দুই শিশুসন্তান ক্রিস্টিয়ান ও শানেল। শুধু তোমার কোলের অবোধ ইসাবেল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। হঠাৎ করেই সবাই এভাবে কাঁদছে কেন, সেটা তার বোধের অগম্য। তুমি চেষ্টা করলে তার দিকে তাকিয়ে হাসতে, কিন্তু সেটা মনে হলো মুমূর্ষু রোগিকে জোর করে উঠে বসানোর মতো। একটু পরেই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরলে, ক্যামেরার লেন্স খুঁজে নিল তোমার চিকচিকে অশ্রু। খানিক পরে মাথা নিচু করে যখন বসে পড়লে, বোঝাই যাচ্ছিল দুই পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি তোমার শেষ হয়ে এসেছে। যে রোমা জানে তোমার প্রথম সবকিছু, যেখানে তুমি পেয়েছ দাঁড়ানোর ঠাঁই, সেখানেই এখন তুমি কী ভীষণ অসহায়। রোমার সঙ্গে ২৫ বছরের সুতো কেটে গেল, এই অমোঘ সত্য বুঝে গেছ তুমি।

     

    বিদায়বেলায় রোদনভরা রোমা সমর্থকদের কাছে তুমি জানতে চাইতে পারতে, ' ক ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ যে তুমি ভালোবাসবে?' এই কদিনে কম তো অভিমান জমা হয়নি। বেশ কিছু দিন ধরেই কোচ লুসিয়ানো স্প্যালেত্তির সঙ্গে চলছে চাপান উতোর। গত বছর থেকেই তোমাকে অবসরের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে- এমন হাওয়াও লাগতে শুরু করল জোরেশোরে। হঠাৎ করেই তুমি ঘোষণা দিলে, আর দেখা যাবে না রোমার হয়ে। কিন্তু ফুটবলই যে আর খেলবেন না, সেটা যেন কৌশলে গেলে এড়িয়ে। বরং 'সামনের সোমবার থেকে শুরু আমার নতুন চ্যালেঞ্জ' বলে যেন বারুদে আরেকটু আগুন ধরিয়ে দিলে। তাহলে কি তোমাকে অন্য কোথাও দেখা যাবে? কিন্তু রোমা ছাড়া টট্টি- এও কী সম্ভব? শোনা গেল, মিয়ামিতে এমএলএস খেলতে পাড়ি জমাতে পার। এক দিন পর নিজেই বোমা ফাটালে। রোমা কর্তারা তোমাকে অবসরে যাওয়ার জন্য জোর করেছে। হঠাৎ করেই সবার মনে হলো, 'বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়।' বিদায়বেলায় সেই অভিমানের জন্য কি অশ্রুটা এমন গাঢ় ছিল? রোমার সাথে তো তোমার দাম্পত্য-জীবনে কম ঝড় যায়নি। শেষ বেলায়ও এমনটা কি তুমি আশা করেছিলে?

    ঝড়ের কথা বললে তুমি এখন নিশ্চয় স্মৃতিকাতর হয়ে যাবে। সেই অভিষেকের পর থেকেই তো কত বার তোমাকে উত্তাল স্রোতে বাইতে হয়েছে নৌকা। সেই ১৯৯৭ সালে যখন কার্লোস বিয়াঞ্চি দায়িত্ব নিলেন, দশ নম্বর জার্সিটা জিউসেপে জিয়ান্নির পর পাওয়ার কথা ছিল তোমার। ততদিনে রোম জেনে গেছে, তাদের যুবরাজ এসে গেছে। অদৃশ্য মুকুটটা না চাইতেই পরা হয়ে গেছে তোমার মাথায়। কিন্তু বিয়াঞ্চি এসে সেই দশ নম্বর জার্সিটা তোমার কাছ থেকে বলতে গেলে কেড়েই নিলেন। রোমানদের একদমই সইতে পারতেন না বিয়াঞ্চি, তোমার ব্যাপারে তাঁর শুরু থেকেই কেমন একটা সন্দেহ-অনাস্থা। তুমিও তো আর সমঝে চলার মানুষ নয়, আপস করার শিক্ষা তো পরিবার থেকে পাওনি। যা হওয়ার তাই হলো, খুব শিগগির অবিশ্বাসের ফাটলে নামল ধস, বিয়াঞ্চি সরাসরিই বলে বসলেন, অনুশীলনের ব্যাপারে তোমার গা নেই কোনো। একটা সময় তো সাম্পদোরিয়াতে তোমাকে ধার দিয়ে দেওয়ার সব আয়োজনও পাকা। কিন্তু তখনই একের পর এক খারাপ ফলের জন্য বিয়াঞ্চি বরখাস্ত হলেন, তোমার আর যেতে হলো না কোথাও। কে জানে, তখন বিয়াঞ্চি আরও কিছুদিন থেকে গেলে ইতিহাস হতে পারত অন্যরকম ।

     

     

                                               যখন ছোট ছিলেন

     

    সেটা অবশ্য অনেক দিন আগের কথা। এর পর জেদেক জেমান এসে তোমার ক্যারিয়ারটা জাগিয়ে তুলেছেন জাদুর কাঠি দিয়ে, ২২ বছর বয়সেই সিরি আতে সবচেয়ে কমবয়সী হিসেবে তুমি পেয়েছ অধিনায়কত্ব। ১০ নম্বর থেকে তোমাকে সরিয়ে নিয়ে আসা যাওয়া হয়েছে বাঁ উইংয়ে, তুমি সেখানে মানিয়ে নিয়েছও দারুণ। জেমান এসেই বুঝে গিয়েছিলেন, এই ছেলে হচ্ছে একজন স্বভাব নেতা। ওর কাঁধে যত বেশি চাপ দেবে, তত সেটি আরও চওড়া হবে, জেমান টের পেয়েছিলেন। টট্টির টট্টি হওয়া শুরু তখন থেকেই। জেমানের পর ফাবিও ক্যাপেলো এলেন, ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সোনালী সময়ের দেখা পেলে তুমি। বাতিস্ততার সঙ্গে তোমার সেই জুটি হয়ে উঠলো অপ্রতিরোধ্য, রোমা পেল ১৮ বছরের মধ্যে প্রথম সিরি আ। তুমি কি তখন ভেবেছিলেন, ওটাই হয়ে থাকবে তোমার ক্যারিয়ারের একমাত্র স্কুদেত্তো? ১৩ গোল করেও সেবার ইতালির বর্ষসেরা ফুটবলার হয়েছিলে, পরে আরও হয়েছিলে তিন বার। কিন্তু ওইবারের স্মৃতিটা বোধ হয় তোমার কখনো ভোলা হবে না।

    যাকগে, বলছিলাম ঝড়ের কথা। ক্যাপেলোর সঙ্গে তোমার সুখের সংসারও বেশিদিন টিকল না। ক্যাপেলো ভীষণ একরোখা, তুমিও আপসের মাত্র নও। সংঘর্ষটা অনিবার্য ছিল। ক্যাপেলো সরাসরি সংবাদমাধ্যমকে বললেন, দলের জন্য তুমি খেল না। অবস্থাটা এমন, যে কোনো একজনকে বিদায় নিতে হতো। কিন্তু তখন তুমি বনে গেছে সম্রাট, মুকুট কেড়ে নেয় সাধ্যি কার? তারপরও অভিমান করে ও সময় হয়তো তুলে রাখার কথা ভেবেছিলে। রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার গুঞ্জন তো তখন প্রায় সত্যি হওয়ার কথা, ছোঁকছোঁক করছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডও। ক্যাপেলোকেই বিদায় নিতে হলো, তুমি থেকে গেলে রোমে। রিয়ালে বা ইউনাইটেডে গেলে, তোমার বিদায়ে রোমের গ্যালারি আজ নিশ্চয় এমন কান্নার মিছিল হতো না?

    অথচ তুমি নিজে সারাজীবন রোমেই থাকতে চেয়েছিলে। মায়ের ছেলে তুমি, ছায়ার মতো মা তোমাকে আগলে রেখেছেন সারাজীবন। সেই ছোট্টটি থেকে, যখন হাঁটার পরেই সবাই বুঝে গেছে, এই ছেলে বলকে কথা বলাতে পারে। ১৩ বছর বয়সে তোমার খোঁজ পেয়ে এসি মিলানের স্কাউট চলে এলো বাড়িতে, তারা তোমাকে নিতে চায় মিলানে। কিন্তু মা মুখের ওপর বলে দিলেন, তুমি রোমাতেই খেলবে। নিবেদিত ক্যাথোলিক মা তোমাকে শিখিয়েছিলেন, নিজের শেকড় কখনো ভোলা যাবে না। যত কিছুই হোক, তোমাকে থাকতে হয়েছে নিয়মের মধ্যে। ওই বয়সে প্রতিভা থাকলে যা হয়,বিগড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ষোল আনা। কিন্তু মা বাজপাখির মতো তোমাকে দেখে রেখেছিল, কঠিন শাসনটা জারি ছিল একেবারে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত। রোমার সঙ্গে অবশ্য ততদিন বাঁধনটা একেবারে পোক্ত হয়ে গেছে, তুমি নিজেই ঘোষণা দিয়ে বলেছে, রোম ছাড়ার কথা আমি কখন ভাবিই না। রোমান হয়ে জন্মেছি, রোমান হয়েই মরব। মা তখনই বুঝেছিলেন, আমার কষ্ট সার্থক হয়েছে।

     

    তবে ফুটবলটা যে জীবনের ধ্রুবতারা করবে, আর বাকি দশজনের চেয়ে যে তুমি আলাদা, এটা প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন তোমার বাবা। তখন বয়স আর কতই বা হবে, বড়জোর চার। বাবার সঙ্গে খেলতে গিয়েছিলে পাড়ার একটা মাঠে। কিন্তু বাকিরা ছিল বয়সে তোমার দ্বিগুণ , তারা তো তোমাকে কিছুতেই নেবে না। নেমেই তুমি করলে দুইটি গোল। বয়সকে টেক্কা দেওয়ার কাজ পরেও করেছ, অনূর্ধ্ব ১৫ দলে ১১ বছর বয়সে অনেকটা চুরি করেই খেলেছ, ১৫ বছর বয়সেই হয়ে গেছ অনূর্ধ্ব ১৭ দলের অধিনায়ক। রোমার প্রথম একাদশে যখন অভিষেক, তখন তো তোমার বয়স মাত্র ১৬। ব্রেসিয়ার সঙ্গে ম্যাচে ভুজাদিন বসকভ যখন তোমাকে বেঞ্চ থেকে ডাকলেন, অনুশীলন করার জন্য তুমি সময় পেয়েছিলে ১০ সেকেন্ড। নেমেই গোল করার মতো কিছু হয়নি, এসব তো সিনেমায় হয়। তবে বুঝিয়ে দিয়েছিলে, এই ছেলে অনেক অনেক দূর যাবে। কিন্তু ২৫ বছর রোমে কাটিয়ে দেবে, ঘুণাক্ষরেও কি ভেবেছিলে? মধ্য বিশেই তো একবার বলেছিলে, ত্রিশের পর খুব বেশিদিন নিজেকে আর মাঠে দেখ না। ত্রিশ তো ত্রিশ, চল্লিশেও যে চালশে হবে না, সেটা ভেবেছিল কজন? ৭৮৬ ম্যাচে ৩০৭ গোল, সিরি আর ইতিহাসে তোমার চেয়ে বেশি গোল আছে শুধু সিলভিও পিওলার, এসব কি কখনো ভেবেছিলে? ক্যারিয়ারে স্ট্রাইকার হিসেবে সেভাবে বলতে গেলে খেলোইনি, তারপরও এমন অক্লান্ত গোল করে যাওয়ার মন্ত্রটা পেয়েছিলে কোত্থেকে?

     

      

                                                          ২০০৪ সালে লাৎসিওর সঙ্গে সেই উদযাপন 

     

    চাইলে তুমি আফসোস করতেই পার। না পাওয়া তো আর কম নয়। পুরো ক্যারিয়ারে একটা মাত্র স্কুদেত্তো, দুবার কোপা ইতালিয়া, কোনো ইউরোপিয়ান শিরোপা নেই- এসব নিয়ে চাইলে অনুযোগ করতেই পারে। মিলান, জুভেন্টাসে গেলে হয়তো সেই আক্ষেপও করতে হতো না। কিন্তু তুমি তো জানো, বিদায়বেলায় এসব কিছুই তোমার থাকবে না। থেকে যাবে শুধু নিম্নগামী ভালোবাসা, যা কোনো বাঁধ মানে না। কাঁপা কন্ঠে তাই আজ সেকারণেই বলেছ, 'তোমরাই (রোমা ভক্তরা) আমার জীবন, তোমরাই আমার সবকিছু। তোমাদের হয়তো আর কখনো আনন্দ দিতে পারব না, তবে আমার হৃদয় তোমাদের সাথেই থাকবে। রোমান হয়ে জন্মানোটা পরম সৌভাগ্য, রোমার অধিনায়ক হতে পারাটা পরম সম্মানের'।  'রোমার হয়ে একটা শিরোপা জেতা রিয়াল বা জুভেন্টাসের হয়ে দশটা শিরোপার চেয়েও বেশি মূল্যবান' এমন কথা তুমি যখন বলতে পেরেছ, কয়েকটা শিরোপার জন্য কেন তোমার আক্ষেপ হবে?

    তবে বিদায়বেলায় রোমা সমর্থকদের ভালোবাসার চেয়েও তোমাকে আপ্লুত করবে হয়তো অন্যকিছু। রোমা-ভক্তেরা যেমন তোমাকে মাথায় তুলে রেখেছিল, লাৎসিও সমর্থকদের কাছ থেকে সারাজীবন শুনতে হয়েছে দুয়ো। রোমের দুই ক্লাবের যে সম্পর্ক, তাতে অবশ্য এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই লাৎসিওর দাঙ্গাবাজ সমর্থকেরা পর্যন্ত তোমাকে একটা চিঠিতে লিখল, 'এতোদিন আপনার সঙ্গে অনেক অবিচার করা হয়েছে, আমাদের, ক্লাবের পক্ষ থেকে আপনাকে সম্মান দিতে পারিনি। আমাদের একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে আমরা কখনোই এমন করতাম না।' শিয়েভোর সঙ্গে শেষ ম্যাচে মাঠ ছেড়ে যাওয়ার সময় তাদের প্রেসিডেন্ট এসে বলে গিয়েছিলেন, 'সত্যিকারের চ্যাম্পিয়নদের একটা জার্সি থাকে না। সত্যিকারের চ্যাম্পিয়নরা সবার।'

    ক্যারিয়ারে চরম শত্রুদের কাছ থেকে এমন কিছু পাওয়ার পর একজন খেলোয়াড়ের কি কোনো অতৃপ্তি থাকতে পারে?

    কাল থেকে তোমার অনেক ফুরসত। আর যদি না খেলো, ছেলেমেয়েদের বেশ সময় দিতে পারবে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কত জমল, সেই হিসেব করতে গিয়ে হয়তো একটু ভাবতে পার, আজকের লা লিগা-প্রিমিয়ার লিগে হাঁটুর বয়সীদেরই ব্যাঙ্ক ব্যালান্স হয়তো অনেক বেশি। তবে পেট্রোডলারের ঝনঝনানি, জৌলুসের এই রঙিন দুনিয়ায় তোমাদের মতো কেউ কেউ আছে বলেই, ফুটবল এখনো যন্ত্রের নয়, টিকে আছে মানুষের খেলা হয়ে। আনুগত্য আর নিষ্ঠার যে উদাহরণ তোমরা রেখে গেছ, সেটার জন্যই হয়তো ফুটবল 'দ্য মোস্ট বিউটিফুল গেম।' তোমার বিদায়বেলায় স্তাদিও অলিম্পিকে আজ 'লাইফ অব বিউটিফুলের' ভেসে আসা সুর যেন বলছিল, ফুটবলের যা কিছু সুন্দর, তার অনেকটুকুতেই ছিলে তুমি।

     

    ফ্রান্সেসকো টট্টি, আমি বেঁচে ছিলাম তোমার সময়ে।  

    ইতি

    তোমার এক ভক্ত।

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন