• শ্রীলঙ্কা-জিম্বাবুয়ে
  • " />

     

    শামসুদ্দীনের 'সন্দেহ' ও কিছু প্রশ্ন

    ভুল, সাংঘাতিক ভুল। ভ্রম। বিভ্রম। কী বলবেন, আপনার ইচ্ছা। চেত্তিথরি শামসুদ্দীনের একটা সিদ্ধান্ত আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেবে এসব শব্দের সঙ্গে। এ ম্যাচে ক্রিকেটাররাও ভুল করেছেন। কুশল মেন্ডিস যে শটে আউট হলেন, তার কয়েক রাতের ঘুম হারাম করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট সেটা। রেজিস চাকাভা ক্যাচ মিস করেছেন, স্টাম্পিংয়ের সুযোগ মিস করেছেন। যে কোনও একটাতে সফল হলেও ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারতো। মেন্ডিস, চাকাভা কারোই দ্বিতীয় কোনও সুযোগ ছিল না। শামসুদ্দীনের ছিল। একবার, দুইবার, তিনবার, যতোবার গুণতে পারেন আপনি! শামসুদ্দীন সে সুযোগ নিতে পারেননি। নিরোশান ডিকভেলাকে নট-আউট দিয়েছেন, বোধহয় তার কাছে ছাড়া আর সবার কাছেই ছিল সেটা আউট! 

    ****
     

    ইনিংসের ৬৯তম ওভার, সিকান্দার রাজার ১১তম, দিনের ২১তম। ৬২তম ওভারে আউট হয়েছেন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস। নিরোশান ডিকভেলাকে সঙ্গ দিচ্ছেন আসেলা গুনারত্নে। প্রথম বলে মিড-উইকেট দিয়ে রাজাকে চার মারলেন ডিকভেলা। রাজা রান দিয়ে ফেলছেন। পরের বলে ল্যাপ সুইপ, আরও দুই রান ফাইন লেগে। পরের বলেও সুইপ, অফস্টাম্প থেকে টেনে আনলেন বল। আবার দুই রান, এবার লং লেগে। পরের বলে তীক্ষ্ণ টার্ন, বাউন্স। রাজা ফিরে এলেন দারুণভাবে। ডিকভেলা যেন চমকে গেলেন কিছুটা, বেসামালও হয়ে পড়লেন। উইকেটকিপার চাকাভা বল ধরে অপেক্ষা করলেন ক্ষণিকের জন্য। সুযোগ বুঝে ফেলে দিলেন বেল। আবেদন, স্কয়ার লেগ আম্পায়ার ইয়ান গৌল্ড টেলিভিশন আম্পায়ারের দ্বারস্থ হলেন। ডিকভেলা একটু অপ্রস্তুত, পা দিয়ে ঠিক করে নিলেন গার্ডটা। 

    **** 

    ফ্রন্টফুট। ওকে। টেলিভিশনে যে ফুটেজ দেখানো হলো, তাতে অবশ্য দৃষ্টি আটকে যাবে গ্রায়েম ক্রেমারের কারণে। তবে ক্রেমার লাইনের সমতলে, রাজার বুট দাগের পেছনে, এটা নিশ্চিত। শামসুদ্দীনের কাছে নিশ্চয়ই অন্যদিক থেকে দেখারও সুযোগ আছে। 

    প্রথমে লেগসাইড ক্যামেরা। চাকাভার গ্লাভসের আঘাতে যখন বেল উঠে গেছে, ডিকভেলার বুট লাইনের ওপর। একবার, দুইবার, তিনবার দেখলেন শামসুদ্দীন। ফ্রেম অদল বদল করে দেখলেন। ক্যামেরার শট আরও কাছে নেয়া হলো, শামসুদ্দীন আরেকবার দেখলেন। দাগের এপাশেই ফুটমার্কের কালো দাগ, তবে বুটের মাথাটা দাগ বরাবর। নিয়ম বলে, লাইন আম্পায়ারের। মানে ব্যাটসম্যানের একটু অংশ হলেও থাকতে হবে পপিং ক্রিজের ভেতরে, লাইনের মধ্যে।  

    শামসুদ্দীন এবার স্টাম্প ক্যামেরা দিয়ে দেখলেন। তিনটা ফ্রেমে। একেবারে নিশ্চিত হতে চাইছিলেন। কলম্বো টেস্টে ডিকভেলার এই সিদ্ধান্তটা গুরুত্বপূর্ণ খুব। ম্যাচের পুরো চেহারাই বদলে দিতে পারে তা। 

    শামসুদ্দীন এবার অফসাইড ক্যামেরায় গেলেন। কমপক্ষে পাঁচটা ফ্রেম আগ-পিছ করে দেখলেন, ডিকভেলার বুটের ‘অবস্থান’ অবশ্য পরিবর্তিত হলো না। বেশ পরিষ্কার একটা সিদ্ধান্ত, শামসুদ্দীনের সময় নেয়াটা ভাবিয়ে তুলতেই পারে। 

    আবার অফসাইড ক্যামেরা, আরও কাছে, দূরে। এই ফ্রেম, সেই ফ্রেম। লেগসাইড ক্যামেরা। পদ্ধতিগুলোর পুনরাবৃত্তি। প্রায় সাড়ে তিন মিনিট ধরে চললো শামসুদ্দীনের এই যজ্ঞ। জায়ান্ট স্ক্রিনে সিদ্ধান্ত জানানোর আগে স্টাম্প মাইক্রোফোনে হাসির শব্দ ভেসে এলো, জিম্বাবুইয়ানরা তখন ডিকভেলার উইকেটপ্রাপ্তির আনন্দ শুরু করে দিয়েছেন হয়তো। সে হাসিটা থেমে গেল, শামসুদ্দীন দিলেন ‘নট-আউট’! ড্রেসিংরুমে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন কোচ হিথ স্ট্রিক। সিদ্ধান্তটা দেখে ছিটকে উঠে গেলেন! বারবার রিপ্লে দেখানোর সময়ই উদযাপন করছিলেন ল্যান্স ক্লুজনার। সিদ্ধান্তটা দেখে চুপসে গেলেন। টাই পরা এক কর্মকর্তাকে দেখা গেল, কাষ্ঠ হাসি হাসতে। 

    এদিকে যেন থমকে গেছেন সিকান্দার রাজা। গ্রায়েম ক্রেমার ভাবলেশহীন, যেন বুঝতে পারছেন না কী হলো। ডিকভেলা পরের বলটা খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, গ্লাভস ঠিক করছেন। বামপাশ ফিরে থুথু ফেললেন। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস কি বেড়িয়ে এলো? ডিকভেলা কি নিজেও জানতেন, দ্বিতীয় জীবনটা পাওয়ার কথা নয় তার? 

    **** 

    ‘বেনিফিট অফ ডাউট’ নামের টার্মটা যেন উঠেই গেছে ‘রেফারেল’ পদ্ধতি আসার পর থেকে। সে জায়গায় এখন বলা হয় ‘কনক্লুসিভ এভিডেন্স’, মানে অকাট্য প্রমাণ। অন-ফিল্ড আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত নাকচ করতে টেলিভিশন আম্পায়ারের কাছে থাকতে হয় অকাট্য প্রমাণ। আসেলা গুনারত্নের একটা ক্যাচের আবেদন করেছিলেন জিম্বাবুইয়ানরা। শর্ট লেগে দাঁড়ানো ফিল্ডারকে লেগে বল গেল উইকেটকিপার চাকাভার কাছে, তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে আলোচনা জন্য এলেন অন-ফিল্ড আম্পায়ার ইয়ান গৌল্ড ও নাইজেল লং। গৌল্ড দ্বারস্থ হলেন টেলিভিশন আম্পায়ারের, ‘সফট সিগন্যাল’ দিলেন আউট। রিপ্লে দেখালো, শর্ট লেগের ফিল্ডারকে লাগার পর মাটিতে লেগেছে বল, উড়ছে ধুলা। শামসুদ্দীনের জন্য অকাট্য প্রমাণ। ‘কনক্লুসিভ এভিডেন্স’। 


    আরও পড়ুন :  ডিআরএস তুমি কার?


    ‘বেনিফিট অফ ডাউট’ সবসময় ব্যাটসম্যানদের পক্ষে যেতো। ‘কনক্লুসিভ এভিডেন্স’ যায় আম্পায়ারদের পক্ষে। তবে রান-আউটে ‘সফট সিগন্যাল’ এর কোনো কাজ নেই, টেলিভিশন আম্পায়ারই সব। 

    চলতি মহিলা বিশ্বকাপে টেলিভিশন আম্পায়ারের না থাকাটা ভুগিয়েছে দলগুলোকে। অস্ট্রেলিয়ার একবার ক্ষতি হয়েছে, একবার হয়েছে লাভ। সব মিলিয়ে দশটি ম্যাচ টেলিভিশনে প্রচার করা হচ্ছে এবার, বাকিগুলো অনলাইনে স্ট্রিমিং। অনলাইন স্ট্রিমিংয়ে ৮টা ক্যামেরা, টেলিভিশনে প্রচারিত ম্যাচগুলোতে যেখানে ব্যাবহৃত হচ্ছে ৩০টি। অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের ম্যাচগুলোতে তাই নেই টেলিভিশন আম্পায়ার। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ব্যাটার চেডিয়ান ন্যাশন ক্রিজের বাইরে ছিলেন, অ্যাশলি গার্ডনারের থ্রো ভেঙ্গে দিয়েছিল স্টাম্প। পরে দেখা গেল, স্কয়ার লেগ আম্পায়ার ‘ঠিকঠাক’ বুঝতে পারেননি ব্যাপারটা। 

    ২৫তম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটার ম্যারিজান কাপকে আবার আউট দিলেন আম্পায়ার। স্লো মোশনে দেখা গেল, ডাইভ দেয়ার কারণে বেঁচে যাওয়ার কথাই ছিল কাপের। এবারের বিশ্বকাপেই ডিআরএসের সুবিধা পাচ্ছে মেয়েরা, তবে সেগুলোও টেলিভিশনে প্রচারিত ম্যাচগুলোতেই। টেলিভিশন আম্পায়ারের না থাকার কারণে মেয়েরা নিজেদের ‘অভাগা’ই ভাবতে পারেন, ক্রিকেটে যখন প্রযুক্তির এতো প্রভাব, তারা সেই ন্যূনতম সুবিধাটাই পাচ্ছেন না! 

    স্টিভ বাকনরের অবশ্য ভুলটা হয়নি। ১৯৯২ বিশ্বকাপ, জন্টি রোডস, ইনজামাম-উল-হক। এসব বললেই ভেসে ওঠার কথা সেই ছবিটা। উড়ন্ত রোডস, ক্রিজে ফিরতে মরিয়া ইনজামাম। রোডস ভেঙ্গে দিয়েছেন সব স্টাম্প, বাকনর আঙ্গুল তুলেছেন। আউট না দিলে আফ্রিকানদের কিছু করার ছিল না, কেরি প্যাকারের টেলিভিশন বিপ্লবের ‘ফল’ রঙিন বিশ্বকাপেও যে ছিল না টেলিভিশন আম্পায়ার। বাকনর সেদিন ‘ভুল’ করলে তাই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটা ছবির জন্মই হতো না! 

    ****

    মহিলা বিশ্বকাপ বা সেই ১৯৯২ সালের ছেলেদের বিশ্বকাপের মতো নয় শ্রীলঙ্কা-জিম্বাবুয়ের একমাত্র টেস্ট। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, ডিআরএসের সকল খরচ বহন করতে হয় স্বাগতিক বোর্ডকে। ডিআরএস না থাকলেও টেলিভিশন আম্পায়ারের উপস্থিতি অবশ্য টেস্ট ম্যাচে ‘অনিবার্য’। 

    চেত্তিথরি শামসুদ্দীন ছিলেন সে কারণেই। অনেকদিন ধরেই আইসিসির এলিট প্যানেলে ভারতীয় আম্পায়ারের উপস্থিতি ছিল না, এস রাভি আসার পর বদলে গেছে সেটা। শামসুদ্দীন ওয়ানডে ম্যাচ পরিচালনা করেছেন ২৪টা, ১১টা টি-টোয়েন্টি। টেস্ট অভিষেক হয়নি অন-ফিল্ড আম্পায়ার হিসেবে। 

    এ বছরের শুরুতে ভারত-ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে দুইটা সিদ্ধান্ত দিয়ে বিতর্কে পড়েছিলেন শামসুদ্দীন। ভারত ইনিংসে কোহলিকে এলবিডাব্লিউ দেননি, রিপ্লে দেখাচ্ছিল তিনি ছিলেন পরিষ্কার আউট। ইংল্যান্ড ইনিংসে জো রুটকে আউট দিয়েছিলেন, রিপ্লে দেখাচ্ছিল ব্যাটে লেগেছিল রুটের। শেষ টি-টোয়েন্টি থেকে এরপর নিজেকে ‘প্রত্যাহার’ করে নিয়েছিলেন তিনি, অন-ফিল্ডের বদলে ছিলেন টেলিভিশন আম্পায়ার। শামসুদ্দীন বিতর্কে ছিলেন তার নিজ দেশের টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে আম্পায়ারিং করেও। 

    **** 

    ডিকভেলার সিদ্ধান্তটার সময় শামসুদ্দীন সময় নিয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন মিনিট। একটার পর একটা দিক থেকে দেখেছেন, ফ্রেমের পর ফ্রেম অদল-বদল করে দেখেছেন। তার মনে নিশ্চয়ই সন্দেহ ছিল, ডিকভেলার বুটের কিছু অংশ ক্রিজের ভেতরে থাকতে পারে। কিন্তু তার সন্দেহের উদ্ভবটা হলো কোন ছবি থেকে? টেলিভিশনে যেসব দেখানো হয়েছে, সেসবে সন্দেহ থাকার কথা নয়। 

    তার কাছে আলাদা ফুটেজ থাকতে পারে। প্রশ্ন হলো, যদি আলাদা ফুটেজই থাকে, সেটা টেলিভিশনে দেখানো হয়না কেন? ডিআরএসের সময় টেলিভিশন আম্পায়ারের কথোপকথন শুধু টেলিভিশন দর্শক নয়, এখন স্টেডিয়ামেও লাউডস্পিকারে শোনানো হয়। দর্শকরা শোনেন, আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের পেছনের কারণটা, জানতে পারেন পদ্ধতিটা। 

    চেত্তিথরি শামসুদ্দীনের এই নট-আউট সিদ্ধান্তের পেছনের কারণটা অবশ্য জানা গেল না। টেলিভিশনে তার কথা শোনানোর ব্যবস্থা ছিল না। শামসুদ্দীনের সিদ্ধান্তের পেছনে কি সেই ভুলে যাওয়া ‘বেনিফিট অফ ডাউট’-এর হাত আছে? 

    যদি তাই থাকে, তবে ‘ডাউট’টা কিসের! সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বোধহয় সেটাই! 
     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন