• " />

     

    ভালবাসার 'ব্রিজ' পেরিয়ে ইতিহাসের পথে

    ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ হলের প্রধান ‘গেট’টা নতুন। এই সেদিনও আবার কী সংস্কার করা হলো। এমনিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে পুরোনো আবাসিক হলগুলোর একটি এটি। আরও সংস্কার হবে, হলের পুকুরের পানি কমবে-বাড়বে। কালের সাক্ষী এই হলের শুধু একটা ইতিহাস বদলাবে না। একটা খেলার বাংলাদেশের প্রথম একটা বিশ্বকাপ দলের জন্ম হয়েছিল এ হলে। হ্যাঁ, জন্মই বটে! 

    ****

    জিয়া হক ব্রিজ খেলতেন ছোট থেকেই, তবে এতো গভীরভাবে না। ব্রিজ কার্ডের খেলা, দুজনের একটা গ্রুপ 'সহযোগী', প্রতিপক্ষ আরেকটা গ্রুপ। ৫২টা কার্ড চারজনকে ভাগ করে দিয়ে খেলা হয়, সবশেষে পয়েন্টের হিসেবেই জয়-পরাজয়। তখন জিয়ারা ‘অকশন’-এ খেলতেন, বিডিং বা অন্যান্য আরও নিয়মকানুন শিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেই। তখন ইন্টারনেট হাতের এতো কাছে ছিল না। ব্রিজ শিখতে ভরসা কিছু বই, আর সিনিয়ররা। ব্রিজের সংস্কৃতি চালু আছে তখন ব্যাপকভাবে। কিন্তু সেই ‘নয়াবান্ধব’ পরিবেশটা যেন নেই। জিয়ার হয়তো একটা বই দরকার, এক ভাইয়ের কাছেই গেছেন তিনবার! তারপর মিলেছে সেটা। প্রথম যেবার টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিলেন, ‘বড় ভাইয়ের’ ধমক খেয়েই কার্ড হাত থেকে পড়ে গিয়ে ‘এক্সপোজ’ হয়ে গেছে, সেই খেলোয়াড় সেই খুল্লামখুল্লা কার্ডকে পেনাল্টি বানিয়ে ‘বিড’ করে বসেছেন!
     
    জিয়ার মতো বিশ্বকাপ দলের চারজন সদস্য কামরুজ্জামান সোহাগ, নাইম, আনিসুর রহমান চৌধুরি, মশিউর রহমানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, শহীদুল্লাহ হলের। এ পাঁচজন ভারতের হায়দরাবাদে একটা টুর্নামেন্ট খেলতে গেলেন একবার। বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইংয়ের জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ। হেরে গেলেন, তবে ব্যাপকতা এলো। বিশ্বকাপের এ দলে আছেন আরও একজন, সাজিদ ইস্পাহানি। তিনি দলনেতা, স্পন্সরও।


    ব্রিজ বিশ্বকাপে ২২টা দলের মধ্যে ১৫টা খেলে সরাসরি, বাকিগুলোকে পেরিয়ে যেতে হয় বাছাইপর্ব। বাংলাদেশ ব্রিজ ফেডারেশন অফ এশিয়া অ্যান্ড মিডল ইস্টের অন্তর্ভুক্ত। গত দুইবার বাছাইপর্বে সেমিফাইনালেই হেরে আসতে হয়েছিল। ভারত-পাকিস্তানই সাধারণত খেলে এ অঞ্চল থেকে।
     
    এবার গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস ছিল তুঙ্গে, সেমিফাইনালে পাকিস্তানকে এক প্রকার পাত্তাই দেয়নি বাংলাদেশ! উঠে গেছে ফাইনালে, সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে গেছে বিশ্বকাপেও। প্রথমবারের মতো।  

    ****

    ১৯৫০, হ্যামিল্টন, বারমুডা। ব্রিজের প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ইউরোপ নামের তিনটা দল খেলেছিল, যুক্তরাষ্ট্র জিতেছিল আরামসেই। ব্রিজের সবচেয়ে পুরোনো টুর্নামেন্ট এটাই, যার নাম এখন বারমুডা বোল। ওয়ার্ল্ড ব্রিজের এবারের আসর বসছে ফ্রান্সের লিঁওতে, ১২-২৬ আগস্ট। 

    যুক্তরাষ্ট্র পেশাদারিত্বে বা জনপ্রিয়তাই এতোটাই এগিয়ে যে, ব্রিজ বিশ্বকাপে তাদের দুইটি দল খেলে! তবে আমেরিকানরা শেষবার জিতেছে ২০০৯ সালে, বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পোল্যান্ড।
     
    ২২ দলের খেলা, প্রথম পর্ব চলবে ৭ দিন। ৩ টা করে ২১টা ম্যাচ হবে রাউন্ড-রবিন পদ্ধতিতে। সেরা আট দল যাবে কোয়ার্টার ফাইনালে, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল হবে দুই দিন করে।
     
    বাংলাদেশের প্রত্যাশার পারদটা খুব উঁচুতে নয়। ১৮-১৯ এর মধ্যে থাকতেই পারলেই খুব খুশী হবেন তারা। তবে ব্রিজের একটা আলাদা মজা আছে, এর অনিশ্চয়তা। অন্যান্য অনেক খেলার মতো নয়, যে আগে থেকেই কে শক্তিশালী তা নির্ধারণ করা আছে। মূলত ‘বিডিং’ পদ্ধতিটাই গড়ে দেয় পার্থক্য। প্রতিপক্ষের সঙ্গে এ পদ্ধতিটা মিলে গেলেই হলো, হারানো যাবে যে কোনও দলকেই। শুধু দিনটা হতে হবে নিজেদের।
     
    জুটি গড়ে খেলা হয়, 'বিডিং' গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো এক দল ‘বিড’ করলো, আরেক দল করলো না। ‘বিড’ না করাটা মোটেই ‘ভাল খেলা’ না, কিন্তু তবুও পয়েন্টের হেরফেরে জিতে যাওয়া সম্ভব! এতো সম্ভবের ভীড়েও, বাংলাদেশ যদি ১৬ পজিশনের উপরে ওঠে, সেটা হবে একরকম ‘অবিশ্বাস্য’ই!

     

    ৪৩তম ওয়ার্ল্ড ব্রিজের পোস্টার 
     

     

    কাজটা এতোটা কঠিন মূলত কাঠামোর কারণেই।
     
    বাংলাদেশে ব্রিজ ফেডারেশন আছে। ফেডারেশন সভাপতি মুশফিকুর রহমানও সঙ্গী হবেন বিশ্বকাপ দলের। তবে ব্রিজকে ছড়িয়ে দেয়ার পথে প্রধান বাধাটা বেশ অনুমেয়, পৃষ্ঠপোষকের অভাব। বিশ্বকাপ দলের পৃষ্ঠপোষক ইস্পাহানী গ্রুপ, বেশ কয়েক বছর ধরেই। তবে আরও টুর্নামেন্ট বা ওয়ার্কশপ করার মতো পৃষ্ঠপোষক তো নেই!
     
    সঙ্গে আছে প্রচারণার অভাবও। জিয়া বলছিলেন, ‘হয়তো কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও হলে গেলাম। আমাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলে কে জানবে, আমরা বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছি? বিশ্বকাপ দিয়ে যে জনপ্রিয়তা অনেক বাড়বে, তা হবে কি? মনে হয় না।’
     
    ‘ব্রিজে আসলে গ্রুপ করে করে খেলোয়াড় আসে। আমাদের ব্যাচে শহীদুল্লাহ হল, ফজলুল হক হল থেকে ২৫-৩০ জন এসেছে। পরে যারা এসেছে, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে। এরা তুলনামূলক অনেক ভাল পরিবেশ পায়। ইন্টারনেট আছে, উন্নতির অনেক সুযোগ।’
     
    বাংলাদেশ ব্রিজ দলের অনুশীলনের ভরসাও এই ইন্টারনেটই। দলের একেকজনের চাকরি একেক জায়গায়, বাসাও তাই। ঢাকার ভয়ানক যানজট ঠেলে তাই সবার একসঙ্গে হওয়া হয়ে ওঠে না। অনলাইনে ব্রিজ বেস অনলাইন নামের সাইটেই চলে অনুশীলন।

    ****

    উন্নতিটাও চোখে পড়ার মতোই। গত বছর আগস্টের ৩-১৪ তারিখ ইতালিতে ওয়ার্ল্ড জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশের একটা দল, বুয়েটের চারজন। এমন টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের কোনও দলের খেলাও ছিল সেটাই প্রথম। ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের সঙ্গে পার্থক্য হচ্ছে, এটা আলাদা একটা ভাগ। মূলত তিনটা ভাগ, জুনিয়র, ওপেন, সিনিয়র। সঙ্গে মহিলাদের জন্য একটা। ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপে বয়সের একটা উর্ধ্বসীমা আছে, নিম্নসীমা নেই। জিয়াদের দলটা এই ওপেন ক্যাটাগরিতেও খেলবেন বাংলাদেশের প্রথম দল হিসেবে। 

    জুনিয়র সেই দলের সদস্য বিশ্ব সাহাকে জিয়াদের দল নিয়ে প্রশ্ন করা হলো। 

    ‘আমরা ব্রিজ শিখেছি জিয়া ভাইদের কাছ থেকে। বলা যায়, তারাই আমাদের “গুরু”। তাদের দলটাই এখন আমাদের দেশের সেরা লাইন-আপ। তাদের কাছে প্রত্যাশা তো অনেক। তবে প্রতিযোগিতাটা খুব বেশি। ভারত যেমন, অনেক এগিয়ে থেকেও আসলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দলের সঙ্গে তেমন প্রতিযোগিতা করতে পারে না।’ 

    জিয়াদের মতো বিশ্বদের দলটাও একটা জায়গা থেকেই আসা। বুয়েটে পড়েন, একই ব্যাচেরই সবাই। বন্ধু, খেলাও শিখেছেন প্রায় একই সময়েই। 

     

    ****


    দূর ভবিষ্যতে কি পেশাদার ব্রিজ খেলোয়াড়ের দেখা মিলবে বাংলাদেশে?

    জিয়ার কন্ঠ এবার বেশ বাস্তববাদী হয়ে গেল যেন। ‘আমাদের পক্ষে তো সম্ভব না। আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এটা সমর্থন করে না। ভালবাসার জন্য কিছু ত্যাগ তো করাই যায়। কিন্তু সব তো আর না!’

    এই ‘কিছু’ই হয়তো বয়ে নিয়ে আসবে জোয়ারের প্রথম ঢেউটা। ব্রিজের ঢেউ। সেই জোয়ারে, আজ থেকে অনেকদিন পর যদি ব্রিজে বাংলাদেশের কোনও পেশাদার দল গড়ে ওঠে, এমন বিশ্ব আসরে যায়, এই ঢেউয়ের কারিগরদের হয়তো সেদিনও স্মরণ করা হবে। যারা হল-জীবনে পড়াশুনার চেয়ে কার্ড বেশি খেলেছিলেন। ব্রিজ খেলেছিলেন। ব্রিজে বেঁধেছিলেন প্রাণ।  

     

    যারা ‘ব্রিজ’ পেরিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বকাপে। 

    ইতিহাসের পথে। 

     

     

    ছবি কৃতজ্ঞতা : জিয়া হক 
     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন