• " />
    X
    GO11IPL2020

     

    বিদায়, মাইক্রোফোনের মাস্টার!

    ১.

    আমার এক বন্ধু আছেন। ক্রিকেটপ্রেমি। তার সঙ্গে বন্ধুত্বের শুরুটাও ক্রিকেট দিয়েই। কীভাবে তিনি ক্রিকেটের প্রেমে পড়লেন, সেটা ভিন্ন ইতিহাস। কীভাবে ক্রিকেট বুঝতে শিখলেন, তার জবাবে তিনি বলবেন, বেশিরভাগই ধারাভাষ্য শুনে। হ্যাঁ, সেই বন্ধুর মতো আমরা অনেকেই আছি। ক্রিকেট-প্রেমের শুরুটা হয়তো বিশেষ কাউকে দেখে বা ‘উত্তরাধিকার’ সূত্রে প্রাপ্ত। তবে সবাই কমবেশি ‘ঋনী’ একদল মানুষের কাছে। ধারাভাষ্যকার। যাঁদের কাছে আমরা ক্রিকেট শিখেছি বিস্তর! তবে সামনাসামনি ধন্যবাদ দেবার সুযোগ মেলেনি। রিচি বেনো শুধু তাদেরই একজন নন। অন্যতম তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে পথদ্রষ্টাও।

    ধারাভাষ্য আর রিচি বেনো। দুটিকে সমার্থক বললে খুব বাড়িয়ে বলা হবে কি! 

     

    ২.

    বাবার কাছে লেগস্পিন শিখেছিলেন। ‘ন্যাচারাল ট্যালেন্ট’ ছিলেন না ক্রিকেটার হিসেবে। যা হয়েছিলেন, সেজন্য নিজেকে ঘষামাজা করতে হয়েছিল অনেক। দু-তিনটি সফরে দলের সঙ্গে ছিলেন, সুযোগ মেলেনি। ১৯৫২ সালে সুযোগ পেলেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে। ব্যাটিংয়ে করলেন ৩ ও ১৯। প্রথম ইনিংসে বল করার সুযোগই পাননি, তার আগেই ইনিংস শেষ করে দিয়েছিলেন কিথ মিলাররা। দ্বিতীয় ইনিংসে একাদশ ব্যাটসম্যান আলফ ভ্যালেন্টাইনকে আউট করলেন। ৬৩ টেস্টের ক্যারিয়ারের শুরুতে যে নিজেকে আলাদা করে চেনালেন, তা নয়। তখন কে জানতো, এই বেনোই একদিন আলাদা করে চেনাবেন নিজের জাত!

     

    বেনো যখন অধিনায়ক... 

     

    ক্যারিয়ারকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় তার। ১৯৫২-৫৮, ৫৯-৬৪। প্রথম ছয় বছরে ক্যারিয়ারের (২২০১) অর্ধেক রান (১০৪৮) করেছেন প্রায়, তবে উইকেট নিয়েছিলেন মাত্র ৮৮টি (ক্যারিয়ার উইকেট ২৪৮টি)। ১৯৫৮ সালে অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন। ১৯৫৮-৫৯ মৌসুমে পিটার মের ইংল্যান্ডকে ৪-০তে হারিয়েছিলেন। ১৯৬১ সালে ওল্ড ট্রাফোর্ডে রাউন্ড দ্য উইকেটে গিয়ে বল করেছিলেন, কাজে লাগিয়েছিলেন ক্রিজের বিপরীত দিকের সৃষ্টি হওয়া ‘ফুটমার্ক’কে! টেস্ট ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ছুঁয়েছিলেন ২০০ উইকেট ও ২০০০ রানের মাইলফলক। লেগস্পিনকে নিয়ে গিয়েছিলেন অন্য উচ্চতায়। আক্রমনাত্মক মানসিকতায় অধিনায়ক হিসেবে ছিলেন অনন্য, একটি সিরিজও তাই হারেননি তিনি! ১৯৬০ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ইতিহাসের প্রথম টাই টেস্টে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা। অধিনায়কত্ব নিয়ে রিচি বলেছিলেন, ‘অধিনায়কত্ব হলো ৯০ শতাংশ ভাগ্য আর ১০ শতাংশ স্কিল। তবে এই ১০ শতাংশ ছাড়া বাকি ৯০ শতাংশ নিয়ে চেষ্টা করা বৃথা।’ ক্রিকেটার রিচি বেনোকে শুধু ক্রিকেটার হিসেবেই আপনি মনে রাখতে পারবেন অনেকদিন। তবে মাইক্রোফোনের সামনের রিচি ছাপিয়ে গেছেন সেই ক্রিকেটারকে!

     

    ৩.

    প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ার উদ্ভাসিত হওয়ার আগেই  সিডনি সান  এর হয়ে কাজ করতেন রিচি বেনো। খেলোয়াড়ি জীবনেও ধারাভাষ্য শুরু করেছিলেন । ১৯৬০ সালে বিবিসির হয়ে রেডিও ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন, অংশ নিয়েছিলেন অনুশীলন কর্মসূচীতে। টেলিভিশনে প্রথম ধারাভাষ্য দিয়েছিলেন এর বছর তিনেক পরে, ১৯৬৩ সালে।

    তবে অবসর নেওয়ার পর শুরু করেন পুরোদমে। ধারাভাষ্য, সাংবাদিকতা। সেই যে শুরু, এরপর তার একেকটা শব্দ যেন পরিনত হলো ‘কিংবদন্তি’ তে। তার বলার ভঙ্গি, শব্দচয়ন, রসবোধ আর সবার ওপরে ক্রিকেটীয় জ্ঞান- রিচি বেনো নিজের ‘জাত’ চেনালেন আবার। কি ইংল্যান্ড, কি অস্ট্রেলিয়া, কি বিবিসি, চ্যানেল ফোর বা চ্যানেল নাইন, তিনি না থাকলে যে সম্পূর্ন হতো না সম্প্রচার! ক্রিকেটকে বদলে দেওয়া কেরি প্যাকারের ওয়ার্ল্ড সিরিজেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন রিচি।

     

    ৪.

    ভালবাসতেন ঘোড়দৌড়ে বাজি খেলা আর গলফ। শেষ ষাট বছর ধরে বন্ধু ধারাভাষ্যকার জ্যাক বেনিস্টারের সঙ্গে বাজি খেলেছেন তিনি। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, প্রতি শনিবার তারা ফোনে ঠিক করতেন, ঘোড়দৌড়ের বাজি কার হয়ে লাগাবেন। পুরস্কার হিসেবে থাকতো নৈশভোজ। জ্যাক নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন, বিল তাকেই পরিশোধ করতে হয়েছেন বেশী। এমনকি শেষ কয়েক সপ্তাহেও রিচির হয়ে তাঁর স্ত্রী ড্যাফনে জ্যাককে ফোন করছেন! তবে ড্রাইভিংয়ে ভাল ছিলেন না খুব একটা। তাঁর পরিমন্ডলের মানুষরা সুকৌশলে তাই তার ‘লিফট’ এড়িয়ে যেতেন।

    ২০১৩ সালে গলফ খেলে ফেরার পথে কার নিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েন। তবে রিচি নিজের চেয়ে বেশী দুশ্চিন্তায় ছিলেন নিজের ‘১৯৬৩ ভিন্টেজ সানবিম আলপাইন’ নিয়ে! সেই দুর্ঘটনার চোট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই প্রকাশ করেন ক্যান্সারের সঙ্গে নিজের লড়াইয়ের কথা। ত্বকের ক্যান্সার বাসা বেঁধেছিল আরও আগেই, রিচি বেনো নামক অসাধারণ এই ক্রিকেট ব্যাক্তিত্বের শরীর!

     

    ৫.

    ১২ সেপ্টেম্বর, ২০০৫। দ্য ওভাল। ঐতিহাসিক অ্যাশেজের শেষ দিন। ইসিবির সঙ্গে চ্যানেল ফোরেরও চুক্তি শেষ ওই সিরিজেই। ইসিবির নতুন সম্প্রচার স্বত্বাধিকারী তখন স্কাই স্পোর্টস। ‘ফ্রি-টু-এয়ার’ পদ্ধতি থেকে ইংলিশ ক্রিকেট প্রবেশ করছে ‘পে-পার-ভিউ’ পদ্ধতিতে। রিচি বেনোর বয়স তখন ৭৪। সেই বয়সে দাঁড়িয়ে রিচি বদলাতে চাইলেন না। আগের পদ্ধতিতেই তাই শুধু চ্যানেল নাইনের হয়ে ধারাভাষ্য চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ব্রিটিশ টেলিভিশনে সরাসরি ধারাভাষ্যের প্রায় ৪২ বছরের ইতি টানলেন।

    শেষ পানিপানের বিরতির সময় ওভালে ঘোষণা এলো। দর্শকরা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে শেষবারের মতো ধন্যবাদ জানালেন। অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড়দের হাতে পানির বোতল, তা নিয়েই সবাই ঘুরলেন ধারাভাষ্য কক্ষের দিকে। অভিবাদন জানালেন। বড় স্ক্রিনে ভেসে উঠলো, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, রিচি বেনো, দ্য মাস্টার অব দ্য মাইক্রোফোন’। বেনো তখনও নির্লিপ্ত। কিছুই বললেন না। একসময় সেদিনের ওভালের পরিবেশ বর্ননা করতে গিয়ে বললেন, ‘আজ এখানে অনেক রকমের গান শুনলাম আমরা। জাতীয় সঙ্গীত জেরুজালেম, ল্যান্ড অব হেভেন গ্লোরি । আমিও অনেক গান সঙ্গে নিয়ে ঘুরি। এর মধ্যে আন্দ্রেয়া বোচেলি আর সারা ব্রাইটনের দ্বৈত সঙ্গীত টাইম টু সে গুডবাই  ভাল লাগার গানগুলোর মধ্যে একটি। এখন সেই সময়, আমি যেমন অবহিত। আমাকেও বিদায় বলতে হবে। আমি আরও যোগ করে বলতে পারি, “থ্যাঙ্কস ফর হ্যাভিং মি”। ৪২ বছর ধরে এই যাত্রা ছিল অসাধারণ। আমি এর প্রত্যেক অংশই ভালবেসেছি। আর পুরোটা সময় জুড়েই সবার ড্রয়িং রুমে যাওয়াটা ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার। আরও ভাল লাগার বিষয় হলো, এটা ছিল অনেক মজার।’

    গ্লেন ম্যাকগ্রার বলে কেভিন পিটারসেন আউট হলেন তখনই। রিচি বলে উঠলেন, ‘তবে ব্যাটসম্যানের জন্য এতটা মজার নয়। ম্যাকগ্রা তাকে তুলে নিলেন!’ কী ‘টাইমিং’! ইংল্যান্ডের মাটিতে শেষবারের মতো ধারাভাষ্য দিতে গিয়েও!

     

     

     

    ৬.

    পৃথিবীকে ‘গুডবাই’ বলার ‘টাইমিং’টা কি ঠিক হলো? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। শরীর ভেঙ্গে পড়েছিলো, শেষ অস্ট্রেলিয়া-ভারত সিরিজে চ্যানেল নাইন কর্তৃপক্ষ তো তাঁকে বাড়ি থেকেও ধারাভাষ্য দেওয়ার ব্যাবস্থা করে দিতে চেয়েছিল। হয়নি শেষপর্যন্ত। হয়নি শেষবারের মতো সেই ‘মারভেলাস’ শব্দটা শোনাও!

    ১০ এপ্রিল সকালে ট্রেনে করে আসছিলাম চট্টগ্রাম থেকে। সেখানেই ওপরে যে বন্ধুর কথা বলেছিলাম, তার কাছেই শোনা, রিচি বেনো আর নেই।

    হয়তো শারীরিক উপস্থিতিতে থাকবেন না। থাকবেন অসংখ্য ভিডিও ফুটেজে। থাকবেন প্রিয় গেম ইএ স্পোর্টসের ক্রিকেট ০৭ এর ধারাভাষ্যেও। আর কানে বাজবে সেই কন্ঠস্বর, সেই একেকটা শব্দ।

    আর আমরা ওভালের সেই জায়ান্ট স্ক্রিনের মতো করে শুধু ধন্যবাদ দেব তাঁকে।

    ধন্যবাদ, রিচি বেনো।

    আপনি সত্যিই ছিলেন, ‘মাআআআরভেলাস’!

     

    প্রিয় প্যাভিলিয়ন পাঠক, 

    কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বের আরও অনেক কিছুর মতো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে নতুন এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরাও। প্যাভিলিয়নের নিয়মিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আপনাদের কাছে অনুরোধ থাকবে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর। আপনার ছোট বা বড় যেকোনো রকম আর্থিক অনুদান আমাদের এই কঠিন সময়ে মূল্যবান অবদান রাখবে।

    ধন্যবাদান্তে,
    প্যাভিলিয়ন