• ফুটবল

অসুন্দর চিলিতে ব্রাজিলের সুন্দরের ফুল

পোস্টটি ১৩০২২ বার পঠিত হয়েছে

১.

“শুভদুপুর সবাইকে। আপনারা এখন যে ম্যাচটি দেখতে যাচ্ছেন সেটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কুৎসিত, কদাকার এবং জঘন্য ফুটবল প্রদর্শনী। প্রথমবারের মত এই দুদল নিজেদের বিপক্ষে খেললো এবং আমরা আশা করছি এটিই যেন তাদের শেষ সাক্ষাৎ হয়। ম্যাচ শেষে বাসায় বসে আপনার মনে হতেই পারে এভাবে যারা খেলতে পারে তাদের তাৎক্ষনিকভাবেই বহিষ্কার করা উচিত ছিল।” ১৯৬২ বিশ্বকাপে  চিলি-ইতালি ম্যাচ সম্প্রচারের আগে বিবিসির ধারাভাষ্যকার ডেভিড কোলম্যান একটা সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছিলেন।

চিলি বিশ্বকাপের শুরুর আগে অবশ্য কালো মেঘ ভর করেছিল। স্বাগতিক হওয়ার লড়াইটা ছিল চিলি এবং আর্জেন্টিনার মাঝে। কিন্তু বিশ্বকাপের মাত্র দুই বছর আগে ভূমিকম্পে চিলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আয়োজক হওয়ার দৌড়ে আর্জেন্টিনাই ছিল এগিয়ে। কিন্তু তাতে বাঁধ সাধেন চিলির ফুটবল ফেডারেশন প্রেসিডেন্ট কার্লোস ডিট্টবর্ন। ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দেন, “চিলির সব হারিয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বকাপটা আমরা হারাতে দেব না। যে কোনো মুল্যে আমাদের বিশ্বকাপটা দরকার।” শোকে মুহ্যমান চিলি প্রান ফিরে পায় ডিট্টবর্নের কথায়। নতুন উদ্যম নিয়ে শুরু হয় স্টেডিয়াম নির্মাণকাজ।

ফিরে দেখা ১৯৩০ বিশ্বকাপঃ 'মন্টেভিডিও, গড ব্লেস ইউ'​

 

সময়মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারলেও, বিতর্কটা আর এড়াতে পারেনি  চিলি। সেবারের আসরকে বলা হয় ইতিহাসের অন্যতম কুৎসিত বিশ্বকাপ। বিশেষ করে স্বাগতিক চিলি এবং ইতালির ম্যাচটার নাম হয়ে আছে ‘ব্যাটেল অব সান্তিয়াগো’। চিলি বিশ্বকাপের কথা আসলেই ঘুরে ফিরে চলে আসে সেই প্রসঙ্গ। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়েও শেষ পর্যন্ত জিতেছে ফুটবলই। আরেকটু স্পষ্ট করে বললে ব্রাজিল।   


২.
টুর্নামেন্ট শুরুর আগের ভুমিকম্পের ধাক্কা তখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি চিলি। অনেকেই দেশ ত্যাগ করেছিলেন জীবন রক্ষায়। যারা দেশে ছিলেন, আঁকড়ে ছিলেন দেশাত্ববোধের মমত্ব। বিশ্বকাপকে তারা দেখছিলেন নিজেদের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্ত একটি মঞ্চ হিসেবে। কিন্তু গোলমালটা বাঁধান ইতালির ‘লা নাজোইনে’ ও ‘কোরিয়েরে দেল্লো সেরা’ পত্রিকার দুই সাংবাদিক। সান্তিয়াগো শহরকে কটাক্ষ করে তাদের লেখালেখি চিলির জনগণের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ‘সান্তিয়াগোতে ফোন কাজ করেনা’, ‘এখানে ট্যাক্সি পাওয়াটা বিশ্বাসযোগ্য স্বামী পাওয়ার মতই দুষ্কর’, ‘দারিদ্র্যতা, মূর্খতা এবং অ্যাকোহলের শহর সান্তিয়াগো’, ‘ভয়ংকর সান্তিয়াগো’ শিরোনামে একের পর আর্টিকেল ছাপিয়ে আগে থেকেই তাঁতিয়ে দিয়েছিলেন চিলিয়ানদের।

ফিরে দেখা ১৯৩৪ বিশ্বকাপঃ ইতালির হলো শুরু, অস্ট্রিয়ার হলো সারা​ 

দুই দলের ম্যাচের আগে তাই যুদ্ধের দামামা। পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে দুই সাংবাদিককে দেশে ফেরত আসলো ইতালি। তবে ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়েই গিয়েছিলো। পানশালা, রেস্টুরেন্ট এমনকি সুপারমার্কেটেও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয় ইতালিয়ানদের। খেলোয়াড়দের প্রাকটিস সেশনে ইতালিয়ানদের পাহারার দায়িত্বে সবসময়ের জন্য নিয়োজিত রাখা হয় আর্মড গার্ড।

ম্যাচের দিন দলে দলে স্বাগতিক সমর্থকেরা মাঠে, মাঠের চারপাশে জড়ো হচ্ছিলেন দলকে সমর্থন জোগাতে। উত্তেজনা আঁচ করতে পেরে আগেই নির্ধারিত স্প্যানিশ রেফারি সরিয়ে এই ম্যাচের দায়িত্ব দেয়া হয় ইংলিশ রেফারি কেন অ্যাস্টোনকে। বিশ্বকাপে চিলির প্রথম ম্যাচেও তিনিই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে সেটি ছিল স্রেফ ফুটবল ম্যাচ আর তিনি যে ম্যাচটি পরিচালনা করতে যাচ্ছিলেন সেটি পরিণত হতে যাচ্ছিলো কুরুক্ষেত্রে।

রেফারি ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজতেই একটা ট্রেলার দেখা গেল। মাত্র ১২ সেকেন্ডেই হলো ম্যাচের প্রথম ফাউল, চার মিনিটে প্রথম লাল কার্ড। সেটা নিয়েও বিপত্তি। রেফারি লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন জর্জিও ফেরারিকে। কিন্তু তিনি মাঠ থেকে বের হবেন না! পরে সেই ঝামেলায় খেলা শুরু হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে গেল আরেকবার! ১০ মিনিট ধরে পরিস্থিতিই সামাল দিলেন রেফারি। 

ফিরে দেখা ১৯৩৮ বিশ্বকাপঃ আজ্জুরিদের সঙ্গে ফ্যাসিজমের জয়

ফেরারি মাঠ ত্যাগ করলেও উত্তেজনায় ভাটা পড়েনি একটুও। লাথি, ঘুষি, হাতাহাতি, অযাচিত ফাউল, গালাগাল, ঘুষিতে নাক ভেঙে দেওয়া – এ যেন এক রণক্ষেত্র। পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে এগুচ্ছিল। খেলোয়াড়রা প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের আহত করার দিকেই ছিলেন বেশি মনোযোগী। ফলাফল যাই হোক না কেন, যেন একে অপরকে আহত করার মাঝেই নিহিত ছিল জয়! এসবের মধ্যে চিলির লিওনেল সানচেজ পার পেয়ে যান গুরুতর দুটি অপরাধ করেও। সাবেক প্রফেশনাল বক্সারপুত্র সানচেজ প্রথমে ইতালি অধিনায়ক হুমবারতো মাসচিওর নাক ভেঙে দেন ঘুষিতে, পরে আহত করেন মারিও ডেভিডকেও। যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে উল্টো মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হন ডেভিডই! তিন দফা পুলিশি হস্তক্ষেপের পর সেদিন শেষ পর্যন্ত চিলি জিতলেও আজও ম্যাচটি স্মরণীয় হয়ে আছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের কুৎসিততম ম্যাচ হিসবেবেই।

“আমি একটি কঠিন ম্যাচ আশা করেছিলাম, অসম্ভব নয়। কিন্তু সেদিন মাঠে যা হয়েছিল তা ছিল আমার চিন্তারও বাইরে। মনে হচ্ছিল আমি কোনো ফুটবল ম্যাচ পরিচালনা করছি না, আম্পায়ারের দায়িত্বে আছি মিলিটারি যুদ্ধক্ষেত্রে। একটা পর্যায়ে আমার মনে হচ্ছিল মাঠে লড়াইটা মূলত হচ্ছে আমি বনাম ২২ জনের মধ্যে।” – ম্যাচ শেষে বলেছিলেন  অ্যাস্টোন।

                                    ফিরে দেখা ১৯৫০ বিশ্বকাপঃব্রাজিলকে আজও কাঁদায় মারাকানাজো


৩.
ব্যাটেল অফ সান্টিয়াগোর এই একটা ঘটনা বাদ দিলে অবশ্য এই বিশ্বকাপও ছিল ব্রাজিলের আধিপাত্যের। স্বাগতিক চিলির স্মরণীয় সাফল্য, ‘ব্যাটেল অব সান্তিয়াগো’, পেলের ইনজুরি, শারীরিক ফুটবল প্রদর্শনী, মাঠে পুলিশি হস্তক্ষেপ – সব মিলিয়ে তাই বিশ্বকাপটা শেষ পর্যন্ত মনে রাখার মতোই ছিল! তবে এতো কিছুর মাঝেও একজন নিজের আলোটা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন পুরো টুর্নামেন্ট। পেলের তারকাদ্যুতির কাছে ম্রিয়মাণ গারিঞ্চা সেই বিশ্বকাপে হয়ে উঠেছিলেন ব্রাজিলের মূল স্তম্ভ। ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপের একটা বড় অংশ সাইডলাইনেই কাটিয়েছিলেন পেলে। তবে ব্রাজিলকে বিশ্বফুটবলের এক পরাশক্তি হিসেবে আত্নপ্রকাশের যে স্বপ্ন ছিল তার, সেই ব্যাটনটা নিজের কাঁধে নিয়ে এগিয়ে যান গারিঞ্চা। পরপর দুটি বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে পাকাপাকিভাবেই বিশ্বফুটবলে নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাব ঘটে সেলেসাওদের।

চার বছর আগে শিরোপাজয়ী দলটার থেকে চিলি বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলে পরিবর্তন ছিল সামান্যই। পেলে ততদিনে হয়ে উঠেছেন একজন পরিপূর্ণ ফরোয়ার্ড, বয়সের সাথে হয়েছেন আর শাণিত। আর ক্রমশ নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়া গারিঞ্চা ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। এই দুজন ছাড়াও ব্রাজিলের সেই দলটিতে তারকাদ্যুতির কোন  অভাব ছিলনা। অনুমিতভাবেই ব্রাজিল সহজেই পার হয় গ্রুপ পর্বের বাঁধা, তবে হারাতে হয় প্রানভোমরা পেলেকে। মেক্সিকোর বিপক্ষে ২-০ তে জয় পাওয়া ম্যাচে ইনজুরির শিকার হয়ে পেলে ছিটকে যান বিশ্বকাপ থেকেই। তবে দলটা ব্রাজিল বলেই পেলের অনুপস্থিতি তেমন প্রভাব ফেলেনি শিরোপা ধরে রাখার মিশনে। পেলের জায়গায় খেলতে নেমেছিলেন যিনি, সেই আমারিলদোর নাম হয়ে গিয়েছিল ‘সাদা পেলে’। গায়ের রঙটাই আলাদা, আমারিলদো বুঝতে দেননি পেলের অভাবটা। পুরো টুর্নামেন্টে করেছিলেন ৩ গোল, তার একটা আবার ফাইনালে।  

ফিরে দেখা ১৯৫৪ বিশ্বকাপঃ অলৌকিক বার্নে জার্মান-জাগরণ​

৪.
কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডর বিপক্ষে তার জোড়া গোলেই সহজ জয় পায় ব্রাজিল। সেমিফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ স্বাগতিক চিলি। ঘরের মাঠের সমর্থন অবশ্য ব্রাজিলিয়ানদের সামনে আর কাজ দেয়নি। আসলে গারিঞ্চাই বাধা হয়ে দাঁড়িছিলেন চিলির ফাইনাল স্বপ্নে। কোয়ার্টার ফাইনালের মতো সেমিফাইনালেও জোড়া গোল করলেন গারিঞ্চা। তবুও ম্যাচটা মন মতো হলো না তার। চিলির বিপক্ষে কার্ড দেখে ফাইনাল থেকে ছিটকে পড়লেন গারিঞ্চা।  

এমনিতেই দলে নেই পেলে, তাই ফাইনালে দলের সেরা তারকা গারিঞ্চার বহিষ্কার ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করে ব্রাজিলের ফুটবল ফেডারেশন। গারিঞ্চার ফাইনালে খেলা নির্ভর করছিলো ফিফা ডিসিপ্লিনারি কমিটির সিদ্ধান্তের ওপর। এরই মধ্যে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের কাছ থেকে ফোন পান সে আসরের প্রধান রেফারি আর্তুরো। ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন একটা আবদারই করেছিল তার কাছে! তিনি যেন গারিঞ্চার পক্ষে তিনি সাক্ষ্য দেন এবং বাকি প্রমাণাদি দুর্বল করে দেন সেই অনুরোধ করেছিলেন ব্রাজিল ফুটবলের প্রেসিডেন্ট। আর্তুরোও তার কথা শুনলেনও! নাটকীয়ভাবে ডিসিপ্লিনারি কমিটির শুনানীতে হাজিরই হলেন না উরুগুয়ের লাইন্সম্যান এস্তেবান মারিনো।  যিনি ছিলেন ওই ঘটনার মূল সাক্ষী। ফলে উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে ফিফার কাছ থেকে সবুজ সংকেত মেলে গারিঞ্চার, ফাইনালে খেলছেন তিনি। 

পরে জানা যায় ব্রাজিলিয়ান রেফারি জন ইটজেল ব্রাজিল ফেডারেশন থেকে দশ হাজার ডলার পেয়েছিলেন মারিনোকে সাক্ষী দেয়া থেকে বিরত রাখার জন্য। ঘটনাবহুল নাটকের শেষটাতেও ছিল বাঁক। যখন জানা গেল ইটজেল মারিনোকে আসলে দিয়েছিলেন পাঁচ হাজার ডলার, বাকিটা নিজেই পকেটে পুরেছেন। এক ঢিলে দুই পাখি শিকার বুঝি একেই বলে!

ফিরে দেখা ১৯৫৮ বিশ্বকাপঃ একজন কিংবদন্তির জন্ম 

ফাইনালে ব্রাজিল প্রতিপক্ষ চেকস্লোভাকিয়া। আগের দুই রাউন্ডে অঘটন ঘটিয়ে হাঙ্গেরি এবং যুগোস্লোভিয়াকে বিদায় করে ওঠা চেকরা অবশ্য মোটেও সহজ প্রতিপক্ষ ছিলোনা। বরং আরেকটি বড় অঘটনের সংকেতই দিয়ে রেখেছিল তারা। মাত্র ১৫ মিনিটেই চেকদের এগিয়ে দেন জোসেফ মাসোপুস্ট। তবে খুব বেশিক্ষণ আর পিছিয়ে থাকতে হয়নি ব্রাজিলকে। সেই আমিরালদোর গোলেই দ্রুত ম্যাচে ফেরে তারা। আক্রমন-পাল্টা আক্রমণে প্রথমার্ধে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে সমানতালে লড়াই চালিয়ে গেল চেকরা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে তাদেরকেই আর চেনা গেল না।


সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবারও সেই আমারিলদোই আরেকবার ত্রাতা হয়ে আসেন। এবার অবশ্য গোল করলেন না, করালেন। তার পাস থেকে ৬৮ মিনিটে গোল দিয়ে ২-১ গোলের লিড এনে দেন জিতো। ব্রাজিলের জয়টা নিশ্চিত হয় আর কিছুক্ষণ পরই, তৃতীয় গোলটি করেন ভাভা। ৩-১ গোলের ফাইনাল জিতে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল।  

৫.
ফাইনালে গোল না পেলেও ১৯৬২-এর আসরকে গারিঞ্চার বিশ্বকাপও বলা যায় অনায়াসে। ১৯৫৪ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে গারিঞ্চার জায়গা না পাওয়াটাই ছিল বিস্ময়কর। ১৯৫৮ তে ছিলেন দলে, বিশ্বকাপ জয়ে রেখেছিলেন বড় অবদান। তবে তারকায়া ঠাসা সেই দলে আলোটা ঠিক পাননি গারিঞ্চা, তাও যতটুকু পেয়েছিলেন তাও ম্লান হয়ে গিয়েছিল ১৭ বছরের পেলের উদ্ভাসিত নৈপুণ্যে। ১৯৬২ তে সুযোগটা পেয়ে তাই দুহাতে নিতে ভুল করেননি। 

চোখধাঁধানো ড্রিবলিংয় প্রতিপক্ষের ডিফেন্স তছনছ করে দেওয়াটা তার কাছে ছিল যেন সহজতম কাজ। একবার বিশ্বকাপের এক ম্যাচে গারিঞ্চাকে ট্যাকল করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার মাটিতে পড়ে যান। খেলা থামিয়ে বলের ওপর এক পা রেখে সেই খেলোয়াড়কে নিজেই হাত দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর জন্য সাহায্য করেন। এরপর গারিঞ্চা সেই ডিফেন্ডারকেই ড্রিবল করে পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। গারিঞ্চার কাছে ড্রিবল করাটা ছিল আনন্দময়, তিনি যখন চাইতেন তখনি ড্রিবল করতেন। চাইলে প্রতিপক্ষের জন্য অপেক্ষাও করতেন, তারা এগিয়ে আসতেন এবং হতভম্ব হয়ে দেখতেন ড্রিবলিং করাটা পৃথিবীর কত সহজতম একটি কাজ। সমসাময়িক যারাই তার সাথে খেলেছেন কিংবা বিপক্ষে, তাদের অনেকের কাছেই তিনি সর্বকালের সেরাদের কাতারে একজন। এ বিষয়ে বিস্তর মতবিরোধ থাকলেও ইতিহাসের অন্যতম সেরা ড্রিবলার এবং রাইট উইংগার হিসেবে সবাই একবাক্যে গারিঞ্চাকে মেনে নেন।

ফুটবলপ্রেমীদের দুর্ভাগ্য টেলিভিশন যুগের আগেই গারিঞ্চা তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়টা পার করে এসেছিলেন। তবে যারাই ১৯৫৮ এবং ১৯৬২ বিশ্বকাপের ফুটেজ দেখেছেন, একবাক্যে স্বীকার করে নেন গারিঞ্চা ছাড়া দু’টির কোনো বিশ্বকাপ জয়ই সম্ভব ছিলনা ব্রাজিলের জন্য।
 

একারণেই  হয়ত ব্রাজিলিয়ানদের একটা বড় অংশের কাছে পেলে নন, সেরা গারিঞ্চাই। যার নমুনা পাওয়া যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল স্টেডিয়াম মারাকানায় দুদলের ড্রেসিংরুমের নামকরণে। স্বাগতিক দলের ড্রেসিংরুমের নাম রাখা হয়েছে ‘গারিঞ্চা’ নামে, অন্যদিকে বিপক্ষ দলের ড্রেসিংরুমের নাম রাখা হয়েছে ‘পেলে’। এভাবেই গারিঞ্চাকে হৃদয়ে ধরে রেখেছে ব্রাজিল।