• ফুটবল

মুকুট এর স্পর্শ না পাওয়া রাজার গল্প

পোস্টটি ১৬১৬ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

fe62bf260b487a9afe13b0a8e23b382d

জিনেদিন জিদান এর সেই বিখ্যাত ঢুস এর কথা মনে আছে? আমরা সবাই আফসোস করেছিলাম যে এক কিংবদবন্তীর হাতে বিশ্বকাপ উঠল না। জিনেদিন জিদান তো সর্বকালের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসাবে দেশকে একবার হলেও বিশ্বসেরার মঞ্চে তুলে নিতে পেরেছিলেন। আজ যার কথা বলব তিনি নিজের জমানার তর্কযোগ্য সেরা ফরোয়ার্ড হয়েও আঙ্গুলছোয়া দুরত্বে বিশ্বসেরার স্বীকৃতি ফেলে এসেছিলেন।

জিদান এর আগে প্লাতিনি ছিলেন। জিদানের সময় ভিয়েরা, ম্যাকলেলে, ডেসাইয়ি, লিজারাজু, ডেশম, ট্রেজেগুয়েট ছিলেন। পরে অরি, রিবেরী হয়ে এখন পগবা বেনজেমারা আছে। হাঙ্গেরীর ইতিহাসে সেরা জেনারেশান একটাই। সেই জেনারেশানকে বলা হয় ম্যাজিক ম্যাগিয়ার্স। ১৯৫৪ বিশ্বকাপ এর ফাইনাল। অনেক চড়াই উতড়াই পেরিয়ে হাঙ্গেরী উঠে এসেছে ফাইনালে। চড়াই উতড়াই এর মধ্যে আছে ব্রাজিল এর সাথে “ব্যাটল অব বার্ন” নামে বিখ্যাত এক ম্যাচ। যেখানে গুনে গুনে ৬ টা লাল কার্ড দিয়েছিলেন রেফারী। কিন্তু ব্রাজিলকে হারিইয়ে কেবল নয় ততদিনে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের জালেও চার চারটি গোল দিয়ে ফাইনালের টিকেট কাটতে হয়েছিল উরুগুয়েকে। ম্যাজিক ম্যাগিয়ার্স এর জন্যে সে এক স্বর্নালী সময়। ফাইনালের বয়স তখন ৬ মিনিট। জার্মান ডিফেন্স এর ভুলে বক্স এর বাইরে বল এর দখল পেল হাঙ্গেরী। দুটি দ্রুত পাস ঘুরে বল চলে গেল এক ছোটখাট লোকের পায়ে। পুসকাস নামের লোকটা কোনাকুনি শটে জালে বল জড়িয়ে দিলেন। এর দুই মিনিট পরে সেই পুসকাস এর বুদ্ধিদীপ্ত পজিশনাল শিফট এর সুযোগ নিয়ে জিবারো হাঙ্গেরীকে এনে দিলেন দুই গোলের লিড। শিরোপা তখন একটু একটু করে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ওই যে একটা কথা আছে না? “ফুটবল একটা ৯০ মিনিটের খেলা যাতে দুই দল খেলে এবং শেষে জার্মানি জেতে”। দূর্ভাগ্যক্রমে ফাইনালটা ছিল ততকালীন পশ্চিম জার্মানীর সাথে। তারা বেশ আয়েশের সাথে তিনটে গোল দিয়ে ম্যাচ বের করে নিয়ে যায়। আরো বড় একটা আফসোস এর কথা শুনবেন? পরের বিশ্বকাপ এ সুযোগ ছিল আক্ষেপটা দূর করার। পুসকাস ও ছিলেন। হাঙ্গেরীও ছিল। শুধু একজন আরেকজনের ছিল না। হাঙ্গেরীও পারেনী প্রথম পর্ব পার হতে। পুসকাস ও পারেননি স্পেন এর জার্সি গায়ে একটি বার ও বল জালে জড়াতে।হয়ত একসাথে থাকা হয়নি বলেই স্রষ্টা আফসোস টা জুড়াননি। স্পেন এর হয়ে ম্যাচ ই খেলেছিলেন চারটি। অথচ হাঙ্গেরীর হয়ে লোকটির গোল রেকর্ড প্রায় অবিশ্বাস্য। ৮৫ ম্যাচে ৮৪ গোল করা ফরোয়ার্ড যে প্রতি যুগে আসে না।
রিয়াল মাদ্রিদ এর পুসকাস
পুসকাস এর নাম বললে হাঙ্গেরী ই আগে আসে। কিন্তু পুসকাস যতটা হাঙ্গেরীর ততটাই রিয়াল মাদ্রিদ এর ও। লীগ জিতেছেন রিয়াল মাদ্রিদ এর হয়ে পাঁচবার। স্প্যানীশ কাপ আর ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ একবার করে।রিয়ালের সর্বকালের সেরা আলফ্রেডো ডি স্টেফানর স্ট্রাইকিং পার্টনার পুসকাস ছিলেন বলেই ডি স্টেফানো আজকের ডি স্টেফানো এই কথাটা খুব যে হঠকারী তাও না। কিন্তু যেটা তাকে অমর করে রেখেছে রিয়াল এর হল অব ফেম এ সেটা হল তিনি রিয়ালের টানা ৫ টা ইউরোপিয়ান কাপ (বর্তমানে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ) এর তিনবার এর দলের আক্রমনভাগের ত্রাস ছিলেন।  রিয়াল মাদ্রিদ এর হয়ে ২৬২ ম্যাচে ২৪২ গোল। দাড়ান দাড়ান। একটু চমকে দেই। রিয়াল মাদ্রিদ এর হয়ে যখন এই ভদ্রলোক সাইন করেন তার বয়স ৩১ পেরিয়ে গেছে। মাঝ ৩০ এ ইউরোপ জুড়ে যে ভীতি আর শিহরণ তিনি ছড়িয়েছেন ডিফেন্ডারদের মনে তা এখন ও কিংবদন্তী। ৫৪ এর পরে নানা গোলযোগে হাঙ্গেরী ছাড়তে হয় পুসকাস কে। তর্কাতীত ভাবে তখনকার বিশ্বসেরা খেলোয়াড় ক্লাবের সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়েছেন অস্ট্রিয়া আর ইটালি জুড়ে। এসি মিলান বা জুভেন্টাস তার বয়সের কারনে তখন তাকে সাইন করায় নি। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড মিউনিখ ট্রাজেডির পর তার দিকে নজর দিলেও ভাষাগত সমস্যার কারনে ইংল্যান্ডে কাজের অনুমতি পান নি। যাযাবর জীবন শেষে যখন রিয়াল মাদ্রিদ তাকে আপন করে নিল, তাদের প্রতিদান তিনি দিলেন একেবারে নগদে। ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ সালে নিজের দ্বিতীয় খেলাতেই হ্যাটট্রিক। স্পোর্টিং গিজনের সাথে। ওই সিজনে আরো তিনবার ম্যাচ বল বাড়িতে নিয়ে যান তিনি। এর পরের কয়েক বছর শুধুই অর্জন এর আর গর্বের। ১৯৬৩ এর লালীগাতে দুটি এল ক্লাসিকোতেই হ্যাটট্রিক করে বসেছিলেন তিনি।এটি একটি রেকর্ড। লা লীগার ইতিহাসে প্রথম পাচ গোল করা, টানা ৬ সিজনে ২০ এর বেশি গোল করা এসব ও তার পায়েই। চারটা পিচিচি (৮ বছরে) জেতা এই লোকটি ১৯৬০ এর ইউরোপিয়ান কাপের কোয়ার্টার, সেমি আর ফাইনাল তিন পর্বেই কমপক্ষে তিন গোল করে করেছেন (ম্যাচ হিসাবে নয়। দুই লেগ মিলিয়ে)। এরপরে ইউরোপে তিনবার হ্যট্রিক হাকান আরো। তার মাঝে রিয়াল বেনফিকার ক্লাসিক ১৯৬২ ফাইনাল ও আছে যেটায় রিয়াল ইউসেবিওর অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে ৫-৩ গোলে হেরে যায়।

পুসকাস এর এর আগের ক্যারিয়ার এর দিকে তাকাতে হলে ফিরে যেতে হবে হাঙ্গেরীতে। এখানে কিস্পেস্ট আর বুদাপেস্ট হনয়েড এর হয়ে মিলিতভাবে ৩৫৮ ম্যাচে ৩৭৪ গোল আর ৫ টা লীগ। যারা এতক্ষণ শুধু সংখ্যা গুলো দেখেই সমীহ দিয়ে ফেলেছেন তাদের জন্যে আরো অনেক জিনিস বাকী। পুসকাস কে বলা যায় সুন্দর গোলের পাইওনির। দর্শনীয় নয়- এমন গোল তার গোটা ক্যারিয়ারেই সামান্য। লং শট। টাওয়ারিং হেডার। কাটিয়ে গোল। ফ্রী কীক। বাম পা ডান পায়ের মিলিত গোল। ক্যারিয়ার জুড়ে এমনই সব সুন্দর গোল করেছেন যে আজ বছর জুড়ে করা সুন্দরতম গোল এর পুরষ্কারটাই পুসকাস এর নামে দেয় ফিফা।

গাম্বিয়ার ডাকটিকেট এ পুসকাস।

পুসকাস এর ক্যারিয়ারে বিশ্বযুদ্ধ আর যুদ্ধ পরবর্তী রাজনীতি খারাপ প্রভাব ফেলেছে বারে বারে। হেলসিঙ্কি তে অলিম্পিক গোল্ড ছাড়া দেশের হয়ে পুসকাস জিততে পারেননি কিছু। ক্লাবের হয়ে সব জিতেছেন অথচ পুসকাস মানেই আজো হাঙ্গেরী। পুসকাস এভাবেই এক ধাধা। ৫৬ সালে হাঙ্গেরীয়ান বিপ্লব এর পরে পুসকাস আর হাঙ্গেরীতে পা রাখেননি। তাই হাঙ্গেরীর হয়ে আর খেলা হয়নি হাঙ্গেরীর সর্বকালের সেরা ফুটবল ম্যাজিশিয়ান এর। ১৯৫০ বিশ্বকাপ এ হাঙ্গেরী নিজে থেকে নাম প্রত্যাহার করায় ৫৪ এর আফসোস এর ফাইনাল ই রয়ে গেছে পুসকাস এর আক্ষেপ এর ঘর পূর্ন করে। পুসকাস এর আক্ষেপ এর আরেকটা ঘর হতে পারে তার ম্যানেজারিয়াল ক্যারিয়ার। স্পেন, আরব আমিরাত বা মেক্সিকো ঘুরে ১২ ক্লাব ম্যানেজ করেছেন। ৬ বার লীগ জিতেছেন। টুকিটাকি কাপ ও জিতেছেন। অসফল বলা যায় না মোটেই। কিন্তু ইউরোপিয়ান আর ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ এর ফাইনাল আবার ও তাকে হতাশ করেছে ৭১ সালে। প্যানাথিনাইকোস এর সর্বোচ্চ ইউরোপিয়ান অর্জন ও তাই থেমে আছে দ্বিতীয় হওয়াতেই। ১৯৯৩ সালে হাঙ্গেরীর কোচের দায়টাও নিয়েছিলেন। যদিও মাত্র চার ম্যাচের জন্যে। এর মাঝে একবার ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়া হাঙ্গেরী ৪-২ এ জিতে দেখিয়েছিল- ম্যাজিশিয়ান চাইলেই আরো কিছুদিন জাদু দেখাতে পারতেন।

এই হয়তো পুসকাস এর নামের পাশে কত কিছু নিয়েই তো লেখা যায়। পেলে, ম্যারাডোনাদের সাথে পুসকাস এর পার্থক্য শুধু তিনি এক গোলের জন্যে ফাইনালটা জিততে পারেন নি। পারলে হয়তো পুসকাস হতেন তাদের নামের সাথে নাম নেয়ার মত একজন। আরো কিছুদিন ম্যানেজার থাকলে হয়তো হতে পারতেন বেকেনবাওয়ার এর মত একজন। ডি স্টেফানোর ছায়ায় ঢাকা না পড়ে গেলে হয়তো হতে পারতেন রিয়াল মাদ্রিদ এর সর্বকালের সেরা। যুদ্ধের ডামাডোল কয়টা বছর কেড়ে না নিলে হয়তো হতেন ক্লাব পর্যায়ে সর্বকালের সেরা। এর কিছুই হয় নি। কিন্তু তার পরেও ফুটবল ইতিহাসের পাতায় ফেরেঙ্ক পুসকাস এক মহানায়ক। এক অমর কিংবদন্তী। রিয়াল মাদ্রিদ এর ছোট ম্যাজিশিয়ান, ম্যাজিক ম্যাগিয়ার্স এর চেরি অন দ্যা টপ।