• ক্রিকেট

কৌশিক দৌড়াচ্ছে। স্ট্যাম্প উড়বেই!

পোস্টটি ১১৬৫৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

মাশরাফিকে নিয়ে লিখতে বসলে আসলে ব্যাপারটা একটা ভয়াবহ সমস্যা দেখা দেয় প্রথম শব্দ থেকেই। এই লোকটি কতটা অসাধারণ পারলে প্রতিদিন সেটা নিয়ে একবার করে কেউ না কেউ লিখে। কেউ না কেউ বলে নি এমন কোন কথা মনে হয় এই ব্যাক্তিকে নিয়ে নেই। খেলোয়াড়ের সীমা ছাড়িয়ে মানুষ, মানুষের সীমানা ছাড়িয়ে নায়ক কখনো নায়কের সীমানা ছাড়িয়ে মহানায়ক। মানুষের মনে এই লোকটিকে নিয়ে অনুভূতি এত প্রখর যে মিরপুরের গ্যালারীতে গালিগালাজ সমৃদ্ধ একদল অবুঝ দর্শক এ ভরা থাকার এত দুর্নাম এর পরেও এই লোকটা হাটুতে চোট পেয়ে পড়ে গেলে ২৫ হাজার দর্শক এর মুখের কথা একবারে বন্ধ হয়ে যায়। মিরপুরে খেলা চলাকালে নেমে আসে অদ্ভুত এক নীরবতা।

দিনে দিনে বেলা তো ওই দুই হাটূর কম হয়নি। ১৬৩ ওয়ানডে ম্যাচের পাশে অনেকদিন আগে থেকে ছেড়ে দিলেও ৩৬টা টেস্ট এও লম্বা রান আপ নিতে হয়েছে সেই হাটূগুলোকে। স্বাভাবিক মানুষের মতই দুটো হাঁটু। অস্বাভাবিক যেটা তার প্রতিটাতেই ৭ বার করে অপারেশান। এই তথ্যটা দিয়ে দিলে পরিসংখ্যান বড়ই বোকা মনে হয়। তারপরেও ৩৬ টেস্টে ৭৮ আর ১৬৩ ম্যাচে ২০৮ উইকেট বেশ তুখোড় বোলার এর সাক্ষ্যই দেয়। কিন্তু এর চেয়ে ঢের ভাল বোলার আছে। আজকাল বাইরে তাকাতেও হয় না। পরিসংখ্যান, গড়, ইকোনমি আর স্পেল এর হিসাবে এমন বোলার এদেশেও যে এক দুটো নেই তাও না। তাহলে সবাই কেন মহানায়ক হয়ে উঠে না?


এই প্রশ্নের উত্তর জানতে ফিরে যেতে হবে কৌশিক পাগলার কাছে।আপনি তো জানতেন মাশরাফি আর কৌশিক একই লোকের নাম? ভুল জানতেন। মাশরাফি যেখানে দলের সবচেয়ে সিনিয়র খেলোয়াড় কৌশিক সেখানে পাগলা। মাশরাফি যেখানে দলের তিন নাম্বার বোলার কৌশিক সেখানে দেড়শ ছুই ছুই গতিতে বল করা দানবীয় পেসার। ১৭ বছর বয়সী ঝড় তোলা এক কিশোর। দেড়শ কিলোমিটার!মনে হয় আবেগে একটু বাড়িয়েই বলে ফেলেছি। কিন্তু দেড়শ না হলেও হালের তাসকিন বা রুবেলরা তখনো এদেশের মানুষের কাছে স্বপ্ন। এদেশের পেসার রা তখনো শেন ওয়ার্ন বা আফ্রিদির জোরের উপর করা ডেলিভারির স্পিড এর সাথে পাল্লা দিয়ে পেস বল করেন। যারা বোলিং শুরু করেন তাদের নামের পাশে লেখা থাকে right arm slow medium. সেই বোলিং এটাক দিয়ে কোন আমলে পাকিস্তান কে আমরা কাত করেছিলাম বিশ্ব আসরে। আমাদের ক্রিকেট ঘোর এরপরে আর কাটে না। কিন্তু আমরা শুধু হারি। টেস্ট খেলতে নেমে স্টিভ ওয়াহ ৫ স্লিপ এর কমে ফিল্ডার দিতেন না প্রথম সেশানে। আর আমাদের ব্যাটে বলে যে কানায় যায় ই না। যা এক দুইটা এলবি ডব্লিউ পাই তাও বল পুরাতন হয়ে গেলে স্পিনার ছাড়া দাম নাই। এর মধ্যে খবর এল কোথাকার কোন ছোকড়া নড়াইল থেকে এসে ১৪৫ কিলো গতিতে গোলা ছুড়ে চলেছে। রেডিওতে গালভরা নাম এল নড়াইল এক্সপ্রেস। আমি তখনো বাচ্চাই বলা যায়। ফুলহাতা ঢোলা হলুদ সবুজ জার্সির ১৯৯৯ বিশ্বকাপ এর জার্সি আর খেলা যদিও পরিষ্কার মনে করতে পারি। আম্মুর চাপে লেখাপড়া করি আর আশায় থাকি এক দুই বল দেখতে পাব। এর মধ্যে জিম্বাবুয়ে আসল সফরে। অনেক তারকায় ঠাসা হলেও পেপার পড়ে জানলাম যে এরাই মোটামুটি দুর্বল। ক্লাস ৪ এর বইটা হাতে নিয়েই একদিন সকালে টেস্ট ম্যাচ দেখতে বসে গেছি আম্মু না থাকার সুযোগে। এই সময় ইনিংসে হারাটা নতুন বুঝতে শিখেছি। দেখলাম বাংলাদেশের এক বোলার বেশ লম্বা রান আপ নিয়ে এসে বল ছুড়ছে এবং ক্রিজে থাকা এলিস্টার ক্যাম্পবেল বেশ হাসফাস করে বাউন্সার ছেড়ে দিচ্ছেন। এটা একটা নতুন দৃশ্য। পেসার বলতে আগে যাদের দেখেছি তারা সব অন্য দেশের যাদের বোলিং এর পরে এরকম ঘটনা হয়। সেই বোলারেরা মাঝে মাঝে স্ট্যাম্প নিয়ে ছিনিমিনি খেলেন আমাদের দেশের ব্যাটস্ম্যানদের। এখানেও তেমন কিছু হবে নাকি? অনেক আশা নিয়ে পরের বল দেখলাম। এবং পরের বলেই এলিস্টার ক্যাম্পবেল কে বাক খাওয়ানো এক অদ্ভুত ডেলিভারিতে মিডল স্ট্যামপ হারিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম। পরে জেনেছিলাম যে ১৬ রানের টার্গেট ই আমরা দিতে পেরেছিলাম তাদের। বোল্ড আউট টা ছাড়া আর তেমন কিছু মনে নাই। কিন্তু টেস্ট এ তো জার্সির পিছে নাম লেখা থাকে না। খুজে পেতে মাশরাফি নাম টা পেতে হল তাই পরের দিনের পেপার দেখে। সেই প্রথম লোকটার উপরে বিশ্বাস জন্মাল। হ্যা আমরাও তো মনে হয় পারি।

ইনজুরী আর মাশরাফি এমন অদ্ভুত এক যুগল যেটা নিয়ে আফসোস, সহানুভূতির পর্ব শেষে এদেশের মানুষকে এক সময় বিরক্তির কাছে নিয়ে গিয়েছিল। তিতা শুনালেও সত্য যে – এত যদি ইনজুরীতেই পড়ে লাভ নাই খেলে এই ধরনের বক্তব্যে নতুন প্রস্ফুটিত সোশ্যাল মিডিয়াকে বেশ কয়বার জ্ঞানী হয়ে উঠতে দেখেছি। কিন্তু আমার মনে তো মাশরাফি মরে না। মাশরাফি নিজেই যে মরতে দেয় না। ২৬ ডিসেম্বর ২০০৪ এ রাজউক কলেজ এ ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বসেছি বাংলাদেশ ভারত খেলা দেখতে। সুনামিতে লন্ডভন্ড হচ্ছে দক্ষিনের দক্ষিন এশিয়া আর বংগবন্ধু স্টেডিয়ামে ভারত। সে ম্যাচে ব্যাটসম্যান মাশরাফি ৩১ রান করেছিল বলে ২০০ পার হল স্কোর। তখনো জানি না সামনে কী অপেক্ষা করছে। টেন্ডুলকার নেই, শেবাগ তো আছে। শেবাগ থাকল মোটে তিন বল। মাশরাফি তাকে বোল্ড করে যে হুঙ্কারটা দিল তাতেই যেন ভারত সুনামিতে কেপে গেল। নিয়মিত উইকেট হারালেও সৌরভ গাঙ্গুলী গাদের আঠার মত ম্যাচ বের করে নিয়ে যাবার নিয়তে পরে ছিলেন। তাকেও বিদায় করলেন মাশরাফি। বল করে নয়। বল হাতে নিয়ে। খালেদ মাহমুদকে যে গতিতে কাট করেছিলেন বামহাতি সৌরভ তা প্রায় পারফেক্ট ছিল। কেউ একজন ওভাবে হাতে জমিয়ে ফেলবে এটা কেউ মনে হয় ভাবেনি।

এরপরে অলিখিত নিয়ম হয়ে গেল যে বাংলাদেশ জিততে হলে মাশরাফিকে প্রথম হুমকিটা দিতে হবে। ২০০৫ এ আশরাফুলের বীরত্বে ঢাকা পড়ে যায় যে গিলক্রিস্ট কে শুন্যহাতে মাশরাফি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বলেই মনে হয় টার্গেট ২৫০ পার হয় নি। টুকিটাকি ইনজুরী সহ এসময়টায় বেশ ভালোই ম্যাচ পেয়েছেন মাশরাফি। ইনজুরী ততদিনে অনেকটা গতি কেড়ে নিয়েছে। রান আপ ছোট হয়েছে। ডক্টর ইয়াং কে বাংলাদেশে বিখ্যাত করে তুলেছে মাশরাফির হাটূ। কিন্তু দিনশেষে মাশরাফিই বাংলাদেশের মূল স্ট্রাইক বোলার। কলার উচু করা পাগলা। ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের সাথে সেই জয়ের আগে ধরে দিবানে বলা শেবাগের স্টাম্প নিয়ে আবার ছিনিমিনি খেলার সময় গুলোর আগে কাটিয়েছেন একটা স্বর্নালী বছর। ২০০৬ এ এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক হয়েছেন। র‍্যাঙ্কিং এ সেরা ১০ এ প্রথম বাংলাদেশি হিসাবে ডুকে পড়েছেন। এর মাঝে শেষ ওভারে ১৭ দিয়ে জিম্বাবুয়ে জেতায় দেশের লোক তাকে মুন্ডুপাত করতে গেছে তিনি কেনিয়া সিরিজের অর্ধেক উইকেট একাই নিয়ে সবাইকে চুপ করে দিয়েছেন। মাশরাফি মুখে বলেন যা তা করেন। যা বলেন না তাও করেন। এই যেমন রাহুল দ্রাবিড়কে টেস্ট এ বোল্ড করে দিলেন একবার। রাহুল দ্রাবিড় তর্কাতিত ভাবে ওই সময়ের সেরা ব্যাটসম্যান। দ্রাবিড় স্লিপে ক্যাচ বা এল বি ডাব্লিউ হতে পারেন। তবে তার স্ট্যাম্প এর নাগাল পেতে স্বয়ং ম্যাকগ্রাকেও বেশ মাথা কুটতে হত। মাশরাফি সেটা করে দেখিয়েছেন।তাও কোথায়? এদেশের ঘুর্নি উইকেট এ।আমরা গত তিন বছরের আগ পর্যন্ত মাশরাফি ছাড়া কেউ নাই বলে উইকেট ন্যাড়া বানাতাম। মাশরাফি তার সেরা বছর গুলো কাটিয়েছেন এই ন্যাড়া উইকেট এ মাথা কুটে। কারণ? আর যে মাশরাফি নেই একটাও।

হাবিবুল বাশারের পাগলা ডেভ হোয়াটমোর এর বিশেষ স্নেহধন্য ছিলেন এসব মুহুর্তের জন্যেই। এরপরে নড়াইলের কৌশিকের জীবনে আরো ইনজুরী এসেছে।আহামরি পারফারমার হিসাবে না হলেও প্রথম বাংলাদেশি হিসাবে আই পি এল এ ডাক পেয়েছেন ও ম্যাচ খেলেছেন।  অধিনায়ক হয়ে হারিয়ে আবার অধিনায়ক হয়েছেন। ১৪৫ কিলো নামতে নামতে সেই আদিযুগের ১২০ এর নিচে নেমে গেছে। পাগলা ৩৩ বছর বয়সে এখন দলের নেতা। তাতে কী পাগলা শুধরে শান্ত হয়ে গেছেন? গেছেন হয়ত। কিন্তু তার ছোয়ায় বাংলাদেশ দলটাই পাগলা হয়ে গেছে সাথে। আগে যারা এক ম্যাচ জিতলে খুশীতে ১০ মাস শান্ত থাকত তারা যাকে তাকে ডেকে এনে হোয়াইট ওয়াশ দিচ্ছে। যে পাকিস্তানকে একবার হারিয়ে চার বছর কিছুই জিতি নি পাগলার দল তাদের ধরে এমন ধোলাই দিল যে তাদের ক্যাপ্টেন কোচ পালটে একাকার। যে দক্ষিন আফ্রিকার সাথে দুই টেস্ট আর চার ওয়ানডে খেলে এককালে আমরা ৫ উইকেট নিতে পারি নি তাদের ও পাগলা মল্ম দিয়ে ওয়াশ করে দিল টিম পাগলা। বাংলাদেশ এর ক্রিকেটে এ সুদিন এসেছে। সাকিব তামিম এর পরে সাব্বির তাসকিনরা এসে যাকে তাকে ধুমসে পেটায়। পেছনে একজন থাকা মনে হয় ফরজ ছিল। সবচেয়ে যোগ্য লোকটিই তো রয়ে গেছেন। কখনো পাগলার মত প্রায় ১৩ বছরের ছোট তাসকিনের সাথে চেস্ট বাম্প দিচ্ছেন। কখনো মাশরাফি হয়ে রুবেলকে বুঝাচ্ছেন পরের বলটা স্লো ইয়র্কার দেয়া উচিত। কখনো সাকিবকে ডেকে বড় ভাই এর মত জিজ্ঞেস করছেন বল করবি নাকি এই ওভার কখনো থেরাপিস্ট হয়ে তামিমকে বলে দিচ্ছেন দরকার নাই কারো কথায় কান দেয়ার। পিটা সমানে। কখনো সৌম্যকে পাবলিক আই থেকে আড়াল করে বলছেন চান্স দেন পারবে সে। মুশফিক কে জড়িয়ে ধরে কাদেন আবার মোস্তাফিজকে ইনজুরী ফ্রী থাকতে শেখান। ১২০ কিলোর বোলার বলে যতই নাক কুচকাক অন্যরা আমরা তো জানিম এত কাবিল আমাদের আর কেউ যে নাই।

বাঙ্গালীরা স্বভাব অনুসারে তাকে নিয়ে আহা উহু করি। গুরু ডাকি। বলি captain oh my captain. মাশরাফিকে কেন পছন্দ এর উত্তরে একবার এক আত্মীয় বলেছিলেন, "এই দ্যশে অল্প দুই একটা পোলারে দেখলেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার মনে হয়। এই  পোলাটার তো হাটা চলা থেকে দাড়িটা পর্যন্ত রয়েল বেংগল টাইগার এর মত। এই দ্যাশের লোক হয়ে অরে পছন্দ না করলে হবে?" এই সবই আমাদের আবেগ। বাধভাঙ্গা আবেগ।
অতি আবেগে মুক্তিযোদ্ধা বানাইতেও যাই কেউ কেউ।
অথচ তিনি কীনা বলছেন-ক্রিকেট শুধুই একটা খেলা
পরিবারের কাছে সব সামান্য
মায়ের বা স্ত্রীর কাছে দায়িত্বের কাছে সব গৌণ
আবার ছেলেকে আই সি ইউতে রেখে দেশের জার্সিকে আপন করেও নিচ্ছেন দলের দরকারে। মাশরাফি কখনো কৌশিক হয়ে যান। কখনো কৌশিককে মাশরাফি দখল করে নেন। কী অদ্ভুত এক মানুষ।কী অদ্ভুত তার গল্পগুলো।

নায়কেরা বিখ্যাত হয়, স্ট্যাটাস মেনে চলেন। মেপে কথা বলেন। লাল নীল কাপড় পরে কল্পনার নায়কেরা আকাশে উড়েন।
মহানায়কেরা? তারা মনে হয় মাশরাফি হন। জাতীয় দলের ২ নাম্বার জার্সিটা পড়ে কলারটা উচু করেন। ছোট বড় আধাশত ইনজুরীর পরে নিজেকে বলেন- এ আর এমন কী? দৌড়া পাগলা দৌড়া।
মিরপুরে হোওওওওওওওও করে রব উঠে। আমরা আশায় থাকি।

ঐ তো কৌশিক দৌড়াচ্ছে।
আবার স্ট্যাম্প উড়বে।