• ফুটবল

বাংলাদেশের ফুটবলের পোস্টমর্টেম

পোস্টটি ৬৩১৮ বার পঠিত হয়েছে
'আউটফিল্ড’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। এখানে প্রকাশিত সব লেখা-মন্তব্য-ছবি-ভিডিও প্যাভিলিয়ন পাঠকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজ উদ্যোগে করে থাকেন; তাই এসবের সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক ও মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

8-14আমার বাবার মতে বাংলাদেশ এর ফুটবলের সেরা সময়টা আমি দেখিনি। আমার infant থেকে toddler হবার সময়টাতে আব্বুর মতে দেশের শেষ সুপারস্টার মোনেম মুন্না তার ক্যারিয়ারের মধ্যগগণ পার করে ফেলেছেন। তাই তার খেলা সরাসরি দেখার সৌভাগ্য আমার হয় নি। আর তার আগের ফুটবল নিয়ে মাদকতার জমানা যেখানে আসলাম চুন্নু বা কাওসার হামিদের নামে হালের মেসি রোনালদো বিতর্ক “নিরামিষ” এর লেভেল এ চলে যাবে সে তো আরো দুরের পথ। তবে আমার ফুটবল দেখার শুরু যে সময়ে তখন থেকেই একটা ব্যাপার জানতাম- যে রোনালদো নাজারিও বা জিদানদের দেখে ফুটবল খেলাটা আমাদের ভাল লাগতে শুরু করেছে তাদের চেয়ে আমরা মাইল এর পর মাইল পিছে। দুইশ দেশ ফুটবল খেলে আর আমরা সেখানে দেড়শ এর ঘরে ঘুরপাক খাই। এইসব ফ্যাক্ট মাথায় ঢুকতে ঢুকতে দেখলাম ২০০৩ সাফ ফুটবল। দক্ষিন এশিয়ার বিশ্বকাপ।বিশ্বাস করুন খেলা দেখে বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল যে আমাদের যত খারাপ বলে মার্ক করে রেখেছে লোকজন আমরা মনে হয় ফুটবলে অত খারাপ ও নই। রজনী নামের ডিফেন্ডারটা, আলফাজ নামের গোল করে চলা ১০ নাম্বার জার্সি পড়া ফরোয়ার্ড বা আমিনুল নামের অমানবিক সব সেভ করা গোলকীপারকে দেখে মনে হয়েছিল- যথেষ্ট ভালই তো খেলি আমরা। মতিউর মুন্নার ৩০ গজ দূরের ড্রাইভ যেদিন ভারতের জালে ঢুকল সেদিন প্রথম টের পেয়েছিলাম নিজের দেশ সাপোর্ট করতে খেলা সাপোর্ট এর বাইরেও বুকের ভেতরে আলাদা কোথায় যেন একটা টান লাগে। ক্রিকেট এর তখন ঘোর অমানিশা চলছে। অকালে টেস্ট মর্যাদা পেয়ে কেনিয়া কানাডার কাছে বিশ্বকাপে নাকাল হয়ে হতাশ বাচ্চা মনে এক দুইবার মনে হয়েছিল- তাহলে মনে হয় ফুটবল দিয়েই হবে।মাদ্রিদের  সেলেবিস বা প্যারিস স্কয়ারের মত ঢাকার কোন এক জায়গায় আমরা সাফ এর চেয়ে বড় ট্রফি নিয়ে উল্লাস করব এক যুগের মধ্যেই। আজকে ঠিক এক যুগ পরে আমাদের জাতীয় দল আগামী তিন বছর কোন জাতীয় পর্যায়ের ম্যাচ খেলতে পারবে না বলে লাইসেন্স আদায় করে নিয়েছে। দেড়শ এর র‍্যাঙ্কিং যাতে দুইশ এর ঘরে না ঠেকে সেইজন্যে আমাদের হা হুতাশ। আমরা আসলে কোথায় স্বপ্নটাকে মেরে ফেলেছি? সেই উত্তরের খোজেই এই পোস্টমর্টেম।
দক্ষিন এশিয়ার বিশ্বকাপে আমাদের সর্বোচ্চ অর্জন সেই ২০০৩ এই

ব্যাধির প্রকোপঃ
এই অকাল মৃত্যুর কারণ সবার কম বেশি জানা। এই মরণ হার্ট এটাক করে মরন নহে। এই মরণ ধুকে ধুকে মরা। তাও মরনের কারন নিয়ে একটু কাটাছেড়া করা যাক। ২০০৩ এর সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হবার পর থেকেই কথা হচ্ছিল দেশের ফুটবলকে ঢেলে সাজানো দরকার। সেই লক্ষ্য নিয়ে ওই বছর থেকেই নিয়মিতভাবে জাতীয় ফুটবল এর সবচেয়ে বড় আসর হিসাবে কাপ লিগের মিশ্রনে একটা বেশ বড় আকারের টুর্নামেন্ট শুরু হয়। নিটল টাটা গ্রুপের স্পন্সর এ পাওয়া সেই লীগের দুটো ভাল দিক ছিল। প্রথমত, নিয়মিত খেলা হত। কাপ এর মত সমাপ্তি হত বলে গোটা পাচেক হলেও মানসম্পন্ন ম্যাচ হত বছরে। আমার নিজের মনে আছে তিন বা চার বছর টানা সেই প্রতিযোগীতার ফাইনাল দেখেছি। মোহামেডান আবাহনী ছাপিয়ে ব্রাদার্স বা মুক্রিযোদ্ধার মত ক্লাব গুলো তখন মাথা উচু করে দাড়াচ্ছে আস্তে আস্তে। এই নিয়মিত খেলার ফল ২০০৫ পর্যন্ত দক্ষিন এশিয়ায় ভারতের চেয়ে এগিয়ে বেশ শক্ত ফুটবল রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ এর নাম ছিল। তবে জাতীয় দলের পাইপলাইনে খেলোয়াড় সঙ্কট আর অর্থনৈতিক বিভিন্ন অদ্ভুত সমস্যার জের ধরে সরকার মনোনীত ফেডারেশান এর উপরে অসন্তুষ্টি বাড়তেই থাকে। এবং একটি নির্বাচিত ফেডারেশান আর AFC এর বাধ্যবাধকতা অনুসারে পেশাদার লীগ চালু হবার বাধ্যবাধকতা আসে। নির্বাচিত ফেডারেশান আর পেশাদার লীগ দুটোই একটি ফুটবল মডেল এর সবচেয়ে দরকারী upgrade. তাই এখান থেকে কথা ছিল আমরা শুধু সামনে যাব। কিন্তু আমাদের জন্যে irony হচ্ছে সেটাই ছিল আমাদের ব্যাধির শুরু।

ব্যাধি ১- পেশাদার লীগ
কোন দেশের পেশাদার লীগ সেই ফুটবলের জন্যে ব্যাধি এমন উদাহরণ মনে হয় খুব বেশি নেই। আমাদের জন্যে সেটাই সত্য। পেশাদার লীগ চালু করার সময় আমাদের ফেডারেশান জাপানের JFA এর শরণাপন্ন হয়েছিল যাদের এশিয়া জোনে সবচেয়ে সমৃদ্ধ পেশাদার লীগ এর ব্যাবস্থা রয়েছে। সেখানকার পরিদর্শক আমাদের স্বাভাবিক বাতি জ্বালানো পাখি উড়ানো সভার মধ্যে বলেছিলেন- যদি সব ক্লাবের নিজের মাঠ সহ অবকাঠামো ব্যাবস্থা না থাকে আর হোম এওয়ে ভিত্তিতে খেলা না হয় তাহলে কোনভাবেই সেটা পেশাদার লীগ এর মর্যাদা পেতে পারে না। প্রায় ৮ বছর এর পেশাদার লীগ এর বয়স হয়ে গেলেও পেশাদার লিগের ন্যুনতম মান টুকু আমরা এখনো পাইনি। তাতে ক্ষতি যেটা হয়েছে পাতানো খেলা আর ক্যালেন্ডার ইয়ার এর নামে হাসি ঠাট্টার ভীড়ে আমাদের প্রতিযোগীতামূলক ফুটবল এর সবেধন নীলমনি নিটল টাটা লীগ টা হারিয়ে গেছে। সেখানেই শেষ নয়, লীগের বাইলজ এর সাথে international break বা international competition এর কোন রকম মিল না থাকায় ক্লাব গুলো জাতীয় দলের ম্যাচের আগে খেলোয়াড় ছাড়তে পারে বা চায় ও না। ফলে জাতীয় দলের এই হালের পেছনে বিশাল দায় পেশাদার লিগ কে দিতে কোন দ্বিধা আসে না।

পেশাদার লীগের সাম্প্রতিক সফলতম দল শেখ জামালের বিরুদ্ধে আছে ম্যাচ পাতানো ও স্বেচ্ছাচারিতার অনেক অভিযোগ

ব্যাধি-২  শিক্ষকতাঃ
শিরোনাম দেখে বিভ্রান্ত হবেন না। কোন কোচ আসলে আমাদের ফুটবলের জন্যে সমস্যা আজ অব্দি বয়ে আনেন নি। বরং আমরা কোচদের জন্যে পদে পদে সমস্যা তৈরি করে নিজেদের ব্যাধি বাড়িয়েছি। কোচ যদি এই বিশাল ব্যাধির সাময়িক এন্টিবায়োটিক হয় তাহলে আমরা নিশ্চিত করেছি যে সেটা যেন কোনভাবেই কাজ না করে। অটো ফিস্টার বা সামির শাকির এর মত কোচ আমাদের কোচিং করিয়ে গেছেন। এরকম মানসম্পন্ন কোচ এর সাথে শেষ দফাটা আমাদের ভাল হয় নি। জর্জ কোটানকেও আমরা ধরে রাখতে তেমন চেষ্টা করিনি। এরপরে কোচ হিসাবে এসেছেন আন্দ্রেস ক্রুসিয়ানি, এডসন সিলভা ডিডো। ক্রুসিয়ানির হাতে আমরা খারাপ করি নি বা ডিডোর হাতেও করতাম না। ডিডো সম্ভবত অনেক আগেই দেখেছিলেন পেশাদারিত্বের অভাব টাকে। আনফিট প্লেয়ারদের কঠিন পরিশ্রমের ভার দেয়ায় তারা গোস্বা করে নালিশ করায় এই ব্রাজিলিয়ানকে চলে যেতে হয় আউটফিট ছেড়ে। এরপরে সার্বিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে এক দুইজন অল্প কয়দিন এর জন্যে এসেছেন। চলেও গেছেন। জোরান দর্দেভিচ নামে টাকমাথার এক ভদ্রলোক এসে সাফ এর অনুর্ধ্ব ২৩ এর সোনা জিতিয়ে কিছু টাকা বেশি দাবী করায় বাফুফে আর সেই চুক্তির দিকে যায় নি। এরপরে হল্যান্ড এর লোডভিক ডি ক্রুইফ কে অনেক বাদ্য বাজনা বাজিয়ে আনা হয়েছিল। তার সাথে ব্যাপারটা বাফুফে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ার পর্যায়ে নামিয়ে নিয়ে যায়। আজ আসেন তো কাল থাকেন না করতে করতে দুই দফায় কাজ করে একটি ম্যাচ জিতিয়েছেন তিনি। আর সর্বশেষ কোচ অটো সেন্টফিন্ট এর মাত্র দুই মাস লেগেছে বুঝতে এদেশের পেশাদারিত্বের অবস্থা। কোচের ব্যাধি থেকে আমাদের শেখার ব্যাপার আসলে বেশ কিছু
- কোচ আমরা স্কাউট করে আনি না। আনি সিভি দেখে। কেউ এসে যদি দাবী করে তিনি বার্সা একাডেমির রিজেক্ট ছিলেন কোন এক কালে তাহলে তাকেও আমরা বসিয়ে দেই জাতীয় দলের কোচের মসনদে।(স্ত্রীর চাকরীর সুবাদে ঢাকায় আসা এক বেকার স্প্যানিশ ভদ্রলোক কে এই যোগ্যতায় আমরা জাতীয় দলের ডাগ আউট ধরিয়ে দিয়েছিলাম দুই ম্যাচের জন্যে। পরে তিনি ফল বিপর্যয়ে পড়ে রাতের আধারে পালিয়ে যান) মান এর বিচারে এরপরে সামির শাকির বার অটোফিস্টার দের মান আসার আশা এরপর করাটাও এক ধরনের ব্যাধি
- মানসম্পন্ন কোচ যদি কখনো এনেও ফেলি, তাহলে তাদের সাথে বেতন এবং ব্যাবহার এ নিশ্চিত করি ভদ্রলোক যেন আর ভুলেও এমুখো না হন। ডি ক্রুইফ এর সহকারী রেনে কোস্টার (যিনি অনুর্ধ্ব ১৬ দল নিয়ে সাফ জিতিয়েছিলেন) তাকে বেতনাদি নিয়ে এ এফ সি এবং ফিফার দারস্থ হওয়া সেটাই প্রমাণ করে।

এ তো গেল জাতীয় দলের কোচ এর কথা। বাংলাদেশ এর ক্রিকেট এ স্পিনার সালাউদ্দিন,কোচ ফাহিম বা ওয়াহিদুল গনিদের নাম উন্নয়নের মূল চালিকা হিসাবে আসে। কারন এরাই প্রান্তিক পর্যায় থেকে আশরাফুল সাকিব শাহরিয়ার নাফিস বা তাসকিন দের মত প্রতিভাদের তুলে এনেছেন। ফুটবলে প্রান্তিক কোচদের ভাল মত চিনতেই বাফুফের বিশাল অনীহা। বেতন বা প্রশিক্ষণ তো স্বপ্ন। নিজের উদ্যোগে মারুফুল হকের মত একজন UEFA A লাইসেন্স করিয়ে এসেছেন। তাকে জাতীয় দলের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল বটে। তবে তার রিপোর্ট এর মূল্যায়নে অনীহাই বুঝায় তাঁর মূল্য আসলে কতটুকু।

ব্যাধি ৩- ক্লাবঃ
ঘানা নিয়মিত বিশ্বকাপ এ খেলা একটি দেশ। তাদের দেশের অর্থনীতি আমাদের চেয়ে অনেক গুনে দূর্বল আর ফুটবল ফেডারেশান আরো বেশি দুর্বল। কিন্তু সেই ঘানা থেকে কেভিন প্রিন্স বোয়াটেং বা আসমোয়াহ গায়ান এর মত প্রতিভা যেমন এসেছে তেমনি মাইকেল এসিয়েন এর মত প্রমানিত তারকাও বের হয়েছে। তাদের ঘরোয়া লীগের প্রাইজমানি দেশীয় টাকায় ২-৩ লাখ টাকার মত। আর ম্যান অব দ্যা ম্যাচের পুরস্কার এক জোড়া স্যান্ডেল। যেখানে মামুনুল ইসলাম ১৮-২০ লাখ টাকায় দলে সাইন করেন। তাহলে ঘানা কোন শক্তিতে এত আগানো? কারণ ফেডারেশান আর ক্লাব সবার দায় আছে জাতীয় ফুটবলের উন্নতির দিকে। নিজেদের খেলোয়াড় মেলে ধরার দিকে। আমাদের ক্লাব গুলো সেখানে প্রতিটি সেক্টরে অর্থকে সমস্যা হিসাবে তুলে আনে। যেসব ক্লাবের অর্থ আছে তারা নিজেদের ফেডারেশান এর মালিক মনে করতে শুরু করে আর পাতানো ম্যাচ থেকে খেলোয়াড় যত্রতত্র খেলানো কোথাও তাদের কোন নিয়ম নীতি নেই। ফ্যানবেস, স্টেডিয়াম আর একাডেমি- বিশ্বব্যাপী যে কোন ক্লাবের পরিচয় এই তিনটি । পেশাদারিত্বের সূচক ও এগুলোই। এই তিনটির কোনটির ব্যাপারে কোন ক্লাব যে আসলেই সিরিয়াস না তার প্রমাণ হতে পারে একটি উদাহরনেই।
একাডেমি যতদিন সব ক্লাবের না হবে বাফুফে নিয়ম করেছিল – অনুর্ধ্ব ২০ বছর বয়সী একজন করে খেলোয়াড়কে নামাতেই হবে। ক্লাবগুলি দায় সারার জন্যে সেই খেলোয়াড়টিকে নামিয়েই তুলে নিত। যেন দায় সারার জন্যেই করা।
এসবের ফলাফল- একাডেমি না থাকায় পাইপলাইনে হাহাকার। স্টেডিয়াম না থাকায় জাতীয় স্টেডিয়াম এর বেহাল দশা। আর ফ্যানবেজ না থাকায় ক্লাবগুলো কয়জন মানুষের শখের খেলনা। আজ বাজেট আছে তো কাল নেই। নেই অর্থনৈতিক ভিত্তি। ক্লাব যেখানে একটা ফুটবল সিস্টেম এর সবচেয়ে বড় ইউনিট হয়ে থাকে আজকে তারাই আমাদের সিস্টেম এর বোঝা।

মোহামেডান আবাহনীর পারফরম্যান্স গ্রাফ জনপ্রিয়তার মতই নিম্নগামী।
ব্যাধি ৪- মুই কী হনুরে!
একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড়- যিনি এটাকিং মিডফিল্ডার তিনি এক দলের কাছ থেকে নিয়েছেন ২০ লাখ। সেই টাকা ফেরত না দিয়ে আবার আরেক দলের কাছ থেকে নিয়েছেন ২২ লাখ। মামলা মোকদ্দমার ভীড়ে পরে ২০ লাখ ফেরত দিয়েছেন। - এমন গল্প এই দেশের ক্লাবে অহরহ। contract বলে প্রফেশনার ফুটবলে একটা টার্ম আছে যেটা এখনো ফুটবলার রা ঠিক হজম করে নিতে পারেন নি। না পারার ই কথা। এক মৌসুমে ১০ গোল করতে পারলে আপনার পিছে দুটো ক্লাব দৌড়াচ্ছে। আপনার মনে হতেই পারে –আমি তো প্রায় ম্যারাডোনা হয়ে গেলাম। কিন্তু আপনাকে সেটা থেকে বাচাবে আপনার এজেন্ট, আপনার শিক্ষা আর নৈতিকতা আর শেষে আপনার প্রফেশনালিজম। কিন্তু যেহেতু আমাদের দেশে ফুটবল মানে এখনো শুধুই বলে লাথি মারা তাই এসবের তো কোন বালাই নেই। এইজন্য “মুই কী হনুরে” রোগে বিশাল জনগোষ্ঠি এখানে আক্রান্ত। স্ট্রাইকার হয়ে বছরে ৫ গোল। তাতেও যদি আপনার বাজার না পড়ে তাহলে পারফরমেন্স এর চেয়ে টাকাটা বেশি দরকারী হবেই। এসবের পরেও তাই জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে ক্ষ্যাপ খেলতে যাওয়া আর ক্ষ্যাপ খেলতে গিয়ে একটু উন্মাতাল জীবন আর সেই উন্মাতাল জীবন পকেটে নিয়ে জাতীয় দলে খেলতে এসে মনে হওয়া- ক্ষ্যাপ খেলে তো এত পকেটে এল, জাতীয় দল কী দিল?
এইসব গল্প একটু প্রতিষ্ঠিত হলেই শোনা যাবে যে কোন ফুটবলার কে নিয়ে। এই সমস্যার নাম attitude বয়সভিত্তিক দল বা ক্লাব একাডেমিতে বিশ্বব্যাপী প্রথম শিক্ষার নাম এই এটিচিউড। you should give your life for your shirt এই কথাটা ইংলীশ একাডেমিগুলোতে প্রতিদিন সকালে একবার করে বলতে হয়। প্রফেশনালিজম এর চর্চা মধ্য বিশ এ করতে গেলে সেটা “হনু” রোগ হিসাবে ব্যাক ফায়ার করবে সেটা খুব অস্বাভাবিক ও নয়। শুধু খেলোয়াড় নয়, ক্লাব গুলোর মাঝেও একই এটিচিউড দেখা যায় একটু খুজলেই। রেলিগেটেড ক্লাব প্রিমিয়ারে থেকে যেতে আবেদন পত্র লিখে ফেডারেশান বরাবর বগের মুলুকেও এমন কোন উদাহরণ মনে হয় পাওয়া দুষ্কর। আবাহনী বা মোহামেডান এর পারফরম্যান্স গ্রাফ নিম্নমুখী হলেও স্পেশাল সুযোগ সুবিধা চাওয়া বা শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব এর বোর্ড এর সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার চেষ্টাও অপেশাদারী মনোভাব এর ই ফলাফল।

ঢাকার বাইরে খেলতে ক্লাব এর অনীহা দুরাবস্থায় আক্রান্ত স্টেডিয়ামের উপরেও চাপ বাড়াচ্ছে প্রতি বছর। ফলে জাতীয় দলের ম্যাচের মান পড়ছে সমস্যায়।
ব্যাধি ৫- ঘোড়ারোগঃ
সবাই আমরা সুযোগ পেলেই বলি ফেডারেশান এর এই দোষ, ফেডারেশান এর ওই দোষ।টাকার নয় ছয় থেকে আমলাতন্ত্র কোথাও কিছু বাদ নেই।তারা বলছেন টাকা নেই। ফিফার অনুদান বলে অনেক টাকা। তারা বলেন স্পন্সর নেই, অথচ কেউ না কেউ ঠিকই এগিয়ে আসেন শেষ পর্যন্ত।  এক ডাকসাইটে ফেডারেশান কর্তা একবার বলেছিলেন ক্রিকেট তাদের ভাত মেরে খাচ্ছে। এবং ২-৩ বছর অগ্নিঝড়া ক্রিকেট বিরোধী বক্তব্য দিয়ে বেশ খবরে থাকতেন তিনি। সমস্যা আসলে এখানেই। নিজেদের পরতে পরতে সমস্যা নিয়ে দেশের সবচেয়ে ধনী বোর্ডের সাথে নিজেদের তুলনা করা যে বাতুলতা এটা ফেডারেশান বুঝে না। সমস্যা সমাধান জাতীয় দল থেকে হয় না। সমস্যা সমাধান করতে হবে বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে এটা তাদের কেউ শিখায় না। জার্মানি ১৯৯৮ আর ২০০২ বিশ্বকাপ এ দলে ট্যালেন্ট এর অভাব এমন রিপোর্ট এর ভিত্তিতে স্কুল পর্যায়ে পুরো একটি জেনারেশান নিয়ে কাজ শুরু করে। যার ফলে নয়ার, ওযিল, মুলার, গোটজে, রয়েস বা ক্রুস এর মত তারকাদের প্রায় সমবয়সী একটা দল তৈরি হয়। যাদের প্রশিক্ষণ, সময় আর অভিজ্ঞতা দিতে জার্মান ফেডারেশান নিজেদের ক্ষমতায় সব করেছে। আর খেলোয়ড়েরাও উদবুদ্ধ ছিল বছরের পর বছর। আমাদের অনুর্ধ্ব ১৬ দলের সাদ নিপুরা বেঞ্চে বসে যাচ্ছে নিম্নমানের আফ্রিকানদের আনাগোনায়। দেশের ৫ স্বীকৃত স্ট্রাইকার মিলে ১০ আন্তর্র্জাতিক ম্যাচে ২ গোল করেছেন। আর একাডেমি চালু করে বন্ধ করে দিচ্ছি আমরা ভুল স্পন্সর পছন্দ করে। ঢাকার বাইরে খেলতে বললে পেশাদার ক্লাব গোস্বা করে দশ কথা বলে বেড়াচ্ছে মিডিয়াতে। অথচ এর মাঝে আমরা ২০২২ বিশ্বকাপ নিয়ে অনেক বড় বানী শুনেছি। লীগ আর ফেডারেশান কাপ মাঠে না থাকলেও একটা কাপ টুর্নামেন্ট এর প্রাইজমানি ১ কোটি টাকা করতে আমাদের আগ্রহ ছড়িয়েছে অনেক। ঘরোয়া ফুটবল এর মুমূর্ষূ কাঠামো নিয়ে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ এর নামে কিছু মাঝারী আর নিচু মানের ক্লাব এর টুর্নামেন্ট করি। এই ঘোড়ারোগ গুলো সাহায্য করে না। মরণ প্রশমিত করে।

 মানসম্পন্ন বিদেশীদের অভাব রয়েছে। অযোগ্য বিদেশীদের মজায়গা করে দিতে গিয়ে দেশে তৈরি হয়েছে স্ট্রাইকার সঙ্কট।

রিপোর্টের ফলাফলঃ
এই সিস্টেম পচে গেছে। ধ্বসে গেছে।যদিও সবাই দাবী করা টাকায়। আসলে সিস্টেম ধসে গেছে সদিচ্ছার অভাব আর ইগোর প্রভাব এ। কী করতে হবে? সে তো প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় আসে। আমাদের কাজ? আমরা দিন গুনব। হয়তো একদিন পোড়াবাড়ির মধ্যে গাছ গজাবে। অথবা কেউ এসে সংস্কার করে টেনে তুলবে আমাদের। ততদিন? বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম শুধুই আলোকিত এক কবরস্থান।বলতে দুঃখ লাগে। তবে সেই ব্যাক্তিটি নিঃসন্দেহে আমাদের কিংবদন্তী ফুটবলার সালাউদ্দিন বা তার আশেপাশের কেউ নন।