• ফুটবল

দ্যা নাম্বার নাইন

পোস্টটি ৭৬০৮ বার পঠিত হয়েছে

ফুটবল রূপকথার পারফেক্ট ছবিতে নায়কের শরীরে থাকে ১০ নাম্বার জার্সি। হাতে থাকে ক্যাপ্টেনের আর্মব্যান্ড আর মাথায় ঝাকড়া চুল। আমার প্রথম নায়ক এর কোনটাই ছিল না। তার মাথার চুল না থাকাটা তাকে বিখ্যাত করে দিয়েছিল আর ৯ নাম্বার জার্সিটাকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন আলাদা উচ্চতায়। লম্বা ক্যারিয়ারের কোন সময়ে টানা ১০ ম্যাচ ক্যাপ্টেনের আর্মব্যান্ড হাতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু আমার আর আমার জেনারেশানে জন্মানো অনেকের ফুটবল রূপকথায় তিনিই নায়ক। তিনিই সেরা। তিনিই সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকার।সাহস করে আরেকটু বাড়িয়ে বললে সেরা ফরোয়ার্ড ও।
গতির ঝড় তুলতে পারতেন হঠাৎ!
৮০ এর দশকে ব্রাজিল জিকো বা সক্রেটিস দের মত অসাধারন ফুটবলার উপহার দিয়েছিল। দিয়েছিল সৌন্দর্য, আক্রমন, পাসিং আর টিমওয়ার্ক এর অনুকরণীয় উদাহরণ। কিন্তু শেষ এর কোন এক জায়গায় গিয়ে গুলিয়ে ফেলত তারা। সৌন্দর্য কে সাফল্যের উপরে জায়গা দিতে গিয়ে তাদের এরকম পরিণতি একটা শিক্ষা তাদের দিয়েছিল। সেটা হচ্ছে ডিফেন্স ইজ দ্যা বেস্ট অফেন্স। এই নীতি নিয়ে ব্রাজিল ২৪ বছর পরে ১৯৯৪ এ বিশ্বকাপ ঘরে তোলে। রোমারিও বেবেতোরা তখন বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ড। দলে জায়গা পেতে কোয়ালিটি ফরোয়ার্ড দের ব্যাপক তোরজোড়। কিন্তু এর মধ্যে রোমারিওর ব্যাক আপ হিসাবে দলে ছিল ১৭ বছর বয়সী এক ছোকরা। রোমারিওর অতিমানবীয় পারফরম্যান্স মাঠে নামার সুযোগ করে না দিলেও ১৭ বছর বয়সেই ছোকরা বুঝে যায় বিশ্বজয় কেমন ব্যাপার। ভাবছেন ছোকরাকে অযথা গ্লোরীর জন্যে দলে রাখা হয়েছিল? ভুল। এই ছেলেটি তখন ক্রুজিরো এর খেলোয়াড়। ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলিয়ান সিরি এ এর এক ম্যাচে দর্শক ছিলেন ব্রাজিল এর লিজেন্ডারী রাইটব্যাক কাফু। তিনি দেখলেন এই টিনএজার সমানে ৫ টা গোল করে বসল। ওই সিজনে ২১ ম্যাচে ২০ গোলই বিশ্বকাপের দরজা খুলে দিয়েছিল তার জন্যে।

     দাঁত উচু সেই ছোকড়ার ছোটবেলার গল্প ক্লাসিক ল্যাটিন আমেরিকান ফুটবল স্বপ্নের শুরুর গল্পের মতই। ফ্যাভেলার অন্ধকার গলিতে কাপড়ের জটলার তৈরি বলে লাথি দিতে দিতে বড় হতে হতেই বুঝে যান অভাবী মানুষের জন্যে দুনিয়া খুব কঠিন জায়গা। একদিন পিজা খেতে চেয়ে বহু ভাই বোন এর সংসারে কর্মজীবি মা কে ব্যার্থ হতে দেখেছিলেন। একদিন পণ করেছিলেন মা কে একদিন দুনিয়ার সব পিজার দোকান কিনে দেবেন। এরপরে আমাজন নদীর বুকে বয়ে গেছে কোটি কিউসেক পানি। ১৯৯৮ সালের শরতের বিকাল। প্যারিস। ল্যাজিওর বিপক্ষে খেলছে ইন্টার মিলান। ল্যাজিওর ডিফেন্স এ ইটালীর রক্ষণভাগের দূর্গ আলেসান্দ্রো নেস্তা। মাঝবিরতিতে নেস্তা তার ডিফেন্সিভ পার্টনার নেগ্রোকে বলেই বসলেন-“ এ কী আপদ এদের ফ্রন্টলাইনে!” (কোন তুলনা নয়। বলে রাখা ভাল এই নেস্তা ৩৫+ বয়সে মেসিকে মার্ক করেছিলেন সফলভাবে) ৭০ মিনিটে সেই আপদ একটাই গোল করেছিলেন। কিন্তু ইটালিয়ান কাটানেচ্চিও ডিফেন্স সিস্টেম (ব্যাক ফোর এর ধারনাটা তখন শুধু ইটালিতেই জনপ্রিয়) এর এরকম সহজ উত্তর আর কারো কাছে সেই সময় ছিল না। রীতিমত ছেলেখেলা করে ঢুকে পড়ছিলেন ল্যাজিওর ডিফেন্স ছিড়েখুড়ে। পায়ে বল গেলেই হল। তোড়জোড় পড়ে যাচ্ছিল দুই দলের মধ্যেই। ল্যাজিওর খেলোয়াড়েরা পড়িমরি করে ব্যাক ট্র্যাক করতে। আর ইন্টার প্লেয়ারেরা এটাকিং থার্ড এ সাপোর্টিং পজিশান নিতে। গুগলে সার্চ দিলে প্রথম যে লিঙ্ক টা আসে ওই ম্যাচ এর তার নাম the Ronaldo Show!

ইটালীয়ান ডিফেন্স কে বরাবর ই বেশ ভুগিয়েছেন রোনালদো


                পরিসংখ্যান ই যথেষ্ট রোনালদো নাজারিও লিমাকে লিজেন্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে। ক্রুজিরোর হয়ে ১৪ ম্যাচে ১২ গোল দিয়ে শুরু আর করিন্থিয়ান্স এর হয়ে ৩১ ম্যাচে ১৮ গোল দিয়ে শেষ। এর মাঝে ইউরোপ শাসন করে যাওয়ার ১৪ বছরের ক্যারিয়ার। দুটি বিশ্বকাপ। একটি করে গোল্ডেন বল-বুট। রোনালদো স্পেনে বার্সা মাদ্রিদ দুই দলের জার্সি ধারণ করেছেন। ইটালীতে ইন্টার আর এসি মিলান। অথচ এতটাই দর্শকপ্রিয় ছিলেন যে কেউ তাকে লিজেন্ড এর চেয়ে নিচু কোন আসনে বসায়নি। খেলোয়াড়েরা সাধারণ মানুষের আইকন। রোনালদো সেখানে পরের জেনারেশান এর খেলোয়াড়দের আইকন। তার ছায়া কতটা বড় সেটা বুঝতে যেতে হবে জাতান ইব্রাহিমোভিচ এর কাছে। নিজের প্রতি বিশ্বাসে কিংবদন্তী এই সুইডিশ শিশুর মত মেনে নিয়েছেন-“ ছোটবেলায় আমি ৯ নম্বর জার্সি পড়তাম। আর বলতাম আমাকে রোনালদো নামে ডাকবে। আমি তার মত হতে চাইতাম। বল নিয়ে সে যেসব করত সেগুলো এখনো আমাকে অনুপ্রানিত করে।“ কাকা, রবিনহো বা আলেক্সান্ডার পাতোদের জন্য তিনি এক বাক্যে আইডল। কখনো চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতেন নি এই একটাই হতে পারে তার ক্যারিয়ার এর আফসোস। কিন্তু নাম্বার ৯ দের স্বর্ণযুগে যেখানে এলবার এর মত বিশ্বমানের ফরোয়ার্ড শুধু তার ছায়ায় পড়ে কখনো ব্রাজিল দলে সেভাবে থিতু হতে পারেন নি। এক জিদান ছাড়া সমসাময়িক কেউ ই তার উচ্চতায় খেলোয়াড় হিসাবে নিতে পারেন নি। সেই জিদান তার এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন-“ সেরা খেলোয়াড়? আমি ম্যারাডোনা বা পেলেকে সামনাসামনি খেলতে দেখিনি। তবে একজন সেরার সাথে কাধে কাধ ঘষার সুযোগ আমার হয়েছে। রোনালদো। নিজের দিনে তার মত আর কেউ খেলতে পারে না এটা প্রায় নিশ্চিত। অসাধারণ।“ অনেক বড় খেলোয়াড় আছেন তার সেই সময়েই। পাভেল নেদভেদ থেকে এডগার ডাভিডস। ক্লারেন্স সিডর্ফ থেকে রিভালদো। রোনালদোকে এদের চেয়ে এক লেভেল উপরে রাখতে হবে শুধু বড় আসরে, দরকারী সময়ে পার্থক্য করে দেবার সামর্থ্যের কারণে। আগেই বলেছি দুইবার বিশ্বকাপ হাতে নিয়েছেন। ৯৮ এর জিদান আর রহস্যজনক অসুস্থতা বাধা হয়ে না দাড়ালে সংখ্যাটা খুব সহজেই তিন হতে পারত। চার বিশ্বকাপে হলুদ জার্সি জড়ানো লোকটি যে তিনবার ফাইনালে দেখেছেন দলকে আর ১৫ বার প্রতিপক্ষের জালে বল জড়িয়েছেন (তখনকার বিশ্বরেকর্ড) সেই বীরত্বই তাকে ইতিহাসের সেরা নাম্বার ৯ বলে পরিচয় করিয়ে দিতে কোন কুন্ঠ্যা রাখে না। ২০০২ এর সেই আইকনিক মুহুর্ত!
     তর্কযোগ্যভাবে সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডারদের একজন পাওলো মালদিনি একবার বলেছিলেন-“ ৯৭ আর ৯৯ এর দুটি ইনজুরী না থাকলে সে সর্বকালের সেরা কে এই বিতর্কের সমাধান করে দিত”। ১৮ বছরের ক্যারিয়ারে দুই বছর যে খেলতেই পারেন নি একটি মিনিট ও। এর মাঝে একটি ইনজুরী এত ভয়াবহ ছিল যে ডাক্তার তাকে প্রফেশনাল ফুটবল ছেড়ে দিতে বলেছিলেন। দুই বছর মাঠের বাইরে কাটিয়ে যখন ফিরলেন ব্রাজিলের কোচের আসনে তখন খুতখুতে স্কোলারি। তার সামনে পরীক্ষায় শুধু যে উতড়ে গিয়েছিলেন তাই নয় তাকে কেন্দ্র করেই স্কোলারি সাহস করেছিলেন রোমারিওকে বাদ দিয়ে ২১ বছর বয়সী রোনালদিনহো আর ১৯ বছর বয়সী কাকাকে দলে নিতে। রোনালদো তার প্রতিদান দিতে ভোলেননি। ব্রাজিলের জার্সির পাচ নম্বর তারাটি উপহার দিয়েছিলেন। গত জেনারেশান এর সেরা কীপার অলিভার কান এর অসহায়ভাবে পড়ে থাকা কাঠামোর সামনে আঙ্গুল উচিয়ে দৌড় দেয়া ছবিটা এখনো ব্রাজিলের সমৃদ্ধ ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুহুর্ত। গ্যালাক্টিকোস এর হয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর বিপক্ষে হ্যাটট্রিক সহ এরকম আরো অনেক আইকনিক মুহুর্তের জন্মদাতা এই ফরোয়ার্ড ইতিহাসের সবচেয়ে পরিপূর্ন নাম্বার ৯। এই বক্তব্যের সত্যতা  কতটা এটি শুধু তারাই জানবে  যে তাকে খেলতে দেখেছে।
১০০ কেজির ছাপ পড়েছিল চেহারাতেও!
রিয়ালে ক্যারিয়ারের সেরা সময় যখন পার করে এলেন, শরীরে মেদ জমেছে। নতুন যুগের সেরাদের মত প্রফেশনাল কখনোই ছিলেন না। পার্টি করে বেড়ানো বা অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস এর কারণে ক্যাপেলো প্রায় বের ই করে দিয়েছিলেন রিয়াল থেকে। ১০০ কেজি ওজন নিয়ে যখন মিলানের ট্রেনিং এ গেলেন, মাই ডিয়ার টাইপ ম্যানেজার কার্লো আনচেলত্তি প্রায় আতকে উঠেছিলেন। বলেছিলেন
- "তুমি তো খেলার মত অবস্থায় নেই হে।"
উত্তর ছিল-"মিস্টার, আপনি আমাকে দলে রাখুন। আর নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি গোল করব।
গোল তিনি করেছিলেন। আনচেলত্তি পরে বলেছিলেন "প্রতিভার বিচারে এমন কেউ আমার হাতে আগে পড়েনি। ১০০ কেজি ওজন নিয়ে সে খেলে গেল এবং গোল ও করে বসল!"
রোনালদো নাজারিও লিমা একজন খেলোয়াড়ের চেয়ে বড় এক আবেগ। একটি ল্যান্ডমার্ক। পরের জেনারেশান এর প্রতি স্ট্রাইকার এর জন্যে একটি মাইলস্টোন।

(আগামী পর্বে সমাপ্য। রোনালদোর ইউরোপজুড়ে ছড়ানো ক্যারিয়ার এর কথা দ্বিতীয় পর্বে লেখার আশায়)

'প্যাভিলিয়ন ব্লগ’ একটি কমিউনিটি ব্লগ। প্যাভিলিয়ন ব্লগে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি এবং ভিডিওর সম্পূর্ণ স্বত্ব এবং দায়দায়িত্ব লেখক এবং মন্তব্য প্রকাশকারীর নিজের। কোনো ব্যবহারকারীর মতামত বা ছবি-ভিডিওর কপিরাইট লঙ্ঘনের জন্য প্যাভিলিয়ন কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। ব্লগের নীতিমালা ভঙ্গ হলেই কেবল সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।